Category: প্রচ্ছদ

  • আজ ঐতিহাসিক ৭ মার্চ

    আজ ঐতিহাসিক ৭ মার্চ

    সফেন আব্দুল্লাহঃ

    ঐতিহাসিক ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সেই ভাষণের মধ্য দিয়ে মুক্তির সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলো বাঙালি জাতি।
    ১৯৭১ সালের এই দিনে মাত্র ১৮ মিনিটের ভাষণে সাড়ে সাত কোটি মুক্তিকামী বাঙালির জন্য বঙ্গবন্ধু রচনা করেন জাতির মুক্তির ইতিহাস। দেন স্বাধীনতার প্রস্তুতির ঘোষণা সেখানেই মেলে জনতার উত্তাল সাড়া। শুরু হয় পাকিস্তানি শোষকদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী শ্লোগান।

    পরাধীনতা ভেঙে নিজেদের সার্বভৌম আত্মপরিচয়ের ঘোষণা- স্বাধীনতা। একটি নিরস্ত্র জাতিকে স্বাধীনতার চেতনায় জাগিয়ে তোলার এমন ভাষণ ইতিহাসে বিরল, তাই যতদিন মুক্তির সংগ্রাম থাকবে, ততদিন ৭ মার্চের ভাষণটি হয়ে থাকবে মুক্তিকামী মানুষের পথনির্দেশক। বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণকে ২০১৭ সালের ৩১ অক্টোবর ‘মেমরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড’ বা ‘বিশ্বের স্মৃতি’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয় ইউনেস্কো।

  • ৬ মার্চ সভা-সমাবেশ মিছিলে উত্তাল ছিল সারা দেশ

    ৬ মার্চ সভা-সমাবেশ মিছিলে উত্তাল ছিল সারা দেশ

    আজ ৬ মার্চ। ১৯৭১ সালের আজকের দিনে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান (আজকের বাংলাদেশ) সভা-সমাবেশ-মিছিলে উত্তাল ছিল। ষষ্ঠদিনের মতো হরতাল পালনকালে ঢাকার সর্বস্তরের জনতা রাস্তায় নেমে আসে।

    এদিন মহিলা আওয়ামী লীগের আয়োজনে নারীরা বিশাল মিছিল বের করেন। অলি আহাদের নেতৃত্বে পল্টনে জনসভা এবং মোজাফফর আহমেদের সভাপতিত্বে গণসমাবেশ হয়। শিল্পী, লেখক, সাংবাদিক, গণশিল্পীরা সভা-সমাবেশ ও মিছিলে শামিল হন। অসহযোগ চলতে থাকে পুরোদমে।

    বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে শান্তিপূর্ণ হরতাল পালন শেষে তারই নির্দেশে বেলা আড়াইটা থেকে বিকাল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত বিভিন্ন ব্যাংক এবং যেসব বেসরকারি অফিসে ইতঃপূর্বে বেতন দেয়া হয়নি- সেগুলো বেতন দেয়ার জন্য খোলা থাকে।

    বেলা ১১টার দিকে সেন্ট্রাল জেলের গেট ভেঙে ৩৪১ জন কয়েদি পালিয়ে যান। পালানোর সময় পুলিশের গুলিতে ৭ জন নিহত এবং ৩০ জন আহত হন। পাক প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান দুপুরে এক বেতার ভাষণে ২৫ মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করেন।

    ভাষণে তিনি বলেন, ‘যা-ই ঘটুক না কেন, যতদিন পর্যন্ত পাকিস্তান সেনাবাহিনী আমার হুকুমে রয়েছে এবং আমি পাকিস্তানের রাষ্ট্রপ্রধান রয়েছি, ততদিন আমি পূর্ণাঙ্গ ও নিরঙ্কুশভাবে পাকিস্তানের সংহতির নিশ্চয়তা বিধান করব।’

    প্রেসিডেন্টের বেতার ভাষণের পরেই বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক শাখার ওয়ার্কিং কমিটির জরুরি বৈঠক হয়। কয়েক ঘণ্টা স্থায়ী এ বৈঠকে প্রেসিডেন্টের বেতার ভাষণের আলোকে দেশের সর্বশেষ রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।

    ইয়াহিয়া খানের বেতার ভাষণের পরপরই ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জে স্বতঃস্ফূর্তভাবে প্রতিবাদ মিছিল হয়। রাওয়ালপিন্ডিতে পিপলস পার্টির চেয়ারম্যান জুলফিকার আলী ভুট্টো প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার ভাষণকে স্বাগত জানিয়ে সংবাদ সম্মেলনে জানান, তার দল ২৫ মার্চ জাতীয় পরিষদের উদ্বোধনী অধিবেশনের আগেই আলোচনার মাধ্যমে শাসনতন্ত্রের মোটামুটি একটি কাঠামো স্থির করতে চায়।

    লাহোরে কাউন্সিল মুসলিম লীগ নেতা এয়ার মার্শাল নূর খান এক সাক্ষাৎকারে বলেন, শেখ মুজিবুর রহমানের দেশ শাসনের বৈধ অধিকার রয়েছে। ক্ষমতা হস্তান্তরের সব বাধা অবিলম্বে দূর করতে হবে। প্রেসিডেন্টের বেতার ভাষণে পরিস্থিতি অবনতির জন্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ওপর দোষারোপ করায় নূর খান দুঃখ প্রকাশ করেন।

    পেশোয়ারে পাকিস্তান মুসলিম লীগ প্রধান খান আবদুল কাইয়ুম খান ২৫ মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন আহ্বানের সিদ্ধান্তকে অভিনন্দিত করে বিবৃতিতে বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।’

    ইয়াহিয়া খানের ঘোষণাকে স্বাগত জানান পিডিপি প্রধান নবাবজাদা নসরুল্লাহ খান ও কাউন্সিল মুসলিম লীগ প্রধান মিয়া মমতাজ। এদিন ছাত্রলীগ ও ডাকসু নেতারা এক বিবৃতিতে ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দান থেকে সরাসরি বঙ্গবন্ধুর ভাষণ বাংলাদেশের সব বেতার কেন্দ্র থেকে রিলে করার দাবি জানান।

  • স্বাধীনতা সংগ্রামের বীজমন্ত্র বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ

    স্বাধীনতা সংগ্রামের বীজমন্ত্র বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ

    বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চ দেয়া ঐতিহাসিক ভাষণ শুধুমাত্র রাজনৈতিক দলিলই নয়, জাতির সাংস্কৃতিক পরিচয় বিধানের একটি সম্ভাবনা তৈরি করেছিল এই ভাষণ।

    অন্যদিকে এই ভাষণটি তথাকথিত পরিশীলিত বাচন ভঙ্গিতে না গিয়ে গ্রামীণ সাধারণ মানুষের ভাষা থাকায় গোটা দেশের মানুষকে আপ্লুত এবং মুক্তির সংগ্রামে উদ্বুদ্ধ করেছিল। ফলে এই ভাষণ

    স্বাধীনতা সংগ্রামের বীজমন্ত্র হয়ে পড়ে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণ নিয়ে এরকম মন্তব্য করেছেন দেশের সাংস্কৃতিক-নাট্য এবং ভাষা বিশেষজ্ঞরা।

    বাংলা একাডেমীর সাবেক মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান বলেছেন, বঙ্গবন্ধু ’৭১-এর ৭ মার্চ যে ভাষণ দিয়েছিলেন ইতিহাসে তার তুলনা খুঁজে পাওয়া যায় না। আব্রাহাম লিংকনের ‘গেটিসবার্গ এড্রেস’ বা দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় চার্চিলের ভাষণসহ অন্য কোন ভাষণের সঙ্গে এ ভাষণের তুলনা চলে না।

