Category: জাতীয়

  • ঝালকাঠির আমড়া, পেয়ারা যাবে ঢাকায়

    ঝালকাঠির আমড়া, পেয়ারা যাবে ঢাকায়

    ঝালকাঠিতে সবজির ভালো উৎপাদন হয় এমন ইউনিয়নের মধ্যে অন্যতম সদরের গাভারামচন্দ্রপুর। পদ্মা সেতু চালুর প্রভাব পড়েছে ইউনিয়নটির গাভা গ্রামের কৃষক জালাল হোসেনের মনেও। আগে তাঁর খেতে উৎপাদিত কৃষিপণ্য বরিশাল শহরের মোকামে বিক্রি করতে হতো। এখন তিনি সরাসরি ঢাকায় পণ্য সরবরাহ করতে পারবেন।

    শুধু কৃষক জালাল হোসেনই নন, ঝালকাঠি সদরের তেরআনা গ্রামের নূর আলম, হোসেনপুর এলাকার কৃষক সুজন হাওলাদারদের মনেও আনন্দ। পদ্মা সেতুর চালু হওয়ায় উন্মুক্ত হবে ঝালকাঠির সঙ্গে সড়কপথে রাজধানী ঢাকার যোগাযোগের সব কটি বাণিজ্যিক পথ। বিশেষ করে দক্ষিণের সবজির বড় মোকাম বলে খ্যাত এ জেলায় ঘটবে কৃষিবিপ্লব। এমনটাই আশা করছেন জেলার কৃষকেরা।

    সদর উপজেলার বাউকাঠি গ্রামের কৃষক হরিপদ দাস বলেন, দ্রুত পচনশীল সবজি হিমাগারে সংরক্ষণের জন্য জেলায় কোনো ব্যবস্থা নেই। তাই জমি থেকে তুলে এনে স্বল্প মূল্যে এত দিন পাইকারদের কাছে বিক্রি করতে হতো। হরিপদ দাসের দাবি, এখন পদ্মা সেতুর কল্যাণে তিন ঘণ্টার মধ্যে পাইকারেরা সবজি নিয়ে ঢাকায় পৌঁছাতে পারবেন। এর আগে ঢাকা যেতে ফেরিতেই সময় লাগত প্রায় তিন ঘণ্টা।

    ঝালকাঠি সদরের গাভারামচন্দ্রপুর, নবগ্রাম, কীর্তিপাশা, বিনয়কাঠি এবং রাজাপুর সদর ইউনিয়নে জেলার সবচেয়ে বেশি সবজি উৎপাদিত হয়। পাশাপাশি ধান আবাদও হয় প্রচুর। এসব সবজির মধ্যে লাউ, হরেক প্রকারের শাক, কাঁচকলা ও কাঁচা মরিচ উল্লেখযোগ্য। আবার দেশীয় ফলের মধ্যে আমড়া, পেয়ারা ও নারকেল উৎপাদনে এগিয়ে জেলাটি। ধান আবাদের চেয়ে সবজি আবাদে বেশি লাভ হওয়ায় অনেকেই এখন সবজি চাষে ঝুঁকছেন।

    ঝালকাঠি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় ২০২১-২২ অর্থবছরে বোরো ধানের উৎপাদন ৫১ হাজার ৮২৯ মেট্রিক টন। ৮ হাজার ৩৪৬ হেক্টর জমিতে শীতকালীন সবজি চাষ হয়ে ১ লাখ ৬০ হাজার ৬৬০ মেট্রিক টন উৎপাদিত হয়েছে। আবার ২০১৯-২০ অর্থবছরের পরিসংখানে দেখা যায়, জেলার দক্ষিণাঞ্চলের উল্লেখযোগ্য অর্থকরী ফল হিসেবে প্রায় ৮০০ হেক্টর জমিতে ৯ হাজার মেট্রিক টন আমড়া উৎপাদিত হয়েছে। ৯০০ হেক্টর জমিতে পেয়ারার উৎপাদন হয়েছে প্রায় ১০ হাজার মেট্রিক টন।

    গত বৃহস্পতিবার সকালে সদর উপজেলার নবগ্রাম ইউনিয়নের বাউকাঠি গ্রামের কৃষক হরিপদ দাস, সঞ্জীব হালদার, কীর্তিপাশা ইউনিয়নের ভিমরুলী গ্রামের পেয়ারাচাষি স্বপন দাস, শাহজাহান মোল্লা, সঞ্জয় চক্রবর্তী ও বিনয়কাঠি ইউনিয়নের কৃষক জামাল খলিফা ও শাহ আলম খলিফার সঙ্গে কথা হয়। পদ্মা সেতু চালু হলে এ অঞ্চলের কৃষকদের জীবন-জীবিকায় কী ধরনের প্রভাব পড়বে, জানতে চাইলে তাঁরা বলেন, পদ্মা পাড়ি দিয়ে তাজা সবজি ঢাকাসহ বড় শহরে পৌঁছে যাবে। এতে এ অঞ্চলের কৃষকেরা সবজিতে অর্থনৈতিকভাবে স্বচ্ছতার মুখ দেখবেন।

    জগদীশপুর এলাকার সবজির পাইকার অমল হালদার বলেন, পদ্মা সেতু চালু হওয়ার কথা শুনেই তিনি ঢাকার কারওয়ান বাজার, নারায়ণগঞ্জসহ বিভিন্ন আড়তে যোগাযোগ শুরু করেছেন। আড়তদারেরা জানিয়েছেন, ট্রাকে সবজি নিয়ে এলে সঙ্গে সঙ্গে বিক্রির টাকা দেওয়া হবে। তবে ভোর পাঁচটার মধ্যে ঢাকায় পৌঁছাতে হবে, যা এখন সম্ভব।

    ভিমরুলী গ্রামের পেয়ারাচাষি সঞ্জয় চক্রবতী বলেন, এত দিন এ এলাকার বিখ্যাত আমড়া ও পেয়ারা এক দিন পর লঞ্চে ঢাকায় যেত। এখন পদ্মা সেতু পার হয়ে কয়েক ঘণ্টায় ঢাকা পৌঁছে দেশের বিভিন্ন জেলায় ছড়িয়ে দেওয়া যাবে।

    ঝালকাঠি জেলা শহর থেকে দূরবর্তী উপজেলা কাঠালিয়ার পাটিখালঘাটা ইউনিয়নের কৃষক সুমাইয়া রুবি ও মাহাতাব উদ্দিন বলেন, আগে তাঁদের উপজেলা থেকে শুধু দূরবর্তী রুটের যাত্রীবাহী বাস চলাচল করত। এখন সরাসরি ঢাকা থেকে পাইকারেরা ট্রাক নিয়ে আমুয়া, বরগুনা ও কাঠালিয়ায় চলে আসতে পারবেন।

    কাঠালিয়া উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. বশির বলেন, পদ্মা সেতুর চালু হওয়ায় ‘স্মল হোল্ডার এগ্রিকালচারাল কম্পিটিটিভনেস প্রজেক্টের (এসএসিপি)’ মাধ্যমে উৎপাদিত কৃষিপণ্য ঢাকায় বিক্রির উদ্যোগ নেওয়া হবে। মাঠপর্যায়ে কৃষকদের কাছ থেকে তাঁদের উৎপাদিত পণ্য সংগ্রহ করে কৃষকদের সমিতির মাধ্যমে ঢাকায় বিক্রি করা হবে।

    জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মনিরুল ইসলাম বলেন, ফেরির অপেক্ষায় আর কৃষিপণ্য নষ্ট ও সময়ক্ষেপণ হবে না। কৃষকের নগদ ও ন্যায্য মূল্য প্রাপ্তি নিশ্চিত হবে। জেলা প্রশাসক জোহর আলী বলেন, ঝালকাঠির ব্র্যান্ড পণ্য শীতলপাটি, সবজি ও পেয়ারাচাষিদের এত দিনের স্বপ্ন পূরণের দ্বার উন্মোচিত হলো পদ্মা সেতু উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে।

