Category: ধর্ম

  • ইসলাম গ্রহণ করে ব্রাজিলিয়ান ফুটবলারের ওমরাহ আদায়

    ইসলাম গ্রহণ করে ব্রাজিলিয়ান ফুটবলারের ওমরাহ আদায়

    মাত্র কয়েকদিন আগে ইসলাম গ্রহণ করেছেন ব্রাজিলিয়ান ফুটবলার সার্জিও রিকার্দো। ইসলাম গ্রহণের পর ভিডিও বার্তার মাধ্যমে ঘোষণাও দিয়েছেন। এবার রমজান উপলক্ষে তিনি পবিত্র মক্কা শরিফে গিয়ে ওমরাহ পালন করেছেন। খবর স্টেফ ফিডের।

    গত সপ্তাহের শেষের দিকে ওমরাহ পালন করে তিনি একটি টুইট করেছেন। টুইটে তিনি লিখেছেন, ‘আলহামদুলিল্লাহ… নাও আই অ্যাম এ মুসলিম’ বা ‘আলহামদুলিল্লাহ… এখন আমি একজন মুসলিম’। রিকার্দোকে পবিত্র মসজিদুল হারামে সৌদিদের বিখ্যাত শ্বেত-শুভ্র পোশাকে দেখা গেছে।

    ওমরাহ আদায়ের পর পবিত্র কাবাঘরের সামনে এক ভিডিওতে তিনি তার অনুভূতি প্রকাশ করেছেন। প্রথম বারের মতো বাইতুল্লাহ বা আল্লাহর ঘর জিয়ারত করে কেমন সুখানুভূতি কাজ করছে তার বর্ণনা দিয়েছেন।

    ইসলাম গ্রহণের পর পবিত্র ওমরাহ পালন ও ইসলামের পবিত্রতম স্থানগুলো পরিদর্শন করায় মুগ্ধ লাখ লাখ মানুষ। তারা রিকার্দোর এমন সিদ্ধান্তের প্রশংসা করছেন। তারা কামনা করছেন, পবিত্র জীবনে এমন চমৎকার অভিষেক যেন তার সারা জীবনে শান্তি-সুখ ও সমৃদ্ধির ছোঁয়া নিয়ে আসে এবং একজন মুসলিম হিসেবে তার জীবনযাত্রা সৌভাগ্যের পরশে স্নিগ্ধ হোক।

    বুধবার (২২ মে) সৌদি ফুটবলার মোহাম্মদ সাঈদ একটি ভিডিও প্রকাশে করেছেন। ভিডিওটিতে রিকার্দো একজন মুসলিম ঘোষণা করেছিলেন যে, ‘আলহামদুলিল্লাহ… আমি মনে করি, আপনি জানেন যে এটি আমার জীবনের সেরা সিদ্ধান্ত।’

    ব্রাজিলিয়ান এ তারকা খেলোয়াড় ২০১০ সালে অবসরপ্রাপ্ত হয়ে মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি ক্লাবে খেলছিলেন। তখন সেখানে ইসলাম সম্পর্কে তিনি জানতে পারেন। এরপর অনুপ্রাণিত হয়ে ইসলাম গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেন।

    ৪৫ বছর বয়সী এ তারকা ভিটোরিয়া এবং বোটাফোগো ছাড়াও ব্রাজিলিয়ান অন্যতম সেরা ক্লাব করিন্থিয়ান্স ও ভাস্কো দা গামায় খেলেছিলেন।

    ১৯৯৯ সালে তিনি জেদ্দার আল-ইত্তিহাদ ক্লাবের মতো সৌদির প্রাচীনতম ক্লাবে খেলেন। ক্লাবটির ৩৩টি দেশীয় ও মহাদেশীয় ট্রফি রয়েছে। একমাত্র এশিয়ান ক্লাব হিসেবে এএফসি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জিতেছে।

    ব্রাজিলিয়ান এ মুসলিম তারকা আল-ইত্তিহাদের প্রতিদ্বন্দ্বী আল-আহলিদের জন্যও খেলেছিলেন। এ ক্লাবটি ১৯৬৮ সালের এক মৌসুমেই দুটি জাতীয় শিরোপা, লীগ এবং কিং কাপ অর্জনকারী প্রথম সৌদি ক্লাব ছিল।

    আল-ইত্তিহাদের জাতীয় প্রতিদ্বন্দ্বী রিয়াদ-ভিত্তিক আল-হিলালেও দুই বছর খেলেছিলেন। ক্লাবটি ৫৮ টি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক শিরোপা জিতেছে। যা অন্য কোনো সৌদি ক্লাবের পক্ষে সম্ভব হয়নি। আল-হিলাল রেকর্ড ৬টি এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন ট্রফিও জিতেছে। ২০০৯ সালে ক্লাবটি আইএফএফএইচএসের বিংশ শতাব্দীর সেরা এশিয়ান ক্লাব ভূষিত হয়েছিল।

    ২০০৩-২০০৪ মৌসুমে রিকার্দো সৌদি প্রিমিয়ার লিগে শীর্ষ গোলদাতা (১৫ গোল) ছিলেন।

  • হযরত সুলায়মান (আঃ)-এর সমাধি, জিনদের তৈরি দেওয়াল ও পিলার

    হযরত সুলায়মান (আঃ)-এর সমাধি, জিনদের তৈরি দেওয়াল ও পিলার

    পবিত্র কোরআন শরিফের ২৭ নং সূরা আন-নামলের ১৭ নং আয়াতে বলা হয়েছে, ‘সুলায়মান (আ.)-এর জন্য মানুষ, জিন ও পাখিদের মধ্য থেকে এক বিশাল বাহিনী সমবেত করা হয়েছিল। তারা ছিল বিভিন্ন ব্যূহে সুবিন্যস্ত।’ হযরত সুলায়মান (আ.) ছিলেন হযরত দাউদ (আ.) এর সবচেয়ে কনিষ্ঠ পুত্র। তিনি জন্মগ্রহণ করেন জেরুজালেমে।

    আল্লাহ তায়ালা তাকে অনেক বিস্ময়কর নেয়ামত দান করেছিলেন। তিনি প্রাণীদের সঙ্গে কথা বলতে পারতেন। তিনি জিনদের নিয়ন্ত্রণ করতেন। পিতা হযরত দাউদ (আ.) এর মৃত্যুর পর তিনি ৩০ বছর ফিলিস্তিন শাসন করেন। তিনি মসজিদুল আকসা সংস্কারে জিনদের নির্দেশ দিয়েছিলেন।

    কথিত আছে, সুলায়মানের সময় জিনদের তৈরি মসজিদুল আকসার কিছু দেওয়াল ও দুটি পিলার এই মসজিদের বেইজমেন্ট এলাকায় এখনো দেখা যায়। হযরত সুলায়মান (আ.)-এর মাজারটি মসজিদুল আকসার কমপাউন্ডে অবস্থিত। মসজিদুল আকসা হচ্ছে মক্কা ও মদিনা শরিফের পর তৃতীয় পবিত্র ধর্মীয় স্থাপনা।

  • সৃষ্টিকর্তার সঙ্গে আলাপের সেরা সুযোগ ইতিকাফ

    সৃষ্টিকর্তার সঙ্গে আলাপের সেরা সুযোগ ইতিকাফ

    সিয়াম শুধু আল্লাহর জন্য। বান্দা ক্ষুধা-তৃষ্ণা, দুনিয়াবি কামনা-বাসনা ছেড়ে সৃষ্টিকর্তার রঙে রঙিন হবেন, তার গুণে গুণান্বিত হবেন, তাতেই সায়েমের সার্থকতা মিলবে মহাপ্রভুর সন্তুষ্টি। আল্লাহর প্রেমে বান্দা আত্মহারা হয়ে তার রঙে বিলীন হবেন।

    এর জন্য প্রয়োজন গভীর এশক, প্রত্যয় ও প্রচেষ্টা। যার অন্যতম উপায় ইতেকাফ। পরম প্রেমাস্পদের জন্য প্রেমিকের ব্যাকুলতা প্রদর্শনের অপূর্ব সুযোগ এনে দেয় ইতেকাফ। রমজানের ২১তম রাত থেকে ২৯তম রাত পর্যন্ত সাংসারিক যাবতীয় ঝামেলা থেকে মুক্ত হয়ে ইবাদতের উদ্দেশ্যে মসজিদে অবস্থান করাই ইতেকাফ।

    এর বহুবিধ উদ্দেশ্য রয়েছে- দুনিয়াদারির ঝামেলামুক্ত হয়ে একান্ত নিরালায় মহাপ্রভুর ধ্যানে প্রেম নিবেদন করা, রমজানের শেষ দশকে লাইলাতুল কদর তালাশ করা, ইবাদত-বন্দেগির মাধ্যমে রমজানের পুণ্যময় সময়ে গুনাহ মাফ এবং নেকির পাল্লা ভারি করা। সহিহ রেওয়ায়েতে আছে রাসূল পাক (সা.) রমজানের শেষ দশকে নিয়মিত ইতেকাফ করতেন এবং তার ইন্তেকালের পর উনার স্ত্রীগণ ইতেকাফ করতেন।