    এই দেশের মাটি মানুষ নিঃস্বর্গ প্রকৃতি এবং জীবনধারায় বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এই ভাষণটি মনে হয় যেন বঙ্গবন্ধু জীবনব্যাপী সাধনায় ধীরে ধীরে ধাপে ধাপে ভাষণটি প্রস্তুত করে নিয়েছিলেন। এমনো মনে হয়, বাঙালির হাজার বছরের দুঃখ-বেদনা, বঞ্চনা এবং ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে দূরে থাকার ইতিহাস, কৃষক, কৈবর্ত, উপজাতিদের বিদ্রোহ প্রভৃতির বারুদ ঠাঁসা উপাদানে তাঁর সচেতন এবং অবচেতন মনে এই ভাষণটি তৈরি হয়ে প্রকাশের জন্য উন্মুখ হয়েছিল।

    ৭ মার্চ কি এক অলৌকিক মুহূর্তে সেই ভাষণটি অমন অসাধারণ ভাষা, ভঙ্গি ও আঙ্গিকগত স্বতন্ত্রে বাঙ্গময়তার সঙ্গে প্রকাশিত হলো, যা মনে হয় যেন এক ঐশ্বরিক ক্ষমতার স্পর্শে উচ্চকিত ভাষণ। যে ভাষণ মানুষকে তার মর্মমূল থেকে গভীরভাবে উদ্দীপ্ত এবং জাগ্রত করে তুলেছিল।

    এতে করে এই ভাষণের পরতে পরতে যুক্ত হয়ে থাকা দ্রোহের বাণী মানুষকে স্বাধীনতা সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়তে, এমনকি প্রয়োজনে লড়াকু মুক্তিযোদ্ধার ভূমিকায় উত্তীর্ণ করে তোলে। এই জন্যই বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ বাঙালির স্বাধীনতার বীজমন্ত্র, মুক্তিযুদ্ধের অর্নিশেষ প্রেরণা এবং বাঙালির হাজার বছরের স্বাধীনতার স্বপ্ন বাস্তবায়নের এক শক্তিশালী হাতিয়ার।

    একুশে পদকপ্রাপ্ত বিশিষ্ট নাট্য ব্যক্তিত্ব নাসির উদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণকে আধুনিক ইতিহাসের একটি অনন্য রাজনৈতিক দিক-নির্দেশনা এবং আন্দোলনের দলিল হিসেবে অভিহিত করে বলেছেন, এতে ভাষাগত যে উৎকর্ষ আছে তা রীতিমত বিষ্ময়কর।

    তিনি বলেন, কলকাতা কেন্দ্রিক ভাষার বাক্য প্রকরণ রীতির বিপরীতে পদ্মা পাড়ের ভাষা ও বাক্য প্রকরণ রীতির উন্মেষ ঘটেছিল এই ভাষণের মধ্যে। এতে করে যে ঘটনাটি ঘটেছে তা হচ্ছে-বাংলা ভাষা একটি সুনির্দিষ্ট দিকে বাঁক নেয়, যা পোশাকী ভাষার বিপরীতে ভাটি বাংলার মৃত্তিকা সংলগ্ন ভাষা।

    এ কারণে এটি শুধু রাজনৈতিক দলিল নয়, একটি সাংস্কৃতিক পরিচয় বিধানের সম্ভাবনা তৈরি করেছিল এই ভাষণ।

    তিনি বলেন, ভাটি বাংলার খরস্রোতা নদী এবং বঙ্গোপসাগরের উত্তাল ধ্বনি এবং ভঙ্গি এই ভাষণের মধ্য দিয়ে জাতির সামনে উপস্থাপিত হয়েছিল। যার কারণে সারাদেশের মানুষ মন্ত্রমুগ্ধের মত এই ভাষণ শুনেছে-যার জন্য তাদের অপেক্ষা করতে হয়েছে যুগ যুগ ধরে।

    তিনি বলেন, সেদিনের ভাষণ পাঠ করলে বিভিন্নভাবেই স্বাধীনতার মর্মার্থ অনুধাবন করা যায়। ভাষণে বঙ্গবন্ধু যে শব্দগুলো ব্যবহার করেছিলেন সেগুলো ছিল একটি চূড়ান্ত লড়াইয়ের নির্দেশ।

    ভাষণে সবকিছুকে ছাড়িয়ে বঙ্গবন্ধু বললেন, ‘এবারের সংগ্রাম, মুক্তির সংগ্রাম। এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ এর পরেই অকুতোভয় বাঙালি এবং সর্বস্তরের মানুষ ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন মুক্তির চূড়ান্ত লড়াইয়ে।

    ঐক্যবদ্ধ মানুষের শক্তি কত যে প্রচ- হতে পারে তা দখলদার বাহিনী তো বটেই সারাবিশ্বের মানুষও দেখেছিলেন অবাক বিষ্ময়ে।

    বিশিষ্ট জনেরা মনে করেন, বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ সবাইর মধ্যে সচেতনতা এবং প্রেরণা সৃষ্টি করেছিল। আর সে কারণে মানুষ নির্দ্বিধায় প্রাণ বিসর্জন দিতে পেরেছিলেন। বঙ্গবন্ধুর দৃপ্ত কণ্ঠে যে বজ্র বাণী সেদিন উচ্চারিত হয়েছিল সেটিই ছিল আমাদের স্বাধীনতার ঘোষণা।
    সূত্র : বাসস

  • বরিশালে ঐতিহাসিক ৭ই মর্চ বঙ্গবন্ধুর ভাষন ও জন্মশত বার্ষিকী উপলক্ষে বিভিন্ন কর্মসূচি

    বরিশালে ঐতিহাসিক ৭ই মর্চ বঙ্গবন্ধুর ভাষন ও জন্মশত বার্ষিকী উপলক্ষে বিভিন্ন কর্মসূচি

    বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী ও স্বাধীনতার সুবর্নজয়ন্তী উপলক্ষে ব্যতিক্রমী নানা কর্মসূচীর আয়োজন করেছে বরিশাল সিটি করপোরেশন (বিসিসি)। স্থানীয় আওয়ামীলীগ, বঙ্গবন্ধু সংস্কৃতিক জোট ও চারুকলা’র সহযোগীতায় এ কর্মসুচীগুলো বাস্তবায়ন করা হবে।

    সিটি মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহ শনিবার দুপুরে তার বাসভবনে সাংবাদিক সম্মেলন করে এ তথ্য জানান।

    তিনি জানান, ৭ মার্চ নগর ভবনে জাতীয় পতাকা উত্তোলনের মাধ্যমে কর্মসুচী শুরু হবে। ৩১ মার্চ সন্ধ্যায় নগরীর বঙ্গবন্ধু উদ্যানে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে কর্মসূচীর শেষ হবে।

    এছাড়া উল্লেখযোগ্য কর্মসূচী হচ্ছে- ৭ মার্চ বিকাল ৩টা ২০ মিনিটে একযোগে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষন প্রচার, ১৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে সাইকেল যাত্রা, ২৫ মার্চ ওয়াপদা কলোনী টর্চার সেলে গণহত্যা বিষয়ক চিত্র প্রদর্শনী।

