Category: ধর্ম

  • প্রিয় নবী (সা.)-এর অসিয়ত

    প্রিয় নবী (সা.)-এর অসিয়ত

    তোমার ঈমানকে খাঁটি করো

    ঈমানের প্রথম শর্ত হলো, মহান আল্লাহকে একমাত্র রব ও রাসুল (সা.)-কে তাঁর প্রেরিত শেষ ও শ্রেষ্ঠ নবী হিসেবে স্বীকার করে নেওয়া। যদি কেউ এর কোনো একটি অস্বীকার করে, তবে সে মুসলিম থাকতে পারে না। তারা কঠিন কিয়ামতের দিন রাসুল (সা.)-এর সুপারিশের ভাগীদার হবে না। কারণ রাসুল (সা.)-এর সুপারিশ পাওয়ার প্রথম শর্ত হলো ঈমান।

    আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা আল্লাহর রাসুল (সা.)-কে প্রশ্ন করা হলো, হে আল্লাহর রাসুল! কিয়ামতের দিন আপনার সুপারিশ লাভের ব্যাপারে কে সবচেয়ে অধিক সৌভাগ্যবান হবে? আল্লাহর রাসুল (সা.) বললেন, ‘আবু হুরায়রা! আমি মনে করেছিলাম, এ বিষয়ে তোমার আগে আমাকে আর কেউ জিজ্ঞেস করবে না। কেননা আমি দেখেছি হাদিসের প্রতি তোমার বিশেষ লোভ রয়েছে। কিয়ামতের দিন আমার শাফাআত লাভে সবচেয়ে সৌভাগ্যবান হবে সেই ব্যক্তি, যে একনিষ্ঠ চিত্তে বলে—আল্লাহ ছাড়া প্রকৃত কোনো ইলাহ নেই।’ (বুখারি, হাদিস : ৯৯)

    যারা একনিষ্ঠ চিত্তে আমৃত্যু মহান আল্লাহর ওপর ঈমান রাখবে ও তাঁর রাসুল (সা.)-কে শ্রেষ্ঠ ও সর্বশেষ নবী হিসেবে স্বীকার করবে, মহান আল্লাহ তাদের ক্ষমা করে দেবেন। মুআজ ইবনে জাবাল (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যেকোনো ব্যক্তি সর্বান্তঃকরণে এ সাক্ষ্য দিয়ে মারা গেল, ‘আল্লাহ ব্যতীত কোনো ইলাহ নাই এবং আমি আল্লাহর রাসুল’, আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দেন। (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৩৭৯৬)

    এখানে সাক্ষ্য দিয়ে মারা যাওয়ার অর্থ হলো, আমৃত্যু মহান আল্লাহ ও তাঁর রাসুল (সা.)-এর ওপর ঈমান রাখা। এবং ঈমান নিয়ে মৃত্যু বরণ করা। আজীবন আল্লাহ প্রদত্ত কোরআন ও রাসুল (সা.)-এর সুন্নত মোতাবেক আমল করবে। যারা এমনটি করতে পারবে, মহান আল্লাহ জাহান্নাম তাদের জন্য হারাম করে দেবেন।

    উবাদা ইবনে সামিত (রা.) মৃত্যুশয্যায় থাকাকালে সুনাবিহি (রহ.)-কে বলেন, ‘আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে বলতে শুনেছি, যে ব্যক্তি সাক্ষ্য দেবে যে আল্লাহ তাআলা ব্যতীত আর কোনো উপাস্য নাই এবং মুহাম্মদ (সা.) আল্লাহর রাসুল, তার জন্য আল্লাহ তাআলা জাহান্নামকে হারাম করে দেবেন।’ (তিরমিজি, হাদিস : ২৬৩৮)

     