    যারা নিয়ত করেছেন ইতেকাফে বসবেন, আজ সন্ধ্যাতেই তারা মসজিদে চলে যাবেন। পরিবারের ভরণ-পোষণের বন্দোবস্ত করা, চাকরি কিংবা ব্যবসায়িক ঝামেলা থেকে মুক্ত থাকা, খাবার ও প্রয়োজনীয়সামগ্রী সময়মতো মসজিদে পৌঁছানোর ব্যবস্থা নিশ্চিত করেই আল্লাহর ধ্যানে বসবেন তারা।

    ১০ দিন ইতেকাফ করা অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ। রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি রমজান মাসের শেষ ১০ দিন ইতেকাফ করবে, সে ব্যক্তি দুটি হজ ও দুটি ওমরার সমান সওয়াব হাসিল করবে।’ তিনি আরও বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি ইবাদতের নিয়তে সওয়াবের আশায় ইতেকাফ করবেন তার যাবতীয় গুনাহ মাফ হয়ে যাবে।’ তা ছাড়া যিনি ইতেকাফ করবেন, তিনি নিশ্চয়ই ‘লাইলাতুল কদর’র মর্যাদা লাভ করবেন।

    পুরুষ ইতেকাফের জন্য নিয়মিত নামাজ হয় এমন কোনো মসজিদে যাবেন আর মহিলারা আপন ঘরে পর্দার সঙ্গে ইতেকাফ করবেন। ইতেকাফকারীকে সব সময় পাক-পবিত্র থাকতে হবে। ফরজ ইবাদতের পাশাপাশি বেশি বেশি আল্লাহর জিকির-আজকার, নফল নামাজ আদায়, কোরআন তেলাওয়াত, দরুদ শরিফ পাঠ, মোরাকাবা-মোশাহাদা ও অন্যান্য ইবাদতে সময় কাটাতে হবে।

    ইতেকাফ স্মরণ করিয়ে দেয় রাসূল (সা.)-এর হেরা গুহায় ধ্যানমগ্ন থাকার ঐতিহাসিক ঘটনা। তিনি সেখানে দীর্ঘ ১৫ বছর গভীর প্রেম সাধনায় কাটিয়েছিলেন এবং লাভ করেছিলেন ঐশীগ্রন্থ আল কোরআন। যা নাজিল হয়েছিল মাহে রমজানের পবিত্র কদরের রাতে। সেই ঐশ্বরিক ধ্যানের মর্ম উপলব্ধি করতে এবং শবে কদরের বিশেষ মুহূর্তে প্রেমময় আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের সঙ্গে প্রেমালাপের সুর্বণ সুযোগ পেতে রমজানের তৃতীয় দশকে ইতেকাফের বিধান এসেছে।

    বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সামর্থ্যবানরা ২১-৩০ রমজান কাবা ও মসজিদে নববীর প্রেমকাননে হাজির হন। সেখানে লাখ লাখ ইতিকাফকারীর চোখে-মুখে দেখেছি ঐশী প্রেমের উচ্ছ্বাস। আল্লাহ যাদের সামর্থ্য দিয়েছেন, তারা জীবনে একবারের জন্য হলেও যেন কাবা বা মসজিদে নববীতে ইতেকাফ করেন। প্রেমময়ের সঙ্গে প্রেমালাপের শ্রেষ্ঠ সময় ইতেকাফ।

  • ইতিকাফে অর্জন হয় নির্জনতা ও একাকীত্ব

    ইতিকাফে অর্জন হয় নির্জনতা ও একাকীত্ব

    হজরত আবু সাইদ (রা.) থেকে বর্ণিত- তিনি বলেন, আমরা নবীয়ে করিম (সা.) এর সাথে রমজানের মধ্যবর্তী দশক ইতিকাফ করেছি, যখন ২০ রমজানের সকাল হল তখন আমরা আমাদের বিছানাপত্র স্থানান্তর করলাম। অতঃপর নবীয়ে করিম (সা.) আমাদের নিকট আসলেন। তিনি বললেন, ইতিকাফ করেছিল সে যেন তার ইতিকাফে ফিরে যায়। কারণ আমি আজ রাতে লাইলাতুল কদর দেখেছি। আমি দেখেছি পানি ও মাটিতে সেজদা করছি। যখন তিনি তার ইতিকাফে ফিরে যান, তখন আসমান অশান্ত হল ফলে আমাদের ওপর বৃষ্টি বর্ষিত হল। সে সত্তার কসম যে তাকে সত্যসহ প্রেরণ করেছে সেদিন শেষে আসমান অশান্ত হয়েছিল, তখন মসজিদ ছিল চালাঘর ও মাচার তৈরি। আমি তার নাক ও নাকের ডগায় পানি ও মাটির আলামত দেখেছি। (মুসলিম শরীফ- ১১৬৭, বোখারী শরীফ- ১৯৩৫)

    অপর এক বর্ণনায় হজরত আবু সাইদ খুদরী (রা.) বলেন, নবীয়ে করিম (সা.) রমজান শরীফের মধ্যবর্তী ১০ দিন ইতিকাফ করতেন, যখন তিনি প্রস্থানরত ২০ তারিখে সন্ধ্যা করে একুশের রাতে পদার্পণ করতেন, নিজ ঘরে ফিরে যেতেন। যে তার সাথে ইতিকাফ করতো সেও ফিরে যেত। তিনি কোনও এক রমজান মাসে যে রাতে সাধারণত ইতিকাফ থেকে ফিরে যেতেন সে রাতে ফিরে না গিয়ে কিয়াম করলেন অতঃপর খুতবা প্রদান করলেন। আল্লাহ’র যা ইচ্ছা ছিল তাই তিনি লোকদের নির্দেশ করলেন। অতঃপর বললেন, আমি শেষ দশক ইতিকাফ করতাম। অতঃপর আমার নিকট স্পষ্ট হল, আমি ইতিকাফ করব শেষ দশকে। যে আমার সাথে ইতিকাফ করেছে সে যেন তার ইতিকাফে বহাল থাকে। আমাকে এ রাতে দেখানো হয়েছিল। অতঃপর তা ভুলিয়ে দেয়া হয়েছে, তোমরা তা অনুসন্ধান করো শেষ দশকে। আর তা অনুসন্ধান করো প্রত্যেক বেজোড় রাতে। আমি দেখেছি, পানি ও মাটিতে সিজদা করছি। সে রাতে আসমান গর্জন করে বৃষ্টি বর্ষণ করল। একুশের রাতে নবীয়ে করিম (সা.) এর সালাতের জায়গায় মসজিদ ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টির পানি ফেললো। আমার দু’চোখ রাসুলুল্লাহ (সা.) কে দেখেছে, আমি তার দিকে দৃষ্টি দিলাম। তিনি সকালের সালাত থেকে ফিরলেন তখন তার চেহারা মাটি ও পানিভর্তি ছিল। (বোখারী শরীফ ১৯১৪)

    মুসল্লির চেহারায় সেজদার সময় যে ধুলাবালি লাগে তা দূর করা উচিত নয়। বোখারী শরীফ হুমাইদি থেকে বর্ণনা করেন, মুসল্লির জন্য সুন্নত হচ্ছে সালাতে চেহারা না মোছা। (শারহুল মুসলিম ৮/৬১, শারহুল উমদা ৫/৪২৩, ইকমালুল মুয়াল্লিম ৪/১৪৮)

    হযরত উমর (রা.) থেকে বর্ণিত- তিনি বললেন, আল্লাহ’র রাসুল (সা.) আমি জাহেলি যুগে মানত করেছি এক রাত মসজিদে হারামে ইতিকাফ করব।

    নবীয়ে করীম (সা.) তাকে বললেন, তুমি তোমার মানত পূর্ণ করো। (বোখারী, মুসলিম) ইতিকাফকারী ইতিকাফের জন্য মসজিদের একটা অংশ নিজেদের জন্য নির্দিষ্ট করে নিতে পারবে, যদি তাতে মুসল্লিদের কোনও সমস্যা না হয়। জায়গাটি নির্ধারণ করা চাই, মসজিদের খালি অংশে বা শেষ প্রান্তে যেন অন্যদের কষ্ট না হয় এবং নিজ ইতিকাফে নির্জনতা ও একাকীত্ব অর্জন হয়। (শারহন নববী ৮/ ৬৯)
    ২০ রমজানুল করিমে আসরের পরপরই প্রত্যেক মুসল্লিরা ইতিকাফের নিয়তে মাগরিবের পরে নিজ নিজ মসজিদে বসে পড়বে। প্রত্যেক মহল্লার মসজিদে যে কেউ একজন মসজিদে ইতিকাফে বসতে হবে। নতুবা সারা মহল্লাবাসী গুনাহগার হবেন। (শামী)

  • মাকে সম্মান কর, দুনিয়া-আখেরাতের কোথাও তুমি আটকাবে না!