    এছাড়া সবচেয়ে ব্যতিক্রমি আয়োজন করা হয়েছে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীর লোগো’র মানবপ্রদর্শনী। ৩০ মার্চ বিকালে বঙ্গবন্ধু উদ্যানে এ প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হবে।

    সিটি মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহ এ প্রসঙ্গে বলেন, লোগো প্রদর্শনীটি হবে দেশের সর্ববৃহৎ মানব প্রদর্শনী।

    তিনি আরও বলেন, কৃষক নেতা শহীদ আবদুর রব সেরনিয়াবাতের জন্মশতবার্ষিকী ২৮ মার্চ।

    ওইদিন পবিত্র শবেবরাত থাকায় আগেরদিন ২৭ মার্চ জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন করা হবে। সেদিন কীর্তণখোলা নদীতে অনুষ্ঠিত হবে নৌকা বাইচ প্রতিযোগীতা।

    বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী ও স্বাধীনতার সুবর্নজয়ন্তী উপলক্ষে ২৪ দিনব্যাপী কর্মসূচীতে উল্লেখিত কর্মসূচী ছাড়াও বিভিন্ন সময়ে অনুষ্ঠিত হবে প্রতিকৃতিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন, শিশুদের চিত্রাকংন প্রতিযোগীতা, গণহত্যা বিষয়ক চিত্র প্রদর্শনী, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।

     

    কর্মসূচী ঘোষনার সময় উপস্থিত ছিলেন জেলা আওয়ামীলীগের সাধারন সম্পাদক তালুকদার মো. ইউনুস, মহানগর আওয়ামীলীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট একেএম জাহাঙ্গীর,সিটি করপোরেশনের প্যানেল মেয়র- ১ গাজী নঈমুল ইসলাম লিটু, প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ফারুক আহম্মেদ প্রমুখ।

  • এইচ টি ইমামের বর্ণাঢ্য কর্মময় জীবন

    এইচ টি ইমামের বর্ণাঢ্য কর্মময় জীবন

    না ফেরার দেশে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম। বুধবার দিনগত রাতে (সিএমএইচ)হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।

    দেশের প্রথম মন্ত্রিপরিষদ সচিব এইচ টি ইমামের বয়স হয়েছিল ৮২ বছর। এইচ টি ইমামের জন্ম ১৯৩৯ সালের ১৫ জানুয়ারি টাঙ্গাইল শহরে। পিতা তাফসির উদ্দীন আহমেদ বি.এ. বি.এল. ও মাতা তাহসিন খাতুন। পুরো নাম হোসেন তৌফিক হলেও পরে তিনি এইচ টি ইমাম নামেই পরিচিতি ছিলেন।

    বাবার চাকুরির যোগ সূত্রে শৈশবে রাজশাহীতে অবস্থান এবং রাজশাহীতেই প্রাথমিক শিক্ষা। পরবর্তীকালে লেখাপড়া করেছেন পশ্চিমবঙ্গের বাঁকুড়া ও কলকাতায়। ঢাকা কলেজিয়েট স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস করেন এইচ টি ইমাম। আর ইন্টারমিডিয়েট পাস করেন পাবনা এডওয়ার্ড কলেজ থেকে। এরপরর রাজশাহী কলেজ থেকে বিএ ডিগ্রি নিয়ে তিনি ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে, অর্থনীতিতে এমএ ডিগ্রি নেন। তখন তিনি বাম ছাত্র সংগঠনে যুক্ত ছিলেন।

    এরপর তিনি, পাকিস্তানে সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় অংশ গ্রহণ করেন। ১৯৬১ ব্যাচের সিএসপিদের মধ্যে তিনি ৪র্থ স্থান লাভ করেন এবং পাকিস্তান সরকারের উচ্চ পদে যোগদান করেন। ১৯৬৮ সালে তিনি লন্ডন স্কুল অব ইকনমিক্স থেকে‘উন্নয়ন প্রশাসনে’পোস্ট গ্রাজুয়েট ডিপ্লোমা করেন।

    শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে সাড়া দিয়ে ১৯৭১ সালে পাকিস্তান সিভিল সার্ভিসের লোভনীয় চাকরিতে ইস্তফা দিয়ে দেশের পক্ষে কাজ করেন এবং প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম মন্ত্রিপরিষদ সচিবও হন তিনি।

    স্বাধীনতার পর ১৯৭৫ সালের ২৬ অগাস্ট পর্যন্ত তিনি মন্ত্রিপরিষদের সচিবের দায়িত্বে ছিলেন। এরপর ১৯৭৮ থেকে ১৯৮৪ পর্যন্ত সাভারের লোকপ্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৪ থেকে ১৯৮৬ পর্যন্ত তিনি সড়ক এবং যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের সচিব-এর দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৬ থেকে ১৯৮৭ পর্যন্ত পরিকল্পনা সচিবের পদে নিযুক্ত ছিলেন। তিনি পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়া যমুনা মাল্টিপারপাজ ব্রিজ অথরিটির এক্সিকিউটিভ ডাইরেক্টর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

    অবসর নেওয়ার পর আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সক্রিয় হন এইচ টি ইমাম। তিনি আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির একজন গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তা ছিলেন। দলের নির্বাচন পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন তিনি। আওয়ামী লীগের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির কো-চেয়ারম্যানও ছিলেন তিনি, যে কমিটির চেয়ারম্যান শেখ হাসিনা।

    ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় যাওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাকে উপদেষ্টার দায়িত্ব দেন। প্রথমে তিনি জনপ্রশাসনবিষয়ক উপদেষ্টা ছিলেন। ২০১৪ সালে তাকে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা নিয়োগ করা হয়।

    এইচ টি ইমাম নিজে নির্বাচনে না দাঁড়ালেও তার ছেলে তানভীর ইমাম সিরাজগঞ্জ-৪ আসনের আওয়ামী লীগ দলীয় সংসদ সদস্য

  • বরেণ্য শিক্ষাবিদ প্রফেসর মোঃ হানিফ আর নেই

    বরেণ্য শিক্ষাবিদ প্রফেসর মোঃ হানিফ আর নেই

    বরেণ্য শিক্ষাবিদ ও সরকারি ব্রজমোহন কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ প্রফেসর মোঃ হানিফ মারা গেছেন। (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না লিল্লাহি রাজিউন)। সোমবার (০১ মার্চ) দিবাগত রাত সোয়া দশটায় রাজধানীর ইবনেসিনা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। মৃত‌্যুকা‌লে তার বয়স হ‌য়ে‌ছি‌ল ৯০ বছর। বিষয়টি নিশ্চত করেছেন আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর কবির নানক। বেশ কিছুদিন ধরে বাধ্যক্যজনিত কারনে অসুস্থ ছিলেন তিনি।

    সরকারি ব্রজমোহন কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ স.ম ইমানুল হাকিম বলেন, দক্ষিণাঞ্চলে শিক্ষা বিস্তারে প্রফেসর মোঃ হানিফ নামটি শ্রদ্ধার সাথে উচ্চারিত হয়। শুধু শিক্ষা নয়, সামাজিক, সাংস্কৃতিক দিকেও তার অবদান অনস্বীকার্য। বিশেষ করে ১৯৮৯ সাল থে‌কে ১৯৯৩ পর্যন্ত হা‌নিফ স‌্যার ব্রজমোহন কলে‌জের অধ‌্যক্ষ থাকাকালীন সময়ে ক‌লে‌জের উন্নয়‌নে ভূয়সী ভূ‌মিকা রা‌খেন। তিনি বিএম কলেজের উন্নয়নের রূপকার।

    বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারি রেজিস্ট্রার বাহাউদ্দিন গোলাপ বলেন, প্রফেসর মোঃ হানিফ স্যারের মৃত্যু আমাদের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি। বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় স্যারের ভূমিকা ছিল অগ্রগন্য।

    সরকারি ব্রজমোহন কলেজের শিক্ষক পরিষদের সাধারণ সম্পাদক আলা‌মিন স‌রোয়ার বলেন, স্যার বার্ধক্যজনিত কারনে মৃত্যুবরণ করেছেন। কিন্তু তিনি তার কর্মের মধ্য দিয়ে আমাদের মাঝে রয়ে যাবেন। জীবদ্দশায় তিনি প্রত্যেকটি কাজে ছিলেন অনুকরণীয়। তার আদর্শ আমাদের পথ দেখাবে।

    প্রসঙ্গত, বরিশাল শিক্ষা বোর্ড প্রতিষ্ঠায় উল্লেখযোগ্য অবদান ছিল প্রফেসর মোঃ হানিফের। এছাড়াও তিনি যশোর শিক্ষা বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান, সরকারি ব্রজমোহন কলেজ ও সরকারি সৈয়দ হাতেম আলী কলেজ, ইসলামিয়া কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ, বরিশাল মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ও বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক সিনেট সদস্য, গ্লোবাল ইউনিভার্সিটির প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি।

    বর‌ন্যে এই শিক্ষা‌বিদের মৃত‌্যু‌র খবরে হাসপাতালে ছুটে যান আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর কবির নানক, ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের সাবেক অধ্যক্ষ প্রফেসর জিয়াউল হক। শোক জানিয়েছেন ব‌রিশাল জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগ, ওয়ার্কার্স পা‌র্টির সভাপ‌তি রা‌শেদ খান মেনন এম‌পি, ব‌রিশাল সি‌টি ক‌র্পো‌রেশ‌নের মেয়র সের‌নিয়াবাত সা‌দিক আব্দুল্লাহ, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি, ব‌রিশাল প্রেসক্লাব, ব‌রিশাল রিপোর্টার্স ইউ‌নি‌টি, ব‌রিশাল ই‌লেক্ট্রনিক্স মি‌ডিয়া জার্না‌লিস্ট অ‌্যা‌সো‌সি‌য়েশন, ব‌রিশাল টে‌লিভিশন মি‌ডিয়া অ‌্যা‌সো‌সি‌য়েশন, ন‌্যাশনাল ডেই‌লিজ ব‌্যু‌রো চীফ আ‌্যা‌সো‌সি‌য়েশন, সাংস্কৃতিক সংগঠন উত্তরণসহ সামাজিক, সাংস্কৃতি ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন।

  • বরিশালে মার্চ মাসের কর্মসূচি সফল করার লক্ষে প্রস্তুতি সভা

    বরিশালে মার্চ মাসের কর্মসূচি সফল করার লক্ষে প্রস্তুতি সভা

    গতকাল বরিশাল কালিবাড়ি রোডস্থ বিসিসি মেয়রের বাসভবনে ৭ই মার্চ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ভাষন,১৭ই মার্চ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মবার্ষিকী, ২৬শে মার্চ স্বাধীনতা দিবসের কর্মসূচি ও ২৮শে মার্চ দক্ষিনবঙ্গের আওয়ামীলীগ রাজনীতির অভিভাবক আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহর পিতা ও বরিশাল সিটি কর্পোরেশন মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহ এর দাদা শহিদ আঃ রব সেরনিয়াবাত এর শততম জন্মবার্ষিকীর কর্মসূচি সফল করার লক্ষে মহানগর ও জেলা আওয়ামীলীগ এর এক প্রস্তুতিসভা অনুষ্ঠিত হয়।

    সভায় উপস্থিত ছিলেন,বরিশাল সিটি কর্পোরেশন এর জনপ্রিয় মেয়র ও মহানগর আওয়ামীলীগ এর সাধারন সম্পাদক সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহ সহ জেলা আওয়ামীলীগ এর সাধারন সম্পাদক এ্যডঃতালূকদার মোঃ ইউনুস,মহানগর আওয়ামীলীগ এর সভাপতি এ্যাডঃ একেএম জাহাঙ্গীর সহ বরিশাল জেলা ও মহানগর আওয়ামীলীগ এর সিনিয়র নেতৃবৃন্দ সহ মহানগর এর ৩০ টি ওয়ার্ড কমিটির সভাপতি ও সাধারন সম্পাদক সহ সহযোগী সংগঠনের নেতৃবৃন্দ,

  • বরিশালে আওয়ামীলীগের আনন্দ মিছিল

    বরিশালে আওয়ামীলীগের আনন্দ মিছিল

    বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের মর্যাদা লাভ করায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে অভিনন্দন জানিয়ে বরিশালে আনন্দ মিছিল ও মিষ্টি বিতরণ করা হয়েছে।

    রবিবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে বরিশাল মহানগর আওয়ামী লীগের উদ্যোগে এ কর্মসূচি পালন করা হয়। এসময় দলীয় নেতাকর্মী এবং সমর্থকদের অংশগ্রহণে আনন্দ মিছিলটি জনস্রতে পরিনত হয়।

    রবিবার সন্ধ্যায় সদর রোডস্থ শহীদ সোহেল চত্ত্বরে দলীয় কার্যালয়ের সামনে থেকে মহানগর আওয়ামী লীগের উদ্যোগে আনন্দ মিছিল বের করা হয়। মিছিলটির নেতৃত্ব দেন বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ও মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহ।

    এসময় অন্যান্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন বরিশাল মহানগর আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি ও বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের প্যানেল মেয়র গাজী নঈমুল হোসেন লিটু, প্যানেল মেয়র রফিকুল ইসলাম খোকন, আওয়ামী লীগ নেতা আনোয়ার হোসাইন, গোলাম সরোয়ার রাজিব, শিল্প ও বানিজ্য বিষয়ক সম্পাদক নিরব হোসেন টুটুল, মহানগর শ্রমিক লীগের সাধারণ সম্পাদক পরিমল চন্দ্র দাস,

    বরিশাল জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি হেমায়েত উদ্দিন সুমন সেরনিয়াবাতসহ মহানগরীর ৩০টি ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি-সম্পাদক, ওয়ার্ড কাউন্সিলর, বিভিন্ন উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান, পৌর মেয়রসহ আওয়ামী লীগ ও সঙ্গ সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।

     

    এর আগে দলীয় কার্যালয় থেকে বের হওয়া মিছিলটি সদর রোড, লাইন রোড, চকবাজার এবং ফজলুল হক এভিনিউ সড়ক প্রদক্ষিণ করে পুনরায় দলীয় কার্যালয়ের সামনে এসে শেষ হয়।

    এসময় মিছিলের অগ্রভাগে ছিলেন বিসিসি মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহ। এর আগে নগরীর বিভিন্ন ওয়ার্ড এবং জেলার বিভিন্ন উপজেলা ও পৌরসভার নেতাকর্মীরা খন্ড খন্ড মিছিল সহকারে দলীয় কার্যালয়ের সামনে এসে জড়ো হয়।

    উল্লেখ্য, গত ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২১ জাতিসংঘের ‘কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি (পিসিপি) এর ত্রি-বার্ষিক মূল্যায়নের পর এলডিসি থেকে উত্তরণের চূড়ান্ত সুপারিশ লাভ করে বাংলাদেশ।

