বেলায়েত বাবলু : ১৯৭৫ থেকে ২০২০। ঘাতকদের বুলেটের ক্ষত চিহ্ন নিয়ে ৪৫ বছর কাটিয়ে দেয়া শহীদ জননী সাহান আরা বেগম চলে গেছেন না ফেরার দেশে। রবিবার রাতে তাঁর মৃত্যু হলেও দুখের এ খবরটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। শোকের ছায়া নেসে আসে বরিশালসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। তাঁর মৃত্যুতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। ঢাকায় প্রথম এবং বরিশালে নিয়ে এসে দ্বিতীয় দফা জানাযা শেষে রাষ্ট্রিয় মর্যাদায় তাঁকে বগুড়া রোড মুসলিম গোরস্থানে দাফন করা হয়েছে। তাঁর মৃত্যুতে প্রকৃতিও শোক পালন করছে। আকাশে নেই সূর্য। মেঘলা আকাশ। অঝোর ধারায় ঝড়ে বৃষ্টিও যেন শোক প্রকাশ করছে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট কালোরাতে সাহান আরা বেগমের শিশু পুত্র সুকান্ত বাবু ঘাতকতের বুলেটে নির্মমভাবে হত্যাকান্ডের শিকার হয়। সেদিন বুলেটে অাঘাতপ্রাপ্ত হয়েও আরেক শিশু পুত্র, আজকের বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহকে বুকে জড়িয়ে কোনভাবে প্রানে বেঁচে গিয়েছিলেন সাহান আরা । সেদিনকার কালো রাতের নিমর্ম বর্বরতার ক্ষতিগ্রস্ত শহীদ জননী সাহান আরা বেগম গত রোববার রাতে অনেকটা আকস্মিকভাবেই না ফেরার দেশে পাড়ি জমান। জননী সাহসিকা সাহান আরা তাঁর দৃঢ়চেতা মনোবলের কারণে বড় বড় বির্পযয়ের সময়ে ভেঙে পড়েননি। তিনি সকল বিপদ যেমন শক্ত হাতে সামলিয়েছেন তেমনি স্বামী, সন্তানকে ভালবাসার বাঁধনে আবদ্ধ করে রেখেছিলেন। দলীয় নেতাকর্মীদের কাছেও তিনি ছিলেন ভরসার আশ্রয়স্থল। ৪ সন্তানের জননী সাহান আরা একজন ভালো গৃহীনি ও যেমন একজন ভালো মা ছিলেন তেমনি পাশাপাশি রাজনৈতিক সচেতনও ছিলেন। স্বামী পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি বাস্তবায়ন ও পরিবীক্ষণ কমিটির আহবায়ক, মাননীয় মন্ত্রী ও বরিশাল-১ আসনের সাংসদ আবুল হাসানাত আবদুল্লাহকে তিনি সবসময় তাঁর সকল কাজে সমর্থন ও সাহস জুগিয়েছেন। ৯৬ পরবর্তী সময়ে তাঁকেও স্বামী সন্তানকে নিয়ে দুঃসহ জীবনযাপন করতে হয়েছে। কোনভাবেই মনোবল না হারিয়ে সকলকে নিয়ে তিনি আবার ঘুরে দাঁড়িয়েছেন। ৭৫ সালের ১৫ আগস্ট যে সন্তানকে বুকের মধ্যে আগলে রেখে ছিলেন সেই ছেলে সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহকে জীবদ্দশায় তিনি প্রতিষ্ঠিত দেখে গেছেন। সন্তান মেয়র হওয়ার পর একবারের জন্য তিনি ছেলের অফিস কার্যালয়ে গিয়েছিলেন। মাকে নিজের চেয়ারে বসিয়ে মেয়র সাদিক আবদুল্লাহ সেদিন কতোটাযে আনন্দিত হয়েছিলেন তা যারা চোখে দেখেননি তারা হয়তো অনুধাবনও করতে পারবেন না। দলের দুঃসময়ে সাহান আরা দলীয় নেতাকর্মীদের অভিভাবকের ন্যায় সাহস জুগিয়েছেন। বাংলাদেশ মহিলা আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত থাকার পাশাপাশি মৃত্যুর সময়কাল পর্যন্ত বরিশাল জেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহ-সভাপতির দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন। সাহান আরা রাজনীতিতে যেমন যুক্ত ছিলেন তেমনি ছিলেন সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর অন্যতম পৃষ্ঠপোষক। তিনি বরিশালের অন্যতম নাট্য সংগঠন শব্দাবলী গ্রুপ থিয়েটারের উপদেষ্টা মন্ডলীর চেয়ারম্যান ছিলেন। যুক্ত ছিলেন প্রান্তিকের সাথেও। গান প্রেমী সাহান আরা দর্শকদের অনুরোধে মাঝে মাঝে গান গাইতেন। সর্বশেষ চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে তাঁর জন্মদিনের অনুষ্ঠানে শব্দাবলীতে তিনি গান গেয়েছিলেন। সাহান আরা বেগম একজন সমাজসেবী ছিলেন। তাঁর কাছে গিয়ে সহায়তা পাননি এমন লোক খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। সাহান আরা বেগম দৈনিক আজকের পরিবর্তন ও মাসিক আনন্দ লিখনের সাথে যুক্ত থেকে এ দুটি পত্রিকা প্রকাশে অন্যতম ভূমিকা পালন করেছেন দীর্ঘদিন। সাহান আরা বেগমকে যারা কাছে থেকে দেখেছেন তারা জানেন তিনি কতোটা আলাপি আর স্পষ্টবাদী ছিলেন। একজন নারী হয়েও তিনি অন্যায়ের কাছে কখনো মাথা নত করেননি। তিনি মৃত্যুকে ভয় পেতেন না। তিনি প্রায়শই বলতেন ৭৫ সালেই মরে যেতে পারতাম। তিনি তাঁর পরিবারের সদস্যদের সাহস জুগিয়েছেন সবসময়। বোধ করি তাঁর অনুপ্রেরণাতেই বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের বর্তমান মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহ রাজনীতিতে বেশী সক্রিয় হয়েছিলেন। সাদিক আবদুল্লাহ তাঁর মা-বাবাকে কতোখানি ভক্তি শ্রদ্ধা করেন তা বলার অপেক্ষা রাখেনা। মায়ের পায়ের তলাতে সন্তানের জান্নাত এটা মনে প্রানে বিশ্বাস করে সাদিক আবদুল্লাহ তাঁর সকল ভালো কাজে মা-বাবার পায়ে সালাম দিতে ভুলেন না। তাঁর মমতাময়ী মায়ের আকস্মিক চলে যাওয়ায় তিনি দারুনভাবে ব্যথিত হয়েছেন। এই শোক কাটিয়ে উঠতে তাঁর অনেক সময় লাগবে। যে মায়ের কারণে পৃথিবীর মুখ দেখা, যার বিচক্ষণতার কারণে নতুন জীবন পাওয়া সেই মায়ের না ফেরার দেশে চলে যাওয়া সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহর জন্য কতোটা বেদনার তা কেউ-ই বুঝবেনা। মহান আল্লাহতালা শোকাহত এ পরিবারকে শোক বইবার শক্তি দান করুন।
Category: রাজণীতি
-

দেশে ২৪ ঘণ্টায় করোনায় মৃত ৪২, নতুন শনাক্ত ২ হাজার ৭৩৫ জন
দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় ২ হাজার ৭৩৫ জন জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে। আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন আরও ৮২ জন। এ নিয়ে করোনা শনাক্ত হয়ে দেশে মোট মৃত্যুর সংখ্যা ৯৩০ জন। দেশে মোট করোনা আক্রান্তের সংখ্যা ৬৮ হাজার ৫০৪ জন।
দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে ১২ হাজার ৯৪৪ টি। নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে ১৩ হাজার ৯৬১ টি।
আজ সোমবার দুপুরে করোনার সর্বশেষ অবস্থা নিয়ে স্বাস্থ্য অধিদফতরের নিয়মিত অনলাইন ব্রিফিংয়ে এসব তথ্য জানানো হয়।গত ২ ফেব্রুয়ারি থেকে দেশে করোনাভাইরাস শনাক্তের পরীক্ষা শুরু করে। ৮ মার্চ দেশে প্রথম রোগী শনাক্ত হয়।
-

সাহান আরা আব্দুল্লাহ’র মৃত্যুতে প্রধানমন্ত্রীর শোক
বরিশাল সিটি করপোরেশনের মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লার মা ও বরিশাল জেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহ-সভাপতি বেগম সাহান আরা আব্দুল্লাহ হৃদক্রিয়া বন্ধ হয়ে রাজধানীর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে মারা গেছেন। (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজেউন)। তার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
রবিবার রাতে আওয়ামী লীগের তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক আফজান হোসেন শাহানারা আব্দুল্লাহর মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইং জানায়, বেগম শাহানারা আব্দুল্লাহর মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করে শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
এদিকে রাতেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে শাহানারা আব্দুল্লার প্রথম জানাজায অনুষ্ঠিত হয়েছে। এসময় কেন্দ্রীয় নেতাদের মধ্যে দলের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, ছাত্রলীগ সভাপতি আল নাহিয়ান জয় উপস্থিত ছিলেন।
-

সাহান আরা আবদুল্লাহ’র মৃত্যুতে বাংলার মুখ ২৪.কম এর শোক
পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি বাস্তবায়ন ও পরিবীক্ষণ কমিটির আহবায়ক, মাননীয় মন্ত্রী ও বরিশাল-১ আসনের সংসদ সদস্য জনাব আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ মহোদয়ের স্ত্রী ও বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের মাননীয় মেয়র জনাব সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহ মহোদয় এর মাতা বীর মুক্তিযোদ্ধা, বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও সমাজসেবক এবং ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট কালরাতের প্রত্যক্ষদর্শী সাহান আরা বেগম মৃত্যুতে বাংলার মুখ ২৪.কম এর প্রকাশকও সম্পাদক সহ পত্রিকায় কর্মরত সকল সংবাদকর্মীবৃন্দ গভীর শোক প্রকাশ করেছেন।
মৃত্যুকালে তিনি স্বামী, ৩ ছেলে ও ১ কন্যা সন্তানসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। আজ তাঁকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় বরিশালে সমাহিত করা হয়।
এক শোক বিবৃতিতে বাংলার মুখ ২৪.কম এর প্রকাশক ও সম্পাদক পলাশ চৌধুরী মরহুমার বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা ও সহমর্মিতা জ্ঞাপন করেন।
-

না ফেরার দেশে সাহান আরা আবদুল্লাহ
পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি বাস্তবায়ন ও পরিবীক্ষণ কমিটির আহবায়ক, মন্ত্রী ও বরিশাল-১ আসনের সংসদ সদস্য আবুল হাসানাত আবদুল্লাহর স্ত্রী ও বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহর মাতা, বরিশাল জেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহ সভাপতি, বীর মুক্তিযোদ্ধা, বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও সমাজসেবক এবং ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট কালরাতের প্রত্যক্ষদর্শী সাহান আরা আবদুল্লাহ ইন্তেকাল করেছেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)।
রোববার (৭ জুন) রাত সাড়ে ১১টার দিকে ঢাকায় চিকিৎসাধীন অবস্তায় তিনি শেষ নিঃশেষ ত্যাগ করেন।
মৃত্যুর বিষয়টি বরিশাল জেলা আওয়ামীলীগের উপ-দপ্তর সম্পাদক ও বরিশাল জেলা আইনজীবী সমিতির সম্পাদক এড. কাইয়ুম খান কায়সার নিশ্চিত করেছেন।
মৃত্যুকালে তিনি স্বামী, ৩ ছেলে ও ১ কন্যা সন্তানসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। আজ সোমবার তাঁকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় বরিশালে সমাহিত করা হবে।
-

মুক্তিযোদ্ধার নতুন তালিকায়ও বিতর্কিতরা
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুর উপজেলার মির্জা ইসমত ও আওলাত হোসেনকে অমুক্তিযোদ্ধা হিসেবে চিহ্নিত করে যাচাই–বাছাইয়ের সময় তাঁদের নাম বাতিল তালিকায় রেখেছিলেন স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারা। তাঁদের একজন এখন মৃত। অথচ ৩ জুন এই দুজনকে যুক্ত করে নতুন করে ১ হাজার ২৫৬ জনকে মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি দিয়ে একটি তালিকা প্রকাশ করেছে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়।
স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার ও যাচাই–বাছাই কমিটির সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ছাড়াও দেশের যে কয়টি জেলার নতুন মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে, তার অনেকগুলো নিয়েই বিতর্ক রয়েছে।
