Category: ইসলাম

  • মক্কা বিজয় ও নবীজির সাধারণ ক্ষমা

    মক্কা বিজয় ও নবীজির সাধারণ ক্ষমা

    বিজয় উদযাপনে করণীয় সম্পর্কে পবিত্র কোরআন ও হাদিসে নির্দেশনা এসেছে।

    বিজয় শিরোনামে নাসর ও ফাতহ নামে দুটি সূরাও রয়েছে পবিত্র কোরআনে। ইরশাদ হয়েছে, ‘যখন আল্লাহর সাহায্যে বিজয় আসবে, তখন মানুষকে দলে দলে আল্লাহর দ্বীনে প্রবেশ করতে দেখবে। তখন তোমার প্রতিপালকের পবিত্রতা বর্ণনা করো। আর তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো। নিশ্চয়ই তিনি ক্ষমাশীল’ (নাসর, আয়াত : ১-৩)।

    এ সূরায় বিজয় উদযাপনের দুই দফা কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে। ১. আল্লাহর প্রশংসাগাথায় তাঁর পবিত্রতা বর্ণনা করা। ২. যুদ্ধকালীন অজান্তে যেসব ভুলত্রুটি হয়েছে, তার জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা।

    অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে, ‘আমি তাদের পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠা (বিজয়) দান করলে তারা সালাত কায়েম করবে, জাকাত দান করবে এবং সৎকাজের আদেশ করবে ও অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করবে (সূরা হজ, আয়াত : ২২)।

    হাদিসে বিজয় উদযাপনে যেসব কর্মসূচির উল্লেখ পাওয়া যায় তা হল আট রাকাত শোকরিয়া নামাজ আদায় করা। কেননা নবী করিম (সা.) মক্কা বিজয়ের দিন শোকরিয়া হিসেবে আট রাকাত নামাজ আদায় করেছিলেন (জাদুল মায়াদ, আল্লামা ইবনুল কাইয়িম জাওজি)।

    নবীজির দেখাদেখি অনেক সাহাবিও তাঁর অনুকরণে আট রাকাত নফল নামাজ আদায় করেন। দশম হিজরিতে মক্কা বিজয়ের পর মহানবী (সা.) আনন্দ উদযাপন করেছেন। প্রিয় জন্মভূমির স্বাধীনতায় তিনি এত বেশি খুশি হয়েছিলেন, যা ভাষায় ব্যক্ত করা সম্ভব নয়।

    বিজয়ের আনন্দে তিনি সেদিন ঘোষণা করেছিলেন, ‘যারা কাবাঘরে আশ্রয় নেবে তারা নিরাপদ। এভাবে মক্কার সম্ভ্রান্ত কয়েকটি পরিবারের ঘরে যারা আশ্রয় নেবে, তারা যত অত্যাচার-নির্যাতনকারীই হোক না কেন তারাও নিরাপদ। এই ছিল প্রিয়নবীর মক্কা বিজয়ের আনন্দ উৎসবের ঘোষণা।

    এভাবে মহানবী (সা.) বিনা রক্তপাতেই বিজয়ীরূপে মক্কায় প্রবেশ করলেন এবং এমন এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন, যুগযুগান্তরে সবার মুখে আজও যা আলোচিত হয়ে আসছে, যেই কুরাইশরা মুসলমানদের ক্ষতি সাধনে সামর্থের শেষ সময় পর্যন্ত অপচেষ্টা চালিয়েছিল তাদেরকে তিনি ‘সাধারণ ক্ষমা’ ঘোষণা করেন, তাও কখন-যখন তিনি মক্কার অধিপতি, ইচ্ছে হলে নিয়মানুযায়ী সবাইকে মৃত্যুদণ্ডও দিতে পারতেন।

    আসলে আল্লাহর রাসুলরা উত্তম চরিত্র নিয়েই দুনিয়ায় আগমন করেন, যেন উম্মত তাদের থেকে শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে।

  • শবে কদরের রাতে করতে পারেন যেসব ইবাদত ও আমল

    শবে কদরের রাতে করতে পারেন যেসব ইবাদত ও আমল

    পবিত্র লাইলাতুল কদর বা শবে কদর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রমজান মাস যে কারণে বিশেষ মর্যাদার পেয়েছে তার অন্যতম ‘লাইলাতুল কদর’ বা কদরের রাত। আল্লাহ মহিমান্বিত এই রাতে কোরআন নাজিল করেছেন এবং রাতকে হাজার মাসের চেয়ে মর্যাদাবান ঘোষণা করেছেন।

    পবিত্র কোরআন ও সহীহ-হাদীস দ্বারা লাইলাতুল কদরের গুরুত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

    পবিত্র কোরআন, নির্ভরযোগ্য হাদিস এবং রাসূলুল্লাহ সা:-এর লাইলাতুল কদরের জন্য গৃহীত কর্মতৎপরতা লাইলাতুল কদরের গুরুত্ব বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
    পবিত্র কোরআনে কদরের রাত সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই আমি কোরআন অবতীর্ণ করেছি মহিমান্বিত রজনীতে; আর মহিমান্বিত রজনী সম্বন্ধে তুমি কী জান? মহিমান্বিত রজনী সহস্র মাস অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ।