    সিডিপি তিনটি সূচকের ভিত্তিতে এলডিসি দেশ থেকে উত্তরণের বিষয়টি পর্যালোচনা করে। আর বাংলাদেশ তিনটি সূচকেই শর্ত পূরণ করে এগিয়ে যাওয়ায় জাতিসংঘের সিডিপি এ সিদ্ধন্ত গ্রহণ করে।

  • বাঙ্গালী জাতির সর্বশ্রেষ্ঠ উপাধির নাম ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি লাভের ৫২ বছর পূর্তি আজ

    বাঙ্গালী জাতির সর্বশ্রেষ্ঠ উপাধির নাম ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি লাভের ৫২ বছর পূর্তি আজ

    আজ ২৩ ফেব্রুয়ারী বাঙ্গালী জাতির সর্বশ্রেষ্ঠ উপাধির নাম ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি লাভের ৫২ বছর পূর্তির দিন।

    ২৩ ফেব্রুয়ারি হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙ্গালী বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে “বঙ্গবন্ধু” উপাধি দেওয়া হয়।

    ১৯৬৯ সালের এই দিনে সে সময়ের রেসকোর্স ময়দানে “বঙ্গবন্ধু” উপাধিতে ভূষিত করেন তার ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সহচর তোফায়েল আহমেদ।

  • বাঙালির সংগ্রামী নেতা মুজিব

    বাঙালির সংগ্রামী নেতা মুজিব

    ১৯৬৬ সালের ৫ই ফেব্রুয়ারি লাহোরে আমার বাবা শেখ মুজিবুর রহমান ঐতিহাসিক ৬-দফা দাবি পেশ করেন। ঢাকায় ফিরে ৬-দফার সমর্থনে জনমত তৈরি করতে সারা দেশে তিনি সভা-সমাবেশ করা শুরু করেন। অল্প সময়ের মধ্যে ৬-দফার পক্ষে ব্যাপক গণজোয়ার সৃষ্টি হয়। স্বৈরশাসক আইয়ুব খান ভীত হয়ে পড়েন। শেখ মুজিবকে রুখতে হবে। তিন মাসের মধ্যে বাবাকে আট বার গ্রেফতার করা হলো। আমার ‘মা’ সব সময় একটা সুটকেস ও বিছানাপত্র গুছিয়ে রাখতেন। বাবাকে গ্রেফতারের আগেই থানা থেকে পুলিশের ফোন আসত, ‘স্যার, আমরা আপনাকে অ্যারেস্ট করতে আসছি।’ বাবা বলতেন, ‘আসুন।’

    বাবা ফোনটা রেখে মাকে সবকিছু গুছিয়ে হাতের কাছে রাখতে বলতেন। তারপরেই বাবা একটা ফোন করতেন তাজউদ্দীন চাচাকে, ‘তাজউদ্দীন রেডি হও। আমাকে নিতে আসছে, তোমার কাছেও যাবে।’ হাসিনা আপা মাঝেমধ্যে বিদ্রোহ করতেন। কিছুতেই পুলিশকে বাসায় ঢুকতে দেবেন না; যেতে দেবেন না বাবাকে।

    বাবা হেসে বলতেন, ‘যেতে তো হবেই।’ তবে মা ঘাবড়াতেন না কখনই। কেবল মুখটা বিবর্ণ ও মলিন হয়ে যেত। অন্যভাবেও বোঝা যেত তার কষ্ট। বাবা যতদিন জেলে থাকতেন, ততদিন মা একটা ভালো বা রঙিন শাড়ি পরতেন না। বাবা বাড়ি ফেরার পর সব আবার ঠিক হয়ে যেত আগের মতো।

    স্কুলে কোনো অনুষ্ঠানে অভিভাবক হিসেবে মা-ই যেতেন; সঙ্গে কামাল ভাই। বেশির ভাগ সময় জেলে থাকার কারণে বাবা কখনো যেতে পারতেন না। অনেক অভিভাবক তাদের বাচ্চাদের আমাদের সঙ্গে মিশতে বারণ করতেন, আমাদের কাছ থেকে দূরে দূরে থাকতে বলতেন। আবার অনেকে স্নেহ-আদর দিয়ে কুশলাদি জানতে চাইতেন।

    রাজনৈতিক পরিবারগুলোর জীবনযাপন অন্যসব পরিবার থেকে একটু আলাদা। তার ওপর শেখ সাহেবের সন্তান বলেই আরো আলাদা ছিল আমাদের ভাইবোনদের জীবন। কামাল ভাই বেশ বড় হয়েও জানতেন না, ‘বাবা’ কী বা কাকে বলে!

    আব্বার লেখা ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে এই বিষয়টা খুবই হূদয়স্পর্শী ও মর্মস্পর্শী হয়ে উঠেছে। সেখান থেকে একটুখানি উদ্ধৃতি দিচ্ছি, যারা পড়েননি তাদের জন্য। বাবার কথায়—“একদিন সকালে আমি ও রেণু বিছানায় বসে গল্প করছিলাম। হাসু ও কামাল নিচে খেলছিল। হাসু মাঝে মাঝে খেলা ফেলে আমার কাছে আসে আর ‘আব্বা’, ‘আব্বা’ বলে ডাকে। কামাল চেয়ে থাকে। এক সময় কামাল হাসিনাকে বলছে, ‘হাসু আপা, হাসু আপা, তোমার আব্বাকে আমি একটু আব্বা বলি।’ আমি আর রেণু দুজনই শুনলাম। আস্তে আস্তে বিছানা থেকে উঠে যেয়ে ওকে কোলে নিয়ে বললাম, ‘আমি তো তোমারও আব্বা।’ এমনিতে কামাল আমার কাছে আসতে চাইত না। আজ গলা ধরে পড়ে রইল। বুঝতে পারলাম, এখন আর ও সহ্য করতে পারছে না।”

    মাঝেমধ্যে আমার মনে হয়, আমার বাবা যদি রাজনীতি না করে শুধু লেখালেখি করতেন, তাহলে হয়তো সেরা লেখকদের সারিতে স্থান করে নিতেন। এত সুন্দর, সহজ-সরল, সাবলীল তার ভাষা, যার তুলনা হয় না।

    জীবন চলার পথে অনেক কঠিন বাস্তবতা আমাদের শিখিয়ে দিয়েছে সবকিছু সহজভাবে গ্রহণ করার। বাবা তখন জেলে। কামাল ভাই ঢাকা কলেজে ভর্তি হবেন। কিন্তু মোনায়েম খানের হুকুম, কিছুতেই শেখ মুজিবের ছেলেকে ঢাকা কলেজে ভর্তি করা যাবে না।

    বাঙালির সংগ্রামী নেতা মুজিব

    মা প্রিন্সিপ্যাল সাহেবকে ফোন করলেন। প্রিন্সিপ্যাল সাহেব বললেন, ‘মা, তুমি ফোন করেছ, আমার চাকরি যায় যাক, কিন্তু আমি কামালকে ভর্তি করিয়ে নেব। ওর স্কুল থেকে প্রধান শিক্ষক মামুন সাহেব প্রশংসা করে সার্টিফিকেট দিয়েছে, আমি অবশ্যই ভর্তি করিয়ে নেব, তোমার কথা আমি ফেলতে পারব না।’