ফরিদপুরের সালথা উপজেলার নতুন ১১ মুক্তিযোদ্ধার অর্ধেকের নাম নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। আর নরসিংদীর নতুন তালিকা দেখে স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারা বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। এমন আরও কিছু অভিযোগ পাওয়া গেছে।
ভালো করে যাচাই–বাছাই না করে এই করোনা দুর্যোগের সময় হঠাৎ নতুন মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা কেন প্রকাশ করা হলো, জানতে চাইলে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক প্রথম আলোকে বলেন, ‘জেলা-উপজেলা থেকে যেসব প্রতিবেদন পাওয়া গেছে, আমরা তা যথেষ্ট যাচাই–বাছাই করে এ তালিকা প্রকাশ করেছি। তারপরও যদি কারও অভিযোগ থাকে, তবে আপিলের সুযোগ আছে।’
এর আগে গত বছরের ১৫ ডিসেম্বর ‘একাত্তরের রাজাকার, আলবদর, আলশামস ও স্বাধীনতাবিরোধী তালিকা প্রকাশ—প্রথম পর্ব’ শিরোনামে ১০ হাজার ৭৮৯ জনের নামের তালিকা প্রকাশ করেছিল মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়। এ নিয়ে সারা দেশে ক্ষোভ–বিক্ষোভ ও সমালোচনার মুখে ওই তালিকা স্থগিত করা হয়।
অমুক্তিযোদ্ধারা তালিকায়
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুরের মির্জা ইসমত ও আওলাত হোসেনকে অমুক্তিযোদ্ধা হিসেবে চিহ্নিত করেছিল স্থানীয় কমিটি। স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের যাচাই–বাছাইয়ের বৈঠকের কার্যবিবরণীতে এ দুজনকে অমুক্তিযোদ্ধা হিসেবে ‘গ’ তালিকায় (বাতিল তালিকা) দেখানো হয়। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার অন্য উপজেলাগুলোতেও বিতর্কিত ব্যক্তিদের নাম মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় যুক্ত করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
বাঞ্ছারামপুর উপজেলার সাবেক মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার এইচ এম আবদুল কাদির প্রথম আলোকে বলেন, ‘উপজেলায় মুক্তিযোদ্ধাদের যাচাই-বাছাইয়ের সময় আমি উপস্থিত ছিলাম। ওই সময় মির্জা ইসমত ও আওলাত হোসেনের নাম “গ” তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। কারণ, আওলাতের কাছে মুজিব বাহিনীর একটি সনদ থাকলেও তিনি মুক্তিযোদ্ধা নন। আর প্রয়াত মির্জা ইসমতের পরিবারের কাছে তাঁর মুক্তিযোদ্ধার কোনো দলিলপত্র নেই। যাচাই–বাছাইয়ে তাঁরা কিছু দেখাতে পারেননি।’
তাহলে তাঁদের নাম কী করে নতুন তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হলো? জবাবে আবদুল কাদির বলেন, ‘আমি নিশ্চিত, অর্থ লেনদেনের মাধ্যমে তারা মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে নাম অন্তর্ভুক্ত করেছে।’
ফরিদপুরের স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের অভিযোগ, নতুন তালিকায় অনেক অমুক্তিযোদ্ধাকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে দেখানো হয়েছে। আবার প্রকৃত অনেক মুক্তিযোদ্ধার নাম বাদ দেওয়া হয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ফরিদপুরের সালথা উপজেলায় নতুন করে ১১ জনকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। ওই এলাকার এক সাবেক মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, এই ১১ জনের মধ্যে অর্ধেকের নাম নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। বিশেষ করে দুজনের বিষয়ে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে অভিযোগ করা হয়েছিল এবং মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী বিষয়টি খতিয়ে দেখার জন্য তৎকালীন উপজেলা কর্মকর্তাকে নির্দেশ দিয়েছিলেন। এলাকায় সবাই জানেন, তাঁরা অমুক্তিযোদ্ধা। এই দুজন হলেন মফিজুর রহমান খান ও আজিজুল হক মোল্লা।
একইভাবে এ জেলার চরভদ্রাসনে নতুন ছয়জনকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে দুজন অমুক্তিযোদ্ধা। চরভদ্রাসন মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক উপকমান্ডার আবুল কালাম বলেন, অমুক্তিযোদ্ধাদের নাম নতুন তালিকায় প্রকাশ করায় প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে।
ফরিদপুর সদরের সাবেক মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার আবুল ফায়েজ প্রথম আলোকে বলেন, ‘তালিকায় অসামঞ্জস্য আছে। সাবেক মন্ত্রী শাজাহান খান যাচাই-বাছাইয়ে ছিলেন। তিনি মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ও জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের (জামুকা) সদস্যও। তাঁর বিরুদ্ধে কী করে বলব, তাই এ তালিকা নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে বিব্রতবোধ করছি।’
নরসিংদীর সাবেক জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মোতালিব পাঠান প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি এ তালিকা দেখে হতবাক। নরসিংদীতে প্রায় ১ হাজার ৩০০ মুক্তিযোদ্ধা হওয়ার জন্য আবেদন করেছিলেন। আমরা চারজনের নাম সুপারিশ করেছিলাম। এখন দেখি সেখান থেকে দুজনের নাম তালিকায় আছে। বাকিদের নাম কোথা থেকে গেল, কারা সুপারিশ করল, কীভাবে করল আমার জানা নেই।’ নতুন তালিকায় নরসিংদী থেকে ১৫ জনের নাম উল্লেখ রয়েছে।