    সেই রাতে ফেরেশতারা ও রুহ অবতীর্ণ হয় প্রত্যেক কাজে তাদের প্রতিপালকের অনুমতিক্রমে। শান্তিই শান্তি, সেই রজনী ঊষার আবির্ভাব পর্যন্ত।

    ’ (সুরা কদর, আয়াত : ১-৫)
    শবে কদরের রাতে যেসব ইবাদত করতে পারেন

    টিভি দেখা এবং মোবাইলে কথা বলা থেকে বিরত থাকুন। পবিত্রতা অর্জন করে পরিষ্কার পোশাক পরিধান করুণ। বেশি বেশি নফল নামাজ পড়ুন। কোরআন পাঠ করুন।

    সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহু আকবার জিকির করুন। কালেমা পড়ুন। ইস্তেগফার (‘আস্‌তাগফিরুল্লা হাল্লাজি লা ইলাহা ইল্লা হুওয়াল হাইয়্যুল কইয়্যুমু ওয়া আতুবু ইলায়হি)পড়ুন। বেশি বেশি দুরুদ পড়ুন। দুয়া ইউনুস (লা ইলাহা ইল্লা আনতা সুবহানাকা ইন্নি কুনতু মিনাজ জোয়ালিমীন) পড়ুন।
    লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ বেশি বেশি পড়ুন। সূরা ইখলাস পড়ুন। রাত ২ টা থেকে ৩ টা পর্যন্ত তাহাজ্জুদ পড়ুন।

  • রমজানে গোপনভাবে দানসদকা

    রমজানে গোপনভাবে দানসদকা

    রমজান মুমিনদের জন্য বোনাসস্বরূপ অর্থাৎ সওয়াব বৃদ্ধির মাস। এ মাসে দানসদকা করলে বিশেষ সওয়াবের অধিকারী হওয়া যায়। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, রসুল (সা.) ছিলেন মানুষের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ দাতা। তাঁর দানশীলতা অন্য সময়ের থেকে অধিকতর বৃদ্ধি পেত রমজান মাসে, যখন জিবরাইল (আ.) তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতেন।

    জিবরাইল (আ.) রমজানের প্রতি রাতে আগমন করতেন এবং তাঁরা পরস্পর কোরআন শোনাতেন। আল্লাহর রসুল (সা.) তখন কল্যাণবাহী বায়ুর চেয়েও অধিক দানশীল। (মুসলিম-২৩০৮)
    এখন লক্ষ করা যায় ধনী ব্যক্তি মাইকিং করে সবাইকে একত্র করে কাপড়ের ওপর নিজের নাম লিখে কাপড় গরিবদের দান করে। সেই ধনী ব্যক্তির দানসদকা নেওয়ার জন্য অনেক গরিব অসহায় মানুষ দীর্ঘ লাইনের মধ্যে দাঁড়িয়ে অনেক কষ্ট-ক্লেশ করে মাত্র একটি কাপড় নিয়ে আসে।

    অনেকে আবার না পেয়ে শূন্য হাতে ফিরেও আসে। এটা কি দানসদকার নিয়ম? এটা দানসদকার নিয়ম নয় আর দানসদকা এভাবে দেওয়া ঠিক নয়। নিজের দান নিজে গরিব অসহায় ব্যক্তির কাছে গিয়ে দেওয়া উত্তম। নিজের আত্মীয় যদি গরিব অসহায় হয়ে থাকে তাহলে তাদের দানসদকার টাকা দিয়ে দেওয়া যেতে পারে।
    আর দান প্রকাশ্য দেওয়ার চেয়ে গোপনে দেওয়া উত্তম, কেননা গোপনে দানে কখনো নিজের মধ্যে অহংকার তৈরি হয় না আর দানগ্রহীতা ব্যক্তির মনমানসিকতা নিচু হয় না। পবিত্র কোরআনে প্রকাশ্য ও গোপনে উভয়ই দান করার কথা বলা হয়েছে কিন্তু পবিত্র কোরআনে অধিকাংশ জায়গায় গোপনে দান করার কথা বলা হয়েছে। মহান আল্লাহতায়ালা বলেন, তোমরা যদি প্রকাশ্য দান কর তাহলে তা ভালো আর যদি গোপনে কর এবং অভাবীকে দাও তাহলে তোমাদের জন্য আরও ভালো। এজন্য আল্লাহ তোমাদের কিছু পাপ মোচন করবেন। (সুরা বাকারা : ২৭০-২৭১)
    লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে যারা দান করে তাদের মহান আল্লাহতায়ালা পছন্দ করেন না।

    মহান আল্লাহতায়ালা বলেন, আর যারা লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে তাদের ধনসম্পদ ব্যয় করে এবং আল্লাহ ও কিয়ামতে বিশ্বাস করে না আল্লাহ তাদের ভালোবাসেন না। ’ (সুরা নিসা-৩৮)। প্রকাশ্য দান যেন প্রচারের জন্য না হয়। প্রকাশ্য দান যেন হয় অন্যদের উৎসাহ প্রদানের জন্য। মহান আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘হে বিশ্বাসীরা! দানের কথা প্রচার করে ও কষ্ট দিয়ে তোমরা তোমাদের দানকে নষ্ট কোরো না। ওই ব্যক্তির মতো যে নিজের সম্পদ অন্যকে প্রদর্শনের জন্য ব্যয় করে এবং আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস করে না। ’ (সুরা বাকারা-২৬১)