    ঈমানের পরিচয়

    ঈমান খাঁটি করতে হলে আমাদের ঈমানের পরিচয় জানতে হবে। রাসুল (সা.) বলেছেন, ঈমান হচ্ছে আল্লাহ, তাঁর  ফেরেশতাকুল, কিতাবসমূহ, রাসুলগণ ও পরকালের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করা এবং ভাগ্যের ভালো-মন্দের ওপর বিশ্বাস স্থাপন করা (যে সব কিছু আল্লাহর পক্ষ থেকেই হয়)। (মুসলিম, হাদিস : ১) এগুলো হচ্ছে ঈমানের মৌলিক বিষয়। এ ছাড়া ঈমানের আরো বহু শাখা-প্রশাখা রয়েছে। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ঈমানের শাখা ৭০টিরও কিছু বেশি অথবা ৬০টির কিছু বেশি। এর সর্বোচ্চ শাখা হচ্ছে (আল্লাহ ছাড়া প্রকৃত কোনো ইলাহ নেই) এ কথা স্বীকার করা, আর এর সর্বনিম্ন শাখা হচ্ছে রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে ফেলা। আর লজ্জা ঈমানের একটি বিশেষ শাখা। (মুসলিম, হাদিস : ৬৯)

    কেননা সব কিছুর মূলে হলো ঈমান। যদি ঈমান ঠিক না থাকে, তাহলে অন্যান্য আমলও নষ্ট হয়ে যাবে। তাই আমাদের উচিত, আমাদের ঈমানকে পরিশুদ্ধ করার জন্য যা যা প্রয়োজন, তা করা। মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে পরিপূর্ণ ঈমানদার হওয়ার তাওফিক দান করুন।

  • আধুনিক সভ্যতায় মানবিক মূল্যবোধ

    আধুনিক সভ্যতায় মানবিক মূল্যবোধ

    আধুনিক যুগে মানবসভ্যতা যদিও বস্তুগত বিচারে এগিয়ে গেছে এবং মানুষের ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে অনেক ‘নতুন বিষয়’ যুক্ত হয়েছে, তবু সে সেই সোনালি অতীতের কথা ভুলে যেতে পারে না, যখন তাদের জীবনের সব প্রয়োজন পূর্ণ হতো এবং তারা এমন সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির সঙ্গে বসবাস করত, যা শিল্প বিপ্লবোত্তর বস্তুবাদী সভ্যতার স্পর্শের বাইরে ছিল। আর মানুষ মানবিক অধিকার ও দায়িত্বগুলোর প্রতি অনেক বেশি যত্নবান ছিল। ঘরে ও বাইরে সর্বত্র মনুষ্যত্বের গুণাবলি বহন করত এবং সবার সঙ্গে মানবিক সম্পর্ক ও যোগাযোগ বজায় রাখত। মূলত জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিপ্লব মনুষ্যত্বকেই হুমকির মুখে ফেলে দিয়েছে।

    বর্তমান যুগে মানুষ জীবনের সব ক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত উন্নতি অর্জন করেছে এবং করছে। তাদের জীবন এখন প্রযুক্তিনির্ভর। কিছুদিন আগেও ‘পৃথিবী একটি বিশ্বগ্রাম’ এই ধারণা দেওয়া হতো, আর এখন তা বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে। বিজ্ঞান এমন সব প্রযুক্তি উপহার দিয়েছে, যা পৃথিবীর রাজনৈতিক ও ভৌগোলিক সীমাকে প্রতীকে পরিণত করেছে এবং সব দূরত্ব ঘুচিয়ে দিয়েছে। এই সীমা-পরিসীমা অতিক্রম করার মাধ্যমগুলোও সহজলভ্য। অত্যাধুনিক প্রযুক্তির কারণে মানুষ পরস্পরের ‘হৃৎস্পন্দন’ও শুনতে পারে। প্রাচীনকালে কোনো এক আরব কবি বলেন, ‘মানুষের হৃৎস্পন্দন তাকে বলছে জীবন কয়েক মিনিট ও সেকেন্ডের নাম।’

    যদিও এখন দূরত্ব দূর হয়েছে, পরস্পরের সঙ্গে সেকেন্ডে যোগাযোগ করা যাচ্ছে এবং দেশ-মহাদেশ পার হয়ে যাচ্ছে অবলীলায়; কিন্তু তাদের হৃদয়ের মৃত্যু হয়েছে। যেন সারা দেহে, শিরা-উপশিরায় রক্ত চলাচল করছে আর হৃিপণ্ড নির্জীব হয়ে আছে। বড় শহরগুলোয় একই ভবনে বসবাসকারীদের মধ্যে পরিচয় থাকে না। ভবনের নিচতলার অধিবাসী ওপরতলায় বাসকারীকে এবং এক প্রবেশপথ ব্যবহারকারী অন্য প্রবেশপথ ব্যবহারকারীকে চেনার প্রয়োজন বোধ করে না। আধুনিক বিশ্বের আরেক চেহারা এটি। প্রতিবেশী যেখানে অপরিচিতজন এবং সহানুভূতি-মমতাবঞ্চিত। পশুসমাজ যেমন বন্ধনহীন এবং তার চারপাশ সম্পর্কে উদাসীন। আল্লাহ বলেন, ‘তারা পশুতুল্য, বরং তারও অধম এবং তারাই হলো উদাসীন।’ (সুরা : আরাফ, আয়াত : ১৭৯)