    মাকে সম্মান কর, দুনিয়া-আখেরাতের কোথাও তুমি আটকাবে না!

    আজ তোমাদেরকে শুধু একটি কথা বলার জন্য একত্র করেছি। এই সফরে হারামে নববীতে বসে আমার বন্ধু মাওলানা ইয়াহইয়াকে বললাম, ‘এখন আমি কী ভাবছি জানো? আমি ভাবছি, কীভাবে আমার ছেলেদেরকে বোঝাতে পারি যে, মায়ের দোয়ার ফযীলত কী; মায়ের দোয়া থাকলে কী হয় আর দোয়া না থাকলে কী হয়।

    আমি জানি না, কীভাবে বললে, কোন ভাষায় বললে আমার ছেলেরা বুঝতে পারবে এবং মায়ের জন্য জান কোরবান করবে। ওরা যদি বলে যে, আপনার কলিজাটা বের করে দেন, আমরা ওটা চিবিয়ে খাব, তারপর বুঝব, তাহলে আমি আনন্দের সাথে আমার কলিজাটা বের করে টুকরো টুকরো করে সবাইকে খাইয়ে দিব।’ এর অর্থ এই নয় যে, আমি খুব বুঝে গিয়েছি। তবে এতটুকু বুঝেছি যে, মা ছাড়া সন্তানের কোনো গতি নেই।

    মা যেমনই হোক মায়ের দোয়া যারা পাবে জীবনে তাদের কোনো ভয় নেই। মানুষ তো মূল্যবান সম্পদ অনেক পয়সা খরচ করে অর্জন করে। আমরা সবাই যেন মায়ের সন্তুষ্টিকে মূল্যবান সম্পদ মনে করি এবং যেকোনো মূল্যে তা অর্জন করার চেষ্টা করি। এই হজ্বের সফরে আল্লাহর কাছ থেকে যা কিছু পেয়েছি, তা সবই আমার মায়ের দোয়ার বরকত। এটা আমাকে আল্লাহ তাআলা হাতে ধরে ধরে বুঝিয়ে দিয়েছেন।

    সফরে একজন আমাকে বলল, ‘আপনি শুধু মায়ের কথা বলছেন, বাবার কথা কেন বলছেন না?’ বললাম, ‘ভাই! আমি কী করব? আমার আল্লাহই শুধু মায়ের কথা বলেছেন’- ووصينا الانسان بوالديه احسانا حملته امه كرها ووضعه كرها ‘মা-বাবার প্রতি সদাচরণ কর কারণ মা কষ্ট করে তোমাকে গর্ভে ধারণ করেছেন …।’

    দেখুন, মা-বাবা দু’জনের সাথেই সদাচরণের আদেশ করেছেন এরপর আর বাবার কথা নেই, আছে শুধু মায়ের কথা। এর দ্বারা বোঝা যায়, বাবা যা কিছু পাচ্ছেন মায়ের সঙ্গে থাকার কারণে পাচ্ছেন। যেহেতু তিনি মাকে অর্থ দিয়ে, শক্তি দিয়ে সাহায্য করেছেন তাই তিনি কিছু পাচ্ছেন। সুতরাং আমার বাবা যদি আমার মায়ের সাথে ভালো আচরণ না করেন তাহলে তিনি আমার মুহাব্বত পাবেন না। তবে রক্তের হক আছে তাই বেআদবী করব না, আদব রক্ষা করব এবং কোরআন যে আনুগত্যের কথা বলেছে সে আনুগত্য করব।

    কিন্তু মুহাব্বত আর করব না। আমার মুহাব্বত পেতে হলে আমার বাবাকে আমার মায়ের মাধ্যমে আসতে হবে। এই কথাটা আমি নিজেকেও বলছি। আমি যদি আমার সন্তানের মুহাব্বত পেতে চাই তাহলে তার মায়ের সাথে আমাকে ভালো ব্যবহার করতে হবে। তোমরা যদি মায়ের মর্যাদা বুঝতে পার তাহলে আমি আল্লাহর রহমতের উপর ভরসা করে নিশ্চয়তার সাথে বলতে পারি যে, দুনিয়াতে এবং আখেরাতে কোনোখানে ইনশাআল্লাহ তোমরা আটকাবে না।

    মাদরাসাতুল মদীনার সাথে যদি তোমাদের সম্পর্ক থাকে তাহলে শোন! তোমরা মাদরাসাতুল মদীনার তালিবুল ইলম তখনই হতে পারবে যখন তোমরা মায়ের অনুগত হবে এবং তোমার মা তোমার প্রতি সন্তুষ্ট থাকবেন। এবার সফরের কোনো প্রস্তুতি ছিল না। আম্মাকে বললাম, আম্মা! আমি কী নিয়ে আল্লাহর ঘরে যাব? আমার ভিতর তো একেবারে খালি। আম্মা বললেন, ‘আল্লায় দিব।’ মায়ের এই দোয়াটা নিয়ে আমি আল্লাহর ঘরে গিয়েছি। আল্লাহ এত দিয়েছেন যে, আমি আল্লাহর প্রতি খুশি হয়ে গিয়েছি।

    আল্লাহ পদে পদে এত দয়া, এত মায়া, এত মুহাব্বতের আচরণ করেছেন যে, ঐ হাদীসটি বার বার মনে পড়েছে-‘মায়ের চেয়েও আল্লাহর মুহাব্বত বেশি।’ ওখান থেকেই আমার নিয়তে এসেছে, আমি গিয়েই আমার ছেলেদেরকে জমা করব এবং মায়ের দোয়া দিয়ে কী পাওয়া যায় তা বলব। এটা যদি আমার ছেলেদেরকে না বলি তাহলে আর কাদেরকে বলব? আমার ছেলেদের চেয়ে প্রিয় আমার আর কে আছে? এবারের এ আয়োজনটাও (সবাইকে খেজুর ও যমযম পান করানো) মায়ের দোয়ার বরকত। মাদরাসাতুল মদীনায় তোমাদের কিছু পাওয়ার দরকার নেই।

    সবাই মাকে খুশি রাখ। মা যদি না পড়লে খুশি হন পড়ো না, আর পড়লে খুশি হলে পড়। মূল উদ্দেশ্য হল, মাকে খুশি করা। আর মাকে কেন খুশি করবে? আল্লাহ বলেছেন তাই। মায়ের খেদমত করা, মাকে খুশি রাখা অর্থাৎ খিদমাতুল ওয়ালিদাইন ও ইহসান ইলাল ওয়ালিদাইন হল মাদরাসাতুল মদীনার নেসাব। এটায় যে পাশ করল সে মাদরাসাতুল মদীনা থেকে পাশ করে গেল। আর এই নেসাবে যে পাশ করল না সে মাদরাসাতুল মদীনার ছাত্র পরিচয় দেওয়ার-আমি মনে করি-অধিকার রাখে না।

    আল্লাহ যেন আমার সকল ছেলেকে, এখন যারা আছে তাদেরকে, পিছনে যারা ছিল তাদেরকে, এবং সামনে যারা আসবে তাদেরকে মায়ের খেদমত করার এবং মাকে খুশি করার তাওফীক দান করেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছেলেকে বাঁচানোর জন্য মায়ের মমতাকে জাগিয়ে দিয়েছিলেন। মৃত্যুর সময় মুখে কালিমা জারি হচ্ছিল না। তখন তিনি বললেন, এ ব্যক্তি হয়তো মায়ের সাথে দুর্ব্যবহার করেছে তাই কালিমা জারি হচ্ছে না। ওর মাকে নিয়ে আস। মাকে বললেন, তুমি তোমার ছেলেকে মাফ করে দাও।

    মা বললেন, না আমাকে ও অনেক কষ্ট দিয়েছে, আমি ওকে মাফ করব না। মাফ করবে না? আচ্ছা এক কাজ কর, লাকড়ি জোগাড় করে আগুন জ্বাল। এরপর ছেলেটাকে আগুনে ফেলে দাও। তখন মা বলে কি, আল্লাহ! আল্লাহ! এটা করবেন না! এটা করবেন না! আমি মাফ করে দিলাম। তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমার সন্তান দুনিয়ার আগুনে জ্বলুক-এটা সইতে পারছ না, কিন্তু তোমার বদ দোয়ার কারণে সে যখন জাহান্নামের আগুনে জ্বলবে তখন সহ্য করবে কীভাবে? তো তিনি মায়ের মমতাকে জাগ্রত করে সন্তানকে রক্ষা করেছেন।