  • কোরআনের বর্ণনায় রোজা ও রমজান

    কোরআনের বর্ণনায় রোজা ও রমজান

    পবিত্র কোরআনের একাধিক স্থানে রোজার আলোচনা এসেছে, যেসব আয়াতে আল্লাহ প্রধানত রোজার বিধি-বিধানগুলো বর্ণনা করেছেন। নিম্নে রমজান ও রোজা সংক্রান্ত আয়াতগুলো বর্ণনা করা হলো।

    ১. রমজানের রোজা ফরজ : আল্লাহ প্রত্যেক সাবালক ও সুস্থ মুসলিম নর-নারীর ওপর রমজানের রোজা ফরজ করেছেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘হে মুমিনরা, তোমাদের ওপর রোজাকে ফরজ করা হয়েছে, যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর।

    যেন তোমরা আল্লাহভীরু হতে পারো। ’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ১৮৩)
    ২. অসুস্থ ব্যক্তির রোজার বিধান : কোনো ব্যক্তি অসুস্থ হলে তার ব্যাপারে শরিয়তের বিধান হলো—‘রোজা নির্দিষ্ট কয়েক দিনের। তোমাদের মধ্যে কেউ পীড়িত হলে বা সফরে থাকলে অন্য সময় এ সংখ্যা পূরণ করে নিতে হবে। এটা যাদের খুব বেশি কষ্ট দেয় তাদের কর্তব্য এর পরিবর্তে ফিদয়া—একজন অভাবগ্রস্তকে খাদ্য দান করা।

    যদি কেউ স্বতঃস্ফূর্তভাবে সৎকাজ করে, তবে তা তার পক্ষে অধিক কল্যাণকর। আর সিয়াম পালন করাই তোমাদের জন্য অধিকতর কল্যাণপ্রসূ যদি তোমরা জানতে। ’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ১৮৪)
    ৩. কোরআন নাজিলের মাস রমজান : আল্লাহ রমজানে কোরআন অবতীর্ণ করেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘রমজান মাস, এতে মানুষের দিশারি এবং সৎপথের স্পষ্ট নিদর্শন ও সত্যাসত্যের পার্থক্যকারীরূপে কোরআন অবতীর্ণ হয়েছে।

    ’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ১৮৫)
    ৪. রোজার সময়সীমা : কতটুকু সময় রোজা রাখতে হবে আল্লাহ তা কোরআনে বলে দিয়েছেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘রোজার রাতে তোমাদের জন্য স্ত্রী-সম্ভোগ বৈধ করা হয়েছে। তারা তোমাদের পরিচ্ছদ এবং তোমরা তাদের পরিচ্ছদ। আল্লাহ জানেন যে তোমরা নিজেদের প্রতি অবিচার করছিলে। অতঃপর তিনি তোমাদের প্রতি ক্ষমাশীল হয়েছেন এবং তোমাদের অপরাধ ক্ষমা করেছেন।

    সুতরাং এখন তোমরা তাদের সঙ্গে সংগত হও এবং আল্লাহ যা তোমাদের জন্য বিধিবদ্ধ করেছেন তা কামনা কোরো। আর তোমরা পানাহার কোরো যতক্ষণ রাতের কৃষ্ণরেখা থেকে ঊষার শুভ্ররেখা স্পষ্টরূপে তোমাদের কাছে প্রতিভাত না হয়। অতঃপর নিশাগম পর্যন্ত রোজা পূর্ণ কোরো। তোমরা মসজিদে ইতিকাফরত অবস্থায় তাদের সঙ্গে সংগত হইয়ো না। এগুলো আল্লাহর সীমারেখা। সুতরাং এগুলোর নিকটবর্তী হইয়ো না। এভাবে আল্লাহ তাঁর নিদর্শনাবলি মানবজাতির জন্য সুস্পষ্টভাবে ব্যক্ত করেন, যাতে তারা আল্লাহভীরু হতে পারে। ’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ১৮৭)

    ৫. রোজা হজ-ওমরাহর প্রতিবিধান : হজ ও ওমরাহর সময় যদি ব্যক্তি কোনো বিশেষ পরিস্থিতির শিকার হয়, তবে রোজার মাধ্যমে কাফফারা আদায় করতে পারবে। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা আল্লাহর উদ্দেশ্যে হজ ও ওমরা পূর্ণ কোরো। কিন্তু তোমরা যদি বাধাপ্রাপ্ত হও, তবে সহজলভ্য কোরবানি কোরো। যে পর্যন্ত কোরবানির পশু তার স্থানে না পৌঁছে তোমরা মাথামুণ্ডন কোরো না। তোমাদের মধ্যে যদি কেউ অসুস্থ হয় কিংবা মাথায় কষ্টদায়ক কিছু থাকে, তবে রোজা বা সদকা অথবা কোরবানি দ্বারা তার ফিদয়া দেবে। যখন তোমরা নিরাপদ হবে, তখন তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি হজের আগে ওমরাহ দ্বারা লাভবান হতে চায়, সে সহজলভ্য কোরবানি করবে। কিন্তু যদি কেউ তা না পায়, তবে তাঁকে হজের সময় তিন দিন এবং ঘরে ফেরার পর সাত দিন এই পূর্ণ ১০ দিন রোজা পালন করতে হবে। ’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ১৯৬)