    পৃথিবীর প্রাচীন ধর্ম ও সভ্যতাগুলো মানবীয় সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতি থেকে বঞ্চিত হয়েছিল, তারা নিজেদের দ্বন্দ্ব ও বিবাদের দৃষ্টান্তে পরিণত করেছিল। মতবিরোধ ও বিভক্তি, কলহ ও রক্তপাত, ঘৃণা ও বিদ্বেষ তাদের প্রকৃতির রূপ নিয়েছিল। ফলে তাদের জন্য ধ্বংস অনিবার্য হয়ে গিয়েছিল। যেন তাদের পরিণতি ফেরেশতারা আগেই অনুভব করতে পেরেছিল এবং আল্লাহকে বলেছিল, ‘আপনি কি সেখানে এমন কাউকে পাঠাবেন, যারা বিশৃঙ্খলা ও রক্তপাত করবে। অথচ আমরা আপনার সপ্রশংস তাসবিহ পাঠ করি এবং আপনার পবিত্রতা ঘোষণা করি।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ৩০)

    কিন্তু আল্লাহর অভিপ্রায় ছিল ভিন্ন। তিনি বললেন, ‘আমি যা জানি তোমরা তা জানো না।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ৩০)

    আল্লাহ জানতেন রক্তপাত, হানাহানি ও বিবাদ মানুষের প্রকৃতিবিরোধী। সুতরাং পৃথিবীতে এক দল মানুষ বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করলেও অন্যরা হবে তাঁর অনুগত ও মানবীয় মূল্যবোধ ও গুণাবলির অধিকারী। আল্লাহ তাদের সম্পর্কে বলেন, ‘যে আমার পথনির্দেশ অনুসরণ করবে তাদের কোনো ভয় নেই এবং তারা দুশ্চিন্তাগ্রস্তও হবে না।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ৩৮)

    সুতরাং পৃথিবীর মানুষ দুই শ্রেণিতে বিভক্ত : এক. যারা আল্লাহর নির্দেশনা মান্য করে চলে, দুই. যারা আল্লাহর দ্বিন অস্বীকার করে এবং তার অনুগ্রহের অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে। দ্বিতীয় শ্রেণির লোকেরা আসমানি জ্ঞান ও পথনির্দেশকে জাগতিক ও বস্তুগত উন্নয়নের পথে অন্তরায় প্রমাণের চেষ্টা করে। অথচ পার্থিব উন্নয়ন, বৈজ্ঞানিক উৎকর্ষ ও জীবনের গতিশীলতা আল্লাহর প্রতি ঈমান দৃঢ় করে। কেননা বিজ্ঞান তার সামনে সৃষ্টিজগতের রহস্য ও শৃঙ্খলা উন্মোচিত করে। সে জানতে পারে বিশাল সৃষ্টিজগতে মানুষ একটি ক্ষুদ্র আয়োজনমাত্র। আল্লাহ যেমনটি বলেছেন, ‘আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টি মানুষ সৃষ্টির চেয়ে বড় বিষয়। কিন্তু বেশির ভাগ মানুষ তা জানে না।’ (সুরা : গাফির, আয়াত : ৫৭)