প্রসঙ্গত, বিএনপি-জামায়াত চারদলীয় জোট সরকারের আমলে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে ১ লাখ ৯৮ হাজার ৮৮৯ জনের তালিকার গেজেট প্রকাশ করা হয়। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এসে অভিযোগ করে, চারদলীয় জোট সরকারের আমলে ৭০ হাজারের বেশি অমুক্তিযোদ্ধা তালিকাভুক্ত হয়েছে। এরপর জেলা প্রশাসক ও ইউএনওদের নিয়ে কমিটি করে মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাইয়ের দায়িত্ব দেয়। এরপর আরও সাড়ে ১১ হাজার মুক্তিযোদ্ধার সনদ দেয়। তবে যাচাই-বাছাইয়ের কাজ চলতে থাকে। সর্বশেষ গেজেটসগ মোট সাত বার তালিকা হালনাগাদের পর মোট মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৩৪ হাজার। আর এখন যুক্ত হলো আরও ১ হাজার ২৫৬ জন।
স্বজনপ্রীতি, তদবির
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত বছরের ১০ ডিসেম্বর জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের (জামুকা) ৬৬তম সভায় নতুন প্রায় ১ হাজার ৩০০ মুক্তিযোদ্ধার নামের একটি তালিকা অনুমোদন করা হয়। গেজেট প্রকাশের আগে যাঁরা প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দেখাতে পারেননি, তাঁদের নাম বাদ দিয়ে ১ হাজার ২৫৬ জনের তালিকা প্রকাশ করা হয়। পর্যায়ক্রমে আরও নতুন তালিকা প্রকাশ করা হবে বলে জানিয়েছে মন্ত্রণালয় সূত্র।
করোনা পরিস্থিতির মধ্যে ছয় মাস আগের তালিকা হঠাৎ করে এভাবে প্রকাশ হওয়ায় বিস্মিত হয়েছেন অনেকেই। স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের মতে, এ সময় এভাবে তালিকা প্রকাশ করার অর্থ হলো কেউ যাতে অমুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে সমালোচনা বা অভিযোগ করতে না পারে।
জামুকার কয়েকটি সভায় উপস্থিত ছিলেন এমন দুজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, সভায় যাচাই–বাছাই করে নতুন অনেকের নাম ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও সুপারিশের ভিত্তিতে যুক্ত করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে কাগজপত্র সঠিক না থাকলেও স্বজনপ্রীতি করেছেন জামুকার কোনো কোনো সদস্য। এ ছাড়া অনেকের তদবিরও ছিল।
মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দুজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বলেন, কোনো কোনো এলাকায় ৮০ থেকে ১০০ জন নতুন মুক্তিযোদ্ধার নাম সুপারিশ করা হয়েছে। এক এলাকায় এত নতুন মুক্তিযোদ্ধা কোথা থেকে এল? বরিশালের একজন মুক্তিযোদ্ধা বলেন, যাচাই–বাছাইয়ে যখন যাঁরা ছিলেন, তখনই তাঁরা নিজেদের পরিচিতদের নাম ঢুকিয়েছেন। তবে এটা ঠিক, তালিকায় প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের নামও আছে।
নতুন তালিকায় ব্রাহ্মণবাড়িয়া, বগুড়া, বরিশাল, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, চট্টগ্রাম, দিনাজপুর, ফরিদপুর, ফেনী, গাইবান্ধা, গাজীপুর, গোপালগঞ্জ, হবিগঞ্জ, জামালপুর, জয়পুরহাট, ঝালকাঠি, কিশোরগঞ্জ, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, মাদারীপুর, মৌলভীবাজার, ময়মনসিংহ, নওগাঁ, নাটোর, নেত্রকোনা, নীলফামারী, নোয়াখালী, নরসিংদী, পঞ্চগড়, রাজবাড়ী, রংপুর, শরীয়তপুর, শেরপুর, সিরাজগঞ্জ, সুনামগঞ্জ ও টাঙ্গাইলের নতুন নতুন নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
জামুকার মহাপরিচালক জহুরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, নতুন তালিকা নিয়ে কোনো প্রশ্ন থাকার কথা নয়। উপজেলা যাচাই-বাছাই কমিটি ও বিভাগীয় কমিটির যাচাই-বাছাই শেষে জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের সভায় তালিকা অনুমোদন করা হয়। দেড় লাখের বেশি আবেদন থেকে তিন ধাপে দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় যাচাই-বাছাই শেষে এ গেজেট প্রকাশ করা হয়েছে।
হঠাৎ এ ধরনের তালিকা প্রকাশ করায় হতাশা প্রকাশ করেছেন একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি শাহরিয়ার কবির। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, ‘এত নতুন মুক্তিযোদ্ধা এল কোথা থেকে? আর এত লোকের নাম প্রকাশেরই–বা দরকার কী! এখন মহামারির সময় তো মানুষ ধরতেও পারবে না কোনো অমুক্তিযোদ্ধা ঢুকে গেল কি না।’
শাহরিয়ার কবির বলেন, একজন সাংসদ বা একজন ইউএনও কখনো যাচাই–বাছাই প্রক্রিয়া সঠিকভাবে করতে পারবেন না। এ ক্ষেত্রে মুক্তিযোদ্ধা ও গবেষকদের সঙ্গে নিতে হবে, যাঁরা যাচাই প্রক্রিয়া সঠিকভাবে সম্পন্ন করতে পারবেন। তিনি বলেন, ‘আমি দেখেছি কীভাবে তাঁরা তথ্য যাচাই করেন। এভাবে জামুকার বৈঠকখানায় মুক্তিযোদ্ধা চিহ্নিত করা যায় না। এতে শুধু এই প্রক্রিয়া প্রশ্নবিদ্ধই হবে।’
-

বাঙালির মুক্তির সনদ ৬-দফাঃ শেখ হাসিনা
৭ই জুন ৬-দফা দিবস হিসেবে আমরা পালন করি। ২০২০ সাল বাঙালির জীবনে এক অনন্য বছর হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। আমাদের অর্থাৎ বাংলাদেশের জনগণের জন্য এ বছরটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উদ্যাপনের ব্যাপক কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছিল। শুধু বাংলাদেশেই নয়, বিশ্বব্যাপী প্রবাসী বাঙালিরাও প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। ইউনেস্কো এ দিবসটি উদযাপনের সিদ্ধান্ত নেয় এবং জাতিসংঘের সদস্যভুক্ত দেশগুলিও প্রস্তুতি নিয়েছিল। জাতিসংঘ ইতোমধ্যে একটি স্মারক ডাক টিকিট প্রকাশ করেছে।
যখন এমন ব্যাপক আয়োজন চলছে, তখনই বিশ্বব্যাপী এক মহামারি দেখা দিল। করোনাভাইরাস বা কোভিড-১৯ নামক এক সংক্রামক ব্যাধি বিশ্ববাসীকে এমনভাবে সংক্রমিত করছে যে, বিশ্বের প্রায় সকল দেশই এর দ্বারা আক্রান্ত এবং অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক – সকল কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশও এ ভাইরাস থেকে মুক্ত নয়। এমতাবস্থায়, আমরা জনস্বার্থে সকল কার্যক্রম বিশেষ করে যেখানে জনসমাগম হতে পারে, সে ধরনের কর্মসূচি বাতিল করে দিয়ে কেবল রেডিও, টেলিভিশন বা ডিজিটাল মাধ্যমে কর্মসূচি পালন করছি।