    জেলখানায় দুই সপ্তাহ পরপর বাবার সঙ্গে দেখা করার অনুমতি ছিল। বাবার সঙ্গে দেখা করার জন্য বাড়িতে ব্যাপক প্রস্তুতি নেওয়া হতো। যদিও ছোট ছিলাম, কিন্তু মনে আছে—দেখতাম, মা ছোট ছোট চিরকুট তৈরি করছেন। তখন বুঝতাম না, এগুলো কেন তৈরি হচ্ছে? মুখে সব কথা বলা যেত না বাবাকে। কারণ, তখন জেলখানায় অনেক পাহারা, অনেক চোখ চারদিকে। ঘরের ভেতরেই দুজন আইবির লোক টেবিলের ও-প্রান্তে বসে থাকত, আর আমরা বাবার পাশে।

    আমাদের ভাইবোনদের দায়িত্ব ছিল হইচই করা। মা হইচইয়ের মধ্যেই বাবাকে যা বলার বলে ফেলতেন এবং চিরকুটগুলো দিয়ে দিতেন। খোকা চাচার দায়িত্ব ছিল আইবির লোকদের হাত দেখার নামে তাদের অন্যমনস্ক করে রাখা আর তাদের চা-নাশতা খাওয়ানো।

    আগরতলা মামলা শুরুর আগে থেকেই আমার মায়ের ওপর কড়া নজরদারি শুরু হয়েছিল। অন্য সবাই মাকে না চিনলেও পাকিস্তান সরকার তাকে বিলক্ষণ চিনতে পেরেছিল। প্রায়ই মাকে জেরা করতে আইবি বা এসবি অফিসে যেতে হতো। একদিন তিনি জানতে পারলেন তাকেও বন্দি করা হবে। তিনি খুব চিন্তিত হয়ে পড়লেন। আমরা ছোট ছোট ভাইবোনেরা, আমার দাদি-দাদা—তাদের কী হবে? কে দেখাশোনা করবে? বিশেষ করে হাসিনা আপার। সেই পরিস্থিতিতে মা আপার বিয়ের কথা ভাবতে লাগলেন। আমার দাদা শেখ লুত্ফর রহমান একজন পাত্র পছন্দ করলেন প্রিয় পৌত্রীর জন্য। পাত্র সরকারি চাকুরে। সুপ্রতিষ্ঠিত সিএসপি অফিসার। কিন্তু মোনায়েম খানের ধমক খেয়ে পাত্রটি শেষমেশ বিয়েতে রাজি হলেন না। মার মনটা খুব ভেঙে গেল এবং খুব দুশ্চিন্তায় পড়লেন। ঠিক এর মধ্যেই মতিয়ুর রহমান সাহেব রংপুর থেকে এসে মাকে বললেন, ‘ভাবি, আপনি চিন্তা করবেন না। আমি একটা ছেলে ঠিক করেছি। নাম ড. ওয়াজেদ মিয়া। সদ্য বিলাতফেরত ছাত্রলীগ করা ছেলে। হাসিনার জন্য খুব ভালো পাত্র হবে।’ মা বাবাকে বিস্তারিত জানালেন। বাবা বললেন, ‘যেটা তুমি ভালো বোঝো, সেটাই করো।

    ‘ভাবি, আপনি চিন্তা করবেন না। আমি একটা ছেলে ঠিক করেছি। নাম ড. ওয়াজেদ মিয়া। সদ্য বিলাতফেরত ছাত্রলীগ করা ছেলে। হাসিনার জন্য খুব ভালো পাত্র হবে।’ মা বাবাকে বিস্তারিত জানালেন। বাবা বললেন, ‘যেটা তুমি ভালো বোঝো, সেটাই করো।’

    আরও পড়ুন:

    স্মৃতির পাতায় বন্ধুকে নিয়ে কতই না গল্প

    ১৯৬৭ সালে ১৭ই নভেম্বর হাসিনা আপার কাবিন হয়ে গেল। বিশেষ অনুমতি নিয়ে জেলখানায় বাবা মেয়েজামাইকে দোয়া করলেন। জেলখানায় বসেই কন্যা সম্প্রদান করলেন। কারাগারের ভেতরে সে সময় একটা নতুন কামরা তৈরি হয়েছিল। জেল কর্তৃপক্ষ অনুরোধ করল, বাবা যেন নতুন জামাইকে ওখানেই বরণ করেন। মিষ্টি ও ফুলের মালারও ব্যবস্থা করা হয়েছিল।

    প্রতি মাসে মা-সহ আমরা ভাইবোনেরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতাম, জেলখানায় বাবার সঙ্গে সাক্ষাতের দিনটির জন্য। এরকম একটা দিনে আমরা জেলখানায় গিয়ে বাবার সাক্ষাত্ পেলাম না। কারা কর্তৃপক্ষ বাবার অবস্থান সম্পর্কে কিছুই জানে না বলে জানাল। ঘণ্টার পর ঘণ্টা আমরা জেলগেটে অপেক্ষা করলাম। আমাদের ঢুকতেও দেওয়া হলো না। অবশেষে আমরা কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি ফিরে এলাম। দারুণ দুঃসময় তখন। বাবা বেঁচে আছেন কি না, বেঁচে থাকলে কোথায় আছেন—কিছুই জানি না। বেশ কয়েক মাস চলল এ অবস্থা। ছাত্রনেতাদেরও অনেকেই বন্দি। ৩২ নম্বরের বাড়ির সামনে মনে হয় কাকপক্ষীও ওড়ে না। এরপর ক্যান্টনমেন্টের ভেতরেই আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার বিচার শুরু হলো। তারপর জানা গেল বাবাকে সেনানিবাসে নিয়ে বন্দি করে রাখা হয়েছে। জেল কর্তৃপক্ষ আসলেই জানত না, শেখ সাহেবকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে সেনাবাহিনী? জানতেন না বাবাও। তবে এটা বুঝতে পেরেছিলেন, ভয়ানক বিপদ সামনে। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে বের হওয়ার পর গাড়িতে ওঠার আগে একমুঠো মাটি হাতে নিয়ে কপালে ঠেকিয়ে বাবা বলেছিলেন, ‘আল্লাহ, আমার কবর যেন এই মাটিতেই হয়।’ এ কথাটা বাবার মুখে শোনা।

    সেনানিবাসে ওরা বাবার ওপর অমানবিক মানসিক নির্যাতন করত। মাথার ওপরে সারাক্ষণ ৫০০ পাওয়ারের বাল্ব জ্বালিয়ে রাখত। একটু ঘুমিয়ে পড়লে বা ঝিমুনি এলে ডেকে তুলে দিত। মূলত মানসিক নির্যাতন করাটাই ছিল ওদের আসল উদ্দেশ্য। শেষের দিকে বিকেলে হাঁটার অনুমতি দিয়েছিল।

    সেনানিবাসের দেওয়ালটা বেশি উঁচু ছিল না। আমরা প্রায়ই দুলাভাই, আপা, মা, ভাইবোনসহ আশপাশ দিয়ে গাড়িতে ঘুরতাম। যদি একটু চোখের দেখা পাই বাবার। কখনো কখনো দেখতেও পেতাম। প্রহরীরাও দেখে না দেখার ভান করত।

    সেনানিবাসেই বাবার জীবননাশ হতে পারত। একদিন বাবা বিকেলে যখন হাঁটাহাঁটি করছিলেন ওখানকার একজন কর্মচারী বাবাকে জানালেন :‘স্যার, আপনি সন্ধের পর বাইরে হাঁটবেন না। এখানে একটা অঘটন ঘটে যেতে পারে।’ ঠিক পরের দিন সার্জেন্ট জহুরুল হককে হত্যা করা হয়। সেনানিবাসের ভেতরে প্রথমে গুলি, পরে বেয়নেট চার্জ করে। আসামি পালিয়ে যাওয়ার সময় গুলি করা হয়েছে বলে কর্তৃপক্ষ জানিয়ে দেয়।