  • পদ্মা সেতু: ৩৫ বছরে আয় হবে ৯০ হাজার কোটি টাকা

    পদ্মা সেতু: ৩৫ বছরে আয় হবে ৯০ হাজার কোটি টাকা

    পদ্মা সেতু: ৩৫ বছরে আয় হবে ৯০ হাজার কোটি টাকা
    পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের পূর্বাভাস অনুসারে, যানবাহন চলাচল করলে পদ্মা সেতু থেকে প্রথম বছর আয় হবে ১ হাজার ৪৩০ কোটি টাকা। এ হিসাবে ৩৫ বছরে এই সেতু থেকে আয় হবে ৯০ হাজার কোটি টাকার বেশি। তবে এই টাকার সবই সেতুর নির্মাণ ও পরিচালনাকারী সংস্থা বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের ঘরে যাবে না। প্রথমেই আয় থেকে সরকারকে ভ্যাট দিতে হবে। টোল আদায়কারীর পেছনে খরচ আছে। এরপর যা থাকবে, তা থেকে অর্থ মন্ত্রণালয়কে পরিশোধ করতে হবে ঋণের কিস্তি। এসব ব্যয়ের পর টাকা থাকলে তা সেতু কর্তৃপক্ষের মুনাফা হিসেবে বিবেচিত হবে।

    এই হচ্ছে পদ্মা সেতুর আয়-ব্যয় পরিকল্পনার সংক্ষিপ্তসার। পদ্মা সেতু প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের সময় সেতুটি দিয়ে যানবাহন চলাচলের পূর্বাভাস তৈরি করে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান। পরে ২০১০ সালে নকশা প্রণয়নের দায়িত্বে থাকা পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ৩৫ বছরের যানবাহনের সংখ্যা এবং আয়ের একটা ছক তৈরি করে। এর ওপর ভিত্তি করে ২০১৯ সালের আগস্টে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে ঋণ চুক্তি করে সেতু কর্তৃপক্ষ। এতে আয়, ব্যয় ও মুনাফার বিস্তারিত উল্লেখ করা হয়েছে।

    পদ্মা সেতু নিজস্ব অর্থায়নে নির্মাণ করা হয়েছে। তবে এই টাকা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষকে ঋণ হিসেবে দিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়। ৩৫ বছরে ঋণের টাকা ১ শতাংশ হারে সুদসহ ফেরত দিতে হবে। এ জন্য তিন মাস পরপর কিস্তি পরিশোধ করতে হবে। সব মিলিয়ে ১৪০ কিস্তিতে ঋণের টাকা (সুদ ও আসলে) পরিশোধ করা হবে।

    সেতু চালুর পরের কয়েক বছর মুনাফা হবে না। ২০২৯ সালে গিয়ে কিস্তি পরিশোধের পর মুনাফা করতে থাকবে সেতু বিভাগ। ২০৫০ সাল নাগাদ পদ্মা সেতু থেকে মুনাফা হবে প্রায় ৯০০ কোটি টাকা।

    যান চলাচলের পূর্বাভাস
    ২০১৮ সালের জুলাই থেকে ২০১৯ সালের জুন পর্যন্ত এক বছরে শিমুলিয়া-কাঁঠালবাড়ি রুটে ফেরি ঘাট দিয়ে যানবাহন চলাচলের একটি হিসাব তৈরি করেছে সেতু বিভাগ। এই চিত্র ধরেই পদ্মা সেতু থেকে আয়ের একটা প্রাথমিক ধারণা করা হয়। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশনের (বিআইডব্লিউটিসি) হিসাবে, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ফেরিতে যানবাহন পারাপার হয়েছে সাড়ে আট লাখ। এ হিসাবে প্রতিদিন গড়ে যানবাহন পারাপার হয়েছে ২ হাজার ৩৩০টি।

    সেতু বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, ফেরিতে দুই ঘণ্টার মতো সময় ব্যয়সহ ঘাটে যানজটে আটকে থাকার ভয়ে অনেক পরিবহন কোম্পানি ফেরি দিয়ে বাস পারাপার করে না। তারা দুই পাড়ে বাস রেখে যাত্রীদের লঞ্চে পারাপার করায়। সেতু চালু হলে যানবাহন চলাচল বেড়ে যাবে। নতুন নতুন বাস রুট চালু হবে। ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যাও বাড়বে। মালবাহী যানবাহন পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া ফেরি পথে ভোগান্তি এড়াতে পদ্মা সেতু ব্যবহার করবে।

    সব মিলিয়ে যে পূর্বাভাস করা হয়েছে, তাতে চলতি বছর প্রতিদিন পদ্মা সেতু দিয়ে ২৩ হাজার ৯৫৪টি যানবাহন চলাচল করবে। ২০২৯ সালে তা হবে ৩৪ হাজার ৭২৫। ২০৫০ সালে এই সেতু দিয়ে যানবাহন চলাচল করবে ৬৬ হাজার ৮২৯টি।

    যেভাবে খরচ হবে টোলের টাকা
    এখন পর্যন্ত পদ্মা সেতু প্রকল্পের ব্যয় ধরা আছে ৩০ হাজার ১৯৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে জাপান সরকারের ঋণ মওকুফ ফান্ডের অর্থ ৩০০ কোটি টাকা। এই অর্থ পরিশোধ করতে হবে না। ফলে সেতু বিভাগকে আসল হিসেবে ২৯ হাজার ৯০০ কোটি টাকা ফেরত দিতে হবে। এর সঙ্গে বাড়তি ১ শতাংশ হারে সুদ গুনতে হবে। অর্থাৎ সুদ-আসলে পরিশোধ করতে হবে ৩৬ হাজার ৪০৩ কোটি টাকা।

    অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে চুক্তিতে টোলের টাকা ব্যয়ের বিস্তারিত উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, সেতুর সাধারণ রক্ষণাবেক্ষণে টোল আয়ের সাড়ে ৭ শতাংশ ব্যয় হবে। এর মধ্যে টোল আদায়কারী প্রতিষ্ঠানের খরচও আছে। প্রতি ১০ বছর পরপর বড় ধরনের মেরামত করতে হতে পারে।

    এ ক্ষেত্রে চালুর দশম বছরে ৫০০ কোটি টাকা খরচ করতে হবে। ২০তম বছরে ব্যয় করতে হবে এক হাজার কোটি টাকা। ৩০তম ও ৪০তম বছরে ব্যয় হবে দেড় হাজার কোটি টাকা করে। আদায় করা টোলের ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট কাটা যাবে। অবচয় হবে মোট নির্মাণব্যয়ের ২ শতাংশ হারে। সব ব্যয় শেষে যে টাকা থাকবে, তা থেকে অর্থ মন্ত্রণালয়ের কিস্তি পরিশোধ করতে হবে। আর কিস্তি পরিশোধের পর যে টাকা (মুনাফা) থাকবে, তার ওপর ২৫ শতাংশ হারে আয়কর দেবে সেতু বিভাগ।

    প্রতি ১৫ বছর পরপর টোল হার ১০ শতাংশ হারে বৃদ্ধির কথা বলা হয়েছে। সে হিসাবে ২০৫৩ সাল নাগাদ একটি প্রাইভেট কারের টোল ২ হাজার টাকার বেশি হবে।