১৯৬৬ সালে বাঙালির মুক্তি সনদ ৬-দফা ঘোষণা দিয়েছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। আমি পরম শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে, শ্রদ্ধা জানাই আমার মা বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুননেসাকে। ৭ই জুনের কর্মসূচি সফল করতে তিনি অনন্য ভূমিকা পালন করেছিলেন। স্মরণ করি, ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্টে শাহাদাৎবরণকারী আমার পরিবারের সদস্যদের। শ্রদ্ধা জানাই জাতীয় ৪-নেতাকে এবং মহান মুক্তিযুদ্ধের সকল শহিদ ও নির্যাতিত মা-বোনকে।
৬-দফা দাবির আত্মপ্রকাশ
১৯৬৬ সালের ৫ই ফেব্রুয়ারি লাহোরে চৌধুরী মোহাম্মদ আলীর বাসভবনে কাউন্সিল মুসলিম লীগের সভাপতি সৈয়দ মোহাম্মদ আফজালের সভাপতিত্বে বিরোধীদলের সম্মেলন শুরু হয়। সাবজেক্ট কমিটির এই সভায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছয়-দফা দাবি পেশ করেন। প্রস্তাব গৃহীত হয় না। পূর্ব বাংলার ফরিদ আহমদও প্রস্তাবের বিরোধিতা করেন।
৬ই ফেব্রুয়ারি পশ্চিম পাকিস্তানের কয়েকটি পত্রিকা এ দাবি সম্পর্কে উল্লেখ করে বলে যে পাকিস্তানের দুটি অংশ বিচ্ছিন্ন করার জন্যই ৬-দফা দাবি আনা হয়েছে। ১০ই ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাংবাদিক সম্মেলন করে এর জবাব দেন। ১১ই ফেব্রুয়ারি তিনি ঢাকায় ফিরে আসেন। বিমান বন্দরেই তিনি সাংবাদিকদের সামনে ৬-দফা সংক্ষিপ্তাকারে তুলে ধরেন।
৬-দফা দাবিতে পাকিস্তানের প্রত্যেক প্রদেশকে স্বায়ত্বশাসন দেওয়ার প্রস্তাব ছিল। কিন্তু পাকিস্তানের অন্যান্য রাজনৈতিক দল এ দাবি গ্রহণ বা আলোচনা করতেও রাজি হয়নি। বঙ্গবন্ধু ফিরে আসেন ঢাকায়।
আওয়ামী লীগের কার্যকরী কমিটিতে ৬-দফা দাবি পাশ করা হয়। আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশনে এ দাবি গ্রহণ করা হয়। ব্যাপকভাবে এ দাবি প্রচারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সিদ্ধান্ত হয় দলের নেতৃবৃন্দ সমগ্র পূর্ব পাকিস্তান সফর করে জনগণের কাছে এ দাবি তুলে ধরবেন। ৬-দফা দাবির উপর বঙ্গবন্ধুর লেখা একটি পুস্তিকা দলের সাধারণ সম্পাদকের নামে প্রকাশ করা হয়। লিফলেট, প্যাম্ফলেট, পোস্টার ইত্যাদিও মাধ্যমেও এ দাবিনামা জনগণের কাছে তুলে ধরা হয়।
কেন ৬-দফা দাবি
১৯৬৫ সালে পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে যে যুদ্ধ হয়েছিল সে যুদ্ধের সময় পূর্ববঙ্গ বা তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ ছিল সম্পূর্ণ অরক্ষিত। পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে এ অঞ্চলের সুরক্ষার কোন গুরুত্বই ছিল না। ভারতের দয়ার উপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল পূর্ব বাংলাকে। ভারত সে সময় যদি পূর্ববঙ্গে ব্যাপক আক্রমণ চালাত, তাহলে ১২শ মাইল দূর থেকে পাকিস্তান কোনভাবেই এ অঞ্চলকে রক্ষা করতে পারত না। অপরদিকে তখনকার যুদ্ধের চিত্র যদি পর্যালোচনা করি, তাহলে আমরা দেখি পাকিস্তানের লাহোর পর্যন্ত ভারত দখল করে নিত যদি না বেঙ্গল রেজিমেন্টের বাঙালি সৈনিকেরা সাহসের সঙ্গে ভারতের সামরিক আক্রমণের মোকাবেলা করত।
পূর্ব পাকিস্তানে সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীর কোন শক্তিশালী ঘাঁটি কখনও গড়ে তোলা হয়নি। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ১৪ ডিভিশনের একটা হেড কোয়ার্টার ছিল খুবই দুর্বল অবস্থায়। আর সামরিক বাহিনীতে বাঙালির অস্তিত্ব ছিল খুবই সীমিত। ১৯৫৬ সালে দৈনিক ডন পত্রিকার এক প্রতিবেদনে বাঙালিদের অবস্থান তুলে ধরা হয়েছিল।
পদবী পশ্চিম পাকিস্তান পূর্ববঙ্গ জেনারেল ৩ জন ০ মেজর জেনারেল ২০ জন ০ ব্রিগেডিয়ার ৩৪ জন ০ কর্নেল ৪৯ জন ১ জন (বাংলা বলতেন না) লে. কর্নেল ১৯৮ ২ জন মেজর ৫৯০ জন ১০ জন নৌ বাহিনী অফিসার ৫৯৩ জন ৭ জন বিমান বাহিনী অফিসার ৬৪০ জন ৪০ জন অর্থাৎ পাকিস্তান সামরিক বাহিনীতে সর্বোচ্চ পদে তা-ও লে. কর্নেল পদে মাত্র ২ জন বাঙালি অফিসার ছিলেন। অথচ যুদ্ধের সময় বাঙালি সৈনিকেরাই সব থেকে সাহসের পরিচয় দিয়েছিলেন।
ঐ যুদ্ধের পর তাসখন্দে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে একটা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় যা তাসখন্দ চুক্তি নামে পরিচিত। সেখানেও পূর্ববঙ্গের স্বার্থের বা নিরাপত্তার বিষয়টি উপেক্ষিত হয়।
একটু পিছন ফিরে তাকালে আমরা দেখি যে, বাঙালির বিরুদ্ধে সব সময় পাকিস্তানের শাসক চক্র বৈমাত্রীয়সুলভ আচরণ করেছে।
প্রথম আঘাত হানে বাংলা ভাষা যা আমাদের মাতৃভাষার উপর। মাতৃভাষায় কথা বলার অধিকার কেড়ে নেওয়ার চক্রান্ত শুরু করে। রক্ত দিয়ে মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষা করে বাঙালিরা। সে ভাষা আন্দোলন শুরু করেছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন ছাত্র শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৪৮ সালে। মূলতঃ তখন থেকেই তিনি উপলব্ধি করেছিলেন পশ্চিম পাকিস্তানীদের শাসন-শোষণ ও বঞ্চনা থেকে মুক্তি পেতে হবে।
বাঙালিরা সব সময়ই পশ্চিমাদের থেকে শিক্ষা-দীক্ষা, সাংস্কৃতিক চর্চায় সমৃদ্ধ ছিল। পাকিস্তান সৃষ্টির আন্দোলনেও অগ্রণী ভূমিকা ছিল এ অঞ্চলের মানুষের। জনসংখ্যার দিক থেকেও সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালি। ৫৬ ভাগ মানুষের বসবাস ছিল পূর্ববঙ্গে।