     

    ভয়ানক বিপদ সামনে। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে বের হওয়ার পর গাড়িতে ওঠার আগে একমুঠো মাটি হাতে নিয়ে কপালে ঠেকিয়ে বাবা বলেছিলেন, ‘আল্লাহ, আমার কবর যেন এই মাটিতেই হয়।’ এ কথাটা বাবার মুখে শোনা।

    সেনানিবাসে ওরা বাবার ওপর অমানবিক মানসিক নির্যাতন করত। মাথার ওপরে সারাক্ষণ ৫০০ পাওয়ারের বাল্ব জ্বালিয়ে রাখত। একটু ঘুমিয়ে পড়লে বা ঝিমুনি এলে ডেকে তুলে দিত। মূলত মানসিক নির্যাতন করাটাই ছিল ওদের আসল উদ্দেশ্য। শেষের দিকে বিকেলে হাঁটার অনুমতি দিয়েছিল।

    সেনানিবাসের দেওয়ালটা বেশি উঁচু ছিল না। আমরা প্রায়ই দুলাভাই, আপা, মা, ভাইবোনসহ আশপাশ দিয়ে গাড়িতে ঘুরতাম। যদি একটু চোখের দেখা পাই বাবার। কখনো কখনো দেখতেও পেতাম। প্রহরীরাও দেখে না দেখার ভান করত।

    সেনানিবাসেই বাবার জীবননাশ হতে পারত। একদিন বাবা বিকেলে যখন হাঁটাহাঁটি করছিলেন ওখানকার একজন কর্মচারী বাবাকে জানালেন :‘স্যার, আপনি সন্ধের পর বাইরে হাঁটবেন না। এখানে একটা অঘটন ঘটে যেতে পারে।’ ঠিক পরের দিন সার্জেন্ট জহুরুল হককে হত্যা করা হয়। সেনানিবাসের ভেতরে প্রথমে গুলি, পরে বেয়নেট চার্জ করে। আসামি পালিয়ে যাওয়ার সময় গুলি করা হয়েছে বলে কর্তৃপক্ষ জানিয়ে দেয়।

    আরও পড়ুন:

    বঙ্গবন্ধুকে উৎসর্গ করা হচ্ছে কলকাতার বইমেলা

    সার্জেন্ট জহুরুল হককে হত্যার খবরে সারা বাংলাদেশে আগুন জ্বলে উঠেছিল। আন্দোলন, প্রতিবাদে মানুষ তখন সেনানিবাসের দিকে ছুটছিল। স্লোগানে স্লোগানে তখন চারদিক মুখরিত। মানুষের মুখে মুখে তখন—‘জেলের তালা ভাঙব, শেখ মুজিবকে আনব’, ‘মিথ্যা মামলা মানি না, মানব না’ স্লোগান। আন্দোলনের জোয়ারে আইয়ুব খান দিশেহারা। নতুন ফন্দি আঁটল গোলটেবিল বৈঠকের। কথা উঠল শেখ মুজিবকে প্যারোলে মুক্তি দিয়ে সে বৈঠকে যোগদান করানোর। আওয়ামী লীগের কিছু বর্ষীয়ান নেতা, ইত্তেফাক সম্পাদক তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়াসহ সবাই চাইছিলেন, বাবা যেন গোলটেবিল বৈঠকে যোগ দিতে সম্মতি দেন। আমাদেরও, বিশেষ করে আপা ও কামাল ভাইকে বলা হলো, আমরা যেন বাবার মুক্তি নেওয়ার ব্যাপারে সবাইকে বোঝাই। আপাকে ও কামাল ভাইকে শুনতে হলো :‘কেমন সন্তান তোমরা, বাবার মুক্তি চাও না?’ আমার মায়ের ওপর অনেক চাপ দিতে লাগল। কিন্তু মা তার সিদ্ধান্তে অনড়। বিনা শর্তে মিথ্যা মামলা তুলে নিতে হবে এবং প্রত্যেকে, যারা আব্বার সঙ্গে কারাবন্দি, তাদের সবাইকে বাবার সঙ্গেই বিনা শর্তে মুক্তি দিতে হবে। তবেই তিনি গোলটেবিল বৈঠকে যোগ দেবেন।

    মা নিজেই একদিন সশরীরে সেনানিবাসে গিয়ে দেওয়ালের এপাশ থেকে কথাটা আব্বাকে বললেন :‘তুমি কিছুতেই প্যারোলে মুক্তি নিয়ে বৈঠকে যেতে রাজি হবে না।’

    কোনোভাবেই যখন মাকে বোঝানো বা রাজি করা যাচ্ছে না, তখন নেতারা অন্যপথে এগোতে চাইলেন। দু-এক দিন পরে, দুপুরবেলা আমি স্কুল থেকে বাড়ি ফিরে ব্যাগটা পাশে নামিয়ে রেখে বাড়ির সামনে এক্কা-দোক্কা খেলছি। হঠাত্ দেখি, নীল রঙের একটা টয়োটা গাড়ি এসে থামল আমাদের বাড়ির সামনে। তাতে বসে আছেন জুলফিকার আলি ভুট্টো সাহেব। পত্রপত্রিকায় ছবি দেখে তাকে খানিকটা চিনতাম। মায়ের মামাতো ভাই আকরাম মামা সেখানে ছিলেন। গাড়ি দেখেই মামা দৌড়ে বাড়ির ভেতরে চলে গেলেন। মি. ভুট্টো গাড়ি থেকে নেমে আমার কাছে জানতে চাইলেন—কী নাম আমার, স্কুল থেকে ফিরলাম কি না ইত্যাদি। আমি সালাম দিয়ে উত্তর দিলাম। উনি জিজ্ঞাসা করলেন, মা কোথায়? ততক্ষণে তড়িঘড়ি করে আকরাম মামা ফিরে এসেছেন। আমি জবাব দেওয়ার আগেই আকরাম মামা বললেন, ‘উনি বাড়িতে নেই।’ ভুট্টো সাহেবের সঙ্গে আরো এক ভদ্রলোক ছিলেন। তাকে ডেকে ভুট্টো সাহেব বললেন, ‘হাসান, চলো যাই।’ আমাকে বাইবাই, খোদা হাফেজ বলে তারা চলে গেলেন। আমি বুঝতে পারলাম না এবং অনেকটা অবাক হয়ে গেলাম, মামা কেন ওদের এভাবে বললেন, মা বাড়িতে নেই?