  • ইসলামের দৃষ্টিতে সুদ

    ইসলামের দৃষ্টিতে সুদ

    ইসলামের দৃষ্টিতে সুদ হলো হারাম। সুদ হলো শোষণের হাতিয়ার। যে কারণে ইসলামে সুদ হারাম বা পরিপূর্ণভাবে নিষিদ্ধ। আল কোরআনে আল্লাহতায়ালা একমাত্র সুদখোর ছাড়া আর কারও বিরুদ্ধে স্বয়ং যুদ্ধের ঘোষণা দেননি।

    এ প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন, ‘হে ইমানদারগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর আর সুদের যা কিছু অবশিষ্ট আছে তা সব পরিত্যাগ কর, যদি তোমরা ইমানদার হয়ে থাক। আর যদি তোমরা তা না কর তাহলে তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রসুলের পক্ষ থেকে যুদ্ধের ঘোষণা শোনো। ’ সুরা বাকারা। সুদ খাওয়া যে আল্লাহর কাছে কত বড় অন্যায় তা মর্মে মর্মে উপলব্ধি করার জন্য উল্লিখিত আয়াত দুটিই যথেষ্ট।

    এ সুদব্যবস্থা সমাজে দরিদ্রতা, ঋণ পরিশোধে অক্ষমতা, অর্থনৈতিক স্থবিরতা বা সমস্যা, বেকারত্ব, বহু কোম্পানি ও প্রতিষ্ঠানের দেউলিয়াত্ব ইত্যাদির মতো কত যে জঘন্য ক্ষতি ও ধ্বংসের দিকে ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রকে ঠেলে দিচ্ছে তা একমাত্র এ বিষয়ে গবেষণাকারীরাই যথাযথভাবে উপলব্ধি করতে সক্ষম। একজন দিনমজুর সারা দিন হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে শরীরের ঘাম ঝরিয়ে যা উপার্জন করে তা ব্যাংকে বা বিভিন্ন খাতে সুদ পরিশোধ করতেই শেষ হয়ে যায়। সুদের ফলে সমাজে একটা লুটেরা শ্রেণির উদ্ভব ঘটে। কিছুসংখ্যক মানুষের হাতে অধিকাংশ অর্থসম্পদ পুঞ্জীভূত হয়ে পড়ে।
    অন্যদিকে সমাজের বা দেশের গরিব-দুঃখীরা ক্রমেই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকে। সম্ভবত এসব কারণেই আল্লাহতায়ালা সুদি কারবারিদের বিরুদ্ধে নিজেই যুদ্ধের ঘোষণা করেছেন। সুদি কারবারে জড়িত, মধ্যস্থতাকারী ও সহযোগিতাকারী- সবাইকে রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অভিশাপ বা বদদোয়া করেছেন। জাবির (রা.) বলেন, রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সুদগ্রহীতা, সুদদাতা, সুদের লেখক আর সুদের সাক্ষীকে অভিশাপ বা বদদোয়া দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, তারা সবাই সমান অপরাধী।
    আর এ কারণেই সুদের হিসাব-নিকাশ লেখা, সুদ কাউকে দেওয়া বা নেওয়ার ব্যাপারে সহযোগিতা করা, সুদি দ্রব্য গচ্ছিত বা আমানত রাখা আর সুদি মালপত্রের পাহারা দেওয়া সবই নাজায়েজ। মোট কথা, সুদের কাজে অংশগ্রহণ আর যে কোনোভাবে সুদের সাহায্য-সহযোগিতা করা সবই হারাম।

  • সত্য যাচাইয়ে রসুলের আদর্শ অনুকরণীয়

    সত্য যাচাইয়ে রসুলের আদর্শ অনুকরণীয়

    পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, “ভালো ও মন্দ সমান হতে পারে না। মন্দ প্রতিহত কর উৎকৃষ্টতা দ্বারা। ফলে তোমার সঙ্গে যার শত্রুতা আছে সে হয়ে যাবে অন্তরঙ্গ বন্ধুর মতো’ (সুরা হা-মিম সাজদা-৪১)। রসুল (সা.) যে কোনো খবর অত্যন্ত ভালোভাবে যাচাই-বাছাই করে সিদ্ধান্ত নিতেন।

    রসুলুল্লাহ (সা.) একবার জাকাত সংগ্রহ করতে একজনকে একটি উপত্যকায় পাঠালে তিনি এসে খবর দিলেন সেখানকার লোকেরা মুরতাদ হয়ে গেছে। তারা জাকাত দিতে অস্বীকার করছে। এ কথা শুনে রসুল (সা.) মর্মাহত হয়ে যুদ্ধের জন্য খালিদ বিন ওয়ালিদকে নির্দেশ দিলেন। যুদ্ধে পাঠানোর আগে রসুল (সা.) তাঁকে নির্দেশ দিলেন সেখানে আক্রমণ শুরু করার আগে ভালোভাবে খোঁজখবর নিতে।