পূর্ববঙ্গের উপার্জিত অর্থ কেড়ে নিয়ে গড়ে তোলে পশ্চিম পাকিস্তান। বাঙালিদের উপর অত্যাচার করাই ছিল শাসকদের একমাত্র কাজ। ১৯৫৪ সালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে অন্যান্য দল ঐক্যবদ্ধ হয়ে যুক্তফ্রন্ট গঠন করে নির্বাচনে জয়লাভ করে। মুসলীম লীগ শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়। কিন্তু ৯২ক ধারা অর্থাৎ ইমার্জেন্সি জারি করে নির্বাচিত সরকার বাতিল করে দেয়। পূর্ববঙ্গে চালু করে কেন্দ্রীয় শাসন। অনেক চড়াইউৎরাই পেরিয়ে যখন ১৯৫৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে তখনও ষড়যন্ত্র থেমে থাকে না। ১৯৫৮ সালে আইয়ুব খান মার্শাল ল’ জারি করে। এভাবেই বার বার আঘাত আসে বাঙালিদের উপর।
৬-দফার প্রতি জনসমর্থন
আইয়ুব খানের নির্যাতন-নিপীড়নের পটভূমিতে যখন ৬-দফা পেশ করা হয়, অতি দ্রুত এর প্রতি জনসমর্থন বৃদ্ধি পেতে থাকে। আমার মনে হয় পৃথিবীতে এ এক বিরল ঘটনা। কোন দাবির প্রতি এত দ্রুত জনসমর্থন পাওয়ার ইতিহাস আর কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে না।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সমগ্র পূর্ব বাংলা সফর শুরু করেন। তিনি যে জেলায় জনসভা করতেন সেখানেই তাঁর বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া হত, গ্রেফতার করা হত। জামিন পেয়ে আবার অন্য জেলায় সভা করতেন। এভাবে পরপর ৮ বার গ্রেফতার হন মাত্র দুই মাসের মধ্যে। এরপর ১৯৬৬ সালের ৮ই মে নারায়ণগঞ্জে জনসভা শেষে ঢাকায় ফিরে আসার পর ধানমন্ডির বাড়ি থেকে তাঁকে গ্রেফতার করে নিয়ে যায়। ৯ই মে তাঁকে কারাগারে প্রেরণ করে। একের পর এক মামলা দিতে থাকে।
একইসঙ্গে দলের নেতা-কর্মীদের গ্রেফতার করা শুরু হয়। সমগ্র বাংলাদেশ থেকে ছাত্রনেতা, শ্রমিক নেতাসহ অগণিত নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করে মামলা দায়ের করে।
১৯৬৬ সালের ১৩ই মে আওয়ামী লীগ প্রতিবাদ দিবস পালন উপলক্ষে জনসভা করে। জনসভায় জনতা ৬-দফার প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করেন। ৩০-এ মে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের কার্যকরী কমিটির (ওয়ার্কিং কমিটি) সভা হয় ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামের সভাপতিত্বে। ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন সাংগঠনিক সম্পাদক মিজানুর রহমান চৌধুরী। ৭ই জুন প্রদেশব্যাপী হরতাল ডাকা হয় এবং হরতাল সফল করার সর্বাত্মক উদ্যো গ্রহণ করা হয়। এ সময় আওয়ামী লীগের অনেক সভা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ধানমন্ডির বাড়িতে অনুষ্ঠিত হত।
৭ই জুনের হরতালকে সফল করতে আমার মা বেগম ফজিলাতুননেসা বিশেষ ভূমিকা পালন করেন। ছাত্র নেতাদের সঙ্গে গোপন বৈঠক করে তিনি দিক-নির্দেশনা দেন। শ্রমিক নেতা ও আওয়ামী লীগের নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে সব ধরনের সহযোগিতা করেছিলেন। পাকিস্তানী শাসকদের দমনপীড়ন-গ্রেফতার সমানতালে বাড়তে থাকে। এর প্রতিবাদে সর্বস্তরের মানুষ এক্যবদ্ধ হয়। ৬-দফা আন্দোলনের সঙ্গে পূর্ব বাংলার সকল স্তরের মানুষ – রিক্সাওয়ালা, স্কুটারওয়ালা, কলকারখানার শ্রমিক, বাস-ট্রাক-বেবিটেক্সি চালক, ভ্যান চালক, ক্ষুদে দোকানদার, মুটে-মজুর, দিনমজুর – সকলে এ আন্দোলনে শরিক হয়েছিলেন।
পাকিস্তানের সামরিক জান্তা ও রাষ্ট্রপতি আইয়ুব খান যে কোন উপায়ে এই আন্দোলন দমন করার সম্পূর্ণ দায়িত্ব দেয় পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর মোনায়েম খানকে।
কিন্তু তাদের শত নির্যাতন উপেক্ষা করে বাংলাদেশের মানুষ ৭ই জুনের হরতাল পালন করে ৬-দফার প্রতি তাঁদের সমর্থন জানিয়ে দেন। পাকিস্তান সরকার উপযুক্ত জবাব পায়। দুঃখের বিষয় হল বিনা উসকানিতে জনতার উপর পুলিশ গুলি চালায়। শ্রমিক নেতা মনু মিয়াসহ ১১ জন নিহত হন। আন্দোলন দমন করতে নির্যাতনের মাত্রা যত বাড়তে থাকে, সাধারণ মানুষ ততবেশি আন্দোলনে সামিল হতে থাকেন।
৭ই জুন হরতাল সম্পর্কে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর ডায়েরিতে লিখেছেন: ‘‘১২ টার পরে খবর পাকাপাকি পাওয়া গেল যে হরতাল হয়েছে। জনগণ স্বতষ্ফূর্তভাবে হরতাল পালন করেছেন। তাঁরা ৬-দফা সমর্থন করে আর মুক্তি চায়। বাঁচতে চায়, খেতে চায়, ব্যক্তি স্বাধীনতা চায়, শ্রমিকের ন্যায্য দাবি, কৃষকদের বাঁচার দাবি তাঁরা চায়, এর প্রমাণ এই হরতালের মধ্যে হয়েই গেল” (কারাগারের রোজনামচা পৃ: ৬৯)।
১৯৬৬ সালের ১০ ও ১১ই জুন ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের কার্যকরী কমিটির সভায় হরতাল পালনের মাধ্যমে ৬-দফার প্রতি সমর্থন জ্ঞাপন করায় ছাত্র-শ্রমিক ও সাধারণ জনগণকে ধন্যবাদ জানানো হয়। পূর্ববঙ্গের মানুষ যে স্বায়ত্বশাসন চায়, তারই প্রমাণ এই হরতালের সফলতা। এ জন্য সভায় সন্তোষ প্রকাশ করা হয়। ১৭, ১৮ ও ১৯-এ জুন নির্যাতন- নিপীড়ন প্রতিরোধ দিবস পালন করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। আওয়ামী লীগের সকল নেতাকর্মীর বাড়িতে বাড়িতে কালো পতাকা উত্তোলন এবং তিন-দিন সকলে কালো ব্যাজ পড়বে বলে ঘোষণা দেওয়া হয়। হরতালে নিহতদের পরিবারগুলিকে আর্থিক সাহায্য এবং আহতদের চিকিৎসা দেওয়ার জন্য একটা তহবিল গঠন এবং মামলা পরিচালনা ও জামিনের জন্য আওয়ামী লীগের আইনজীবীদের সমন্বয়ে একটি আইনগত সহায়তা কমিটি গঠন করা হয়। দলের তহবিল থেকে সব ধরনের খরচ বহন করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। আন্দোলনের সকল কর্মসূচি শান্তিপূর্ণভাবে পালন করারও নির্দেশনা দেওয়া হয়।