    প্রত্যেক হজ্বের সফরে আমি সঙ্গীদেরকে বলার চেষ্টা করি যে, ‘হজ্ব করতে এসেছেন তো হজ্ব থেকে ফায়দা হাসিল করারও চেষ্টা করুন। হজ্ব থেকে ফায়দা হাসিল করতে হলে আপনার সাথে যে কয়জন নারীর সম্পর্ক আছে তাদের সাথে সদ্ব্যবহার করতে হবে। আপনার সাথে মায়ের সম্পর্ক আছে, বোনের সম্পর্ক আছে, মেয়ের সম্পর্ক আছে, স্ত্রীর সম্পর্ক আছে।

    তাদের সঙ্গে সদ্ব্যবহার করলে আপনি হজ্বের ফায়দা পাবেন, হজ্বের বরকত পাবেন।’ দেখ, আল্লাহ তাআলাও আমাদেরকে যমযম দান করার জন্য হাজেরা আ.-এর মাতৃত্বকে অসীলা বানিয়েছেন। তাঁর তড়প ও বে চায়নী না হলে যমযম আসত না। অনেক বছর আগে একটা গজল শুনেছিলাম-‘যমযম ক্যায়্যা হ্যায়, এক মা কি তড়প।’

    ‘যমযমের হাকীকত কী? শুধু একজন মায়ের ব্যাকুলতা।’ যখনই যমযমের একটা ঢোক পান করি তখনই আমার মনে হয় আমি যেন মাতৃত্বের দান গ্রহণ করছি। সাফা ও মারওয়ার যে সাঈ এটা তো আসলে মায়ের তড়প। বলতে গেলে পুরো হজ্বটাই নারী সমাজের একটা অবদান পুরুষ সমাজের উপর। মোটকথা, মায়ের প্রতি, বোনের প্রতি, স্ত্রীর প্রতি, কন্যার প্রতি এবং নারী সমাজের প্রতি সদয় হওয়া হজ্বের শিক্ষা।

    মদীনায় পৌঁছে ভিতরটা খুব অন্ধকার মনে হল। যিয়ারতে যাওয়ার সাহস হচ্ছিল না। সবাই গেলেন, কিন্তু আমি যেতে পারলাম না। হারামে নববীতে শুয়ে আছি, হঠাৎ শেষ রাত্রে মনে হল, আল্লাহ আমাকে ডাক দিয়েছেন, মিয়া! তোমার না মা আছে। তুমি এত চিন্তা করছ কেন? তোমার মায়ের থেকে দোয়া নাও। মায়ের থেকে দোয়া নিলেই আমি তোমার রাস্তা খুলে দিব। মনে হল, আমি এই সম্বোধনটা আমার আল্লাহর কাছ থেকে শুনতে পেলাম। আসমানের দিকে তাকিয়ে বললাম, আল্লাহ! তোমার শোকর, তুমি দিলের মধ্যে ঢেলে দিয়েছ।

    তোমার সম্বোধন আমি বুঝতে পেরেছি। তোমার শোকর। আমি তো কোনো সফরের মধ্যে মায়ের সাথে ফোনে কথা বলিনি, কিন্তু তুমি দিলে ঢেলে দিয়েছ তাই আমি মায়ের সঙ্গে ফোনে কথা বলব। মায়ের কাছ থেকে দোয়া নিব। এরপর কিন্তু তুমি আর আমাকে না দিয়ে পারবে না। এরপর ফোন করে মায়ের সাথে কথা বললাম, আম্মা! আমার অবস্থা খুব খারাপ। আমি সাহস পাচ্ছি না আল্লাহর নবীর সামনে যেতে। আপনিও তো সালাম পেশ করার দায়িত্ব দিয়েছেন কিন্তু আমি তো যেতে সাহস পাচ্ছি না।

    আপনি আমার জন্য দোয়া করেন। আমি এখন রওনা দেব। মা বললেন, ‘আচ্ছা।’ একটিমাত্র শব্দ। আমার মনে হল, ঠাণ্ডা পানি পান করলে যেমন গলা-বুক শীতল করে পানিটা নেমে যায়, তেমনি আচ্ছা শব্দের শীতলতাও আমার প্রতিটি শিরায় উপশিরায় প্রবাহিত হচ্ছে। সমগ্র সত্তাকে শীতল ও স্নিগ্ধ করে দিল একটি শব্দ। আমি অনুভব করলাম, আচ্ছা শব্দের আলোটা আমার ভেতর প্রবেশ করছে আর আমার অন্ধকারগুলি ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে। আমার সর্বসত্ত্বা পূর্ণ আলোকিত হয়ে গেল মায়ের একটি ‘আচ্ছা’ শব্দ দ্বারা।

    একজন প্রশিক্ষিত সৈনিক যেমন অস্ত্র হাতে পেলে নির্ভীক হয়ে যায় আমি তেমনি ‘আচ্ছা’ শব্দের অস্ত্রটা পেয়ে নির্ভীক হয়ে গেলাম। আমি রওয়ানা দিলাম। এত তৃপ্তি! এত শা্ন্তি! গিয়ে যখন দাঁড়ালাম মনে হল, আমি যেন দুনিয়ার সবচেয়ে আপন জায়গায় এবং সবচে প্রিয় জায়গায় এসে পড়েছি। জীবনে এমন সুন্দর সালাম মনে হয় আর কখনো পেশ করার তাওফীক হয়নি। আমি আল্লাহকে বললাম, আল্লাহ! আমি মায়ের দোয়া নিয়ে এসেছি। এখন তুমি আমাকে খালি হাতে কীভাবে ফিরিয়ে দিবে!

    খালি হাতে ফিরিয়ে দিতে চাইলে তো তুমি মায়ের কথাটা মনে করিয়ে দিতে না। তো আলহামদুলিল্লাহ, ঐ দুরুদ ও সালামের বরকত খুব অনুভব করেছি। তখনই মনে হয়েছে যে, আমার সন্তানদেরকে এটা বোঝাতে হবে। দেখ, আল্লাহ কেমন ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। মায়ের দিকে মুহাব্বতের নযরে তাকালে তুমি মাকবুল হজ্বের সওয়াব পাবে। কিন্তু মানুষের তো ঐ হজ্বের দরকার নেই, তাদের শুধু দরকার দুই লাখ তিন লাখ টাকা খরচ করে এই হজ্ব করা! তোমরা মায়ের হয়ে যাও। মায়ের হয়ে গেলে আল্লাহর হয়ে যাবে।

    আর আল্লাহর হয়ে গেলে আল্লাহও তোমাদের হয়ে যাবেন। মাকে কখনো কষ্ট দিয়ো না। যে মায়ের অবস্থা এমন যে, সন্তান অসুস্থ হলে তাঁর আর কোনো অসুস্থতা থাকে না, নিজের সকল অসুস্থতার কথা ভুলে যান সন্তানের চিন্তায়-সেই মাকে মানুষ কীভাবে কষ্ট দেয়! আমি অনেক সময় অনেকের জন্য দোয়া করি যে, আল্লাহ তাআলা যেন তোমার প্রতি তোমার মায়ের মুহাব্বত কমিয়ে দেন। কারণ মায়ের অন্তরে যদি তোমার প্রতি বেশি মুহাব্বত থাকে তাহলে জ্বলনও বেশি হবে।

    আর তুমি যেহেতু তার মুহাব্বতের মর্যাদা রক্ষা করছ না সুতরাং জ্বলনটা যত বেশি হবে তোমার পক্ষ থেকে অমর্যাদাও তত বেশি হবে। ফলে তুমি ক্ষতিগ্রস্থ হতে থাকবে। তারচে তোমার প্রতি যদি তোমার মায়ের মুহাব্বতটা কমে যায় তাহলে জ্বলনটাও কমে যাবে। ফলে তুমি একটু রক্ষা পাবে। কিংবা আল্লাহ যেন তোমাকে মুহাব্বতের মর্যাদা রক্ষা করার তাওফীক দান করেন। যাই হোক, তোমরা যদি বাঁচতে চাও তাহলে মায়ের বিষয়টা খেয়াল রাখার চেষ্টা কর। এটা আমাদের জন্য একটা বিরাট রাস্তা। এই রাস্তায় আমাদের বড় বড় সৌভাগ্য আসতে পারে।

    আবার এটা আমাদের বরবাদিরও কারণ হতে পারে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন- هما جنتك أو نارك মা-বাবা হল তোমার জান্নাত কিংবা জাহান্নাম। অর্থাৎ মা-বাবার মর্যাদা রক্ষা করে কেউ জান্নাতে যাবে আবার মা-বাবার অমর্যাদা করে কেউ জাহান্নামে যাবে। আর আল্লাহ তাআলা তো মুশরিক মা-বাবার সঙ্গেও সদাচরণ করার আদেশ দিয়েছেন।

    এই পৃথিবীতে তোমাকে নিয়ে ভাববার কেউ নেই। এমনকি বাবাও তোমাকে নিয়ে তেমন ভাবেন না যেমন ভাবেন তোমার মা। ঘরে ভালো কিছু রান্না হলে তুমি নেই তাই নিজেও খেতে পারেন না।