    খালিদ বিন ওয়ালিদ রাতের বেলা ওই উপত্যকা অবরোধ করলেন এবং ভোরের জন্য অপেক্ষা করতে থাকলেন। ফজরের সময় ওই উপত্যকা থেকে আজানের ধ্বনি ভেসে এলে তিনি চমকে উঠলেন। এরপর ওই এলাকায় গিয়ে প্রকৃত অবস্থা জানতে চাইলেন। সেখানকার নেতৃস্থানীয়রা জানালেন, তারা জাকাত দেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট লোকের অপেক্ষা করছেন।
    কিন্তু সেখানে কেউ না আসায় মদিনায় প্রতিনিধি পাঠানোর কথা ভাবছেন। প্রকৃত ঘটনা হলো এর আগে যাকে পাঠানো হয়েছিল তিনি ওই এলাকায় না গিয়ে পথিমধ্য থেকে ফিরে এসে মিথ্যা সংবাদ দিয়েছিলেন। আর মিথ্যা সংবাদ পরিবেশনের কারণে একটি উপত্যকায় বিপর্যয় ঘটতে যাচ্ছিল। কেবল রসুল (সা.)-এর বিচক্ষণতা ও প্রকৃত সংবাদ যাচাই-বাছাইয়ের কারণে ওই উপত্যকাটি সম্ভাব্য বিপর্যয় থেকে রক্ষা পেল। প্রত্যেক সংবাদকর্মীর উচিত সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রে প্রাপ্ত তথ্যের সত্যতা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া।

    সংবাদ পরিবেশনে সীমা লঙ্ঘন যাতে না হয় সে বিষয়েও সতর্ক থাকতে হবে। কারণ দায়িত্বহীনতার পরিণতিতে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে দেশ, জাতি ও সাধারণ মানুষ। আল কোরআনে বলা হচ্ছে, ‘কিন্তু সীমা লঙ্ঘন কোরো না। নিশ্চয় আল্লাহ সীমা লঙ্ঘনকারীদের ভালোবাসেন না। ’ বুখারি ও মুসলিমের হাদিসে রসুল (সা.) মিথ্যা সংবাদ প্রচার ও মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়াকে কবিরা গুনাহ উল্লেখ করা হয়েছে। সংবাদ পরিবেশনে সততার ব্যত্যয় মানুষের ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক এমনকি রাষ্ট্রীয় জীবন দুর্বিষহ করে তুলতে পারে। ছড়িয়ে পড়তে পারে অশান্তির দাবানল। অসত্য সংবাদ পরিবেশনা ও গুজব সৃষ্টি জাতীয় জীবনে কী বিপর্যয় ঘটায় তা দেশ ও বিশ্বের সমসাময়িক ঘটনাপ্রবাহের দিকে তাকালেও অনুমিত হবে। রসুল (সা.) প্রাপ্ত প্রতিটি তথ্য যাচাই করে সিদ্ধান্ত নিতেন। সংবাদ পরিবেশনের আগে তার যথার্থতা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া প্রত্যেক সংবাদকর্মীর নৈতিক দায়িত্ব।

  • আজ পবিত্র শবেবরাত

    আজ পবিত্র শবেবরাত

    আজ হিজরি বর্ষপঞ্জির শাবান মাসের ১৪ তারিখ দিবাগত রাত পবিত্র শবেবরাত। পবিত্র হাদিস গ্রন্থে এ রাতটিকে ‘লাইলাতুন নিসফি মিন শাবান’ বা ‘শাবান মাসের মধ্যরজনী’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ফারসি ‘শব’ মানে রাত, আরবি ও ফারসিতে ‘বরাত’ মানে মুক্তি। তাই উম্মতে মোহাম্মদি শবেবরাতকে পাপমুক্তির রাত হিসেবে পালন করে থাকেন।

    বিশ্বাস করা হয়, গুনাহ মাফের এ রজনীতে নতুন করে ভাগ্য লেখা হয়। পবিত্র এ রাতের ফজিলত সম্পর্কিত নবী করিম (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহতায়ালা অর্ধ শাবানের রাতে (শবেবরাত) সৃষ্টির প্রতি রহমতের দৃষ্টি দেন এবং মুশরিক ও বিদ্বেষ পোষণকারী ছাড়া আর সবাইকে ক্ষমা করে দেন। ’ (মুসনাদে আহমদ : ৪/১৭৬)
    বাংলাদেশে যথাযথ ধর্মীয় মর্যাদা ও ভাবগাম্ভীর্যের সঙ্গে শবেবরাত পালন করবেন ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা। পাপমোচন বা গুনাহ মুক্তির এ রাতে তারা আল্লাহর দরবারে ক্ষমা প্রার্থনাসহ নিজের, পরিবারের ও মুসলিম উম্মাহর সুখ, শান্তি ও সমৃদ্ধি কামনা করবেন।

