আমি তো বাংলাদেশের পতাকা বহন করছি : সাব্বির

সব মিলিয়ে সময়টা ভাল কাটছে না। এক কিশোর দর্শকের গায়ে হাত তোলার অপরাধে বড় শাস্তির খড়গ ঝুলছে তার ওপর। মোটা অঙ্কের অর্থ জরিমানা। বিসিবির কেন্দ্রীয় চুক্তি থেকে বাদ আর ছয় মাস ঘরোয়া ক্রিকেট থেকে নিষিদ্ধ। এতো গেল মাঠের বাইরের চিত্র।

মাঠেও সাব্বির রহমান রুম্মনের অবস্থা কিন্তু তেমন ভালো না। শেষ ১০ মাস একদিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে রান খরায় তিনি। শারীরিকভাবে খুব ফিট। ফিটনেস ট্রেনিং আর বিপ টেস্টে ভালো করেন সময়। সাহস আছে। ভয়-ডর কম। স্ট্রোক খেলার সামর্থ্যও বেশ।

একদিনের সীমিত ওভারের ফরম্যাটে সাব্বির হতে পারেন বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ের এক কার্যকর অস্ত্র; কিন্তু সময়ের প্রবাহমানতায় সেই তেজোদ্দীপ্ত উইলোবাজিও কেমন যেন ফ্যাকাশে। ২০১৭ সালের ২৫ মার্চ ডাম্বুলায় শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে হাফ সেঞ্চুরির (৫৬ বলে ৫৪) পর শেষ ১২ ম্যাচে পঞ্চাশের ঘরে পা রেখেছেন মোটে একবার; ২৪মে ডাবলিনে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ফিফটিই (৮৩ বলে ৬৫) শেষ।

তার আগে ও পরের ইনিংসগুলোয় রান খরায় ভুগছেন সাব্বির। টানা সেই সময়ের স্কোরগুলোর দিকে তাকালেই সে সত্যতা ফুটে উঠবে। গত বছর ২৫ মার্চ ডাম্বুলায় লঙ্কানদের সাথে হাফ সেঞ্চুরির পর থেকেই শুরু শনির দশা। শ্রীলঙ্কা (০), আয়ারল্যান্ড (০) ও নিউজিল্যান্ডের (১) সঙ্গে পরের তিন ম্যাচে করেছেন মোটে ১।

পরের দুই ম্যাচে (৩৫+৬৫) মনে হচ্ছিল আবার নিজেকে ফিরে পেয়েছেন; কিন্তু এরপর আবার সেই তিমিরে পড়ে থাকা। শেষ সাত ইনিংসে কোন ফিফটি নেই। ২৪+৮+৮+১৯+১৯+১৭+৩৯ = মোট রান ১৩৮।

এ রকম অবস্থায় দর্শকের গায়ে হাত তুলে সাধারণ ক্রিকেট অনুরাগী মহল ও ক্রিকেট বোর্ডের বিরাগভাজন হয়ে পড়েছেন তিনি। এক কথায় ‘খারাপ সময়’ সাব্বিরের। সব মিলিয়ে মানসিক চাপে বিপর্যন্ত এই টপ অর্ডার ব্যাটসম্যান।

গত কিছু ম্যাচে ব্যাটে রান নেই। এ বোধ আছে ভিতরে। সে কথা স্বীকারও করেছেন অকপটে। তারপরও সব চাপ সামলে ঘরের মাঠে তিনজাতি আসরে ভাল খেলতে মুখিয়ে সাব্বির। তার দাবি এ আসরের জন্য নিজেকে বেশ ভালভাবেই প্রস্তুত করেছেন তিনি।

আসর শুরুর ৪৮ ঘন্টা আগে তাই তো মুখে এমন আত্মবিশ্বাসী সংলাপ, ‘ব্যক্তিগতভাবে আমি ভালোভাবে প্রস্তুত। যদিও গত কয়েকটা ম্যাচ আমার খারাপ গেছে।’ সেই খারাপ খেলার কারণ খুঁজে বের করে ঘাটতি পুরণের চেষ্টাও করেছেন।

সাব্বির বলেন, ‘আমি চেষ্টা করেছি, যেটা দুর্বল জায়গা আছে, তা শক্ত করার জন্য। সেসব নিয়ে কাজ করছি। এখন দেখা যাক, সামনে ম্যাচ আসছে। ভালো করার চেষ্টা করবো ইনশাল্লাহ।’