    এমন মাকে ভালবাসবে না, সম্মান করবে না তো কাকে করবে! মাকে ভালবাসলে, মাকে সম্মান করলে নিজেই লাভবান হবে। লেখাপড়া শিখতে মেধা লাগে, শ্রম লাগে, অনেক কিছু লাগে, কিন্তু মাকে ভালবাসতে, মাকে সম্মান করতে, মাকে খুশি করতে কিছুই লাগে না।

    তো বাবারা! মাকে ভালবাস, মাকে সম্মান কর, মাকে সন্তুষ্ট কর এবং মায়ের দোয়া হাসিল কর। তাহলে দেখবে দুনিয়া ও আখেরাতের কোথাও তুমি আটকাবে না। তোমার সন্তান হবে মর্যাদার শীর্ষে। আল্লাহ সকলকে তাওফীক দান করুন। আমীন।

  • সন্তানকে নামাজী করে তোলার কিছু কার্যকরী উপায়

    সন্তানকে নামাজী করে তোলার কিছু কার্যকরী উপায়

    ঈমানের পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল নামাজ। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর পক্ষ থেকে বার বার নামাজের তাগিদ পেয়েছেন। কুরআনে পাকে আল্লাহ তাআলা বিভিন্ন জায়গায় সরাসরি ৮২ বার সালাত শব্দ উল্লেখ করে নামাজের গুরুত্ব তুলে ধরেছেন।

    আর এই কারণেই নামাজ আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। নামাজের মাধ্যমে আমরা নিজেদেরকে আল্লাহর সামনে পেশ করতে পারি। শিশু বয়স থেকে নামাজের অনুশীলন করলে পরবর্তী জীবনে এর বিরাট সুফল লাভ করা যায়। তাই পরিবারের অভিভাবকদের জ্ঞাতার্থে এমন কিছু উপায় উল্লেখ করা হলো, যার মাধ্যমে সন্তানকে নামাজ পড়ার প্রতি খুব সহজেই উৎসাহিত করতে পারবেন।

    এক. শিশুরা সাধারণত মা-বাবার অনুকরণ করে থাকে। সুতরাং তাদেরকে দেখান যে আজান শুনার সাথে সাথে আপনি অজু করে নামাজের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন। মুসলিম মা-বাবা হিসেবে আপনি আপনার সন্তানের কাছে প্রথম উদাহরণ। আপনি যদি সবসময় ইবাদত-বন্দেগীকে অগ্রাধিকার দেন এবং এই ক্ষেত্রে কোন অলসতা বা অবহেলা না করেন তাহলেই আপনার সন্তান নামাজের প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠবে।

    দুই. আমাদের নবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.) বলেছেন, তোমরা তোমাদের সন্তানদেরকে নামাজ শিক্ষা দাও, যখন তাদের বয়স থাকে সাত। আর যখন তারা দশ বছরে পৌঁছে যাবে তখন তোমারা তোমাদের সন্তানদেরকে নামাজের জন্য প্রহার করো। এবং তাদের বিছানা আলাদা করে দাও। (আবু দাউদ)

    বুঝা গেল, যদিও সাত বছর বয়সে শিশুরা নামাজ আদায় করতে বাধ্য নয় কিন্তু তারা সাত বছর থেকে নামাজে অভ্যস্ত হয়ে গেলে, তরুণ হওয়ার পরেও নামাজের বিষয়ে অনাগ্রহী হবে না।

    তিন. আপনার বাসায় যদি জায়গা থাকে তাহলে নামাজের জন্য একটি রুমকে নির্দিষ্ট করে রাখুন। আর যদি অতিরিক্ত জায়গা না থাকে তাহলে অন্তত একটি রুমের এক কোণায় সামান্য জায়গা নামাজের জন্য নির্ধারণ করে রাখুন। যাতে করে আপনার সন্তান বুঝতে পারে নামাজ পড়া অনেক গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয়। যার কারণে একটা নির্দিষ্ট জায়গা রাখা হয়েছে। আপনার সন্তানদেরকে শিক্ষা দিন যে, এটা শুধু নামাজের জন্য নির্ধারিত জায়গা। এই জায়গাকে সব সময় পরিষ্কার ও পবিত্র রাখতে হবে।

    চার. ছোটরা চাক্ষুষ বিষয় ও পুরস্কারের প্রতি বেশি আগ্রহী হয়ে থাকে। আপনার বাসায় ইসলামী ক্যালেন্ডার ঝুলিয়ে রাখতে পারেন। এটা আপনার সন্তানদের প্রার্থনা করতে উৎসাহিত করবে। কেননা ইসলামী ক্যালেন্ডারটি আপনার সন্তানের চাক্ষুষ অনুস্মারক হিসাবে কাজ করবে। আর প্রতিটি শুক্রবার তাকে স্মরণ করিয়ে দিন।

    পাঁচ. যখন আপনার সন্তানের বয়স সাত হয়ে যাবে তখন তাদেরকে নামাজের সময় শিক্ষা দিন। তাদের জীবনের এই নতুন অধ্যায়কে উৎসাহিত করার জন্য আপনার সন্তানের বন্ধুদের বাসায় আমন্ত্রণ জানান এবং তাদেরকে হিজাব, তাজবিহ অথবা আজান দেয় এমন এলার্ম ঘড়ি গিফট করুন।

    ছয়. আল্লাহর বিষয়টি বোঝা ছাড়া, প্রার্থনা শুধু একটি অনুষ্ঠান হয়ে উঠবে এবং পালনকর্তার সাথে আধ্যাত্মিক এবং মানসিক সংযোগের অভাব হয়ে পড়বে। শৈশব থেকে আপনার সন্তানদের আল্লাহর বিষয়ে শিক্ষা দিন। আল্লাহ কীভাবে কীভাবে সবকিছু তৈরি করেছেন। তাদেরকে কি কি দিয়েছেন এবং তাদেরকে কীভাবে রক্ষা করবেন ইত্যাদি বিষয়ে তাদের সাথে কথা বলুন। এর মাধ্যমে আপনার সন্তানদের অন্তরে আল্লাহর প্রতি এক গভীর ভালোবাসা তৈরি হবে।

    সাত. নবীদের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বাসায় আলোচনা করুন। তাদের জীবনী পাঠ করুন এবং তাদের সিরাত নিয়ে কথা বলুন। এটা আপনার জীবনে দৈনিক একটা রুটিন বানিয়ে নিন। নবীদেরকে তাদের সামনে মডেল হিসেবে তুলে ধরুন। তাহলে তারা তার মতো হতে চেষ্টা করবে।

    আট. এটা একটা নাটকীয় পরিবর্তন হতে পারে, যে একদমই নামাজ পড়ে না সে প্রতিদিন পাঁচওয়াক্ত নামাজ পড়ছে। তো শুরু হোক এই ছোট পরিবর্তন দিয়ে।

    নয়. আমরা সব সময়ই চাই আমাদের সন্তানরা নামাজকে ভালোবাসুক। কিন্তু এমন সময়ও আসবে যে, তারা অলসতা করবে এবং নামাজ পড়তে চাইবে না। মা-বাবা হিসেবে আমাদের দায়িত্ব হবে তারা যেন সব সময়ই নামাজ পড়ে- সেই ব্যবস্থা করা। বিশেষত তাদের বয়স যখন দশ বছর হয়ে যায়। তখন নামাজ ছেড়ে দেওয়া কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য হবে না। নামাজ পড়ার বিষয়টা অভ্যাসে পরিণত হয়ে গেলে কঠিন কিছু নয়।

    দশ. নামাজের প্রতি অনুরাগ একটি ইতিবাচক মনোভাব। এটাকে উৎসাহিত করার একটি উপায় হচ্ছে, এটি নিয়ে একটি যৌথ অনুশীলন করতে হবে। প্রতিদিন পরিবারিকভাবে কমপক্ষে একবার নামাজ পড়ার চেষ্টা করুন। আপনার সন্তান যদি আজান দিতে সক্ষম হয় তাহলে তাকে আজান দেওয়ার দায়িত্ব দিন।

  • ঐতিহাসিক মক্কা বিজয়ে যা ঘটেছিল ২০ রমজান

    ঐতিহাসিক মক্কা বিজয়ে যা ঘটেছিল ২০ রমজান

    হুদায়বিয়ার সন্ধিকে আল্লাহ তাআলা প্রকাশ্য বিজয় ঘোষণা দিয়েছিলেন। আল্লাহর সেই প্রকাশ্য বিজয় ৮ম হিজরির ২০ রমজান সফলতার মুখ দেখে। মক্কার মুক্ত বাতাসে প্রশান্তির সুঘ্রাণ লাভ করেন বিশ্বনবি। কৃতজ্ঞতায় সেজদায় লুটিয়ে পড়েন প্রিয় কাবা চত্ত্বরে।