    মহান আল্লাহর করুণা লাভের আশায় নফল নামাজ আদায়, কোরআন তিলাওয়াত, জিকির-আসকার, কবর জিয়ারতসহ নানা ইবাদত-বন্দেগির মধ্য দিয়ে আজকের রাতটি অতিবাহিত করবেন। পবিত্র শবেবরাত উপলক্ষে আগামীকাল ৮ মার্চ বুধবার সরকারি ছুটি। এ উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মোঃ আবদুল হামিদ এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পৃথক বাণী দিয়েছেন। রাষ্ট্রপতি তাঁর বাণীতে বলেন, সৌভাগ্যমি ত পবিত্র শবেবরাতের পূর্ণ ফজিলত আমাদের ওপর বর্ষিত হোক।

  • শবেবরাতেও যাদের ক্ষমা নেই

    শবেবরাতেও যাদের ক্ষমা নেই

    শবেবরাতে যারা মহান আল্লাহর কাছে ক্ষমা, দয়া, রিজিক ইত্যাদি চাইবে তাদের চাওয়া পূরণ করা হবে। তবে এ রাতে মুশরিক ও হিংসুককে খাঁটি তাওবা না করলে ক্ষমা করা হবে না, তাদের চাহিদাও পূরণ করা হবে না। নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ মধ্য শাবানের রাতে (বিশেষভাবে) আত্মপ্রকাশ করেন এবং মুশরিক ও হিংসুক ব্যতীত তাঁর সৃষ্টির সবাইকে ক্ষমা করেন। ’ (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ১৩৯০)

    কারো ভালো কিছু বা উন্নতি দেখে তার বিলুপ্তি কামনাকে বলা হয় হাসাদ বা হিংসা, যা জায়েজ নয়।

    নবীজি (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘তোমরা পরস্পর বিদ্বেষ পোষণ কোরো না। হিংসা কোরো না। ষড়যন্ত্র কোরো না। সম্পর্ক ছিন্ন কোরো না।

    তোমরা সবাই আল্লাহর বান্দা ও ভাই ভাই হয়ে যাও। ’ (বুখারি, হাদিস : ৬০৭৬)
    তবে কারো ভালো কিছু বা উন্নতি দেখে তার বিলুপ্তি কামনা না করে নিজেও তা অর্জনের চেষ্টা করাকে বলা হয় গিবতা বা ঈর্ষা, যার উৎসাহ দেওয়া হয়েছে।

    ইবলিস শয়তান হিংসা ও অহংকারের কারণে আদম (আ.)-কে সেজদা না করে বিতাড়িত হয়েছে। আদমপুত্র হাবিলের কোরবানি কবুল হওয়ায়, হিংসাবশত কাবিল তাঁকে খুন করে প্রথম অন্যায় খুনকারী হয়েছে।

    ইউসুফ (আ.)-এর ভাইয়েরা হিংসা করে তাঁকে কূপে ফেলে নিন্দার পাত্র হয়েছে। এ ছাড়া অসংখ্য-অগণিত মানুষ হিংসার রোগে আক্রান্ত হয়ে নানা অপরাধে জড়িয়েছে-জড়াচ্ছে।
    মুনাফিকের স্বভাব হিংসা করা। হিংসার কারণে তারা ঈমানদারদের উন্নতিতে নাখোশ হয়। ইরশাদ হয়েছে, ‘তোমাদের (ঈমানদারদের) কোনো কল্যাণ হলে তারা অসন্তুষ্ট হয়।

    আর তোমাদের কোনো অকল্যাণ হলে তারা আনন্দিত হয়। ’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত : ১২০)
    প্রকৃত মুমিনের স্বভাব—অন্যের কল্যাণ কামনা করা, অকল্যাণ কামনা থেকে বিরত থাকা। নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের কেউ প্রকৃত মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না সে তার ভাইয়ের জন্য সেটাই পছন্দ করবে, যা তার নিজের জন্য পছন্দ করে। ’ (বুখারি, হাদিস : ১৩)

  • পবিত্র মেরাজের মাস রজব

    পবিত্র মেরাজের মাস রজব

    রজব ইসলামের ইতিহাসে একটি গৌরবান্বিত মাস। এ মাসের ২৭ তারিখের রাতে মেরাজে আল্লাহর দিদার লাভ করেন রসুলুল্লাহ (সা.)। মেরাজ শব্দের অর্থ ওপরে ওঠা বা ঊর্ধ্বলোকে গমন। রসুলুল্লাহ (সা.)-কে মহান আল্লাহ পৃথিবী থেকে ঊর্ধ্বলোকে নিয়ে বিশেষ মর্যাদায় ভূষিত করে যে সম্মান দিয়েছেন, ইসলামের ইতিহাসে তা মেরাজ বা ঊর্ধ্বলোকে ভ্রমণ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে।

    উল্লেখ্য, মেরাজের ঘটনা কবে সংঘটিত হয়েছে এ সম্পর্কে বিভিন্ন বর্ণনা থাকলেও বেশির ভাগ বর্ণনা দ্বারা বোঝা যায়, রসুল (সা.)-এর নবুয়ত প্রাপ্তির পাঁচ থেকে ১২ বছরের মধ্যে মেরাজ সংঘটিত হয়েছে। আল্লাহর অসীম কুদরত মেরাজের রাত নানান কারণে তাৎপর্যপূর্ণ।
    পুণ্য এই রাতে মুহাম্মদ (সা.) মহান আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাতের সৌভাগ্য লাভ করেন। নবুয়তের কয়েক বছর পর রজবের এক শুভরাতে কাবার হাতিম থেকে বোরাকযোগে ঊর্ধ্বাকাশে গমন এবং আল্লাহর দিদার ও সান্নিধ্য লাভ করেন।