    চুক্তিতে বলা হয়েছে, সেতু বিভাগ ঋণের টাকা তিন মাস পরপর মোট ১৪০টি কিস্তিতে পরিশোধ করবে। চালুর পর প্রথম বছর কিস্তি আসে ৫৯৬ কোটি টাকা। দশম বছরে গিয়ে সাড়ে ৮০০ কোটি টাকা পরিশোধ করতে হবে। ১৬তম বছরে গিয়ে কিস্তির পরিমাণ ১ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে। ৩৫তম বছরে ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে হবে সাড়ে ১ হাজার ৩০০ কোটি টাকা।

    সেতু বিভাগ সূত্র জানায়, প্রথম বছরই সরকারকে ৬০০ কোটি টাকা কিস্তি পরিশোধ করতে হবে। টোল থেকে আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৪৬৮ কোটি টাকা। আয় থেকে ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট দিতে হবে। টোল আদায়ের জন্য যে ঠিকাদার নিয়োগ দেওয়া হবে, তাদের পেছনে ব্যয় করতে হবে। ফলে শুরুতে আয়ের চেয়ে ব্যয়ের পরিমাণ বেশি হবে। ১৫ বছর পর যানবাহনের চলাচল বেড়ে গেলে এবং টোলের হার বাড়ানো হলে আয় করতে শুরু করবে সেতু বিভাগ।

  • যেখান থেকে শুরু হয়েছিল ঢাকা-কুয়াকাটা ফেরিমুক্ত আন্দোলন

    যেখান থেকে শুরু হয়েছিল ঢাকা-কুয়াকাটা ফেরিমুক্ত আন্দোলন

    পটুয়াখালী শহরের কাছেই লাউকাঠী নদীর ওপর বরিশাল-পটুয়াখালী মহাসড়কে পটুয়াখালী সেতুটি করা হয়েছে। পটুয়াখালী চৌরাস্তা থেকে উত্তর দিকে ২০০ মিটার দূরত্বে সড়ক পথে এই সেতু নির্মাণ করা হয়।

    ২০০০ সালের ৮ জুলাই সরকারের শেষ সময়ে তখনকার ও বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই সেতুর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন।
    এই সেতু নির্মাণের মধ্য দিয়ে শুরু হয় বাংলাদেশের দক্ষিণ অঞ্চলের সড়ক যোগাযোগের নতুন মাত্রা। শুরু হয় ফেরিমুক্ত সড়ক যোগাযোগের আন্দোলন। সেই থেকেই ঢাকা-কুয়াকাটা মহাসড়কে একের পর এক সেতু নির্মাণ করা হয়েছে।

    ২০০০ সালের আন্দোলনে পরিসমাপ্তি হয় আজ (২৫ জুন শনিবার) বাঙালির স্বপ্নের পদ্মা সেতু উদ্বোধন ও খুলে দেওয়ার মধ্য দিয়ে। বাংলাদেশের দুই যুগ আগে যে সেতুর পরিকল্পনা শুরু হয়েছিল, সেই পদ্মা সেতু উদ্বোধনের মাধ্যমে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের এক-তৃতীয়াংশ জেলা ঢাকা এবং বাকি অংশের সঙ্গে সড়কপথে যুক্ত হয়েছে।

    পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর সড়ক ও রেলপথে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের ২১টি জেলার সঙ্গে ঢাকার সরাসরি যোগাযোগ স্থাপিত হবে। এর ফলে এ অঞ্চলের মানুষের একদিকে দীর্ঘদিনের ভোগান্তির লাঘব হবে, অন্যদিকে অর্থনীতি হবে বেগবান। আশা করা হচ্ছে পদ্মা সেতু জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে এক দশমিক দুই-তিন শতাংশ হারে অবদান রাখবে এবং প্রতি বছর দশমিক আট-চার শতাংশ হারে দারিদ্র বিমোচন হবে বলেও প্রত্যাশা করা হয়েছে।

    বর্তমান সরকারের ২০০৯ সাল থেকে শুরু হয়ে আরও ৫টি সেতুর তথ্য উল্লেখ্য করা হলো।

    শহীদ শেখ কামাল সেতু: পটুয়াখালী-কুয়াকাটা মহাসড়কে কলাপাড়া-নীলগঞ্জ পয়েন্টে আন্ধারমানিক নদের ওপর ২০১৬ সালে নির্মিত হয় এ সেতু। প্রায় ৮৯০ মিটার দীর্ঘ এ সেতুর নামকরণ হয়েছে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বড় ছেলে শেখ কামালের নামে।

    শহীদ শেখ জামাল সেতু: পটুয়াখালী-কুয়াকাটা মহাসড়কের হাজীপুর-পুরান মহিপুর পয়েন্টে সোনাতলা নদীর ওপর ২০১৬ সালে নির্মিত হয় শেখ জামাল সেতু। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দ্বিতীয় পুত্র শেখ জামালের নামে এ সেতুর নামকরণ হয়েছে।

    শহীদ শেখ রাসেল সেতু: পটুয়াখালী-কুয়াকাটা মহাসড়কের মহিপুর-আলীপুর পয়েন্টে শিববাড়িয়া নদীর ওপর নির্মিত শেখ রাসেল সেতু। বঙ্গবন্ধুর ছোট ছেলে শেখ রাসেলের নামে এ সেতুর নামকরণ হয়েছে। দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম বড় সামুদ্রিক মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রটি এই সেতুটির নিচে।

    শহীদ আবদুর রব সেরনিয়াবাত সেতু; বরিশাল-কুয়াকাটা মহাসড়কে কীর্তনখোলা নদীর ওপর ২০১১ সালে নির্মাণ করা হয় শহীদ আবদুর রব সেরনিয়াবাত সেতু। স্থানীয়ভাবে দপদপিয়া সেতু নামেও পরিচিত এটি। ১৯৭৫ সালের ১৫ অগাস্ট নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভগ্নিপতি আবদুর রব সেরনিয়াবাতের নামে এ সেতুর নামকরণ হয়েছে।

    পায়রা সেতু: পটুয়াখালীর লেবুখালীতে পায়রা নদীর ওপর নির্মিত এই সেতুটি দেশের পঞ্চম বৃহত্তম সেতু। সেতুটির দৈর্ঘ্য ১,৪৭০ মিটার (৪,৮২০ ফুট)। এ সেতু নির্মাণের পর থেকে বরিশাল থেকে কুয়াকাটা পর্যন্ত ১১১.৫ কিলোমিটার যাত্রাপথে ফেরি পারাপারের প্রয়োজন সমাপ্ত হয়। ২০২১ সালের ২৪ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেতুর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন।

    ২০১৬ সালের জুলাই মাসে পায়রা সেতুর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এমপি। এছাড়াও ১৯৯৮ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কের উজিরপুর উপজেলার সন্ধ্যা নদীর ওপর নির্মিত মেজর এম.এ জলিল (শিকারপুর) ও বাবুগঞ্জ এলাকায় সুগন্ধা নদীর ওপরের বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর (দোয়ারিকা) সেতুর নির্মাণকাজের উদ্বোধণ করেছিলেন। প্রায় ১১২ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত হয় ৩৯০ মিটার দীর্ঘ। দুটি সেতুর অবস্থানও খুব কাছাকাছি।

    তবে এই সেতুর সঙ্গে আরও ১১ কিলোমিটার সংযোগ সড়ক থাকলেও পুরো এলাকায় কোনো বাতির ব্যবস্থা ছাড়াই ২০০৩ সালের ১২ এপ্রিল তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া তড়িঘড়ি করে সেতু দু’টিতে যান চলাচলের উদ্বোধন করেন।

  • ৫৩ কিলোমিটার সাইকেল চালিয়ে পদ্মা সেতুতে ওরা ১১ জন

    ৫৩ কিলোমিটার সাইকেল চালিয়ে পদ্মা সেতুতে ওরা ১১ জন

    আজকের দিনকে দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের জন্য বিশেষ দিন হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। কারণ আজ স্বপ্নের পদ্মা সেতু উদ্বোধন হয়েছে।