    ২০ রমজান শুধু মক্কা বিজয়ই হয়নি বরং প্রিয় নবি স্বমহিমায় নিজ জন্মভূমিতে ফিরে এসেছিলেন। বিশ্বনবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ১০ হাজার সাহাবি নিয়ে ১০ রমজান মদিনা থেকে মক্কার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন।

    ১০ হাজার সাহাবির বিশাল মুসলিম বাহিনী বিশ্বনবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সফল নেতৃত্বে বিনা রক্তপাতে ঐতিহাসিক মক্কা বিজয় করনে। এ বিজয়ের ফলে ইসলামের ইতিহাসে ২০ রমজান ঐতিহাসিক অমরত্ব লাভ করে।

    এ পবিত্র নগরীতে অবস্থিত বায়তুল্লাহ বা তাওহিদের কেন্দ্রভূমি ‘কাবাঘর’। যা সর্ব প্রথম হজরত আদম আলাইহিস সালাম নির্মাণ করেছিলেন। অতঃপর বর্তমান কাবঘর আল্লাহর নির্দেশে হজরত ইবরাহিম আলাইহিস সালাম নির্মাণ করেছিলেন।

    কাবার ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত হয়ে মক্কা বিজয়ের ১০ বছর আগে আল্লাহর নির্দেশে এ পবিত্র ভূখণ্ড ছেড়ে রাতের অন্ধকার মক্কা ছেড়ে মদিনায় গমন করেছিলেন প্রিয় নবি।

    তাওহিদের কেন্দ্রভূমি পবিত্র কাবাকে মূর্তি পূজা, অশ্লীলতা ও শিরকের স্থান থেকে মুক্ত করতে বিশ্বনবি রমজান মাসকেই উপযুক্ত সময় মনে করেন। সে লক্ষ্যেই ১০ রমজান মদিনা থেকে ১০ হাজার সাহাবি নিয়ে মক্কা অভিমুখে রওয়ানা হন। ২০ রমজান মক্কায় পৌছে বিনা রক্তপাতে বিজয় করেন পবিত্র ভূমি মক্কা। ঐতিহাসিক মক্কা বিজয়ের সময় যেসব ঘটনা ঘটে। তার কিছু তুলে ধরা হলো-

    আবু সুফিয়ানের গ্রেফতার ও ইসলাম গ্রহণ
    মুসলিম বাহিনী মক্কার কাছাকাছি আসলে মক্কার নেতা আবু সুফিয়ান তাদের অবস্থান জানতে গোপনে সেখানে উপস্থিত হলে মুসলিম বাহিনীর হাতে ধরে পড়ে যান।

    মক্কা বিজয়ের আগের ইসলাম ও মুসলমানদের অনেক ক্ষতি করেছিল আবু সুফিয়ান। বিশ্বনবিকে হত্যার ষড়যন্ত্রের অন্যতম পরিকল্পনাকারীও ছিল আবু সুফিয়ান। সে হিসেবে তাকে দেখামাত্রই হত্যা করার কথা ছিল। কিন্তু মুসলিম বাহিনী তা না করে আবু সুফিয়ানকে বিশ্বনবির কাছে হস্তান্তর করেন।

    বিশ্বনবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আবু সুফিয়ানকে করুণা করেন। তিনি বললেন, হে আবু সুফিয়ান! যাও, আজ তোমাকে কোনো বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে না। আল্লাহ তোমাকে ক্ষমা করে দিন। তিনি সমস্ত ক্ষমা প্রদর্শনকারীর চেয়ে শ্রেষ্ঠ ক্ষমা প্রদর্শনকারী।

    বিশ্বনবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এ আচরণ দেখে মুগ্ধ হয়ে যান আবু সুফিয়ান। তার মধ্যে এক সুন্দর চিন্তার সৃষ্টি হলো। তিনি বুঝতে পারলেন, বিশ্বনবি রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের জন্য মক্কায় আসেননি। তার এ আগমনে দখলদারিত্বের কোনো ইঙ্গিতও নেই। দুনিয়ার রাজা-বাদশাহদের মতো কোনো প্রতিশোধ স্পৃহা ও অহংকারবোধের চিহ্নও নেই।

    সে কারণে মুক্ত হওয়া সত্ত্বেও আবু সুফিয়ান মক্কা ফিরে না গিয়ে ইসলাম গ্রহণ করে বিশ্বনবির এ কাফেলায় অংশগ্রহণ করেন।

    মক্কায় প্রবেশের আগে বিশ্বনবির নির্দেশ ও নসিহত
    রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মক্কায় প্রবেশের আগে হজরত খালিদ বিন ওয়ালিদ রাদিয়াল্লাহু আনহুকে এ নির্দেশ দিলেন যে, তুমি পেছন থেকে মক্কায় প্রবেশ কর। আর মক্কার কোনো অধিবাসীকে হত্যা করবে না। তবে কেউ যদি তোমার ওপর অস্ত্র ওঠায়; তবে তুমি শুধুমাত্র আত্মরাক্ষার জন্য অস্ত্র ধারণ করবে।

    এ নির্দেশ দিয়ে বিশ্বনবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সামনের দিক থেকে পবিত্র নগরী মক্কায় প্রবেশ করেন। তিনি পবিত্র নগরী মক্কায় প্রবেশকালে কোনো প্রতিরোধের স্বীকার হননি এবং কোনো হতাহতের ঘটনাও ঘটেনি।

    খালিদ ইবনে ওয়ালিদের কৈফিয়ত গ্রহণ
    হজরত খালিদ বিন ওয়ালিদের সৈন্যবাহিনীর ওপর কতিপয় কুরাইশ গোত্রের লোক তীর বর্ষণ করে; যার ফলে তিনজন মুসলমান শাহাদাত বরণ করেন। হজরত খালিদ ইবনে ওয়ালিদ প্রতিহত করতে গেলে তাতে ১৩ জন লোক নিহত হয় আর অন্যরা পালিয়ে যায়।

    ৩ মুসলমানের শাহাদাত এবং ১৩ জন মক্কার লোকের নিহত হওয়ার ঘটনার জন্য বিশ্বনবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হজরত খালিদ ইবনে ওয়ালিদ রাদিয়াল্লাহু আনহুর কাছে কৈফিয়ত চান। খালিদ ইবনে ওয়ালিদ ঘটনার প্রকৃত বর্ণনা দিলে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছিলেন, ‘আল্লাহর ফয়সালা এ রকমই ছিল’।

    বিশ্বনবির সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা
    রক্তপাতহীন বিজয়ে বিশ্বনবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মক্কাবাসীদের প্রতি কোনোরূপ প্রতিশোধ গ্রহণ না করে মুসলমানদের নিরাপত্তার স্বার্থে ও শৃঙ্খলার জন্য শর্তসাপেক্ষে সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেন। বিশ্বনবির ঐতিহাসিক সে ঘোষণাটি ছিল এমন-
    >> যারা নিজ নিজ ঘরে অবস্থান করবে এবং দরজা বন্ধ রাখবে, তারা নিরাপদ।
    >> মক্কার নেতা আবু সুফিয়ানের ঘরে যারা অবস্থান করবে, তারাও নিরাপদ।
    >> পবিত্র কাবাঘরে যারা আশ্রয় গ্রহণ করবে, তারাও নিরাপদ।

    মক্কা প্রবেশকালে বিশ্বনবির সাজ-সজ্জা
    সাদা ও কালো রঙের পতাকা ধারণ করে বিশ্বনবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পবিত্র ভূমি মক্কায় প্রবেশ করেন। মাথায় পরেন লৌহ নির্মিত শিরাস্ত্রণ এবং তার ওপর কালো পাগড়ি।

    মক্কায় প্রবেশ কালে তিনি ‘সুরা ফাতেহা’ তেলাওয়াত করতে থাকেন। তাঁর এ আগমনে মহান আল্লাহর প্রতি অগাধ আস্থা ও বিনয়-নম্রতা প্রকাশ পেয়েছিল। তার বিনয় ও নম্রতা এতটাই বেশি ছিল, যে সাওয়ারিতে তিনি আরোহন করেছিলেন, সে উটের ওপর ঝুঁকে পড়ার ফলে তার পবিত্র চেহারা উটের কুঁজ স্পর্শ করছিল।

    মক্কায় প্রবেশকালে বিশ্বনবির সঙ্গী
    হিজরতের সময় ঘনিষ্ট সহচর হজরত আবু বকর থাকলেও প্রিয় জন্মভূমি পবিত্র মক্কায় প্রবেশকালে বিশ্বনবির বাহনে তার সঙ্গী ছিলেন শিশু হজরত উসামা রাদিয়াল্লাহু আনহু। তিনি হজরত জায়েদ রাদিয়াল্লাহু আনহু ছেলে।

