ফুটবল বিশ্বকাপের উন্মাদনায় যখন দেশজুড়ে কোটি মানুষের চোখ মাঠের খেলায়, তখন এর আড়ালে বরিশালে উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে অনলাইন জুয়ার আসক্তি। সহজে অর্থ উপার্জনের প্রলোভনে নতুন নতুন কিশোর-তরুণ জড়িয়ে পড়ছে অনলাইন বাজিতে। সর্বস্ব হারিয়ে অনেকেই মাদকাসক্ত হয়ে পড়ছে, শেষ পর্যন্ত পরিবারের উদ্যোগে ঠাঁই হচ্ছে মাদক নিরাময় কেন্দ্রে।
বরিশালের বিভিন্ন মাদক নিরাময় কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মাসেই অনলাইন জুয়ার কারণে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পরবর্তীতে মাদকাসক্ত হয়ে পড়া ১২৩ জন তরুণকে জেলার ছয়টি নিরাময় কেন্দ্রে ভর্তি করেছে তাদের পরিবার।
বরিশাল নগরীর এক তরুণ (ছদ্মনাম সাকিবুল ইসলাম) জানান, রাজধানীর শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করার পর দূরসম্পর্কের এক আত্মীয়ের মাধ্যমে অনলাইন জুয়ার সঙ্গে তার পরিচয় হয়। প্রথমে ৫০০ টাকা জমা দিয়ে কয়েক হাজার টাকা জেতায় তার আগ্রহ তৈরি হয়। পরে ধীরে ধীরে আসক্ত হয়ে গত দুই মাসে প্রায় দেড় থেকে দুই লাখ টাকা হারান।
তিনি বলেন, প্রথমে লাভ হওয়ায় মনে হয়েছিল সহজেই টাকা আয় করা যায়। পরে একসময় জুয়া নেশায় পরিণত হয়। ইয়াবা ও গাঁজা সেবনের পাশাপাশি অনলাইন জুয়ায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় কাটাতে শুরু করি। বিশ্বকাপ এলেই নতুন করে অনেক তরুণ এই জুয়ার ফাঁদে জড়িয়ে পড়ে।
একই নিরাময় কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন আরেক তরুণ নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, অনলাইন জুয়ার কারণে নিজের ও পরিবারের বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে তার। পরে বিষয়টি পরিবারের কাছে স্বীকার করলে তারা তাকে চিকিৎসার জন্য নিরাময় কেন্দ্রে ভর্তি করেন। স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন তিনি।
বাবুগঞ্জ উপজেলার এক যুবক (ছদ্মনাম শরিফুল) অকপটেই বলেন, বিশ্বকাপ উপলক্ষ্যে অনলাইন জুয়ায় জড়িয়ে পড়েছি। আসর শেষ হওয়ার পর নিজেকে বদলে ফেলতে চাই। অন্যদেরও এ বিষয়ে সচেতন করার চেষ্টা করব।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বন্ধু কিংবা পরিচিতজনের মাধ্যমে অধিকাংশ তরুণ প্রথমবার অনলাইন বাজির প্ল্যাটফর্মে যুক্ত হন। একবার আসক্ত হওয়ার পর জুয়ার টাকা জোগাড় এবং লোকসানের হতাশা কাটাতে অনেকেই মাদকের দিকে ঝুঁকে পড়েন। সেখান থেকে চুরি, ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধেও জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
বরিশালের দি নিউ লাইফ মাদক নিরাময় কেন্দ্রের চেয়ারম্যান মর্তুজা জুয়েল বলেন, আমাদের পর্যালোচনায় দেখা গেছে, তরুণরা প্রথমে স্মার্টফোনে অতিরিক্ত আসক্ত হয়। এরপর অনলাইন জুয়ার সঙ্গে যুক্ত হয়। পরবর্তীতে মাদক ও অপরাধপ্রবণ বিভিন্ন গোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে পড়ে। এতে একটি সম্ভাবনাময় জীবন অন্ধকারে হারিয়ে যায়। এ থেকে উত্তরণের প্রধান উপায় পারিবারিক নজরদারি ও সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি।
এদিকে অনলাইন জুয়ার সিন্ডিকেট দমনে সাইবার নজরদারি জোরদার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এর আগে ২০২৪ সালে ‘টুসকি’ নামের একটি অনলাইন জুয়া প্ল্যাটফর্মের বরিশাল বিভাগীয় প্রধানকে গ্রেপ্তার করেছিল পুলিশ। এবারও বিশ্বকাপকে ঘিরে অনলাইন জুয়া নিয়ন্ত্রণে বিশেষ নজরদারির কথা জানিয়েছে প্রশাসন।
বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার আব্দুল হান্নান বলেন, ফুটবল বিশ্বকাপ ও আইপিএলের মতো বড় ক্রীড়া আয়োজনকে কেন্দ্র করে অনলাইন জুয়ার প্রবণতা বেড়ে যায়। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। আমাদের টহল দল ও সাইবার ইউনিট সার্বক্ষণিক নজরদারিতে রয়েছে।
ক্রীড়ার সুস্থ বিনোদনকে কেন্দ্র করে যেন তরুণ প্রজন্ম অনলাইন জুয়ার মতো সামাজিক ব্যাধিতে জড়িয়ে না পড়ে, সেজন্য আইন প্রয়োগের পাশাপাশি পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সমাজের সমন্বিত সচেতনতাই সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন সচেতন মহল ও সংশ্লিষ্টরা।