    যে সেতু দিয়ে কাল থেকে শুরু হবে যান চলাচল। দক্ষিণের ১৯ জেলায় যাতায়াতের ক্ষেত্রে দূরত্ব কমবে, বাঁচবে সময়। দ্রুত যাতায়াতের জন্য যাত্রীরা উপকৃত হবেন। দ্রুতগতি হবে পণ্য পরিবহণে। বাড়বে ব্যবসার বিস্তার।

    স্বাভাবিক কারণেই দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বাসিন্দাদের জন্য আজ এক বিশেষ উৎসবের দিন।

    আর বিশেষ দিনটিকে আরও বিশেষ করে রাখল গোপালগঞ্জের ১১ কিশোর। সেতু দেখতে গোপালগঞ্জের মুকসুদপুর থেকে সাইকেল চালিয়ে এসেছে তারা ।

    অর্থাৎ বৃষ্টির মধ্যেই পিচ্ছিল পথে ৫৩ কিলোমিটার সাইকেল চালাতে হয়েছে তাদের। পদ্মা সেতুর ৮ কিলোমিটার আগে পাচ্চর এলাকায় ঝুম বৃষ্টিতে পড়েন ১১ কিশোর।

    কিন্তু বৃষ্টি বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। ভিজে চুপচুপ হয়েও তারা এগিয়ে গেছেন সামনের দিকে।

    এই ১১ জন মুকসুদপুরের দিকনগর উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী মো. ফরহাদ শেখ, হৃদয় মোল্লা, মাহাফুজ শেখসহ আরও ৮ জন।

    দলের নেতা মো. ফরহাদ শেখ গণমাধ্যমকে বলেন, সকাল ৮টায় দিকনগর থেকে রওনা সাইকেলযোগে রওনা হই আমরা ১১ জন। পথে কোনো বিশ্রামই নিইনি। আমরা পদ্মা সেতু উদ্বোধন অনুষ্ঠান পর্যন্ত যে করেই হোক পৌঁছাব।

    দলের অপর সদস্য হৃদয় মোল্লা বলেন, যেদিন শুনেছি— ২৫ জুন স্বপ্নের পদ্মা সেতু উদ্বোধন হবে, সেদিনই আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে আমরা ২৫ জুন সেতু দেখতে যাব। তবে পরে ১১ জন এসেছি।

    দিকনগর উচ্চ বিদ্যালয়ের আরেক শিক্ষার্থী মাহাফুজ শেখ জানায়, রাস্তায় বৃষ্টির জন্য কয়েকবার সমস্যা হয়েছে। কিন্তু আমরা থামিনি। আর পদ্মা সেতু দেখতে যাব শুনে বাড়ি থেকে কোনো সমস্যা করেনি। সেতু দেখতে পাব এই আশায় চলে এসেছি।

  • উদ্বোধনের পর পদ্মা সেতুতে পায়ে হাঁটা মানুষের ঢল

    উদ্বোধনের পর পদ্মা সেতুতে পায়ে হাঁটা মানুষের ঢল

    প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদ্মা সেতু উদ্বোধনের পর সেতুতে হাজার হাজার মানুষ হেঁটে বেড়িয়েছেন। শনিবার (২৫ জুন) দুপুর ১২টায় মুন্সীগঞ্জের মাওয়া প্রান্তে প্রধানমন্ত্রী সেতুর নামফলক উন্মোচন করেন।

    পরে সেতু দিয়ে সরকারপ্রধানের গাড়ি বহর পদ্মা সেতু পাড়ি দিয়ে জাজিরা প্রান্তে পৌঁছায়। সেখানে আরেকটি নামফলক উন্মোচন করে মাদারীপুরের শিবচরের জনসমাবেশে ভাষণ দেন।

    উদ্বোধনের পরপরই মাওয়া প্রান্ত থেকে প্রথমে জনস্রোত সেতুতে ওঠে। হাজার হাজার জনতা পায়ে হেঁটে সেতুতে ঘুরে বেড়ান। কেউ কেউ মোটরসাইকেল নিয়েও সেতুতে ওঠেন।

    এ সময় নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের জনতার কাউকে সেতুতে উঠতে বাধা প্রদান করতে দেখা যায়নি। কেউ কেউ সেতুর পাশের সীমানা বেড়ার নিচ দিয়েও সেতুতে উঠতে দেখা গেছে।

    তবে, ঘণ্টাখানেক পর সোয়া ২টার দিকে সেতু থেকে জনতাকে সরিয়ে নিতে দেখা যায়। ৩টার দিকে পুরো সেতু খালি হয়ে যায়। নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা কেউ এ বিষয়ে কথা বলতে রাজি হননি।

    সেতুতে ওঠা একজন বলেন, ‘আমি নারায়ণগঞ্জে থাকি। আজ পদ্মা সেতুর উদ্বোধন দেখতে এসেছি। কিন্তু উদ্বোধন অনুষ্ঠানস্থল থেকে অনেক দূরে আমাদের আটকে দেয় নিরাপত্তা বাহিনী। পরে হেঁটে অনেক দূর থেকে পদ্মা সেতুতে এসে উঠেছি।’

    শরীয়তপুর থেকে আসা মামুন বলেন, ‘স্বপ্নের পদ্মা সেতুতে উঠে পড়েছি। নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে হচ্ছে। পদ্মা সেতু দেখে কিছু বলার আর ভাষা নেই। আমাদের অনেকদিনের স্বপ্ন আজ পূরণ হলো।’

  • সাঁতরে গিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বললেন কিশোরী

    সাঁতরে গিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বললেন কিশোরী

    প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ভালোবেসে অনেক সময়েই বহু নজির গড়তে দেখা গেছে ভক্ত কিংবা সাধারণ মানুষের। প্রধানমন্ত্রীও সেই ভালোবাসার মূল্যায়ন করেছেন। তার বহু মানবিক আচারণের ঘটনা দৃষ্টান্ত হয়ে আছে ইতিহাসের পাতায়ও। তেমনি এক ঘটনা চোখে পড়লো শনিবার (২৫ জুন) ঐতিহাসিক পদ্মা সেতুর উদ্বোধনের দিনে।

    এদিন পদ্মা সেতুর উদ্বোধন উপলক্ষে মাদারীপুরের শিবচরে আওয়ামী লীগ আয়োজিত জনসভায় প্রধান অতিথি হিসেবে ভাষণ দেন প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা। জনসভার মঞ্চ তৈরি করা হয় পদ্মা সেতুর আদলে। মঞ্চে সেতুকে আরও জীবন্ত রূপ দিতে জলাধারের ওপর এটি নির্মাণ করা হয়। পানিতে রাখা হয় নৌকাও।

    মঞ্চে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যর শেষে দেখা দেয় অভাবনীয় এক দৃশ্যের। পানিতে নেমে এক কিশোরী সাঁতরে এগিয়ে যেতে থাকেন মঞ্চের দিকে। এ সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাকে বাধা দিতে গেলেও মঞ্চের সামনে থাকা দলটির জেষ্ঠ্য নেতারা বাধা দিতে নিষেধ করেন। এরপর ওই কিশোরী সাঁতরে মঞ্চের কাছে চলে যায়।

    এসময় ওই কিশোরী প্রধানমন্ত্রীর দিকে তাকিয়ে কথা বলতে শুরু করেন। প্রধানমন্ত্রীও মঞ্চে দাঁড়িয়ে ওই কিশোরীর সঙ্গে বেশ কিছুক্ষণ কথা বলেন। যদিও ওই কিশোরী কি কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তা শোনা যায়নি।