    ঘটনা হচ্ছে ভুট্টো সাহেবকে দেখেই মামা ছুটে রান্নাঘরে গিয়ে মাকে বললেন, ‘বুজি, ভুট্টো সাহেব এসেছেন।’ ঐ খবর শুনে মা তড়িঘড়ি করে পাশের বাড়ি চলে যান। ঐ বাড়িটি ছিল বদরুন্নেসা আহমেদের। তিনি ’৭২ সালে শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ছিলেন। বদরুন্নেসা কলেজ ওনারই নামে।

    দুই বাড়ির মধ্যে ছোট্ট একটা গেট ছিল। আমরা ওনাকে ফুফু বলে ডাকতাম। ঐ বাড়িতে ঢুকেই মা মামাকে বললেন, ‘বলে দে, আমি বাড়িতে নেই।’ মি. ভুট্টোর সঙ্গে দেখা করার প্রশ্নই ওঠে না। ভুট্টো সাহেব চলে গেছেন—এই খবর শুনে তবেই মা বাসায় ফিরে আসেন। ভুট্টো সাহেব নিশ্চয়ই খবর নিয়েই এসেছিলেন যে কাকে ধরতে হবে শেখ সাহেবকে বোঝানোর জন্য। কারণ, ভুট্টো সাহেব যা চাইবেন, তার সপক্ষে একটি কথা বলাও সম্ভব ছিল না মায়ের পক্ষে। বেগম মুজিব অনেক আগে থেকেই তার বিপরীত মেরুতে দাঁড়িয়ে।

    এখানে বলতে হয়, কী অসাধারণ মনোবল ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ছিল আমার মায়ের। তিনি জানতেন, জনতার সাগরে জেগেছে ঊর্মি এবং এও জানতেন, জনতা জেগে উঠলে কারো সাধ্য নেই তাকে থামানোর। সেটা জানবার জন্য নিশ্চয়ই তার উত্স ছিল এবং সেটাই স্বাভাবিক

    তার হাতেনাতে প্রমাণ পাওয়া গেল ১৯৬৯-এর ২২শে ফেব্রুয়ারি। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার অভিযুক্ত সবাইকে নিয়ে কারাগার থেকে সসম্মানে বেরিয়ে এলেন বাঙালির প্রিয় মুজিব ভাই, শেখ সাহেব, প্রাণের প্রিয় শেখ মুজিবুর রহমান।

    বাবা জেলে থাকলে সব দিক সামলাতে হতো আমার মাকে। বাড়ির চারপাশে গুপ্তচররা নানান বেশে চলাফেরা করত। কখনো ফকির সেজে, পাগল সেজে, ফেরিওয়ালা সেজে এবং কখনো-বা বন্ধু সেজে। সেদিকেও মায়ের সদা সজাগ দৃষ্টি থাকত। আমাদের বাড়িতে ফেরিওয়ালা ঢোকা একদম নিষেধ ছিল। আমরা ভাইবোনেরা সবারই ডাকটিকিট সংগ্রহের নেশা ছিল। আমরা টিকিট সংগ্রহ করতাম ধানমন্ডি লেকের পাড়ে ফুটপাত থেকে। সেখানে হঠাত্ এক লোকের আবির্ভাব হলো। তিনি, আমরা যারা বাচ্চারা খেলতাম লেকের পাড়ে, তাদের নানা জিনিস দিতে শুরু করলেন। আমাকে লজেন্স ও ডাকটিকেট দিতেন। আমাকে ও জামাল ভাইকে বেশি বেশি দিতেন। আমরা দুই ভাইবোন খুশিতে বাসায় এসে একদিন মাকে সেগুলি দেখাতেই মা বললেন, ‘এক্ষুনি ফেরত দিয়ে এসো, অচেনা লোকের হাত থেকে কিছু নেবে না।’ আমরা দৌড়ে গিয়ে সেগুলি ফেরত দিয়ে এলাম। ঐ লোকটা আরেকটা কাজ করত। খুব দুঃখের কাহিনি শোনাত, তার নিজের জীবনের। সেটাও মাকে জানালাম। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর কীভাবে যেন সেই লোকটা যে গুপ্তচর ছিল সেটা জানতে পারি। কারণ, আমি একবার যদি কারো চেহারা দেখতাম, সেটা ভুলতাম না।

    গুপ্তচরবিষয়ক আরেকটা ছোট্ট ঘটনা। একবার এক লোক আমাদের বাড়ির সামনে বারবার সাইকেলে চড়ে চক্কর দিচ্ছিল। আমরা বাড়ির সামনে লেকের পাড়ে ভাইবোন ও পাড়ার ছেলেমেয়েরা বিকেলে খেলাধুলা করছি। ঐ লোককে সাইকেলে ঘোরাফেরা করতে দেখে কামাল ভাইয়ের সন্দেহ হলো। কামাল ভাই বললেন, এ নিশ্চয়ই এসবির লোক। জামাল ভাই, কামাল ভাই মিলে লোকটাকে জব্দ করার একটা ফন্দি আঁটলেন। আমাদের ‘টমি’ নামে বড়সড় একটা পোষা অ্যালসেসিয়ান কুকুর ছিল। জামাল ভাই, কামাল ভাই ওকে বলল—‘টমি ছুহ্।’ টমি তখন ভয়ংকরভাবে ছুটে গিয়ে ঘেউ ঘেউ করতে করতে সাইকেলওয়ালার পেছন পেছন ছুটতে শুরু করল। লোকটা তাল সামলাতে না পেরে সাইকেল থেকে পড়ে গেল। টমিকে থামতে বলা হলো। ও মনিবের কথা শুনে ঘেউ ঘেউ করেই যাচ্ছিল। কিন্তু ঐ লোকের ওপর কোনো আক্রমণ করেনি। লোকটা সাইকেল নিয়ে কোনোক্রমে পালাতে পারলে বাঁচে। তবে যাওয়ার সময় জোরে জোরে বলে গেল—‘রাত কো দেখা দেঙ্গে।’ সেই রাতেই বাবা গ্রেফতার হলেন।

    এসব দেখেশুনে মা আমাদের সবাইকে সাবধান হতে বললেন। অচেনা কারো সামনে কোনো কথা যেন না বলি। আরেকটা কাজ মা করতেন। যেদিন বাবার মিটিং থাকত, বাবাকে প্রস্তুত করে মিটিংয়ে পাঠিয়ে দিয়ে তিনি নিজেই বেরিয়ে পড়তেন জনসভার উদ্দেশে। জনসভার চারপাশটা চক্কর দিয়ে আসতেন। নিজের চোখে সব দেখে আসতেন। লোক সমাগম কেমন হলো এবং লোকজনের মনোভাব সম্পর্কে তথ্য নিয়ে আসতেন। পাছে বাবাকে যাতে কেউ ভুল তথ্য দিতে না পারে। কেবল একটি বার এই নিয়মের ব্যত্যয় ঘটেছিল। সেবার তিনি জনসভার চারপাশে চক্কর দিতে যাননি। সেটা ছিল রেসকোর্স ময়দানে ৭ই মার্চ ১৯৭১-এর ঐতিহাসিক জনসভা।

    আমাদের জীবনটা বিচিত্র অভিজ্ঞতায় ভরপুর। এসব লিখেও শেষ করা যাবে না। আমাদের জীবনের সবচেয়ে মর্মান্তিক দিন, শুধু আমাদের নয়, গোটা বাঙালি জাতির জন্যও—১৫ই আগস্ট ১৯৭৫। ঐদিন আমাদের নিঃশেষ করে দিয়ে গেল ঘাতক-খুনিরা। আমরা শুধু দুটো বোন বেঁচে থাকলাম। আমরা বাকহীন, কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েছিলাম। এত বড় অন্যায়, কিছুতেই সহ্য হবে না। আল্লাহর ওপর সম্পূর্ণ বিশ্বাস রেখে নানান চড়াই-উতরাই পেরিয়ে আজ আমরা দুটি বোন সত্যিকারের সোনার বাংলায় দাঁড়িয়ে আছি। হাসু আপা নিজের জীবনকে উত্সর্গ করে দিয়েছেন বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলার মানুষের কল্যাণের জন্য। সবার দোয়া ও ভালোবাসাই আমাদের পাথেয়। জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু।

    লেখক: জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কনিষ্ঠ কন্যা