    পবিত্র কাবাঘরে প্রবেশ
    পবিত্র নগরী মক্কায় প্রবেশ করে সর্ব প্রথম তাওহিদের মর্যাদা রক্ষায় আত্মনিয়োগ করেন। তিনি পবিত্র কাবা ঘরে প্রবেশ করে সর্বপ্রথম মূর্তিগুলোকে বাইরে ছুঁড়ে ফেলার নির্দেশ দেন। সে সময় কাবাঘরে ৩৬০টি মূর্তি রক্ষিত ছিল। কাবাঘরের দেয়ালে ছিল অংকিতচিত্র। এ সবই তিনি প্রথমে নিশ্চিহ্ন করে দেন।

    মক্কা বিজয়ের উৎসব : কাবাঘর তাওয়াফ
    পবিত্র কাবাঘরকে শিরকের নোংরামী ও অপবিত্রতা থেকে মুক্ত করার পর তিনি উচ্চস্বরে তাকবির ধ্বনিসহ কাবা শরিফ তাওয়াফ করেন। তার এ তাওয়াফ ও তাকবির ধ্বনিই ছিল মক্কায় বিজয়ের উৎসব ও স্লোগান।

    বিশ্বনবির তাওয়াফের উৎসব ও তাকবিরের স্লোগান দেখে মক্কাবাসীদের অন্তর চোখ খুলে যায়। তারা অনুভব করতে সক্ষম হয় যে, এতবড় বিজয় উৎসবেও তারা কোনো শান-শওকতের পথ গ্রহণ না করে অত্যন্ত বিনয়াবনত মস্তকে আল্লাহ প্রশংসা ও কাবা ঘর তাওয়াফ করে আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্বই ঘোষণা করছে। এ বিজয় প্রকৃত পক্ষেই তাওহিদের বিজয়।

    অতঃপর বিশ্বনবির ভাষণ
    ঐতিহাসিক মক্কা বিজয়ের পর বিশ্বনবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এক ঐতিহাসিক ভাষণ দেন। ভাষণের শুরুতেই তিনি তাওহিদের ঘোষণা দিয়ে বলেন-
    >> ‘এক আল্লাহ ছাড়া কোনো মাবুদ নেই, তার কোনো শরিক নেই। তিনি তাঁর সব ওয়াদা সত্যে পরিণত করেছেন। তিনি তাঁর বান্দাদের সাহায্য করেছেন এবং সমস্ত শত্রুবাহিনীকে ধ্বংস করে দিয়েছেন।’

    >> জেনে রাখুন! গর্ব ও অহংকার, আগের সব হত্যা ও রক্তপণ এবং সব রক্তমূল্য আমার পায়ের নিচে। শুধুমাত্র পবিত্র কাবাঘরের তত্ত্বাবধান এবং হাজিদের পানি সরবরাহ এর ব্যতিক্রম।

    >> হে কুরাইশ সম্প্রদায়! অন্ধকার যুগের সব আভিজাত্য ও বংশ-মর্যদার ওপর গর্ব-অহংকার প্রকাশকে আল্লাহ নিষিদ্ধ করেছেন। সব মানুষ এক আদমের সন্তান আর আদমকে সৃষ্টি করা হয়েছে মাটি থেকে। অতঃপর বিশ্বনবি সুরা হুজরাতের ১৩নং আয়াত তেলাওয়াত করেন। আর তাহলো-
    ‘হে লোক সকল! আমি তোমাদেরকে একজন পুরুষ ও একজন নারী থেকে সৃষ্টি করেছি এবং তোমাদের নানা গোত্র ও জাতিতে বিভক্ত করে দিয়েছি, যেন তোমরা একে অপরকে চিনতে পার। কিন্তু আল্লাহর নিকট সম্মানিত হচ্ছে সেই ব্যক্তি, যে অধিকতর আল্লাহকে ভয় করে। আল্লাহ মহাবিজ্ঞ ও সর্বজ্ঞ। (সুরা হুজরাত : ১৩)

    যে ভাষণে শত্রুর হৃদয় জয়
    মক্কা বিজয় মুসলিম উম্মাহর জন্য অনেক বড় শিক্ষা। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কুরাইশদের উদ্দেশ্যে যে ভাষণ দিয়েছিলেন সেখানে মক্কার সব গোত্রের বড় বড় নেতারা উপস্থিত ছিলেন। যারা ইসলাম ও মুসলমানদেরকে মক্কা নগরীর নিজ নিজ বাড়ি-ঘর থেকে বিতাড়িত করেছিলেন।

    তাদেরকে উদ্দেশ্য করে তিনি জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ‘আপনারা বলুন! আজ আমি আপনাদের সঙ্গে কিরূপ আচরণ করব?

    তখন তারা উত্তর দিয়েছিল, ‘আপনি আমাদের সম্মানিত ভাই এবং সম্মানিত ভাইয়ের ছেলে।

    এ কথা শুনে বিশ্বনবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঘোষণা করলেন, ‘আজ আর আপনাদের ব্যাপারে কোনো অভিযোগ নেই। আপনার সবাই মুক্ত। বিশ্বনবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এ ভাষণে মক্কার চরম শত্রুরাও তার ভাষণে মুগ্ধ হয়েছিলেন। ভালোবাসার আবেগে আপ্লুত হয়েছিলেন।

    এভাবেই ঘোষিত হয়েছিল পবিত্র নগরীরি ঐতিহাসিক মক্কা বিজয়। যা বিশ্ব মানবতার জন্য এক মহান শিক্ষা।

    আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহকে ঐতিহাসিক মক্কা বিজয়ে বিশ্বনবির গৃহীত সিদ্ধান্ত ও নসিহতগুলো বাস্তবজীবনে পালনের তাওফিক দান করুন।

    আমিন।

  • রমজানে এই ৪টি দোয়া বেশি বেশি পড়ুন

    রমজানে এই ৪টি দোয়া বেশি বেশি পড়ুন

    হযরত সালমান (রা.) থেকে বর্ণিত হাদীসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শাবানের শেষ দিন রমযানের আগমনী খুতবায় ইরশাদ করেন,

    অর্থ: “তোমরা এই মাসে (অর্থাৎ রমযান মাসে) চারটি কাজ বেশি বেশি করতে থাকো। (তন্মধ্য হতে) দুটি কাজ এমন, যেগুলো দ্বারা তোমরা তোমাদের প্রতিপালককে সন্তুষ্ট করবে। আর দুটি কাজ এমন, যা না করে তোমাদের কোন উপায় নেই। প্রথম দুটি কাজ যেগুলো দ্বারা তোমরা তোমাদের প্রতিপালককে সন্তুষ্ট করবে তা হল, অধিক পরিমানে কালিমায়ে তায়্যিবা পড়বে এবং ইস্তেগফার করবে।

    আর যে কাজ দুটি তোমাদের না করে কোন উপায় নেই তা হল, আল্লাহ তাআলার নিকট জান্নাত চাইবে এবং জাহান্নাম হতে মুক্তি চাইবে।” –সহীহ ইবনে খুযাইমা, হাদীস নং ১৮৮৭; বাইহাকী, শুআবুল ঈমান, হাদীস নং ৩৬০৮

    উপরোক্ত হাদীস থেকে বুঝা যায় রমাদান মাসে নিম্নোক্ত ৪টি কাজ বেশি বেশি করতে হবে- ১। অধিক পরিমানে কালিমায়ে তায়্যিবা অর্থাৎ لا إله إلا الله (লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ) পড়া। ২। ইস্তেগফার করা অর্থাৎ আল্লাহ তাআলার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করা। যেমন أَسْتَغْفِرُ الله (আস্তাগফিরুল্লাহ) পড়া।

    সুনানে আবু দাউদ ও তিরমিযীতে বর্ণিত হাদীসে এসেছে, যে ব্যক্তি নিম্নোক্ত ইস্তেগফারটি পড়বে তাকে মাফ করে দেওয়া হবে যদিও সে জিহাদের ময়দান থেকে পলায়ন করে (অর্থাৎ ভয়াবহ কোন গুনাহ করলেও তাকে মাফ করে দেওয়া হবে)। –সুনানে আবূ দাউদ, হাদীস নং ১৫১৯; সুনানে তিরমিজী, হাদীস নং ৩৫৭৭

    ইস্তিগফারটি এই- أَسْتَغْفِرُ الله الَّذِي لاَ إِلَهَ إِلاَّ هُوَ الْحَيُّ الْقَيُّومُ وَأَتُوبُ إِلَيْهِ আস্তাগফিরুল্লাহাল্লাযী লা-ইলাহা ইল্লা হুয়াল হাইয়্যুল কাইয়্যুমু ওয়া আতু-বু ইলাইহি। অর্থ: আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি – যিনি চিরস্থায়ী চিরঞ্জীব, আমি তাঁর কাছেই তওবা করছি।