    প্রধানমন্ত্রীর এমন আচরণের প্রশংসা করছেন দলটির নেতাকর্মীরা। এরপর কথা বলা শেষে ওই কিশোরীকে সরিয়ে নিয়ে যান পুলিশের নারী সদস্যরা।

  • স্বপ্নের পদ্মা সেতুতে যানবাহন চলবে রোববার থেকে

    স্বপ্নের পদ্মা সেতুতে যানবাহন চলবে রোববার থেকে

    দেশের সবচেয়ে বড় অবকাঠামো স্বপ্নের পদ্মা সেতু আজ উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।আগামীকাল (রোববার) থেকেই পদ্মা সেতুতে যানবাহন চলবে, সেজন্য সব প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে কর্তৃপক্ষ।রোববার সকাল ৬টা থেকেই সব ধরনের যানবাহন সেতুতে চলতে পারবে।

    পদ্মা সেতু প্রকল্পের পরিচালক মো. শফিকুল ইসলাম এ তথ্য জানিয়েছেন। শনিবার সেতু উদ্বোধনের পর বিকালে শফিকুল ইসলাম বলেন,‘আজ সেখানে কোনো যানবাহন চলাচল করবে না। রোববার সকাল ৬টা থেকে যানবাহন চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হবে।’

    তিনি আরও বলেন, ‘শুরুর দিন যানবাহন ব্যাপক চাপ হবে বলে আমরা ধারণা করছি। আমাদের টোলপ্লাজার কর্মীদেরও সেভাবে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। আশা করছি, তারা ভিড় সামলাতে পারবে। এ ছাড়া সেতু রক্ষণাবেক্ষণ এবং নিরাপত্তার জন্যও সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া আছে।’

    বাংলাদেশের অহংকার আর আত্মমর্যাদার প্রতীক বহুল প্রতীক্ষার পদ্মা সেতু আজ (শনিবার) উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।এর মধ্যদিয়ে স্বপ্নের পূর্ণতা পেল।

    প্রধানমন্ত্রী উদ্বোধন ঘোষণা করেই সেতু পাড়ি দিয়েছেন তার গাড়ির টোল দিয়ে।বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনাকে টোল গুনতে হয়েছে ৭৫০ টাকা।

    সেতুতে টোলের হার ইতোমধ্যে নির্ধারিত হয়েছে।মিনিবাসে ১৪০০ টাকা, মাঝারি বাসে ২০০০ টাকা এবং বড় বাসে ২৪০০ টাকা টোল দিতে হবে। ছোট ট্রাকের টোল ১৬০০ টাকা, মাঝারি ট্রাকে ২১০০-২৮০০ টাকা, বড় ট্রাকে ৫৫০০ টাকা। পিকআপের টোল ১২০০ টাকা।

    কার ও জিপের টোল ধরা হয়েছে ৭৫০ টাকা, মাইক্রোবাসে ১৩০০ টাকা। মোটরসাইকেল নিয়ে পদ্মা সেতু পার হতে চাইলে টোল দিতে হবে ১০০ টাকা। পদ্মা সেতু হয়ে যাতায়াতকারী বেশিরভাগ পরিবহণের বাস ঢাকার সায়েদাবাদ আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল থেকে ছেড়ে যাবে।

  • একটি শেখের বেটি এবং একটি যাদুর সেতু

    একটি শেখের বেটি এবং একটি যাদুর সেতু

    তানজিম হোসাইন রাকিবঃ গোটা বাংলাদেশকে আমূল বদলে দেওয়া পদ্মা সেতু মাথা তুলে দাড়িয়ে শুভ উদ্ভোদন হয়েছে আজ।একটি পদ্মাসেতু গোটা দেশ ও জাতির জন্য যে কত বড় আশীর্বাদ তা বাঙালি জাতি ছাড়া অনুমান করা অসম্ভব। তবে এই যাদুময় সেতু উপহার দেওয়া যে কত বড় চ্যালেঞ্জিং ছিল সেটা শেখের বেটি হাসিনা ছাড়া আর কারো পক্ষে অনুমান করা সম্ভব নয়। তাই একটি শেখের বেটি এবং একটি যাদুর পদ্মা সেতু দুটোই বাংলাদেশের সব থেকে বড় সম্পদ।

    এ সেতুকে যাদুর সেতু বলার পিছনে কারন রয়েছে অহর অহর। পদ্মা সেতুর বদৌলতে রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশের সঙ্গে এ অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থা সহজ হবে। পিছিয়ে পড়া এই অঞ্চল ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে আরও মনোযোগ কাড়বে, গড়ে উঠবে এসব জেলায় নতুন নতুন শিল্প কারখানা। এ সেতু দিয়ে বাংলাদেশ যুক্ত হতে পারবে এশিয়ান হাইওয়েতে। ফলে দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনীতির চাকা ঘোরার পাশাপাশি বাড়বে কর্মসংস্থান। পদ্মা সেতু বাংলাদেশের পদ্মা নদীর ওপর নির্মিত একটি বহুমুখী সড়ক ও রেল সেতু। এর মাধ্যমে মুন্সীগঞ্জের লৌহজংয়ের সঙ্গে শরীয়তপুর ও মাদারীপুর জেলা যুক্ত হবে। ফলে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম অংশের ২১টি জেলার সঙ্গে উত্তর-পূর্ব অংশের সংযোগ ঘটবে। ২১ টি জেলাগুলো হলো- খুলনা বিভাগের খুলনা, বাগেরহাট, যশোর, সাতক্ষীরা, নড়াইল, কুষ্টিয়া, মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ ও মাগুরা। বরিশাল বিভাগের বরিশাল, পিরোজপুর, ভোলা, পটুয়াখালী, বরগুনা ও ঝালকাঠি এবং ঢাকা বিভাগের গোপালগঞ্জ, ফরিদপুর, মাদারীপুর, শরীয়তপুর ও রাজবাড়ী।

    বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য পদ্মা সেতু হতে যাচ্ছে এর ইতিহাসের একটি সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জিং নির্মাণ প্রকল্প। দুই স্তরবিশিষ্ট স্টিল ও কংক্রিট নির্মিত ট্রাস ব্রিজটির ওপরের স্তরে আছে চার লেনের সড়ক পথ এবং নিচের স্তরটিতে আছে একটি একক রেলপথ। এছাড়াও রয়েছে এই যাদুর সেতুর অসংখ্য সুযোগ সুবিদা।

    এ হলো পদ্মা সেতুর সুযোগ সুবিধার কথা। তবে পদ্মা সেতু কেন এতটা চ্যালেঞ্জিং? কি আছে এমন যার জন্য এত ব্যায় এই সেতুতে? কেন এই সেতু তৈরীতে এত বেগ পোহাতে হয়ছে এই হাসিনা সরকারকে? চলুন এক নজরে একটু দেখে আসার চেষ্টা করি।

    ২০০৬-০৭ সালে প্রকল্প প্রস্তুতির সঙ্গে যুক্ত কিছু লোকের দুর্নীতির অভিযোগ ওঠায় বিশ্বব্যাংক তার প্রতিশ্রুতি প্রত্যাহার করে নেয় এবং অন্যান্য দাতারা সেটি অনুসরণ করে। এই ঘটনায় তৎকালীন যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেনকে মন্ত্রিসভা থেকে সরিয়ে নেয়া হয় ও সচিব মোশারেফ হোসেন ভূঁইয়াকে জেলেও যেতে হয়েছিল। পরবর্তীতে এমন কোনো অভিযোগ প্রমাণ না পাওয়ায় কানাডিয়ান আদালত মামলাটি বাতিল করে দেয়। দুর্নীতির অভিযোগ পরবর্তীতে আদালতে খণ্ডিত হয়। বর্তমানে প্রকল্পটি বাংলাদেশ সরকারের নিজস্ব সম্পদ থেকে অর্থায়ন করা হয়েছে।

    বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য পদ্মা সেতু ইতিহাসের একটি সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জিং নির্মাণ প্রকল্প। দুই স্তরবিশিষ্ট স্টিল ও কংক্রিট নির্মিত ট্রাস ব্রিজটির ওপরের স্তরে আছে চার লেনের সড়ক পথ এবং নিচের স্তরটিতে আছে একটি একক রেলপথ।

    আমাদের মনে রাখতে হবে, সেতুটি এমন এক নদীর ওপর হয়েছে, যা পৃথিবীর অন্যতম খরস্রোতা নদী। পদ্মা এমন এক নদী, যেটি একেক সময় একেক রূপ ধারণ করে। ফলে নদী শাসন করে পদ্মা সেতু করতে গিয়ে মানের বেলায় কোনো ধরনের আপস করা হয়নি। পদ্মা সেতু তৈরি হয়েছে মূলত দেশীয় উপকরণ দিয়ে। সেতু তৈরিতে সবচেয়ে বেশি লাগে দু’টি উপকরণ। একটি হলো স্টিল, অন্যটি সিমেন্ট। আমাদের দেশে যথেষ্ট ভালো মানের সিমেন্ট ও স্টিল তৈরি হয়। শুধু স্টিল আর সিমেন্টই নয়, রড, বালু, পাথরসহ অন্য যেসব উপকরণ পদ্মা সেতুতে ব্যবহৃত হয়েছে, সব উপকরণই ছিল সর্বোচ্চ মানের। যারা এসব উপকরণ সরবরাহ করেছে, তারা সবাই ছিল সতর্ক। তাই পদ্মা সেতুতে নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহারের কোনো সুযোগই ছিল না।

    পদ্মা সেতুর পাইল বা মাটির গভীরে বসানো ভিত্তি এখন পর্যন্ত বিশ্বে গভীরতম। সর্বোচ্চ ১২২ মিটার গভীর পর্যন্ত গেছে সেতুর অবকাঠামো। ১০ই ডিসেম্বর বহুল কাক্সিক্ষত এ সেতুর সর্বশেষ স্টিলের কাঠামো (স্প্যান বসানো হয়। ৪১তম স্প্যান বসানোর পর ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার পদ্মা সেতুর পুরোটাই দৃশ্যমান হয়। ২০১৭ সালের ৩০শে সেপ্টেম্বর পদ্মা সেতুর জাজিরা প্রান্তে প্রথম স্প্যান বসানোর মধ্য দিয়ে দৃশ্যমানতা শুরু হয় স্বপ্নের পদ্মা সেতুর। বাকি ৪০টি স্প্যান বসাতে তিন বছর দুই মাস লাগে।

    পদ্মা বহুমুখী সেতুর সম্পূর্ণ নকশা এইসিওএম’র নেতৃত্বে আন্তর্জাতিক ও জাতীয় পরামর্শকদের নিয়ে গঠিত একটি দল তৈরি করে। বাংলাদেশের প্রথম বৃহৎ সেতু প্রকল্প যমুনা বহুমুখী সেতু প্রকল্পের আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ প্যানেল তৈরি করা হয়। অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরীকে ১১ সদস্যের বিশেষজ্ঞ প্যানেলের সভাপতি নিযুক্ত করা হয়। এ প্যানেল সেতুর নকশা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন পর্যায়ে প্রকল্প কর্মকর্তা, নকশা পরামর্শক ও উন্নয়ন সহযোগীদের বিশেষজ্ঞ পরামর্শ প্রদান করেন।

    পদ্মা সেতুর ভৌত কাজকে মূলত কয়েকটি প্যাকেজে ভাগ করা হয়েছে যথা- (ক) মূল সেতু, (খ) নদী শাসন, (গ) জাজিরা সংযোগকারী সড়ক, (ঘ) টোল প্লাজা ইত্যাদি। মাওয়া সংযোগকারী সড়ক, টোল প্লাজা ইত্যাদি এবং মাওয়া ও জাজিরা সার্ভিস এলাকা। প্রকল্পে নিয়োজিত নকশা পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ‘মনসেল-এইকম’ ভৌত কাজের ঠিকাদার নিয়োগের প্রাক-যোগ্যতা দরের নথি প্রস্তুত, টেন্ডার আহ্বানের পর টেন্ডার নথি মূল্যায়ন, টেন্ডার কমিটিকে সহায়তাসহ এ-সংক্রান্ত যাবতীয় কাজের দায়িত্বপ্রাপ্ত। আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ প্যানেল নকশা পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের কাজ তদারক করতো। ভৌত কাজের বিভিন্ন প্যাকেজের জন্য দরপত্র মূল্যায়ন কমিটি গঠন করা হয়েছিল। পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্পের পরিচালক ছিলেন কারিগরি মূল্যায়ন কমিটির সভাপতি।

    সর্বোপরি পদ্মা বহুমুখী সেতু কেবল দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নয়, পুরো বাংলাদেশের অর্থনীতিই বদলে দেবে। আরও বিশদভাবে বলতে গেলে এই সেতু দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার যোগাযোগ, বাণিজ্য, পর্যটনসহ অনেক ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। সব মিলিয়ে এই সেতু আসলেই দেশের মানুষের স্বপ্নের সেতু হয়ে বাস্তবে ধরা দিয়েছে।জাতির জনকের স্বপ্ন পূরণের জন্যই যেন মহান আল্লাহ্তায়ালা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ২১ বার হত্যা চেষ্টা সত্ত্বেও বাঁচিয়ে রেখেছেন। শেখ হাসিনা আমাদের আশার বাতিঘর বাংলাদেশের রক্ষাকবচ। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, খাদ্য, বিদ্যুৎ, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, যোগাযোগ ও সামাজিক অবস্থান সর্বক্ষেত্রে জননেত্রী শেখ হাসিনা সফলতার সঙ্গে বাংলাদেশকে উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।

  • নিজেদের টাকায় সবচেয়ে বড় স্বপ্নের নির্মাণ

    নিজেদের টাকায় সবচেয়ে বড় স্বপ্নের নির্মাণ

    একক প্রকল্প হিসাবে দেশের সবচেয়ে বড় অবকাঠামো রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। এ প্রকল্পে মোট খরচ ধরা হয়েছে এক লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকা। যার ৯০ শতাংশই রাশিয়ার ঋণ সহায়তা। দেশটির ভিবি ব্যাংক এ ঋণ দিচ্ছে। এ প্রকল্পে সরকারের অর্থায়ন মাত্র ১০ শতাংশ। অর্থাৎ রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে মোট ব্যয়ের ৯১ হাজার ৪০ কোটি টাকাই দিচ্ছে রাশিয়া। সরকারি কোষাগার থেকে দেওয়া হচ্ছে বাকি ২২ হাজার ৫২ কোটি টাকা।

    অন্যদিকে পদ্মা সেতু নির্মাণ প্রকল্পে মোট খরচ ৩০ হাজার ১৯৩ কোটি টাকা। টাকার অঙ্কে পদ্মার সেতুর চেয়ে রূপপুর পারমাণবিক প্রকল্পে তিনগুণ বেশি ব্যয় হচ্ছে। তবে রূপপুরের টাকা ঋণনির্ভর। আর পদ্মা সেতু প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে সম্পূর্ণ দেশীয় অর্থায়নে।

    পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, পদ্মা সেতুর চেয়ে দেশে একাধিক মেগা প্রকল্পের ব্যয় বেশি। যেমন- পদ্মা সেতু রেললিঙ্ক প্রকল্প। এ প্রকল্পের মোট ব্যয় ৩৯ হাজার ২৪৬ কোটি টাকা, যার ২১ হাজার ৩৬ কোটি টাকা চীনের দেওয়া ঋণ। মহেশখালী–মাতারবাড়ি সমন্বিত অবকাঠামো উন্নয়নপ্রকল্পও পদ্মা সেতু প্রকল্পের চেয়ে বড়। এ প্রকল্পে মোট ব্যয় ৫১ হাজার ৮৫৪ কোটি টাকা, যার মধ্যে জাপানি ঋণ ৪৩ হাজার ৯২১ কোটি টাকা। বাকি ছয় হাজার ৪০৬ কোটি টাকা সরকারি কোষাগারে থেকে মেটানো হবে।

    ঢাকায় পাতাল রেল নির্মাণের কাজ চলমান। এ প্রকল্পের ব্যয়ও পদ্মা সেতুর চেয়ে বেশি। কয়েক দফা জরিপ ও ফিজিবিলিটি স্টাডির পর নির্ধারণ করা হয়েছে আরেক মেট্রোরেল প্রকল্প এমআরটি-১-এর রুট। এর আওতায় এয়ারপোর্ট থেকে কমলাপুর আর নতুনবাজার থেকে পূর্বাচল পর্যন্ত ২৭ দশমিক ৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের অ্যালাইনমেন্ট ঠিক করা হয়। এমআরটি লাইন-১-এ এয়ারপোর্ট-খিলক্ষেত-যমুনা ফিউচার পার্ক-নতুনবাজার-বারিধারা-উত্তর বাড্ডা-হাতিরঝিল-রামপুরা-মৌচাক হয়ে কমলাপুর পর্যন্ত ১৬ দশমিক ২ কিলোমিটার আর অন্যটি নতুনবাজার-যমুনা ফিউচার পার্ক-বসুন্ধরা-পুলিশ অফিসার হাউজিং সোসাইটি-মাস্তুল-পূর্বাচল পশ্চিম-পূর্বাচল সেন্টার-পূর্বাচল সেক্টর-৭-পূর্বাচল ডিপো পর্যন্ত ১১ দশমিক ৩ কিলোমিটার রুট নির্মিত হবে।

    মেট্রোরেল প্রকল্পের আওতায় বৈদেশিক ঋণে সুদ দিতে হবে এক হাজার ৯১৬ কোটি টাকা। এ প্রকল্পে পরামর্শক খাতে পাঁচ কোটি ও প্রশিক্ষণ খাতে ব্যয় ধরা হয়েছে দুই কোটি টাকা। প্রকল্পের আওতায় সেমিনার, কর্মশালা ও সম্মেলনে দেড় কোটি টাকা রাখা হয়েছে। সব মিলিয়ে প্রকল্পের প্রস্তাবিত ব্যয় ৫১ হাজার ৯০০ কোটি টাকা। এরমধ্যে জাইকার দেওয়া ঋণ ৩৩ হাজার ৯১৪ কোটি ১১ লাখ টাকা।

    অর্থাৎ এটা বলা যায়, পদ্মা সেতুর থেকে ব্যয়বহুল একাধিক প্রকল্প হচ্ছে। তবে দেশীয় টাকায় পদ্মা সেতুই সেরা। কারণ ৩০ হাজার ১৯৩ কোটি টাকার সবই দেশীয় অর্থায়ন।

    পদ্মা সেতু প্রকল্পের নকশা চূড়ান্ত হওয়ার পর ২০১১ সালের এপ্রিল থেকে জুনের মধ্যে সেতু প্রকল্পে অর্থায়নের বিষয়ে বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি), জাইকা ও ইসলামি উন্নয়ন ব্যাংকের (আইডিবি) সঙ্গে ঋণচুক্তি সই করে সরকার। কিন্তু নির্মাণকাজের তদারক করতে পরামর্শক নিয়োগে দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের অভিযোগ আনে বিশ্বব্যাংক। এরপর একে একে সব অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠান প্রতিশ্রুত অর্থায়ন স্থগিত ঘোষণা করে।

    বিশ্বব্যাংকসহ অন্যরা অর্থায়ন স্থগিতের পর প্রকল্পে যুক্ত হওয়ার প্রস্তাব নিয়ে আসে মালয়েশিয়ার সরকার। এ নিয়ে কিছুদিন আলোচনা চলার পর তা আর এগোয়নি। ২০১২ সালের ৯ জুলাই মন্ত্রিপরিষদের এক বৈঠকে নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আন্তর্জাতিক অর্থলগ্নিকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে পদ্মা সেতুর জন্য অর্থ না নেওয়ার কথা জানিয়ে দেয় সরকার।

    অবশ্য ২০১৪ সালে তদন্ত শেষে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) জানিয়ে দেয়, দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ২০১৭ সালে কানাডার টরন্টোর এক আদালতও জানান, পদ্মা সেতু প্রকল্পে দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের উপযুক্ত প্রমাণ পাননি তারা। বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক চলে যাওয়ার পরে দেশীয় টাকায় বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন কৃতিত্ব দেখায় বাংলাদেশ।

    পদ্মা সেতু থেকে মাসে টোল আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১৩৩ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। বছরের হিসেবে তা হবে এক হাজার ৬০৩ কোটি ৯৭ লাখ টাকা। এ টাকা দিয়ে সেতুর রক্ষণাবেক্ষণ ছাড়াও নির্মাণ খরচের ঋণ পরিশোধ করবে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ। কোনো উন্নয়ন সহযোগী বা প্রতিষ্ঠানকে নয়, স্বয়ং বাংলাদেশ সরকারকে ৩৫ বছরে সুদসহ ৩৬ হাজার কোটি টাকা পরিশোধ করবে সেতু কর্তৃপক্ষ।
    বাংলাদেশ সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে ৩০ হাজার ১৯৩ কোটি ৩৯ লাখ টাকা ব্যয়ে পদ্মা বহুমুখী সেতু নির্মিত। এর পুরোটাই সরকারের কাছ থেকে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ ঋণ হিসেবে গ্রহণ করেছে। চুক্তির অনুচ্ছেদ-২ মোতাবেক ঋণের অর্থ প্রকল্প সমাপ্তির পর বার্ষিক ১ শতাংশ হারে সুদসহ ৩৫ বছরে ১৪০ কিস্তিতে পরিশোধ করতে হবে। এছাড়া নকশা প্রণয়নের সময় নেওয়া ২১১ কোটি টাকার বিপরীতে ৩৪০ কোটি টাকা পরিশোধ করতে হবে।

    এ প্রসঙ্গে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান বলেন, পদ্মা সেতু বাঙালি জাতির বড় অর্জন। নিজেদের টাকায় এত বড় অর্জন দ্বিতীয়টি নেই। ৩০ হাজার ১৯৩ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। বাঙালি জাতির জন্য পদ্মা সেতু গৌরব ও অহংকারের। তবে কারও কাছ থেকে ঋণ নেওয়া হয়নি। এটা আমাদের টিম লিডার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দক্ষ নেতৃত্বে গোটা জাতি এ টাকা দিয়েছে।

  • স্বপ্নের পদ্মা সেতুতে ট্রেন চলবে ২০২৩ সালে

    স্বপ্নের পদ্মা সেতুতে ট্রেন চলবে ২০২৩ সালে

    আগামীকাল ২৫ জুন স্বপ্নের পদ্মা সেতু চালু হওয়ার ঠিক এক বছর পর ২০২৩ সালের জুন মাসে উদ্বোধন হবে ‘পদ্মা সেতু রেল লিংক প্রকল্প’। ঢাকা থেকে পদ্মা সেতু হয়ে রেলপথ যাবে যশোরে। এই রেলপথের মোট দৈর্ঘ্য হবে ১৭২ কিলোমিটার। এর মধ্যে ২৩ কিলোমিটার হবে পুরোপুরি এলিভেটেড (উড়াল)।