নিজের দুর্বলতার কথা মিডিয়ার সামনে প্রকাশ করতে চান না অনেকেই; কিন্তু সাব্বির সাহস নিয়েই বলে ফেলেছেন, ‘আসলে দুর্বল জায়গাটা কীভাবে বলবো বলুন! কিছু স্পিন নিয়ে কাজ করেছি। সামনের পায়ে খেলা নিয়েও কাজ করেছি। নেটে একা একা এগুলো নিয়ে সময় কাটিয়েছি। যে দুর্বলতা ছিল, তা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করেছি। ম্যাচে রান পাওয়া আসলে কপালের ব্যাপার। রান না পেলেই টেকনিক ভালো না, করলে ভালো না; আমার মনে হয় না ব্যাপারটা তেমন।’

তার বিপক্ষে সেট হয়ে আউট হয়ে যাওয়ার অনেক অভিযোগ আছে। এমন নজিরও আছে বেশ কিছু। উইকেট ও পরিবেশ-পরিস্থিতির সঙ্গে নিজেকে খাপ খাইয়ে নিয়েও শেষ পর্যন্ত উইকেট দিয়ে আসার অভ্যাস আছে। এটা কেন? টেম্পারামেন্টে ঘাটতি?

সাব্বির তা মনে করেন না। তার মূল্যায়ন, ‘এটা টেম্পারেমেন্টের ব্যাপার না। আমার খেলাই আসলে এমন। আগে যখন তিন নম্বরে খেলতাম, তখন ব্যাপারটা অন্যরকম ছিলো। এখন ছয়-সাত বা পাঁচ-ছয়ে খেলবো। এটা টিম ম্যানেজমেন্টের ব্যাপার। আমি যখন যেখানে খেলার সুযোগ পাবো, চেষ্টা করবো পরিস্থিতি অনুযায়ী খেলার। এখন আমি চিন্তা করছি, কখন কিভাবে খেলা উচিত তা নিয়ে। যদি উইকেটে থাকি, ম্যাচ ফিনিশ করবো ইনশা আল্লাহ।’

মাঠের বাইরে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ও অনভিপ্রেত আচরণের জন্য একটা বড়সড় শাস্তি পেয়েছেন। সেটা অবশ্যই তাড়া করে বেড়াচ্ছে তাকে। তাতে কী সাব্বিরের পারফরমেন্সে কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়বে? কেউ কেউ এমন ধারনা পোষণ করছেন।

তবে সাব্বিরের কথা শুনে মনে হলো, তিনি শতভাগ পেশাদার মানসিকতা থেকেই দর্শক পেটানোর শাস্তির বিষয়গুলোকে মূল্যায়ন করছেন। তার চিন্তাটা একদম পেশাদার ক্রিকেটারের মতো। আজ বিকেলে শেরেবাংলায় জাতীয় দলের প্র্যাকটিসে ওই দর্শকের গায়ে হাত তোলার কারণে বোর্ডের বাৎসরিক কেন্দ্রীয় চুক্তির বাইরে ছিটকে পড়া, অর্থ দণ্ড আর ঢাকার প্রিমিয়ার লিগসহ আগামী ছয় মাস ঘরোয়া ক্রিকেটে নিষিদ্ধ হবার বিষয়টা ভিতরে ঠিকই কাজ করছে। তবে তিনি সেটাকে বড় মানসিক আঘাত হিসেবে দেখতে নারাজ।

সাব্বির মানছেন, মানুষ হিসেবে ওই ঘটনাগুলো ভিতরে একরকম প্রভাব ফেলেছে; কিন্তু পেশাদার ক্রিকেটার হিসেবে তা নিয়ে না ভেবে মাঠে নিজের করণীয় কাজগুলো ঠিক মত করার কথাই ভাবছেন।

তাইতো মুখে এমন সংলাপ, ‘মানুষ হিসেবে আমার ওপর এ ঘটনা অনেক প্রভাব ফেলেছে। তবে যদি পেশাদার খেলোয়াড় হিসেবে চিন্তা করি, তাহলে আর ওসব নিয়ে ভাবা ঠিক হবে না। আমি তা ভাবতেও চাই না। অতীত অতীতই! যা হওয়ার হয়ে গেছে। এটার কোনো নেতিবাচক প্রভাব যাতে খেলায় না পড়ে, সেটা নিয়ে চিন্তা করছি। চিন্তা করছি ন্যাশনাল টিমকে আমার জায়গা থেকে সেরাটা দিতে। কারণ আমি বাংলাদেশের পতাকা বহন করছি। চেষ্টা করছি ভালো কিছু করার জন্য।’

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *