Category: ধর্ম

  • রমজানের শেষ সময়টুকু কাজে লাগাই

    রমজানের শেষ সময়টুকু কাজে লাগাই

    আশা-প্রত্যাশা মাবন জীবনে বেঁচে থাকার এক মহাশক্তি। আশা হলো, না পেয়েও পাওয়ার স্বপ্নে নিরব থাকা। হতাশার গ্লানি যদি কখনও জীবনে ছুঁয়ে যায়, সেখান থেকেও আশার বীজ বপন করা হয়। আর মোমিনের জীবনে হতাশাও নেকি। শুধু প্রয়োজন সবরের। জীবনের বাঁকে বাঁকে আমরা আশার প্রাসাদ গড়ি। শেষ বিকেলে হিসেব কষি—কী পেলাম, কী হারালাম! কেউ প্রাপ্তির আনন্দে হই আত্মহারা, কেউ বঞ্চিতের বেদনায় দিশেহারা। এভাবেই বয়ে চলছে জীবন নদী।

    সে স্রোতে গত হচ্ছে দিন, সপ্তাহ, মাস, বছর, যুুগ-যুগান্তর। যেদিন থেকে প্রাপ্তবয়স্কের খাতায় নাম উঠেছে, সেদিন হতে কত রমজান এলো, গেল। কখনও কী ভেবেছি—রমজানে কী পেলাম, কী পেলাম না! কী প্রত্যাশা করেছিলাম, আর কী পেয়েছি? নাকি প্রত্যাশা-প্রাপ্তির চিন্তা ছাড়াই অতীত করেছি সব রমজান?

    রজবের চাঁদ থেকে রমজান পাওয়ার ব্যাকুলতায় বারবার মুখরিত হয়েছে আল্লাহপ্রমিকদের জবান—‘হে আল্লাহ! আমাদের রজব-শাবানের বরকত দাও। রমজান পর্যন্ত পৌঁছে দাও।’

    আল্লাহ আমাদের করুণা করে দান করেছেন মাহে রমজান। আরশের মালিক আমাদের রহমতের ছায়ায় শীতল করবেন। মাগফিরাতের চাদরে ঢেকে নেবেন। আর জাহান্নাম থেকে নাজাতের ফরমান জারি করবেন। এই তো মোমিনের প্রত্যাশা। রমজান তো আসেই মোমিনকে পাপশূন্য ও সজীব করে তোলে। জাহান্নাম থেকে মুক্তির খোশ-পয়গাম শোনাতে। একজন মোমিনের জীবনে এর চেয়ে বড় প্রত্যাশা আর কী হতে পারে?

    কিন্তু আফসোস, আমরা রমজানের বাঁকা চাঁদ দেখে আনন্দে মসজিদে গেছি, রোজা রেখেছি। আবার ঈদের আনন্দে মসজিদ ছেড়ে বাজার ধরছি। দুনিয়ার সওদা কিনতে আখেরাতের সওদা বিনাশ করছি। ২৭ রমজান কদরের রাত মনে করে শেষ মোনাজাত করে ভেবেছি, বিদায় রমজান; আবার দেখা যাবে আগামী বছর।

    এক মাসের অর্জন যেন মুহূর্তেই ম্লান। ভুলে যাই—কী প্রত্যাশা ছিল রমজানে। রাসুল (সা.) বলেন, ‘শ্রমিক যেমন দিন শেষে মুজুরি পায়, মোমিন বান্দাও তেমন রোজা শেষে পুরস্কার পায়। সে পুরস্কার ক্ষমার, নাজাতের। সুতরাং তার থেকে বোকা আর কে, যে পুরস্কারের সময় থাকে গায়েব!’ প্রাপ্তির এ সময় তো রোনাজারির, অশ্রুদানের। নিজেকে বড় অপরাধী ভেবে দরবারে এলাহিতে মিনতি করতে থাকার—হায়, আমার কী গোনাহ মাফ হলো? আমি কী আল্লাহর প্রিয় বান্দা হতে পেরেছি?

    মাওলানা ইদরিস সন্দ্বীপী (রহ.) বলতেন, ‘শিশু বাচ্চা তার সব প্রয়োজন পুরণ করে কেঁদে কেঁদে। তার না আছে চাওয়ার ভাষা, না আবেদনের শক্তি। তাই সে কাঁদে এবং সব পেয়ে যায়। সুতরাং মানুষ যদি মালিকের কদমে মাথা রেখে বিনয়ের সঙ্গে চোখ থেকে অশ্রু ফেলে, মালিক তাকে ক্ষমা না করে পারে?’

    আমাদের অন্তর তো পাথর। কিছু হৃদয় তো পাথরের চেয়েও শক্ত। তাই আমাদের চেখে পানি নেই। শেষ রাতে, মৃদু আঁধারে যারা কাঁদে, তাদের রমজান কত সুন্দর! মালিকের সঙ্গে তাদের প্রেম কত গভীর! খুব ইচ্ছে করে এমন দিলের পরশ পেতে । কিন্তু পাব কোথায় সে দিলওয়ালা! এখন তো হাত বাড়ালে প্রায় সবইই পাওয়া যায়। শুধু অভাব তাদের, যাদের চোখদুটো অশ্রুবিগলিত। তাই বলে হাল ছাড়ব না।

    চলুন, রমজানের শেষ সময়টুকু সবাই মালিকের কদমে সেজদায় লুটে পড়ি। কাঁদতে না পারলেও ভান তো ধরতে পারি। আশা রাখি, মালিক আমাদের ক্ষমা করে দেবেন। জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেবেন। এটাই তো বড় আমাদের প্রাপ্তি।

  • শবে কদরে কী আমল করবেন

    শবে কদরে কী আমল করবেন

    মহিমান্বিত রাত লাইলাতুল কদর। যা সম্মানীয় ও মর্যাদাপূর্ণ। এ রাত মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে উম্মতে মুহাম্মদির জন্য শ্রেষ্ঠ নেয়ামত। যা অন্য কোনো নবীর উম্মতদের দেওয়া হয়নি। এ রাত হাজার মাসের চেয়েও উত্তম। উম্মতে মুহাম্মদির স্বল্প বয়সের কারণে ইবাদতের ঘাটতি পূরণে মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে বান্দার জন্য উপহারস্বরূপ এ রাতের বিশেষ ব্যবস্থা। এ রাতে ইবাদত-বন্দেগি করার মাধ্যমে বান্দা নিজেকে ক্ষমা প্রার্থনা করার সুযোগ এবং গোনাহ মাফের মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারে।

    হাদিস শরিফে লাইলাতুল কদরে ইবাদত-বন্দেগি করার ফজিলত ও এ রাতের গুরুত্বারোপ করে এর তাৎপর্য বর্ণনা করা হয়েছে। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘যে ব্যক্তি কদরের রাতে ঈমান ও ইখলাসের সঙ্গে কিয়াম (নফল নামাজ আদায়) করবে, তার অতীতের যাবতীয় গোনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে।’ (বোখারি : ১৯০১)। আরেক হাদিসে এসেছে, ‘রমজান মাস এলে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেতেন, ‘নিশ্চয়ই রমজান মাস তোমাদের কাছে উপস্থিত হয়েছে। এতে এমন বরকতপূর্ণ রাত আছে, যা হাজার মাসের তুলনায় উত্তম। যে একে সম্মান করবে, সে যেন পুরো কল্যাণকেই সম্মান করল। আর যে এর কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হলো, সে যেন পুরো কল্যাণ থেকেই বঞ্চিত হলো।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৬৪৪)।

    মহিমান্বিত এ রাতে কিছু গুরুত্বপূর্ণ আমল রয়েছে, যা পালনে বান্দার জন্য অশেষ সওয়াব ও কল্যাণ রয়েছে। যেমন—
    ১. সূর্যাস্তের সঙ্গে সঙ্গে গোসল করে পবিত্র হয়ে ইবাদতের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করা।
    ২. মাগরিবের নামাজের পর ছয় রাকাত সালাতুল আওয়াবিন আদায় করা।
    ৩. কোরআনুল কারিম তেলাওয়াত করা।
    ৪. বেশি বেশি জিকির-আজকার করা।
    ৫. বেশি বেশি দরুদ শরিফ পাঠ করা।
    ৬. কৃত গোনাহের জন্য কান্নাকাটি করা এবং গোনাহ থেকে মাফ চাওয়া।
    ৭. কোনো মানুষকে কষ্ট দিয়ে থাকলে তার কাছে ক্ষমা চাওয়া।
    ৮. দুস্থদের বেশি বেশি দান-সদকা করা।
    ৯. মা-বাবা এবং মুরব্বিদের কবর জেয়ারত করা।
    ১০. আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনে বেশি বেশি নফল নামাজ আদায় করা এবং ভালো কাজ করা।

    এ রাতে কিছু বর্জনীয় আমল রয়েছে; যা বর্জনে বান্দার জন্য অশেষ কল্যাণ ও পুরস্কারের ব্যবস্থা রয়েছে। যেমন—
    ১. হেলা ও অবহেলায় এ রাত কাটিয়ে না দেওয়া।
    ২. ঘুমিয়ে এ রাত কাটিয়ে না দেওয়া।
    ৩. আলসেমি করে ইবাদতহীন বসে না থাকা।
    ৪. মানুষের প্রতি হিংসা-বিদ্বেষ না রাখা।
    ৫. আতশবাজি ফোটানো যাবে না।
    ৬. গোল্লা ফোটানো যাবে না।
    ৭. দলবেঁধে আড্ডাবাজি না করা।
    ৮. সবাই মিলে চিৎকার-চেঁচামেচি এবং হৈ-হুল্লোড় না করা।
    ৯. যাবতীয় গোনাহের কাজ থেকে বিরত থাকা।
    ১০. মানুষের প্রতি সুন্দর ও উত্তম আচরণ করা।

  • ইতেকাফের প্রয়োজনীয় ১০ মাসআলা

    ইতেকাফের প্রয়োজনীয় ১০ মাসআলা

    সাধারণ গোসলের জন্য মসজিদ থেকে বের হওয়া
    রমজান মাসের শেষ দশকের ইতেকাফ অবস্থায় সাধারণ গোসলের জন্য মসজিদ থেকে বের হওয়া জায়েজ নয়। বেরুলে ইতেকাফ নষ্ট হয়ে যাবে। সুতরাং কোনো ব্যক্তি সাধারণ গোসলের জন্য মসজিদ থেকে বের হওয়ার কারণে তার সুন্নত ইতেকাফ নষ্ট হয়ে গেছে। যেদিন গোসলের জন্য বের হয়েছে, ওই দিনের ইতেকাফ কাজা করে নেওয়া জরুরি। আর এই ইতেকাফটি নফল ইতেকাফ হিসেবে গণ্য হবে।

    বাড়তি রোজার নিয়ত
    সুন্নত ইতেকাফে (রমজানের শেষ দশ দিনে) রোজা থাকে, তাই এ সময় বাড়তি রোজার নিয়তের প্রয়োজন নেই। তবে ওয়াজিব ইতেকাফে রোজা রাখা শর্ত।

    মুস্তাহাব ইতেকাফে সচেতনতামূলক রোজা
    মুস্তাহাব ইতেকাফে সচেতনতামূলক রোজা ভালো। তবে নির্ভরযোগ্য মত হলো, শর্ত নয়। না রাখলে সমস্যা নেই।

    ইতেকাফের সময়সীমা
    ওয়াজিব ইতেকাফে কমপক্ষে একদিনের নিয়ত করতে হবে। বেশিও হতে পারে। আর সুন্নতে মুয়াক্কাদা ইতেকাফ রমজানের শেষ দশ দিনে হয়। আর মুস্তাহাব ইতেকাফের জন্য নির্দিষ্ট কোনো সময় নেই। হতে পারে এক মিনিট বা তার কমবেশি। সুতরাং যতক্ষণ মসজিদে অবস্থান করবে, ততক্ষণের নিয়ত করতে পারে।

    ইতেকাফের কাজা
    ইতেকাফে বসে দু’প্রকার (কাজকর্ম) হারাম । অর্থাৎ যেগুলো করলে ওয়াজিব আর সুন্নত ইতিকাফ নষ্ট হয়ে যায়। যদি নষ্ট হয়ে যায়, তাহলে কাজা করা লাগবে। আর কাজার উদ্দেশ্য হলো, যেসব দিন ইতেকাফ নষ্ট হয়ে গেছে, তার কাজা করে দেবে। ওয়াজিব ইতেকাফের কাজা ওয়াজিব, আর সুন্নতের কাজা সুন্নত। রমজানের ইতেকাফের কাজার জন্য রমজান হওয়া র্শত নয়। তবে যেহেতু রোজার সময়ের কাজা, তাই রোজা রাখা র্শত। যদি মুস্তাহাব ইতেকাফ হয়, তাহলে কোনো সমস্যা নেই। আর মুস্তাহাব ইতেকাফের জন্য নির্দিষ্ট কোনো সময় নেই বলে কোনো কাজাও নেই।

    অপ্রয়োজনে মসজিদের বাইরে যাওয়া
    ভুলেও নিজের ইতেকাফের মসজিদকে এক মিনিট কিংবা আরও কম সময়ের জন্য ছেড়ে দেওয়া জায়েজ নয়।

    অপ্রয়োজনীয় বেচাকেনায় লিপ্ত হওয়া
    ইতেকাফ অবস্থায় অপ্রয়োজনীয় দুনিয়াবি কোনো কাজে ব্যস্ত হওয়া মাকরুহে তাহরিমি। যেমন—অপ্রয়োজনীয় বেচাকেনায় লিপ্ত হওয়া। তবে হ্যাঁ, যা না করলেই নয়, এমন হলে ভিন্ন কথা। যেমন—ঘরে খাবার নেই, আর ইতেকাফকারী ছাড়া উপযুক্ত অন্য কেউ নেই। তাহলে ইতেকাফকারী বেচাকেনা করতে পারেন। তবে মসজিদে কোনো জিনিস বা মালামাল উপস্থিত করা যাবে না।

    ইতেকাফের বিনিময় দেওয়া-নেওয়া
    বিনিময় নিয়ে ইতেকাফ করা বা করানো সম্পূর্ণ নাজায়েজ। কারণ, ইতেকাফ একটি ইবাদত। আর ইবাদতের বিনিময় দেওয়া-নেওয়া নাজায়েজ। বিনিময়ের মাধ্যমে ইতেকাফ করলে সুন্নতে মুয়াক্কাদা (কেফায়া) আদায় হবে না। ফলে এলাকাবাসী সবাই সুন্নতে মুয়াক্কাদায়ে কেফায়া আদায় না করার কারণে গোনাহগার হবে।

    ইতেকাফরত ব্যক্তির অসুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরা
    ইতেকাফরত ব্যক্তির অসুস্থ হয়ে পড়ায় বাড়ি চলে আসতে হয়েছে। এ ক্ষেত্রে তাকে একদিনের ইতেকাফ কাজা করতে হবে। আর তা পরের রমজানেও কাজা করা যাবে। এজন্য যে কোনো একদিন সূর্যাস্তের পর থেকে পরের দিন সূর্যাস্ত পর্যন্ত মসজিদে ইতেকাফ করবে। অবশ্য রমজানের বাইরে ইতেকাফ কাজা করতে চাইলে দিনের বেলা নফল রোজাও রাখতে হবে।

    ইতেকাফ অবস্থায় মাসিক শুরু হলে
    ইতেকাফ অবস্থায় কোনো নারীর মাসিক শুরু হলে তার ইতেকাফ ভেঙে যাবে। যেদিন মাসিক শুরু হলো, শুধু সেই একদিনের ইতেকাফ কাজা করে নেওয়া জরুরি।

  • রমজানে কোরআনের মহিমা

    রমজানে কোরআনের মহিমা

    হিজরি নবম মাস রমজান। রমজান শব্দের অর্থ প্রচণ্ড গরম, সূর্যের খরতাপে পাথর উত্তপ্ত হওয়া, সূর্যতাপে উত্তপ্ত বালু বা মরুভূমি, মাটির তাপে পায়ে ফোসকা পড়ে যাওয়া, পুড়ে যাওয়া, ঝলসে যাওয়া, কাবাব বানানো, ঘাম ঝরানো, চর্বি গলানো, জ্বর, তাপ ইত্যাদি। রমজানে ক্ষুধা-তৃষ্ণায় রোজাদার যে আমল করে, তা আগে কৃত সব পাপকে পুড়িয়ে ছাই করে দেয়। রোজাদার নিষ্পাপ হয়ে যায়। তাই এ মাসের নাম রমজান। (লিসানুল আরব)।

    এ মাসেই আল্লাহতায়ালা তাঁর অবারিত রহমত মহিমান্বিত আল কোরআন নাজিল করেছেন। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘রমজান মাস, যে মাসে নাজিল করা হয়েছে আল কোরআন; মানুষের জন্য হিদায়াতরূপে এবং পথনির্দেশনার প্রমাণ ও সত্য-মিথ্যা পার্থক্য নির্ণয়কারী হিসেবে।’ (সুরা বাকারা : ২৮৫)।

    কোরআন শব্দটি আরবি ‘করউন’ শব্দ থেকে নির্গত । করউন মানে হলো পড়া। আর কোরআন হলো এমন একটি ঐশীগ্রন্থ, যা বারবার পড়া ও এর আদেশ-নিষেধ মান্য করা হয়। বারবার পড়া থেকে এটাকে কোরআন বলা হয়। (তাফসিরে বায়জাবি)। মানবতার মুক্তি ও কল্যাণের জন্য আল্লাহতায়ালা একটি অতুলনীয় গ্রন্থ দিয়েছেন। যার নাম কোরআন। পবিত্র কোরআন ছাড়াও আল্লাহতায়ালা যুগে যুগে আরও ছোট-বড় অনেক কিতাব নাজিল করেছেন। এর মধ্যে সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ আসমানি গ্রন্থ কোরআন।

    রমজান মাসের গুরুত্ব, মর্যাদা এবং এ মাসে কোরআন নাজিল হওয়ার কথা মহান আল্লাহ ঘোষণা করেন। অন্য সব মাসের ওপর রমজান মাসের সম্মান ও মর্যাদার বর্ণনা দিচ্ছেন যে, এ পবিত্র মাসেই কোরআনুল কারিম অবতীর্ণ হয়েছে। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘ইব্রাহিম (আ.)-এর সহিফা রমজানের প্রথম রাতে, তাওরাত ছয় তারিখে, ইনজিল তেরো তারিখে এবং কোরআনুল কারিম চব্বিশ তারিখে অবতীর্ণ হয়।’ (মুসনাদে আহমাদ : ৪/১০৭)।

    ইসলামি থিওলজি অনুযায়ী, রমজান মাসে মহাগ্রন্থ আল কোরআন লওহে মাহফুজ হতে দুনিয়ার আসমান বাইতুল ইজ্জতে নাজিল হয়। ফলে রমজান কোরআন নাজিলের মহিমায় মহিমান্বিত। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জিবরাইল (আ.)-এর সঙ্গে এ মাসে কোরআন পুনরাবৃত্তি করতেন। উম্মাহকে কোরআনের ছায়াতলে জীবন কাটাতে আহ্বান করতেন। কোরআন নিয়ে চিন্তা-গবেষণা করতেন। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘আমি এ মোবারক গ্রন্থটি আপনার ওপর নাজিল করেছি। যাতে মানুষ এর আয়াতসমূহের ব্যাপারে চিন্তা-গবেষণা করতে পারে এবং জ্ঞানবান লোকেরা এর দ্বারা উপদেশ গ্রহণ করতে পারে।’ (সুরা সোয়াদ : ২৯)।

    কোরআনের কারণে রমজানের মর্যাদা বেড়ে গেছে। রমজানে যে ব্যক্তি একটি হরফ তেলাওয়াত করবে, সে ৭০টি হরফ তেলাওয়াতের সওয়াব পাবে। রোজা ও কোরআনের মধ্যে এক নিবিড় সম্পর্ক বিদ্যমান। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, রোজা ও কোরআন বান্দার জন্য সুপারিশ করবে। ‘রোজা বলবে, হে আল্লাহ! আমি তাকে দিনের বেলায় পানাহার থেকে বিরত রেখেছি।’ কোরআন বলবে, ‘হে পরওয়ারদেগার! তাকে আমি রাতের বেলায় নিদ্রা থেকে বিরত রেখেছি। কাজেই তুমি আমার সুপারিশ কবুল করো।’ এমতাবস্থায় আল্লাহ উভয়ের সুপারিশ কবুল করবেন। (মুসনাদে আহমদ : ৬৫৮৯)।

    সর্বোপরি কোরআন মানবজাতির হেদায়াতের আলোকবর্তিকা। কোরআনের মাধ্যমে আল্লাহ ও বান্দার সঙ্গে সম্পর্ক সমাদৃত। এ কোরআনকে যারা ধারণ করেছে, তারা দামি হয়েছে; যেমন মর্যাদাবান এ মাস। বিখ্যাত মুফাসসির সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, যে ব্যক্তি কোরআন তেলাওয়াত করবে, কোরআনের বিধান অনুযায়ী চলবে, আল্লাহতায়ালা তাকে সব ভ্রষ্টতা থেকে রক্ষা করবেন। কেয়ামতের ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি থেকে হেফাজত করবেন। তার প্রমাণ আল্লাহতায়ালার এ বাণী, ‘যে আমার হেদায়াতের অনুসরণ করবে, সে বিপথগামী হবে না; দুঃখগ্রস্ত হবে না।’ (তাফসিরে তাবারি : ১৮/৩৮৯)।

  • ইতেকাফের আগে নারীদের যে ৮ বিষয় জানা জরুরিইতেকাফের আগে নারীদের যে ৮ বিষয় জানা জরুরি

    ইতেকাফের আগে নারীদের যে ৮ বিষয় জানা জরুরিইতেকাফের আগে নারীদের যে ৮ বিষয় জানা জরুরি

    মসজিদে ইতেকাফ পুরুষদের জন্য
    মসজিদে গিয়ে রমজানের শেষ ১০ দিন ইতেকাফ করা পুরুষদের জন্য সুন্নত, নারীদের জন্য নয়। তাই তারা ঘরে নিজের নামাজের জায়গায় ইতেকাফ করবেন, মসজিদে নয়। (বাদায়েউস সানায়ে : ২/১১৩)।

    স্থান নির্ধারণ
    নারীরা ঘরে নামাজ ও অন্যান্য ইবাদতের জন্য নির্ধারিত স্থানে ইতেকাফ করবেন। যদি আগ থেকেই ঘরে নামাজের জন্য কোনো স্থান নির্ধারিত না থাকে, তাহলে ইতেকাফের জন্য একটি স্থান নির্ধারণ করে নেবেন। সেখানেই ইতেকাফ করবেন। (হেদায়া : ১/২৩০)।

    নির্ধারিত স্থান মসজিদের মতো
    নারীরা ঘরের যে স্থানটিকে ইতেকাফের জন্য নির্ধারিত করবেন, তা মসজিদের মতো গণ্য হবে। মানবিক প্রয়োজন ছাড়া তারা সেখান থেকে বেরুতে পারবেন না। মানবিক প্রয়োজন ছাড়া সে স্থানের বাইরে গেলে ইতেকাফ ভেঙে যাবে। (ফতোয়ায়ে আলমগিরি : ১/২১১)।

    ইতেকাফের জন্য স্বামীর অনুমতি
    বিবাহিতা নারীকে রমজানের শেষ দশকের ইতেকাফ বা অন্য সময়ের নফল ইতেকাফের জন্য স্বামীর অনুমতি নিতে হবে। স্বামীর অনুমতি ছাড়া ইতেকাফ করা অনুচিত। স্বামীদের উচিত, যুক্তিসঙ্গত ও গ্রহণযোগ্য কারণ ছাড়া স্ত্রীদের ইতেকাফে বাঁধা না দেওয়া। তাদের ইতেকাফের সুযোগ দেওয়া। এতে কিন্তু উভয়ই সওয়াব পাবেন। (ফতোয়ায়ে আলমগিরি : ১/২১১)।

    অনুমতি দেওয়ার পর বাঁধা এলে
    স্বামী স্ত্রীকে ইতেকাফের অনুমতি দেওয়ার পর আর বাঁধা দিতে পারবেন না। বাঁধা দিলেও সে বাঁধা মানা স্ত্রীর জন্য জরুরি নয়। (ফতোয়ায়ে শামি : ৩/৪২৮)।

    মেলামেশা
    ইতেকাফ অবস্থায় (রাতেও) স্বামী-স্ত্রীর মেলামেশা করা যাবে না। করলে ইতেকাফ ভেঙে যাবে। (সুরা বাকারা : ১৮৭, বাদায়েউস সানায়ে : ২/২৮৫)।

    হায়েজ-নেফাস
    নারীদের ইতেকাফের জন্য হায়েজ-নেফাস থেকে পবিত্র হওয়া শর্ত। হায়েজ-নেফাস অবস্থায় ইতেকাফ সহিহ হয় না। (বাদায়েউস সানায়ে : ২/২৭৪)।

    পিরিয়ড শুরু হওয়া পর্যন্ত ইতেকাফ
    নারীদের ইতেকাফে বসার আগেই হায়েজ-নেফাসের দিন-তারিখ হিসাব করে বসা উচিত। যাতে ইতেকাফ শুরু করার পর পিরিয়ড শুরু না হয়ে যায়। তবে কারও রমজানের শেষ দশকে পিরিয়ড হওয়ার নিয়ম থাকলে তিনি পিরিয়ড শুরু হওয়া পর্যন্ত নফল ইতেকাফ করতেই পারেন। তবে ওষুধ-বড়ি খেয়ে পিরিয়ড বন্ধ রেখে রোজা রাখলে ও ইতেকাফ করলে রোজা ও ইতেকাফ সহিহ হবে। ইতেকাফ শুরু করার পর পিরিয়ড শুরু হয়ে গেলে ইতেকাফ ভেঙে যাবে। পরে শুধু একদিনের ইতেকাফ রোজাসহ কাজা করতে হবে। (আহসানুল ফাতাওয়া : ৪/৫০২)।

  • রমজানে মোমিন যেভাবে প্রশিক্ষণ পায়

    রমজানে মোমিন যেভাবে প্রশিক্ষণ পায়

    রোজা প্রতিটা যুগে আল্লাহর আইনের একটি অঙ্গ ছিল। আজ যখন কোনো ব্যক্তি রোজা রাখে, যেন সে ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতার অংশ হয়ে গেছে। যা প্রতিটা যুগের বিশ্বাসীদের মধ্যে অব্যাহত ছিল। আর প্রতিটা যুগে তা অব্যাহত থাকবে। রোজাদার ব্যক্তি মনে মনে এই মর্মে সন্তুষ্টি বোধ করে, আল্লাহর উত্তম ও গ্রহণযোগ্য বান্দাগণ যুগে যুগে যা করেছেন, তা সে করছে। এই উপলব্ধি তাকে মানব ইতিহাসের আল্লাহ কেন্দ্রিক সেই কাফেলার অন্তর্ভুক্ত করে, যে কাফেলায় আছেন নবিগণ, সত্যবাদীগণ, শহিদগণ। অর্থাৎ যারা জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সত্যের সাক্ষ্য দিয়েছেন এবং সৎকর্মশীল।

    রোজার নির্দেশ চান্দ্র ক্যালেন্ডারের ওপর ভিত্তি করে এসেছে। শাবান মাসের শেষ সন্ধ্যায় পরবর্তী মাসের চাঁদ দেখে রোজা শুরু হয়। এভাবে রোজার কার্যক্রম শাবান মাসের শেষ থেকে শুরু হয়ে যায়। লোকেরা শাবানের শেষ তারিখ গণনা করা শুরু করে। যাতে তারা সেদিন চাঁদ দেখতে পায়। রমজানের আগমনের সিদ্ধান্ত নিতে পারে। চাঁদ দেখে রোজা রাখা এমন, যেন রোজা রাখার আগে একজন ব্যক্তির মধ্যে রোজার মনোভাব জাগ্রত করা।

    রোজার প্রতিটি মুহূর্ত আমলের। এটি বিশেষ ধর্মীয় আমলের সময়। এ সময়টি শুরু হয় শাবানের সন্ধ্যায়। শাবান মাসের ২৯তম সন্ধ্যা আসার সঙ্গে সঙ্গে মোমিনের চোখ চাঁদ দেখার জন্য আকাশে স্থির হয়ে যায়। তাদের চেতনা এটা জানার জন্য জাগ্রত হয়, চাঁদ পৃথিবীর আবর্তনের সেই পর্যায়ে প্রবেশ করেছে কি-না, যখন থেকে অবশ্যই তাদের জীবনের গতিপথটি সম্পূর্ণ পরিবর্তন করতে হবে।

    এখন প্রতিদিন তাদেরকে এটা জানার জন্য উদ্বিগ্ন হতে হবে, ঠিক কখন সকাল শুরু হবে এবং সূর্য কয়টা বেজে কত মিনিটে অস্ত যাবে। কেননা, প্রতিদিন তাদের জন্য এই কথার ঘোষণা হয়, এখন তাদের জীবনব্যবস্থায় সময়ের সদ্ব্যবহার করে চলতে হবে।

    রোজার আগে যখন তার খিদে পেত, তখন সে খাবার খেত; পিপাসার সময় পানি পান করত। যেন বাকি দিনগুলিতে ক্ষুধা ও আকাঙ্ক্ষা তাদের গাইড ছিল; তবে এখন অনুশাসন তাদের জীবনের গাইড হয়ে গেছে। এখন তাদের খুব ভালোভাবে জানতে হবে, রাতে কয়টা বেজে কত মিনিট পর্যন্ত খাওয়া উচিত। এরপর পুরোপুরি খাওয়া এবং পান করা বন্ধ করতে হবে। তারপর সন্ধ্যায় সঠিক সময়ে আবার খাওয়া-দাওয়া শুরু করতে হবে।

    ঠিক একইভাবে যখন সত্যিকারের রোজাদারকে মন্দ কিছু বলা হয়, তখন সে তার প্রতিক্রিয়া জানায় না। বলে, ‘আপনার প্রতি শান্তি বর্ষিত হোক। আপনি আমাকে খারাপ বলেছিলেন বলে আমি আপনার প্রতি খারাপ ব্যবহার করব না। কারণ, আমি রোজাদার।’

    যে দিনগুলি কোনো সতর্কতা বা ভয় ছাড়াই কেটে যেত, এখন তাদেরকে এ জীবনবোধের সঙ্গে দিনগুলি কাটাতে হয় যে, তাদের কি করা উচিত এবং কি না করা উচিত, কী খাবেন এবং কী খাবেন না, এটি করবেন না, না হলে রোজা ভেঙে যাবে, এটি করবেন না, অন্যথায় আপনি রোজার পরেও রোজা রাখবেন।

    রোজা একজন ব্যক্তির জন্য একটি বিশেষ প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে ভর্তি হওয়া। রোজার দিনগুলোতে একজন ব্যক্তি তার সব সময় প্রশিক্ষণে ব্যয় করেন এবং জানতে চান, একজন মানুষের সীমারেখা; সে কতদূর যেতে পারে এবং কোথায় যেতে পারে না, কীভাবে থাকা উচিৎ হবে এবং কীভাবে থাকা উচিৎ নয়।

    রোজার উদ্দেশ্য হলো, একজন ব্যক্তির প্রতিদিনের রুটিনে ‘আপনি কি করতে পারবেন এবং কি করতে পারবেন না’-এর বিষয়টি উত্থাপন করে তার স্থায়ী মানসিকতা তৈরি করা। এটি নীতিগত জীবনের প্রশিক্ষণ। আর এ ধরনের নীতিগত জীবন প্রতিটি মোমিনের সারা জীবনের জন্য প্রয়োজন।

  • ক্ষমার দশকে মুমিনের দোয়া

    ক্ষমার দশকে মুমিনের দোয়া

    মাগফেরাত তথা ক্ষমার দশক হিসেবে পরিচিত রমজানের দ্বিতীয় দশক। আজ দ্বিতীয় দশকের প্রথম দিন। ক্ষমার দশকে রমজানের বিশেষ ফজিলত হলো- গুনাহমুক্ত জীবন পাওয়া। ক্ষমার এ দশকে মহান রবের কাছে নিজেদের গুনাহগুলো মাফ করিয়ে নেওয়াই রোজাদারের জন্য সর্বোত্তম সময়। মাগফেরাতের এ দশকে যেন রোজাদার মাত্রই গুনাহ থেকে মুক্তি পায়। এ দশকে ক্ষমা পেতে কী পড়বেন রোজাদার মুমিন?

    ক্ষমার এ দশকে শারীরিক প্রতি অঙ্গকে গুনাহ থেকে বিরত রাখাই প্রথম কাজ। চোখ, কান, মুখ, হাত-পাসহ প্রতিটি অঙ্গকে গুনাহের কাজ থেকে মুক্ত রাখা। সব সময় তাসবির মতো ছোট্ট এ ক্ষমা প্রার্থনার দোয়াটি বেশি বেশি পড়া-

    উচ্চারণ : ‘আল্লাহুম্মাগফিরলানা; ফা-ইন্নাকা খাইরুল গাফিরিন।’

    অর্থ : ‘হে আল্লাহ! আপনি আমাদের ক্ষমা করে দিন; আপনিই তো সর্বোত্তম ক্ষমাকারী।’

    ক্ষমা পাওয়ার উপায় কী?

    এ দশকে রোজা পালনের পাশাপাশি আল্লাহর কাছে ক্ষমা পাওয়ার সর্বোত্তম মাধ্যম কী? আল্লাহ তাআলা কোন কোন আমল ও দোয়ায় বান্দাকে ক্ষমা করে দেন? আল্লাহর কাছে ক্ষমা পাওয়ার দোয়াগুলোই বা কী?

    ক্ষমা পাওয়ার অন্যতম মাধ্যম আল্লাহর কাছে তাওবা করা। রোজা রেখে প্রথমত নিজেকে অন্যায় ও গুনাহের কাজ থেকে বিরত রাখা। তারপর ক্ষমা চেয়ে আল্লাহর দিকে ফিরে আসা। এটি ক্ষমা পাওয়ার অন্যতম উপায়।

    কোরআন ও সুন্নায় বেশি বেশি তাওবা-ইসতেগফার করার ব্যাপারে বিশেষভাবে তাগিদ দেওয়া হয়েছে। কেননা গুনাহমুক্ত জীবনের অন্যতম উপায় হচ্ছে তাওবা-ইসতেগফার করা। আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেন-

    وَمَن يَعْمَلْ سُوءًا أَوْ يَظْلِمْ نَفْسَهُ ثُمَّ يَسْتَغْفِرِ اللّهَ يَجِدِ اللّهَ غَفُورًا رَّحِيمًا

    ‘যে গুনাহ করে কিংবা নিজের অনিষ্ট করে, এরপর আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে, সে আল্লাহকে ক্ষমাশীল, করুণাময় পায়।’ (সুরা নিসা : আয়াত ১১০)

    وَتُوْبُوْا إِلَى اللهِ جَمِيْعاً أَيُّهَا الْمُؤْمِنُوْنَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُوْنَ

    ‘(হে মুমিনগণ!) তোমরা সবাই আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন করো, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার।’ (সুরা নুর : আয়াত ৩১)

    রমজানের এ দশকে ক্ষমা পেতে বেশি বেশি তাওবা-ইসতেগফার করা জরুরি। ক্ষমার দশকে যেসব তাওবা-ইসতেগফার করার মাধ্যমে বিগত জীবনের গুনাহ থেকে মুক্তির আশা করা যায়; সেসব ছোট-বড় তাওবা-ইসতেগফার তুলে ধরা হলো-

    ১. أَستَغْفِرُ اللهَ

    উচ্চারণ : ‘আস্তাগফিরুল্লাহ।’

    অর্থ : আমি আল্লাহর ক্ষমা প্রার্থনা করছি।

    নিয়ম : প্রতি ওয়াক্ত ফরজ নামাজের সালাম ফেরানোর পর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ ইসতেগফারটি ৩ বার পড়তেন।’ (মিশকাত)

    ২. أَسْتَغْفِرُ اللهَ وَأَتُوْبُ إِلَيْهِ

    উচ্চারণ : ‘আস্তাগফিরুল্লাহা ওয়া আতুবু ইলাইহি।’

    অর্থ : আমি আল্লাহর ক্ষমা প্রার্থনা করছি এবং তাঁর দিকেই ফিরে আসছি।

    নিয়ম : এ ইসতেগফারটি প্রতিদিন ৭০/১০০ বার পড়া। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রতিদিন ৭০ বারের অধিক তাওবাহ ও ইসতেগফার করতেন।’ (বুখারি)

    ৩. رَبِّ اغْفِرْ لِيْ وَتُبْ عَلَيَّ إِنَّكَ (أنْتَ) التَّوَّابُ الرَّحِيْمُ

    উচ্চারণ : ‘রাব্বিগ্ ফিরলি ওয়া তুব আলাইয়্যা ইন্নাকা (আংতাত) তাওয়্যাবুর রাহিম।’

    অর্থ : ‘হে আমার প্রভু! আপনি আমাকে ক্ষমা করুন এবং আমার তাওবাহ কবুল করুন। নিশ্চয় আপনি মহান তাওবা কবুলকারী করুণাময়।’

    নিয়ম : রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মসজিদে বসে এক বৈঠকেই এই দোয়া ১০০ বার পড়েছেন।’ (আবু দাউদ, ইবনে মাজাহ, তিরমিজি, মিশকাত)

    ৪. أَسْتَغْفِرُ اللَّهَ الَّذِي لاَ إِلَهَ إِلاَّ هُوَ الْحَىُّ الْقَيُّومُ وَأَتُوبُ إِلَيْهِ

    উচ্চারণ : ‘আস্‌তাগফিরুল্লা হাল্লাজি লা ইলাহা ইল্লা হুওয়াল হাইয়্যুল কইয়্যুমু ওয়া আতুবু ইলায়হি।’

    অর্থ : ‘আমি ওই আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাই, যিনি ছাড়া প্রকৃতপক্ষে কোনো মাবুদ নেই, তিনি চিরঞ্জীব, চিরস্থায়ী এবং তাঁর কাছেই (তাওবাহ করে) ফিরে আসি।’

    নিয়ম : দিনের যে কোনো ইবাদত-বন্দেগি তথা ক্ষমা প্রার্থনার সময় এভাবে তাওবাহ-ইসতেগফার করা। হাদিসে এসেছে- এভাবে তাওবাহ-ইসতেগফার করলে আল্লাহ তাআলা তাকে ক্ষমা করে দেবেন, যদিও সে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পলায়নকারী হয়।’ (আবু দাউদ, তিরমিজি, মিশকাত)

    ৫. সাইয়েদুল ইসতেগফার পড়া

    اللَّهُمَّ أَنْتَ رَبِّي لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ خَلَقْتَنِي وَأَنَا عَبْدُكَ وَأَنَا عَلَى عَهْدِكَ وَوَعْدِكَ مَا اسْتَطَعْتُ أَعُوذُ بِكَ مِنْ شَرِّ مَا صَنَعْتُ أَبُوءُ لَكَ بِنِعْمَتِكَ عَلَيَّ وَأَبُوءُ لَكَ بِذَنْبِي فَاغْفِرْ لِي فَإِنَّهُ لَا يَغْفِرُ الذُّنُوبَ إِلَّا أَنْتَ

    উচ্চারণ : আল্লাহুম্মা আংতা রাব্বি লা ইলাহা ইল্লা আংতা খালাক্কতানি ওয়া আনা আবদুকা ওয়া আনা আলা আহ্দিকা ওয়া ওয়াদিকা মাসতাতাতু আউজুবিকা মিন শাররি মা সানাতু আবুউলাকা বিনিমাতিকা আলাইয়্যা ওয়া আবুউলাকা বিজাম্বি ফাগ্ফিরলি ফা-ইন্নাহু লা ইয়াগফিরুজ জুনুবা ইল্লা আংতা।’

    অর্থ : ‘হে আল্লাহ! তুমিই আমার প্রতিপালক। তুমি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই। তুমিই আমাকে সৃষ্টি করেছ। আমি তোমারই বান্দা আমি যথাসাধ্য তোমার সঙ্গে প্রতিজ্ঞা ও অঙ্গীকারের উপর আছি। আমি আমার সব কৃতকর্মের কুফল থেকে তোমার কাছে আশ্রয় চাই। তুমি আমার প্রতি তোমার যে নেয়ামত দিয়েছ তা স্বীকার করছি। আর আমার কৃত গোনাহের কথাও স্বীকার করছি। তুমি আমাকে ক্ষমা করে দাও। কারন তুমি ছাড়া কেউ গোনাহ ক্ষমা করতে পারবে না।’

    নিয়ম : সকালে ও সন্ধ্যায় এ ইসতেগফার করা। ফজর ও মাগরিবের নামাজের পর এ ইসতেগফার পড়তে ভুল না করা। কেননা হাদিসে এসেছে- যে ব্যক্তি এ ইসতেগফার সকালে পড়ে আর সন্ধ্যার আগে মারা যায় কিংবা সন্ধ্যায় পড়ে সকাল হওয়ার আগে মারা যায়, তবে সে জান্নাতে যাবে।’ (বুখারি)

    এছাড়াও ওঠা-বসায় এভাবেও তাওবা-ইসতেগফার করা যেতে পারে। তাহলো-

    ৬. اَسْتَغْفِرُ اللهَ رَبِّىْ مِنْ كُلِّ ذَنْبٍ وَ اَتُوْبُ اِلَيْهِ

    উচ্চারণ : ‘আসতাগফিরুল্লাহ রব্বি মিন কুল্লি যামবিন ওয়াতুবু ইলাইহি।’

    অর্থ : ‘আমি আমার প্রভু আল্লাহর কাছে আমার সমুদয় পাপের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করছি এবং তারই দিকে প্রত্যাবর্তন করছি।’

    ৭. سَمِعْنَا وَأَطَعْنَا غُفْرَانَكَ رَبَّنَا وَإِلَيْكَ الْمَصِيرُ

    উচ্চারণ : ‘সামি’না ওয়া আতানা গুফরানাকা রাব্বানা ওয়া ইলাইকাল মাসির।’

    অর্থ : ‘আমরা (আল্লাহ তাআলার আদেশ) শুনলাম ও মানলাম, হে আমাদের প্রভু-প্রতিপালক! আমরা তোমারই কাছে ক্ষমা চাই আর তোমারই দিকে সবার ফিরে যেতে হবে।’ (সুরা বাকারা: আয়াত ২৮৫)

    ৮. رَبَّنَا مَا خَلَقْتَ هَذا بَاطِلاً سُبْحَانَكَ فَقِنَا عَذَابَ النَّارِ

    উচ্চারণ : ‘রাব্বানা মা খালাকতা হাজা বাতিলাং সুবহানাকা ফাকিনা আজাবান নার।’

    অর্থ : ‘হে আমাদের প্রভু! তুমি এ বিশ্বজগতকে বৃথা সৃষ্টি করনি। তুমি পবিত্র। সুতরাং তুমি আমাদের আগুনের শাস্তি থেকে রক্ষা কর।’ (সুরা আল-ইমরান : আয়াত ১৯১)

    ৯. لَئِن لَّمْ يَرْحَمْنَا رَبُّنَا وَيَغْفِرْ لَنَا لَنَكُونَنَّ مِنَ الْخَاسِرِينَ

    উচ্চারণ : ‘লা ইল্লাম ইয়ারহামনা রাব্বুনা ওয়া ইয়াগফির লানা লানাকুনান্না মিনাল খাসিরিন।’

    অর্থ : ‘আমাদের প্রতিপালক! আমাদের ওপর যদি কৃপা না করেন এবং আমাদের ক্ষমা না করেন তাহলে অবশ্যই আমরা ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হব।’ (সুরা আরাফ : আয়াত ১৪৯)

    বিশেষ করে হজরত আদম আলাইহিস সালাম যে দোয়া পাঠ করার ফলে আল্লাহ তাআলার ক্ষমার কাছে ক্ষমা পান। সেটিও বেশি বেশি করা যেতে পারে-

    ১০. رَبَّنَا ظَلَمْنَا أَنفُسَنَا وَإِن لَّمْ تَغْفِرْ لَنَا وَتَرْحَمْنَا لَنَكُونَنَّ مِنَ الْخَاسِرِينَ

    উচ্চারণ : ‘রাব্বানা যালামনা আনফুসানা ওয়া ইল্লাম তাগফির লানা ওয়া তারহামনা লানাকুনান্না মিনাল খাসিরিন।’

    অর্থ : ‘হে আমাদের প্রভু-প্রতিপালক! নিশ্চয় আমরা আমাদের প্রাণের ওপর অত্যাচার করেছি আর তুমি যদি আমাদেরকে ক্ষমা না কর ও আমাদের প্রতি কৃপা না কর তাহলে অবশ্যই আমরা ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাব।’ (সুরা আরাফ : আয়াত ২৩)

    মনে রাখা জরুরি

    কোনো রোজাদারই যেন ক্ষমার দশকের আল্লাহর ক্ষমা থেকে বঞ্চিত না হয়। রমজানের গুরুত্বপূর্ণ সময়গুলো যে বৃথা নষ্ট না হয়। শারীরিক, বাহ্যিক ও আত্মিক সব ধরনের গুনাহ ও অন্যায় থেকে বিরত থেকে তাওবা-ইসতেগফার, ইফতার-সেহরি, তারাবি-তাহাজ্জুদে নিয়োজিত থাকা। আর তাতেই মিলবে মহান রবের পক্ষ থেকে ক্ষমা। রোজাদার মুমিন হবেন সফল।

    আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহকে ক্ষমার দশকে কোরআন-সুন্নায় বর্ণিত তাওবা-ইসতেগফার ও ইবাদত-বন্দেগিতে অতিবাহিত করার তাওফিক দান করুন। গুনাহমুক্ত হয়ে পবিত্র জীবন পাওয়ার তাওফিক দান করুন। আমিন।

  • মুখেরও রোজা আছে

    মুখেরও রোজা আছে

    মানুষের যত সওয়াব বা গোনাহ হয়, এর অন্যতম মাধ্যম কথা বা জবান। জবান বা কথার কারণে মানুষ সওয়াব যেমন অর্জন করতে পারে, তেমনি গোনাহ কামাইও করতে পারে। এ কারণে কথা বা জবানের বিষয়ে সতর্ক থাকার জন্য পবিত্র কোরআন ও হাদিসে বারবার তাগিদ এসেছে। রোজা পালনকালে কথা বা জবানের ব্যাপারে অধিকতর সর্তকতা কাম্য।

    জিহ্বা দিয়ে যেসব পাপ
    জিহ্বা দিয়ে ১৯টি পাপ সংঘটিত হয়—
    ১) কারও নাম খারাপ করে ডাকা বা নাম ব্যঙ্গ করা।
    ২) খারাপ ঠাট্টা বা বিদ্রূপ করা।
    ৩) অশ্লীল ও খারাপ কথা বলা।
    ৪) কাউকে গালি দেওয়া।
    ৫) কারও নিন্দা করা।
    ৬) অপবাদ দেওয়া।
    ৭) চোগলখুরি করা।
    ৮) বিনা প্রয়োজনে গোপনীয়তা ফাঁস করে দেওয়া।
    ৯) মোনাফিকি করা ও দুই মুখে (দ্বিমুখী) কথা বলা।
    ১০) বেহুদা ও অতিরিক্ত কথা বলা।
    ১১) বাতিল ও হারাম জিনিস নিয়ে আলোচনা করে আনন্দ লাভ করা।
    ১২) কারও গিবত করা।
    ১৩) খারাপ উপনামে ডাকা।
    ১৪) কাউকে অভিশাপ দেওয়া।
    ১৫) কাউকে সামনাসামনি বা সম্মুখে প্রশংসা করা।
    ১৬) মিথ্যা স্বপ্ন বলা।
    ১৭) অনর্থক চিৎকার বা চেঁচামিচি করা।
    ১৮) জিহ্বা দিয়ে হারাম বস্তুর স্বাদ নেওয়া, গ্রহণ করা বা খাওয়া।
    ১৯) জিহ্বা দিয়ে খারাপ অর্থে কাউকে কোনো ভঙ্গি করা বা দেখানো।

    জবানের জন্য সদা প্রস্তুত প্রহরী
    পবিত্র কোরআনে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘মানুষ যে কথাই উচ্চারণ করে না কেন, তা লেখার জন্য তৎপর প্রহরী তার কাছে প্রস্তুত আছে।’ (সুরা কফ : ১৮)। অর্থাৎ মানুষ যখন যা বলে, চাই তা ভালো হোক বা মন্দ, তা লেখার জন্য সদা প্রস্তুত প্রহরী নিযুক্ত রয়েছে। তাই কথা বলার ক্ষেত্রে আমাদের অত্যধিক সতর্কতা কাম্য।

    জান্নাতের নিশ্চয়তা
    উবাদা ইবনে সামিত (রা.) বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘যে ব্যক্তি দুই চোয়ালের মধ্যবর্তী অঙ্গ জিহ্বা এবং দুই পায়ের মধ্যবর্তী অঙ্গ গুপ্তাঙ্গ সম্পর্কে নিশ্চয়তা দেবে, আমি তার জান্নাতের নিশ্চয়তা দেব।’ (বোখারি : ৬৪৭৪)। আসলাম (রা.) বলেন, একবার ওমর (রা.) আবু বকর (রা.)-এর কাছে গিয়ে দেখলেন, তিনি নিজের জিহ্বা টানছেন। তখন ওমর (রা) বললেন, ‘বিরত হোন। মহান পরওয়ারদেগার আপনাকে মাফ করুন। বলুন কী হয়েছে?’ আবু বকর (রা.) বললেন, ‘এ জিহ্বাই আমাকে ধ্বংসের পথে নামিয়ে দিয়েছে।’ (মুআত্তায়ে মালেক)।

    মোমিন মিথ্যা বলতে পারে না
    সাফওয়ান ইবনে সুলাইম (রা.) সূত্রে বর্ণিত; একবার রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করা হলো, ‘মোমিন ভীরু হতে পারে কি-না?’ তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ।’ তাকে আরও জিজ্ঞেস করা হলো, ‘মোমিন কৃপণ হতে পারে কি-না?’ তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ।’ আবার জিজ্ঞেস করা হলো, ‘মোমিন মিথ্যাবাদী হতে পারে কি?’ তিনি বললেন, ‘না।’ (সুনানে বায়হাকি)। অর্থাৎ একজন মুসলমান অন্যান্য গোনাহ করলেও মিথ্যা বলার মতো ভয়াবহ গোনাহ করতে পারে না।

    জ্ঞানীরা কম কথা বলেন
    বিশিষ্ট ইসলামি চিন্তাবিদগণ সর্বসম্মতভাবে এ কথা বলেছেন, ‘কথা বা শব্দের পদস্খলনই বিপদ বা ধ্বংসের কারণ। জ্ঞানী ও বিচক্ষণ মানুষ সবসময় কম কথা বলেন। কথা মেপে মেপে বলেন। কারণ, অহেতুক ও অপ্রয়োজনীয়ভাবে বেশি কথা বললে ভুল, মিথ্যা বা বিপজ্জনক কথা বের হওয়ার আশঙ্কা অধিক। ফলে ঈমানদার, প্রজ্ঞাবান ও সচেতন মানুষ কম কথা বলেন। তারা সর্বদা আল্লাহতায়ালার জিকিরে জিহ্বাকে ব্যস্ত রাখেন।’

    ভালো কথার পুরস্কার ও খারাপ কথার শাস্তি
    আল্লাহতায়ালার ভয়ে জ্ঞানীরা কথা বলার সময় বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করেন। মিথ্যা, মন্দ, অশ্লীল ও অহেতুক কথা থেকে নিজেকে হেফাজত রাখার জন্য সবসময় অস্থির থাকেন। কারণ, তারা জানেন, প্রতিটি কথাই লিপিবদ্ধ হয়। সে অনুযায়ী ভালো কথার পুরস্কার ও খারাপ কথার শাস্তি দেওয়া হয়। এ জন্য তারা আল্লাহতায়ালার জিকির, ভালো কথার বাইরে প্রয়োজন ছাড়া কথা বলেন না। বরং অধিকাংশ সময়ে নিশ্চুপ থেকে দ্বীন সম্পর্কে ভাবনা-চিন্তা করেন।

    জবানকে চক্রান্ত ও অপরের ক্ষতির জন্য ব্যবহার
    পক্ষান্তরে আরেকদল আছে, যারা নিজের কথা বা জিহ্বার লাগাম ছেড়ে দেয়। সবসময় অহেতুক, অপ্রয়োজনীয় বা অশ্লীল কথা বলতে পরোয়া করে না। সুযোগ পেলেই গিবত-পরচর্চা, মিথ্যাচার, ষড়যন্ত্র করতে পিছপা হয় না। জবানকে তারা চক্রান্ত ও অপরের ক্ষতির কাজেই নিয়োজিত করতে সাময়িক তৃপ্তি পায়। এমন লোকের সংখ্যা সমাজে অনেক। অথচ হাদিসে সুস্পষ্ট ভাষায় হুশিয়ারি উচ্চারণ করা হয়েছে।

    প্রকৃত মুসলমানের স্বরূপ
    প্রতিদিন আমরা সবার সঙ্গে কমবেশি কথা বলি। কথা বলার মধ্যে অনেক সময় ভুল-ত্রুটি হয়। ইচ্ছায়-অনিচ্ছায়, হাসি-তামাশায় কখনও কখনও অসত্য কথাও মুখ দিয়ে বেরিয়ে যায়। যা ইসলামের দৃষ্টিতে হারাম ও নিষিদ্ধ। পবিত্র জিহ্বা দিয়ে যখন অপবিত্র মিথ্যা কথা বেরিয়ে আসে, তখন সমাজ ও সংসারে তৈরি হয় নতুন সমস্যা। জিহ্বার হেফাজত করার ব্যাপারে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যথেষ্ট গুরুত্বারোপ করেছেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘প্রকৃত মুসলমান সেই ব্যক্তি, যার জবান ও হাত দ্বারা অন্য মুসলমান নিরাপদ থাকে।’ (বোখারি : ৬৪৮৪)।

    উত্তম কথা বলার তাগিদ
    কথা বা জবানের ব্যাপারটি কত গুরুত্বপূর্ণ, তা পবিত্র কোরআনের বিভিন্ন আয়াত থেকেও জানা যায়। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘হে নবী! আমার বান্দাদের বলে দিন, তারা যেন কথা বলার সময় এমন সব কথা বলে, যা উত্তম। কেননা, শয়তান তাদের মাঝে বিভেদ সৃষ্টির প্রতি উৎসাহিত করে।’ (সুরা বনি ইসরাইল : ১২)।

    জবানই বিশৃঙ্খলা ও শাস্তির কারণ
    আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘একজন আরেকজনের গিবত কোরো না। তোমাদের কেউ কি তার মৃত ভাইয়ের গোশত খেতে পছন্দ করবে। আর অবশ্যই তোমরা তা অত্যন্ত ঘৃণা করো।’ (সুরা হুজরাত : ১২)। অতএব, কথা বলার বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ভুল বা বিপজ্জনক কথা, যেমন—মিথ্যা, গিবত, কুটনামি ইত্যাদি কথার মাধ্যমে প্রকাশ পেলে তা অশেষ বিশৃঙ্খলা ও শাস্তির কারণ।

    কথায় হোক সতর্কতা
    কথার দ্বারা কমপক্ষে দশটি বিপদের বিষয়ে ইসলামি স্কলারগণ সতর্ক করেছেন। সেগুলো হলো—মিথ্যা, গিবত, চোগলখোরি, বেহুদা বকবকানি, গালি-গালাজ, অশ্লীলতা, অভিসম্পাত, ঠাট্টা-বিদ্রুপ, উস্কানি, হিংসা-বিদ্বেষ প্রচার ইত্যাদি। যারা অসতর্ক হয়ে নিজের মনের খেয়ালে ও বেপরোয়া-লাগামহীনভাবে কথা বলে, তাদের দ্বারা এসব বিপদ ঘটার আশঙ্কা সর্বাধিক।

    অহেতুক কথা সামাজিক বিশৃঙ্খলার কারণ
    কখনও এমন হয়, বলতে বলতে বেশি কথা বলাটাই কিছু মানুষের অভ্যাস হয়ে যায়। সাধারণ কাজের মতোও সে তখন মিথ্যা, গিবত ইত্যাদি বলতে থাকে। এগুলো যে চরম অপরাধ ও গোনাহের কাজ, তা অনুধাবণ করার মতো ক্ষমতা বা মানসিক পরিস্থিতিও তার থাকে না। বেশি কথা বলার কু-অভ্যাসের দাস হয়ে সে প্রতিদিনই নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে আজেবাজে ও অহেতুক কথা বলে সামাজিক বিশৃঙ্খলার কারণ এবং গোনাহের ভাগীদার হতে থাকে।

    রমজান ও কথা
    রমজান মাসে কৃচ্ছ্বতার সময়ও কারও কারও মধ্যে কথাবার্তায় বেপরোয়া ভাব দেখা যায়। অকাতরে মিথ্যা, গিবত, চোগলখোরি, বেহুদা বকবকানি, গালি-গালাজ, অশ্লীলতা, অভিসম্পাত, ঠাট্টা-বিদ্রুপ, উস্কানি, হিংসা-বিদ্বেষ প্রচার, কুৎসা, পরচর্চা ইত্যাদির মাধ্যমে অন্য মানুষের এবং নিজের বিপদ সৃষ্টি এবং আশপাশের পরিবেশ বিনষ্ট করতে অনেকেই তৎপর হয়। সারা বছরের বদঅভ্যাসের দাস হয়ে রমজানের পবিত্র পরিবেশকেও বিনষ্টে কেউ কেউ তৎপর হয়। অথচ তাদের রোজা কতটুকু কাজে আসবে, সে ব্যাপারে তারা মোটেও ভাবনা-চিন্তা করে না।

    এসব অপকর্মের মাধ্যমে রোজা নষ্টের পাশাপাশি অন্য রোজাদারকে কষ্ট দিয়ে অধিক গোনাহের ভাগীদার হয় সেসব দুর্ভাগা লোক। ফলে রোজার সময় শারীরিক সংযমের সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন অঙ্গ তথা জবানের নিয়ন্ত্রণ করা একান্ত জরুরি। মাহে রমজানের জবান বা কথার অপব্যবহারের ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করা বিশেষভাবে অপরিহার্য্য।

  • ইফতার ও সেহরির সময়সূচি : ১০ রমজান

    ইফতার ও সেহরির সময়সূচি : ১০ রমজান

    আজ মঙ্গলবার, ১০ রমজান ১৪৪৩ হিজরি, ১২ এপ্রিল ২০২২ইং। ইসলামিক ফাউন্ডেশন কর্তৃক ঘোষিত ঢাকা ও তার পাশ্ববর্তী এলাকার জন্য আজকের ইফতার ও সেহরির (১১ রমজানের) সময়সূচি এবং ইফতারের দোয়া ও রোজার নিয়ত তুলে ধরা হলো-

    ইফতার – ৬:২৩ মিনিট।
    সেহরির শেষ সময় (১১ রমজান, ১৩ এপ্রিল) – ৪:১৭ মিনিট।

    তবে দূরত্ব অনুযায়ী ঢাকার সময়ের সঙ্গে সর্বোচ্চ ১১ মিনিট পর্যন্ত যোগ করে ও ১০ মিনিট পর্যন্ত বিয়োগ করে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ সেহরি ও ইফতার করতে হবে বলে জানিয়েছে ইসলামিক ফাউন্ডেশন।

    ইফতারের দোয়া
    بِسْمِ الله – اَللَّهُمَّ لَكَ صُمْتُ وَ عَلَى رِزْقِكَ وَ اَفْطَرْتُ
    উচ্চারণ : ‘বিসমিল্লাহি – আল্লাহুম্মা লাকা সুমতু, ওয়া আলা রিযক্বিকা আফত্বারতু।’
    অর্থ : ‘আল্লাহর নামে (শুরু করছি); হে আল্লাহ! আমি তোমারই জন্য রোজা রেখেছি এবং তোমারই দেওয়া রিজিক দ্বারা ইফতার করছি। (আবু দাউদ, মিশকাত)

    সেহরির পর রোজার নিয়ত
    بِصَوْمِ غَدًا نَوَيْتُ مِنْ شَهْرِ رَمَضَان
    উচ্চারণ : ‘বিসাওমি গাদান নাওয়াইতু মিন শাহরি রামাদান।
    অর্থ : আমি রমজান মাসের আগামীকালের রোজা রাখার নিয়ত করছি।

  • রহমত শেষ হয়ে মাগফিরাতের বৃষ্টি ঝরবে আজ

    রহমত শেষ হয়ে মাগফিরাতের বৃষ্টি ঝরবে আজ

    মাহে রমজানের রহমতের দশক শেষ আজ। সন্ধ্যা থেকেই শুরু হবে মাগফিরাতের দশক। দুনিয়ার সব গোনাহগার মানুষের জন্য চিরস্থায়ী শান্তি ও মুক্তির দিশারী এ মাগফিরাতের দশক। এ দশকে বান্দার ক্ষমা লাভ আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘রমজানের প্রথম ১০ দিন রহমতের, দ্বিতীয় ১০ দিন মাগফিরাত লাভের এবং তৃতীয় ১০ দিন জাহান্নাম থেকে নাজাত প্রাপ্তির।’ (মিশকাত)।

    ক্ষমা লাভের আবেদন
    মোমিন ব্যক্তি সারা বছরের নেকি ও পুণ্যের ঘাটতি পূরণের জন্য প্রানান্তকর চেষ্টা-সাধনা করেন এ রমজান মাসে। যে চেষ্টা সাধনায় যাবতীয় পাপ-পঙ্কিলতা, অন্যায়, অপরাধমূলক চিন্তাভাবনা ও অসৎ কাজকর্ম থেকে ক্ষমা লাভ হয় এ দশকে। এ জন্য মোমিন বান্দা প্রথম ১০ দিন সব ধরনের অন্যায় থেকে নিজেকে মুক্ত করে আল্লাহর রহমত কামনায় অতিবাহিত করে। ফলে সে আল্লাহর রহমত তথা দয়া, করুণা ও অনুগ্রহ লাভে ধন্য হয়। এমনিভাবে রমজান মাসের দ্বিতীয় ১০ দিন অতিবাহিত করে গোনাহ থেকে ক্ষমা লাভের আবেদন নিয়ে। তখন আল্লাহ রহমতপ্রাপ্তদের গোনাহ মাফ করে দেন।

    মাগফিরাত লাভে করণীয়
    হাদিসে বর্ণিত আছে, রমজান মাসের প্রতি রাতেই একজন ফেরেশতা ঘোষণা করতে থাকেন, ‘হে পুণ্য অন্বেষণকারী! অগ্রসর হও। হে পাপাচারী! থামো, চোখ খোলো।’ তিনি আবার ঘোষণা করেন, ‘ক্ষমাপ্রার্থীকে ক্ষমা করা হবে। অনুতপ্তের অনুতাপ গ্রহণ করা হবে। প্রার্থনাকারীর প্রার্থনা কবুল করা হবে।’ সুতরাং মাগফিরাত বা ক্ষমা লাভে প্রত্যাশী এ দশকের প্রতি রাতেই গোনাহ মাফে রোনাজারি করবে। আশা করা যায়, রমজানে হাদিসের আমল আল্লাহতায়ালা কবুল করবেন।

    মাগফিরাত পেতে আমল
    মাগফিরাত প্রত্যাশী মোমিন বান্দার উচিত, আজ সন্ধ্যা থেকেই তারাবির নামাজ যথাযথ আদায় করে চোখের পানি ফেলে আল্লাহর কাছে রোনাজারি করা, অসহায় ব্যক্তিদের ইফতার করানোর মাধ্যমে গোনাহ মাফের চেষ্টা করা, রাতের ইবাদত-বন্দেগির সঙ্গে সঙ্গে রাতে আল্লাহর সাহায্য কামনায় হাদিসের ওপর আমল করা। তবেই মাগফিরাত বা গোনাহ থেকে ক্ষমা লাভ করা সম্ভব। আল্লাহতায়ালা মুসলিম উম্মাহকে মাগফিরাতের দশকে ক্ষমা লাভ করার তৌফিক দান করুন। আমিন।

    যাদের জন্য ধ্বংস অনিবার্য
    রমজানের রোজা হলো, গোনাহ মাফ এবং মাগফিরাত লাভের মধ্য দিয়ে চিরশান্তি, চিরমুক্তির একটি সুনিশ্চিত ব্যবস্থা, অতি নির্ভরযোগ্য এক সুযোগ। কিন্তু যে বা যারা এ সুযোগের সদ্ব্যবহার না করে, তার ধ্বংস অনিবার্য; তার বিপদ অবশ্যম্ভাবী। কেননা, ইমাম বোখারি (রহ.) রচিত আল মুফরাদ গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে, জাবের ইবনে আবদুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, জিবরাইল (আ.) এসে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বললেন, ‌ধ্বংস হোক ওই ব্যক্তি, যে রমজান মাস পাওয়ার পরও নিজের গোনাহ মাফ করিয়ে নিতে পারল না। তখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘আমিন’। আরেক হাদিসে এসেছে, ‘যে ব্যক্তি রমজান মাস পেল, কিন্তু এ মাসেও তাকে ক্ষমা করা হলো না; সে আল্লাহতায়ালার রহমত থেকে চিরবঞ্চিত ও বিতাড়িত।’ (মুসতাদরাকে হাকিম)।

    প্রথম দশকের আমলে নির্ভর ক্ষমা
    মাগফিরাত মানে ক্ষমা। নিজের কৃতকর্মের জন্য ক্ষমা চাওয়া। খারাপ কাজগুলো পরিহার করে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতে হবে। নিয়মকানুন মেনেই আমরা রোজা পালন করে আসছি। কিন্তু মিথ্যা কথা, কুটনামি করা, গিবত বা পরনিন্দা করা, মিথ্যা কসম খাওয়া, কুনজর বা কামুক দৃষ্টিতে তাকানো—এসব খারাপ দিকগুলো কি পরিহার করতে পেরেছি? এ খারাপ বিষয়গুলো রোজাকে ধ্বংস করে দেয়। রমজানের প্রথম দশকে আমল শুদ্ধ করার ওপর নির্ভর করে ক্ষমার সুসংবাদ।

    ক্ষমা লাভের বিশেষ দোয়া
    মাগফিরাতের দশকে ক্ষমা লাভের একটি দোয়া আমরা বেশি বেশি করতে পারি। তা হলো—
    আল্লাহুম্মা হাব্বিব ইলাইয়্যা ফি-হিল ইহসান; ওয়া কাররিহ ফিহিল ফুসুক্বি ওয়াল ই’সইয়ান; ওয়া হাররিম আলাইয়্যা ফি-হিস সাখাত্বা ওয়ান নিরানা বিআ’ওনিকা ইয়া গিয়াছাল মুসতাগিছিন।
    অর্থ : হে আল্লাহ! এ দিনে সৎ কাজকে আমার কাছে প্রিয় করে দাও। আর অন্যায় ও নাফরমানিকে অপছন্দনীয় করো। তোমার অনুগ্রহের উসিলায় আমার জন্য তোমার ক্রোধ ও যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি হারাম করে দাও। হে আবেদনকারীদের আবেদন শ্রবণকারী!

    আল্লাহতায়ালা রমজান মাসের রোজা পালন, ইবাদাত-বন্দেগি ও দোয়া-ইস্তিগফারের মাধ্যমে মুসলিম উম্মাহকে ক্ষমা করে তাঁর আনুগত্যশীল বান্দাদের মধ্যে শামিল হওয়ার তৌফিক দান করুন। আমিন।