    সেতুর পাশাপাশি পুরোদমে এগিয়ে চলছে পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পের কাজও। এজন্য ঢাকা থেকে পদ্মা সেতু হয়ে ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলা পর্যন্ত ৮২ কিলোমিটার রেলপথ ২০২৩ সালের জুন মাসে খুলে দিতে কাজ চলছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ রেলওয়ে।

    বাংলাদেশ রেলওয়ে জানায়, প্রকল্পের মোট ব্যয় ৩৯ হাজার ২৪৬ কোটি ৭৯ লাখ টাকা। এর মধ্যে চায়নার ঋণ ২১ হাজার ৩৬ কোটি ৬৯ লাখ এবং সরকারি অর্থায়ন ১৮ হাজার ২১০ কোটি টাকা।

    চলতি বছরের ৩১ মে পর্যন্ত মোট ব্যয় হয়েছে ২৩ হাজার ২০৫ কোটি টাকা। মোট গড় অগ্রগতি ৬০ শতাংশ। প্রকল্পের কাজ শুরু হয় ২০১৬ সালের জানুয়ারি মাসে। ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত ঢাকা থেকে ভাঙা অংশ চালুর পরিকল্পনা নিয়ে কাজ এগিয়ে যাচ্ছে। কাজ চলছে মোট তিনটি ফেজে ভাগ হয়ে। ঢাকা-মাওয়া অংশের অগ্রগতি ৫৬ শতাংশ। এছাড়া মাওয়া-ভাঙ্গা ৭৮ দশমিক ৫ ও ভাঙ্গা থেকে যশোরের অগ্রগতি ৫০ শতাংশ। ২০২৪ সালের জুন মাসে ভাঙ্গা থেকে যশোর পর্যন্ত কাজ সম্পন্ন হবে।

    পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পের উপ-প্রকল্প পরিচালক (ওয়ে অ্যান্ড ওয়ার্ক) আবু ইউসুফ মোহাম্মদ শামীম বলেন, প্রকল্পের আওতায় ১৭২ কিলোমিটার মেইন লাইন নির্মাণ করা হবে। আমরা দুটি ভাগে বিভক্ত করে প্রকল্পটি উদ্বোধন করবো। ঢাকা থেকে ভাঙা পর্যন্ত ৮২ কিলোমিটার রেলপথ ২০২৩ সালের জুন মাসে খুলে দেওয়ার পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছি। আশা করি এই অংশটুকু চালু করতে পারবো, কাজের অগ্রগতিও ভালো।

    যশোর পর্যন্ত কবে নাগাদ চালু হবে? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমাদের প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত। আশা করছি ভাঙ্গা থেকে যশোর পর্যন্ত এই মেয়াদে চালু করতে পারবো।

    প্রকল্পের আওতায় ১৭২ কিলোমিটার মেইন লাইন ও ৪৩ দশমিক ২২ কিলোমিটার লুপ লাইন নির্মাণ করা হবে। এই রেলপথে চলাচলের জন্য সংগ্রহ করা হবে ১০০টি ব্রডগেজ রেল কোচ। প্রকল্পের কাজ সঠিকভাবে বাস্তবায়নে অধিগ্রহণ করা হবে ২ হাজার ৪২৬ একর ভূমি।

    বাংলাদেশের রেলপথ মানেই ব্যালাস্ট্রেড। এই রেলপথে গ্রানাইট পাথর ব্যবহার করা হয়। থাকে ইস্পাতের স্লিপার ও কাঠের বন্ধন। রেললাইনে পাথর দেওয়ার কারণ হচ্ছে যাতে ট্রেন লাইনচ্যুত না হয়। তবে পদ্মা সেতু রেল সংযোগের উড়ালপথে কোনো পাথর থাকবে না। অত্যাধুনিক এই উড়াল রেলপথে ১২০ কিলোমিটার গতিতে ছুটতে পারবে ট্রেন।

    কমলাপুর থেকে যশোর পর্যন্ত রুটে ২০টি স্টেশন নির্মাণ করা হবে। এর মধ্যে ১৪টি স্টেশনই হবে নতুন। পুরোনো ছয়টি স্টেশনকে ঢেলে সাজানো হবে আধুনিক ও যুগোপযোগী করে। কেরানীগঞ্জ ও মুন্সিগঞ্জের নিমতলায় নতুন দুটি স্টেশন নির্মাণ করা হবে। এরপর নির্মাণ করা হবে মুন্সিগঞ্জের শ্রীনগর ও মাওয়া স্টেশন। মাওয়া স্টেশনটি হবে তুলনামূলক বেশি নান্দনিক। প্রকল্প অনুযায়ী, দূর থেকে এটাকে দেখলে কোনো উন্নতমানের শপিংমল মনে হবে।

    পদ্মা স্টেশনের পরে শরীয়তপুরে হবে ‘শিবচর স্টেশন’। এছাড়া ফরিদপুরের ভাঙ্গায় উন্নত দেশের আদলে নির্মাণ করা হবে জংশন। ভাঙ্গা থেকে একটি লুপ ফরিদপুর সদর ও অন্য লুপ নাগরকান্দায় গেছে। তবে প্রকল্পের আওতায় নাগরকান্দায় স্টেশন নির্মাণ করা হবে। এরপর গোপালগঞ্জের মকসুদপুর ও মহেশপুরে নির্মিত হবে রেলস্টেশন। তারপর নড়াইলের লোহাগড়া, নড়াইল সদরে স্টেশন করা হবে। এরপর যশোরের জামদিয়া ও পদ্মবিলে নির্মাণ করা হবে দুটি নতুন স্টেশন।

    প্রকল্পের আওতায় বিদ্যমান ছয়টি রেলস্টেশন ঢেলে সাজানো হবে। এর মধ্যে রয়েছে ঢাকার কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনও। এছাড়া গেন্ডারিয়া ও ফরিদপুরের ভাঙ্গা স্টেশন নান্দনিক করে গড়ে তোলা হবে। সংস্কারের জন্য নির্ধারিত অন্য তিনটি স্টেশন পড়ছে সেতুর ওপারে। সেগুলো হলো- গোপালগঞ্জের কাশিয়ানি, যশোরের সিংগাই ও রূপদিয়া স্টেশন। বিদ্যমান এসব স্টেশন নতুন আঙ্গিকে গড়ে তোলা হবে।

    রেলস্টেশনের স্টাফসহ অন্যদের আবাসন সুবিধা নিশ্চিত করতে ১০টি স্টেশনে আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সম্বলিত রেসিডেন্স বিল্ডিং বা আবাসিক ভবন গড়ে তোলা হবে। এ স্টেশনগুলো হলো; নিমতলা, শ্রীনগর, মাওয়া, পদ্মা, শিবচর, ভাঙ্গা জংশন, লোহাগড়া, জামদিয়া, নড়াইল ও পদ্মবিল জংশন।

    বাংলাদেশ রেলওয়ের পশ্চিমাঞ্চলে ৯৭৮টি অনুমোদিত এবং ২৭১টি অননুমোদিত লেভেল ক্রসিং রয়েছে। এসব লেভেল ক্রসিংয়ের মধ্যে মাত্র ২২১টিতে রয়েছে গেটকিপার। ফলে ১ হাজার ২৮টি লেভেল ক্রসিং রয়ে গেছে অরক্ষিত। ফলে প্রতিনিয়তই ঘটছে দুর্ঘটনা, বাড়ছে প্রাণহানি। তবে ঢাকা-যশোর ১৭২ কিলোমিটার রেলপথে থাকছে না কোনো লেভেল ক্রসিং। এতে একদিকে যেমন দুর্ঘটনা ঘটবে না, অন্যদিকে সড়কেও পড়বে না জটলা।