    ৩। আল্লাহ তাআলার নিকট জান্নাত চাইতে থাকা। আরবীতে এভাবে বলা যায়- اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْئَلُكَ الْجَنَّةَ উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা ইন্নী আসআলুকাল জান্নাহ। অর্থ: হে আল্লাহ আমি আপনার নিকট জান্নাত চাই।

    ৪। আল্লাহ তাআলার নিকট জাহান্নাম থেকে মুক্তি চাওয়া। اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ النَّارِ উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা ইন্নী আউযু বিকা মিনান্নার। অর্থ: হে আল্লাহ আমি আপনার নিকট জাহান্নাম থেকে পানাহ চাই।

    উভয়টি একসাথে এভাবে বলা যায়- اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْئَلُكَ الْجَنَّةَ وَ أَعُوذُ بِكَ مِنَ النَّارِ উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা ইন্নী আসআলুকাল জান্নাতা ওয়া আউযু বিকা মিনান্নার। অর্থ: হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে জান্নাত কামনা করছি এবং জাহান্নাম থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছি। রাব্বুল আলামিন আমাদেরকে তাঁর সন্তুষ্টি ইবাদতের সাথে রমাদানের প্রতিটি মুহূর্ত কাটানোর তাওফিক দান করুন। আমীন।

  • তাহাজ্জুদ নামায কত রাকাত এবং কীভাবে নিয়ত করতে হয় জেনেনিন

    তাহাজ্জুদ নামায কত রাকাত এবং কীভাবে নিয়ত করতে হয় জেনেনিন

    আসসালামু আলাইকুম। তাহাজ্জুদ নামাযের নূন্যতম রাকাত সংখ্যা কত? দুই বা চার রাকাত পড়লে কি তাহাজ্জুদ নামায হিসেবে গণ্য হবে? এই নামাযের নিয়ত চার রাকাত নামাযের নিয়তের মত নাকি দুই রাকাত নামাযের নিয়তের মত করতে হবে ?

    আবু সালামা ইবনে আব্দুর রহমান (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি হযরত আয়েশা (রা.) কে জিজ্ঞাসা করেন যে, রমযানে নবীজীর নামায কেমন হত? তিনি উত্তরে বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) রমযানে এবং রমযানের বাইরে এগারো রাকাতের বেশি পড়তেন না।

    প্রথমে চার রাকাত পড়তেন, যার সৌন্দর্য ও দীর্ঘতা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করো না! এরপর আরও চার রাকাত পড়তেন, যার সৌন্দর্য ও দীর্ঘতা তো বলাই বাহুল্য! এরপর তিন রাকাত (বিতর) পড়তেন। -সহীহ বুখারী ১/১৫৪, হাদীস ১১৪৭; সহীহ মুসলিম ১/২৫৪, হাদীস ৭৩৮; সুনানে নাসায়ী ১/২৪৮, হাদীস ১৬৯৭; সুনানে আবু দাউদ ১/১৮৯, হাদীস ১৩৩৫; মুসনাদে আহমদ ৬/৩৬, হাদীস ২৪০৭৩

    আব্দুল্লাহ ইবনে আবী কাইস বলেন, قلت لعائشة : بكم كان رسول الله صلى الله عليه وسلم يوتر؟ قالت: كان يوتر بأربع وثلاث, وست وثلاث, وثمان وثلاث, وعشر وثلاث, ولم يكن يوتر بأنقص من سبع, ولا بأكثر من ثلاث عشرة.

    অর্থাৎ, আমি হযরত আয়েশা রা.-এর কাছে জিজ্ঞাসা করলাম যে, নবীজী বিতরে কত রাকাত পড়তেন? উত্তরে তিনি বলেন, চার এবং তিন, ছয় এবং তিন, আট এবং তিন, দশ এবং তিন। তিনি বিতরে সাত রাকাতের কম এবং তেরো রাকাতের অধিক পড়তেন না। -সুনানে আবু দাউদ ১/১৯৩, হাদীস ১৩৫৭ (১৩৬২); তহাবী শরীফ ১/১৩৯; মুসনাদে আহমদ ৬/১৪৯, হাদীস ২৫১৫৯

    উল্লেখিত বর্ণনা দ্বারা বুঝা গেল রাসূলুল্লাহ (সা.) কখনো তাহাজ্জুদ নামায চার রাকাত পড়তেন, কখনো ছয় রাকাত পড়তেন। কখনো আট রাকাত পড়তেন। কখনো দশ রাকাত পড়তেন।

    সুতরাং তাহাজ্জুদের নামায ১০ রাকাত পর্যন্ত পড়া রাসূলুল্লাহ (সা.) থেকে আমরা সহীহ হাদীসে পাই। এর চে’ বেশি পড়া যাবে না, এমন নয়। যেহেতু এটি নফল নামায তাই যতো বেশি পড়া যায় ততোই সওয়াব। তাই ইচ্ছেমত পড়া যায়।

    সেই সাথে চার রাকাতের কম পড়লে তা তাহাজ্জুদ হবে না, বিষয়টি এমনও নয়। তাই দুই রাকাত পড়লেও তা তাহাজ্জুদ নামায হিসেবেই গণ্য হবে। সময় কম থাকলে দুই রাকাত পড়ে নিলেও তাহাজ্জুদ নামায পড়া হয়েছে বলে ধর্তব্য হবে।

    রাতের এবং দিনের নফল নামাযের নিয়ত চার রাকাত করেও নিয়ত করা যায়, এমনিভাবে দুই রাকাত করেও নিয়ত করা যায়। কোন সমস্যা নেই।

    তাই আপনি তাহাজ্জুদ নামাযের নিয়ত চাইলে ২ রাকাতের নিয়ত করে ২ রাকাত ২ রাকাত করে পড়তে পারেন। অথবা ৪ রাকাত ৪ রাকাত নিয়ত করে ৪ রাকাত করে পড়তে পারেন। -ফাতওয়ায়ে শামী-২/৪৫৫; তাবয়ীনুল হাকায়েক-১/১৭২; আল বাহরুর রায়েক-২/৫৩; ফাতওয়ায়ে মাহমুদিয়া-১১/২৮৭

    উত্তর প্রদান করেছেন- মুফতী লুৎফুর রহমান ফরায়েজী, পরিচালক-তালীমুল ইসলাম ইনষ্টিটিউট এন্ড রিসার্চ সেন্টার ঢাকা।

  • আগামী ৫ জুন পবিত্র ঈদুল ফিতর!

    আগামী ৫ জুন পবিত্র ঈদুল ফিতর!

    অনলাইন ডেস্ক : আগামী ৪ জুন মঙ্গলবার সন্ধ্যায় শাওয়াল মাসের চাঁদ দেখার সম্ভাবনা আছে এবং পরদিন ৫ জুন বুধবার পবিত্র ঈদ-উল-ফিতর পালিত হবে।

    আজ মঙ্গলবার বাংলাদেশ অ্যাসট্রোনোমিক্যাল সোসাইটির (বিএএস) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানা যায়, আগামী ৩ জুন সোমবার বিকাল ৪টা ২ মিনিটে বর্তমান চাঁদের অমাবস্যা কলা পূর্ণ করে নতুন চাঁদের জন্ম হবে। চাঁদটি ওইদিন সন্ধ্যা ৬টা ৪২ মিনিটে সূর্যাস্তের সময় দিগন্ত রেখা হতে ১ ডিগ্রি নিচে ২৯২ ডিগ্রি দিগংশে অবস্থান করবে। তাই এদিন চাঁদের কোনো অংশই দেশের আকাশে দেখা যাবে না।

    চাঁদটি পরদিন ৪ জুন, মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৬টা ৪২ মিনিটে সূর্যাস্তের সময় দিগন্ত রেখা থেকে ১১ ডিগ্রি উপরে ২৮৯ ডিগ্রি দিগংশে অবস্থান করবে এবং ৫৮ মিনিট দেশের আকাশে অবস্থান শেষে সন্ধ্যা ৭টা ৪১ মিনিটে ২৯৪ ডিগ্রি দিগংশে অস্ত যাবে।

    এই সময় চাঁদের ১% অংশ আলোকিত থাকবে এবং দেশের আকাশ মেঘমুক্ত পরিষ্কার থাকলে একে বেশ স্পষ্টভাবেই দেখা যাবে। এই সন্ধ্যায় উদিত চাঁদের বয়স হবে ২৬ ঘণ্টা ৪০ মিনিট এবং সবচেয়ে ভালোভাবে দেখা যাবে সন্ধ্যা ৭টা ৮ মিনিটে।

    সুতরাং, ইসলামী নিয়ম অনুযায়ী আগামী ৪ জুন সন্ধ্যায় নতুন চাঁদ দেখার সাপেক্ষে আগামী ৫ জুন ২০১৯, বুধবার থেকে আরবি ১৪৪০ হিজরির ‘শাওয়াল’ মাসের গণনা শুরু হবে এবং ওই দিনই পবিত্র ঈদ-উল-ফিতর পালিত হবে।