    এ পুণ্যরাতে মুসলমানের জন্য পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ হয়। রসুল (সা.)-এর অসংখ্য মাজেজার মধ্যে মেরাজ অন্যতম। মেরাজের রাতে রসুল (সা.)-এর মক্কা থেকে বায়তুল মুকাদ্দাস ও বায়তুল মুকাদ্দাস থেকে ঊর্ধ্বাকাশে গমন, সপ্ত আকাশ ভ্রমণ, নবীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ, বেহেশত-দোজখ দর্শন ও সিদরাতুল মুনতাহা পর্যন্ত গমন, সিদরাতুল মুনতাহা থেকে রফরফের মাধ্যমে আরশে আজিমে গমন, সেখান থেকে লা-মাকান ভ্রমণ এবং আল্লাহর দিদার ও সান্নিধ্য লাভ এবং সেখান থেকে পুনরায় মক্কায় আগমনের ঘটনা ঘটে। এ বিস্ময়কর সফর বা ভ্রমণকেই এক কথায় মেরাজ বলা হয়।
    মেরাজের সফরে দুটি পর্ব রয়েছে। একটি হলো মক্কা মুকাররমা থেকে বায়তুল মুকাদ্দাস পর্যন্ত সফর। অন্যটি হলো বায়তুল মুকাদ্দাস থেকে বিভিন্ন আসমানে আরোহণ ও ভ্রমণ। প্রথম পর্বকে ইসরা আর দ্বিতীয় পর্বকে মেরাজ বলে। অর্থাৎ মক্কা মুকাররমা থেকে বায়তুল মুকাদ্দাস পর্যন্ত সফর হলো ইসরা বা রাতের সফর আর বায়তুল মুকাদ্দাস থেকে সাত আসমানে ভ্রমণ হলো মেরাজ বা ঊর্ধ্বলোকে ভ্রমণ।

  • হাদিসের দৃষ্টিতে মানব জাতির মুক্তি

    হাদিসের দৃষ্টিতে মানব জাতির মুক্তি

    “আল্লাহুম্মা ছল্লি ওয়াসাল্লিম ওয়া বারিক আলা সাইয়্যেদিনা মুহাম্মাদিন ওয়া আলা আলিহি ওয়া আসহাবিহি আজমাইন, ক্বালা রাসুলুল্লাহি সাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, আছছিদকু ইউনজি ওয়াল কিজবু ইউহলিক। ”

    এ হাদিসটি হজরত আবু হুরাইরা (রা.) বর্ণিত হাদিস। হজরত ইমাম বায়হাকি (রহ.) তার সুনানে কুবরার মধ্যে হাদিসখানা উল্লেখ করেছেন। এই হাদিসের মধ্যে হজরত রসুলে পাক (সা.) এই দিকনির্দেশনা করেছেন যে, কোন বস্তু মানুষকে নাজাত বা মুক্তি প্রদান করে, আর কোন বস্তু মানুষকে হালাক বা ধ্বংস করে দেয়।

    মুক্তি বা নাজাতের চিন্তা করা এটা মানুষের স্বভাবগত বিষয়। যে তা না করে সে বোকা! হজরত রসুলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইন্তেকালের পর একদিন হজরত ওমর (রা.) হজরত ওসমান গনি (রা.)-এর সামনে দিয়ে অতিক্রমকালে হজরত ওসমান গনি (রা.)-কে সালাম দিলেন। হজরত ওসমান গনি (রা.) সালামের জবাব দেননি। সালাম দেওয়া সুন্নত, আর সালামের জবাব দেওয়া ওয়াজিব।

    আগে সালাম দিলে সওয়াব বেশি। জবাব দিলে সওয়াব কম। সালাম দিয়ে সুন্নত পালন করলে সওয়াব বেশি পাওয়া যায়। আর জবাব দিয়ে ওয়াজিব পালন করলে সওয়াব কম।
    সুতরাং বোঝা গেল বড় কাজ করলেই বড় হওয়া যায় না। ছোট কাজ করেও বড়ত্ব অর্জন করা যায়। আসল কথা হলো মনের ব্যাপার।
    যাই হোক সালামের জবাব না দেওয়া এটা একটা অপরাধ। তাই হজরত ওসমান (রা.) সালামের জবাব না দেওয়ার কারণে হজরত ওমর (রা.) হজরত আবু বকর (রা.)-এর কাছে অভিযোগ করলেন।

    তখন খলিফা ছিলেন হজরত আবু বকর (রা.)। হজরত ওমর (রা.)-এর মতো ব্যক্তিত্ব খলিফার দরবারে বিচার নিয়ে গেছেন সালামের জবাব না দেওয়ার অভিযোগে। আজকে যদি কোনো ব্যক্তি এ ধরনের অভিযোগ নিয়ে কোনো অফিসের বস বা কর্মকর্তার কাছে যায় এবং বলে, স্যার আমি অমুককে সালাম দিয়েছি, সে সালামের জবাব দেয়নি। তাহলে তাকে পাগল ছাড়া কিছু বলবে?