৬-দফা দাবির ভিত্তিতে স্বায়ত্বশাসনের আন্দোলন আরও ব্যাপকভাবে দেশব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য সভা, সমাবেশ, প্রতিবাদ মিছিল, প্রচারপত্র বিলিসহ বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। এই দাবির প্রতি ব্যাপক জনমত গড়ে তোলার কার্যক্রম শুরু হয়।
এদিকে সরকারি নির্যাতনও বৃদ্ধি পেতে থাকে। তবে যত বেশি নির্যাতন আইয়ুব-মোনায়েম গং-রা চালাতে থাকে, জনগণ তত বেশি তাদের উপর ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেন এবং সকল নিপীড়ন উপেক্ষা করে আরও সংগঠিত হতে থাকেন।
১৯৬৬ সালের ২৩ ও ২৪-এ জুলাই আওয়ামী লীগের কার্যকরী কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয় এবং আন্দোলন দ্বিতীয় ধাপে এগিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। এ আন্দোলন কেন্দ্র থেকে জেলা, মহকুমা ও ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে, তীব্রতর হতে থাকে।
সরকারও নির্যাতনের মাত্রা বাড়াতে থাকে। ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বপ্রাপ্তদের একের পর এক গ্রেফতার করতে থাকে। অবশেষে একমাত্র মহিলা সম্পাদিকা অবশিষ্ট ছিলেন। আমার মা সিদ্ধান্ত দিলেন তাঁকেই ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক করা হোক। আওয়ামী লীগ সে পদক্ষেপ নেয়।
আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা
পাকিস্তান সরকার নতুন চক্রান্ত শুরু করল। ১৯৬৮ সালের ১৮ই জানুয়ারি ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ঢাকা কুর্মিটোলা ক্যান্টনমেন্টে বন্দি করে নিয়ে যায়। অত্যন্ত গোপনে রাতের অন্ধকারে সেনাবাহিনীর দ্বারা এ কাজ করানো হয়। এরপর তাঁর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা দেওয়া হয়, যা আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা হিসেবে অধিক পরিচিতি পায়।
এই মামলায় ১-নম্বর আসামি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তাঁর সঙ্গে আরও ৩৪ জন সামরিক ও অসামরিক অফিসার ও ব্যক্তিদের আসামি করে।
অপরদিকে ৬-দফা দাবি নস্যাৎ করতে পশ্চিম পাকিস্তানের কিছু নেতাদের দিয়ে ৮-দফা নামে আরেকটি দাবি উত্থাপন করে মানুষকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করা হয়। তবে এতে তেমন কাজ হয় না। উঁচুস্তরের কিছু নেতা বিভ্রান্ত হলেও ছাত্র-জনতা বঙ্গবন্ধুর ৬-দফার প্রতিই ঐক্যবদ্ধ থাকেন।
আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা অর্থাৎ রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিরুর রহমান মামলার মূল অভিযোগ ছিল যে, আসামিরা সশস্ত্র বিপ্লবের মাধ্যমে অভ্যুত্থান ঘটিয়ে পূর্ব পাকিস্তানকে পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। এ কারণে তাঁদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা দেওয়া হয়।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের বক্তব্য ছিল: আমরা পূর্ব পাকিস্তানের জনসংখ্যার ৫৬ ভাগ, সংখ্যাগুরু। আমরা বিচ্ছিন্ন হব কেন? আমরা আমাদের ন্যায্য অধিকার চাই, স্বাধীনভাবে বাঁচতে চাই। যারা সংখ্যালগিষ্ঠ, তারা বিচ্ছিন্ন হতে পারে, সংখ্যাগরিষ্ঠরা নয়।
এই মামলা দেওয়ার ফলে আন্দোলন আরও তীব্র আকার ধারণ করে। বাংলার মানুষের মনে স্বাধীনতা অর্জনের আকাঙ্ক্ষা ও চেতনা শাণিত হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গড়ে তোলা হয়। ছাত্ররা ৬-দফাসহ ১১-দফা দাবি উত্থাপন করে আন্দোলনকে আরও বেগবান করে। প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, জেলা, মহকুমায় আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে।
ক্যান্টনমেন্টের ভিতরেই কোর্ট বসিয়ে মামলার কার্যক্রম পরিচালনা করা শুরু হয়। অপরদিকে জেল, জুলুম, গুলি, ছাত্র হত্যা, শিক্ষক হত্যাসহ নানা নিপীড়ন ও দমন চালাতে থাকে আইয়ুব সরকার।
পাকিস্তানী সরকারের পুলিশী নির্যাতন, নিপীড়ন ও দমনের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষ স্বতষ্ফুর্তভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে শুরু করে। তাঁরা রাস্তায় নেমে আসে। সরকারপন্থী সংবাদপত্র থেকে শুরু করে থানা, ব্যাংক, সরকারের প্রশাসনিক দপ্তরে পর্যন্ত হামলা চালাতে শুরু করে। সমগ্র বাংলাদেশ তখন অগ্নিগর্ভে পরিণত হয়।
‘আগড়তলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার করো, জেলের তালা ভাঙবো শেখ মুজিবকে আনবো, শেখ মুজিবের মুক্তি চাই’ – এ ধরনের শ্লোগানে শ্লোগানে স্কুলের ছাত্ররাও রাস্তায় নেমে আসে। এরই এক পর্যায়ে ১৯৬৯ সালের ১৫ই ফেব্রুয়ারি এই মামলার অন্যতম আসামি সার্জেন্ট জহুরুল হককে বন্দিখানায় হত্যা করা হয়। মানুষ ক্ষোভে ফেটে পড়ে। তাঁদের আশঙ্কা হয় এভাবে শেখ মুজিবকেও হত্যা করবে। সাধারণ মানুষ ক্যান্টনমেন্ট আক্রমণ করতে অগ্রসর হয়। জনতা মামলার বিচারক প্রধান বিচারপতির বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়। তিনি পশ্চিম পাকিস্তানে পালিয়ে যান।
প্রচণ্ড গণআন্দোলনের মুখে ২১-এ ফেব্রুয়ারি আইয়ুব খান আগড়তলা মামলা প্রত্যাহার করে নিতে বাধ্য হয়। ২২-এ ফেব্রুয়ারি দুপুরে একটা সামরিক জিপে করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে ধানমন্ডির বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া হয় অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে। অন্য বন্দিদেরও মুক্তি দেয়।