    বলবে, মিয়া! অভিযোগ করার আর কোনো বিষয় পেলে না? আর যদি কেউ প্রেসিডেন্টের কাছে যায় এই অভিযোগ নিয়ে, তাহলে? যাই হোক আমিরুল মুমিনিন হজরত আবু বকর (রা.) হজরত ওসমানের বিরুদ্ধে এই অভিযোগ শুনে চিন্তা করলেন, তিনি তো এমন লোক নন। যার কাছে নবী করিম (সা.) স্বীয় দুই কন্যাকে বিয়ে দিয়েছেন এবং এও বলেছেন, যদি আমার একশত মেয়ে থাকত, আর একেক জন মারা যেত, তাহলে একে একে সবাইকে আমি ওসমানের কাছে বিয়ে দিতাম। তা ছাড়া নবী করিম (সা.) বলে গেছেন, আল্লাহতায়ালা আমাকে জানিয়েছেন ওসমান (রা.) জান্নাতি। সুতরাং এমন ব্যক্তি সালামের জবাব থেকে বিরত থাকে কীভাবে? বিষয়টির কারণ ও রহস্য জানতে আমিরুল মুমিনিন স্বয়ং বের হয়ে হেঁটে হজরত ওসমান (রা.)-এর বাড়িতে গেলেন। গিয়ে সালাম দিলেন।
    আজকাল তো মানুষ এমনভাবে সালাম দেয় যে, সালামের যা অর্থ ছিল, তা পরিবর্তন হয়ে সম্পূর্ণ বিপরীত অর্থ চলে আসে। বলে ‘সামালেকুম’ অর্থাৎ আপনি মরে যান। জবাবে বলে ওয়ালাইকুম, অর্থাৎ আপনিও মরে যান। সুতরাং হজরত আবু বকর (রা.) সালাম দিলেন ‘আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ। হজরত ওসমান (রা.) বললেন, “ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহ। ”

    হজরত আবু বকর (রা.) হজরত ওসমান (রা.)-কে জিজ্ঞেস করলেন, হজরত ওমর আপনাকে সালাম দিয়েছিলেন, আপনি তার সালামের জবাব দেননি কেন? হজরত ওসমান (রা.) বললেন, বলেন কী? হজরত ওমর (রা.) সালাম দেবেন আর সালামের জবাব দেব না-এটা কী করে সম্ভব? তিনি কখন সালাম দিয়েছেন তা তো আমি কিছুই বলতে পারছি না। হজরত আবু বকর (রা.) ফিরে এলেন। বললেন, আসল ঘটনা আমি বুঝতে পেরেছি। আসল ঘটনা হলো, নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ওফাতের ফলে ওসমানের অবস্থা এমন হয়েছে যে, তার সামনে দিয়ে কে যায় কে আসে এবং কে সালাম দেয় আর কে কী বলে এসবের ব্যাপারে তার কোনো অনুভূতিই নেই। এ প্রসঙ্গে হজরত ওসমান (রা.) স্বয়ং বলেন, আমাকে ক্ষমা করবেন! নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ইন্তেকালের ফলে আমি খুবই চিন্তিত ছিলাম। কারণ আমি নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে একটি প্রশ্ন করতে চেয়েছিলাম মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্তে, কিন্তু সেটা সম্ভব হয়নি। তাই আমি খুবই পেরেশান ছিলাম। হজরত আবু বকর (রা.) বললেন, সেই প্রশ্নটা কী? হজরত ওসমান (রা.) বললেন, প্রশ্নটা হলো, রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ইন্তেকালের পর জাতির মুক্তির কী ব্যবস্থা হবে?

    যে যেমন তাঁর চিন্তা-ভাবনাও তেমন। তিনি নিজের ব্যাপারে চিন্তিত ছিলেন না। যেহেতু তিনি আগামী দিনে আমিরুল মুমিনিন হবেন, তাই চিন্তা-ভাবনাও ঠিক সে পর্যায়ের। যাই হোক হজরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) তা শুনে বললেন, আমি এই প্রশ্ন রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে করেছি এবং তিনি এর উত্তর দিয়ে গেছেন। হজরত আবু হুরাইরা (রা.) বলেন, আমিও রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তা জিজ্ঞেস করেছি তিনি আমাকেও এর উত্তর দিয়ে গেছেন। হজরত মায়াজ (রা.) বলেন, আমাকেও রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর উত্তর দিয়ে গেছেন। হজরত আনাস (রা.) বলেন, আমাকেও রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর উত্তর প্রদান করে গেছেন। হজরত ওসমান (রা.) বললেন, আমি ধন্য হে আবু বকর (রা.) আপনিই খলিফা হওয়ার উপযুক্ত। নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অবর্তমানে আপনি তাঁর স্থলাভিষিক্ত হওয়ার অধিক যোগ্য। হে আবু হুরাইরাহ তুমিও উপযুক্ত।