ভাষা আন্দোলন-স্বায়ত্বশাসন থেকে স্বাধীনতা: ৬ দফার সফলতা
গণআন্দোলনে আইয়ুব সরকারের পতন ঘটে। ক্ষমতা দখল করে সেনাপ্রধান ইয়াহিয়া খান। ১৯৬৯ সালের ৫ই ডিসেম্বর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ঘোষণা দেন পূর্ব পাকিস্তানের নাম হবে ‘বাংলাদেশ’।
৬-দফার ভিত্তিতে ১৯৭০ সালের ৭ই ডিসেম্বর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সমগ্র পাকিস্তানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে।
কিন্তু বাঙালিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর না করে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয় পাকিস্তানী সামরিক জান্তা। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ ঐতিহাসিক ঘোষণা দেন ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেন বঙ্গবন্ধু। বাংলাদেশের মানুষ তা অক্ষরে অক্ষরে পালন করেন।
অসহযোগ আন্দোলন থেকে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বিজয় অর্জন করে বাঙালি জাতি। ২৫-এ মার্চ পাকিস্তানী সামরিক জান্তা গণহত্যা শুরু করে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ১৯৭১ সালের ২৬-এ মার্চের প্রথম প্রহরে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেন। ৯-মাসের যুদ্ধ শেষে ১৬ই ডিসেম্বর বাঙালি চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করে। বাঙালিরা একটি জাতি হিসেবে বিশ্বে মর্যাদা পায়, পায় জাতিরাষ্ট্র – স্বাধীন, সার্বভৌম বাংলাদেশ।
-

বরিশাল মহানগর যুবলীগ নেতা নাজমুল মঈন এর করোনা পজিটিভ
বাংলাদেশ আওয়ামী মুক্তিযোদ্ধা প্রজন্মলীগ বরিশাল মহানগর এর সাংগঠনিক সম্পাদক ও মহানগর যুবলীগ নেতা নাজমুল মঈন করোনায় আক্রান্ত।গতকাল শনিবার তার রিপোর্ট করোনা পজিটিভ আসে।নাজমুল মঈন এর শারীরিক সুস্থতা কামনা করে বরিশাল এর রাজনৈতিক ও সাংবাদিক মহল।
মহানগর যুবলীগ এর অন্যতম নেতা শেখ আরাফাত জামান বাবু এক বিবৃতিতে নাজমুল মঈন এর জন্য সকলের নিকট দোয়া প্রার্থনা করে ।
মহানগর আওয়ামী মুক্তিযোদ্ধা প্রজন্মলীগ এর সভাপতি ও বাংলারমুখ ২৪ ডটকম/ডেইলি বরিশাল নিউজ এর প্রকাশক ও সম্পাদক মুহাঃ পলাশ চৌধুরী তার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম (ফেসবুক) সহ বিভিন্ন বার্তায় তিনি নাজমুল মঈন এর শারীরিক সুস্থতা কামনা করে ।
-

নিবিড় পর্যবেক্ষণে মোহাম্মদ নাসিম
আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য, কেন্দ্রীয় ১৪ দলের মুখপাত্র এবং সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের অবস্থা সংকটাপন্ন। তার চিকিৎসার জন্য পাঁচ সদস্যের মেডিক্যাল বোর্ড গঠন করা হয়েছে।
আজ শনিবার বিকেল মোহাম্মদ নাসিমের ব্যাক্তিগত সহকারী আশরাফুল আলম মিন্টু গণমাধ্যমকে জানান, বোর্ড মিটিংয়ে তাকে ৭২ ঘণ্টা নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
তিনি জানান, মোহাম্মদ নাসিমের চিকিৎসায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) উপাচার্য ডা. কনক কান্তি বড়ুয়াকে প্রধান করে একটি মেডিক্যাল বোর্ড গঠন করা হয়েছে। অপারেশনের পর চিকিৎসকরা মোহাম্মদ নাসিমকে ৪৮ ঘণ্টার পর্যবেক্ষণে রাখেন। এবার তা বাড়িয়ে ৭২ ঘণ্টা করা হয়েছে।
করোনায় আক্রান্ত হওয়ার পর গত সোমবার থেকে রাজধানীর শ্যামলীর বাংলাদেশ স্পেশালাইজড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন মোহাম্মদ নাসিম। গত বৃহস্পতিবার শারীরিক অবস্থার উন্নতি হওয়ায় শুক্রবার তাকে আইসিইউ থেকে কেবিনে স্থানান্তরের কথা ছিল। কিন্তু শুক্রবার ভোর সাড়ে ৫টায় স্ট্রোক করায় অবস্থার অবনতি ঘটে।
পরে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের নিউরোসার্জারি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. রাজিউল হকের নেতৃত্বে তার মস্তিষ্কে সফল অস্ত্রোপচার করা হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একাধিকবার নাসিমের ছেলে তানভীর শাকিল জয় এবং অস্ত্রোপচারকারী চিকিৎসক অধ্যাপক ডা. রাজিউল হককে ফোন করে সাবেক এই স্বাস্থ্যমন্ত্রীর সর্বশেষ শারীরিক অবস্থার বিষয়ে খোঁজ-খবর নেন।
গতকাল অস্ত্রোপচারের পর মোহাম্মদ নাসিমের ছেলে ও সাবেক সংসদ সদস্য তানভীর শাকিল জয় বলেছিলেন, ‘আব্বুর অপারেশন সফল হয়েছে। তাঁকে হাসপাতালের আইসিইউতে রাখা হয়েছে। আগামী দুদিন তাঁকে বিশেষ পর্যবেক্ষণে রাখা হবে। প্রধানমন্ত্রী ফোনে ডাক্তার ও আমার সঙ্গে কথা বলেছেন। তিনি খোঁজখবর রাখছেন। আপনারা সবাই ওনার জন্য দোয়া করবেন।’
১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে নিহত জাতীয় চার নেতার একজন এম মনসুর আলীর ছেলে মোহাম্মদ নাসিম কয়েক দশক ধরে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা। তিনি আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলেরও মুখপাত্র।
১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন মন্ত্রিসভায় মোহাম্মদ নাসিম কয়েকটি মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব পালন করেছেন। সে সময় তিনি স্বরাষ্ট্র, ডাক, তার ও টেলিযোগাযোগ, গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। এ ছাড়া বিগত সরকারের তিনি স্বাস্থ্যমন্ত্রী হিসেবে টানা পাঁচ বছর দায়িত্ব পালন করেছেন।