    কিন্তু আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান মানুষকে স্রষ্টামুখী করছে না কেন? কারণ প্রবৃত্তিপূজারি মানুষ ভালোমন্দের মাপকাঠিই পরিবর্তন করে ফেলেছে। প্রবৃত্তির অনুসরণ করতে গিয়ে তারা বহু ভাগে বিভক্ত হয়ে গেছে। নিজের মত ও মতাদর্শ বাস্তবায়নের জন্য প্রগতির দোহাই দিচ্ছে এবং আধুনিকতাকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। তারা এমনভাবে কথা বলছে যেন আগের যুগের মানুষ ‘ব্যক্তিস্বাধীনতা’ সম্পর্কে কোনো ধারণা রাখত না। তারা মানুষের প্রকৃতিবিরোধী কাজকে তাদের অধিকার প্রমাণের চেষ্টা করছে। তাদের দাবি ধর্ম, সামাজিক মূল্যবোধ, ইতিহাস-ঐতিহ্য, সভ্যতা ও সংস্কৃতির সব বন্ধন থেকে মুক্ত হয়েই মানুষকে উন্নয়নের রাজপথে হাঁটতে হবে। যে আইন মানুষ তার মানবিক মূল্যবোধ ও হাজার বছরের সামাজিক চর্চা থেকে অর্জন করেছে। আপাতত সুন্দর ‘অবাধ স্বাধীনতা’র দাবি শহর-নগর-গ্রাম সর্বত্র উচ্চকণ্ঠ হচ্ছে এবং স্রষ্টার সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক শিথিল হচ্ছে। একই সঙ্গে ‘আত্মমুখী’ মানবিক মূল্যবোধ, ভালোবাসা, সৌহার্দ্য ও মমত্ব শূন্য হয়ে যাচ্ছে।

    মানবসমাজের এই মানবিক সংকট দূর করতে প্রয়োজন আত্মশুদ্ধি, ঐশী জ্ঞান ও প্রজ্ঞার চর্চা, মানুষের চোখ থেকে মোহের পর্দা দূর করা; সর্বোপরি (জীবনের বাস্তবতা ও মানবপ্রকৃতি সম্পর্কে) অজ্ঞতা ও কুসংস্কার থেকে তাদের বের করে প্রকৃত মুক্তির পথে নিয়ে আসা। নবী-রাসুলদের মাধ্যমে আল্লাহ মানুষকে এই মুক্তির পথেই আহ্বান জানিয়েছেন—যার ভিত্তি ছিল আল্লাহর একত্ববাদ। মহানবী (সা.)-এর মাধ্যমে আল্লাহ তাঁর পূর্ণতা দান করেছেন। জীবনবিধান হিসেবে ইসলামকে আল্লাহ পরিপূর্ণ করেছেন। আল্লাহ ঘোষণা দিয়েছেন, ‘আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বিন পরিপূর্ণ করলাম এবং তোমাদের ওপর আমার অনুগ্রহগুলো পূর্ণ করলাম এবং জীবনবিধান হিসেবে ইসলামকে তোমাদের জন্য মনোনীত করলাম।’ (সুরা : মায়েদা, আয়াত : ৩)

    আল্লাহর আনুগত্য থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া; বিশ্বাস ও চিন্তাগত ঔদ্ধত্যের শিকার মানুষদের এই মানবিক ও সাম্যভিত্তিক সমাজ, আল্লাহর আনুগত্যে ভরপুর অনুগ্রহপ্রাপ্ত জীবন ভালো লাগে না। তারা বন্ধনহীন বিশৃঙ্খল জীবন পছন্দ করে, যা পুরো মানবসভ্যতাকেই বিশৃঙ্খলার মুখে ঠেলে দেয় এবং মানবজাতির ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে টেনে নিয়ে এসেছে। এই ধ্বংসযাত্রা সম্পর্কে নিশ্চিত হয়েও আরো ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে পৃথিবীর পুঁজিপতি ও স্বার্থপর কম্পানিগুলো। আর তাদের সহযোগিতা করছে পোষ্য মিডিয়া। তারা প্রকৃত সত্য আড়াল করে অন্তঃসারশূন্য এক চাকচিক্যময় জীবন মানুষের সামনে তুলে ধরছে এবং মানুষকে তার স্রষ্টা থেকে বিমুখ করে পার্থিব জীবনে আচ্ছন্ন করে রাখছে। মানবজাতির এই সংকটকাল ও এই সময়ের করণীয় সম্পর্কে মহানবী (সা.) বলেন, ‘অন্ধকার রাতের টুকরার মতো বিপর্যয় নেমে আসার আগেই তোমরা সৎকাজের প্রতি অগ্রসর হও। ওই সময় যে ব্যক্তি সকালে মুমিন থাকবে সে সন্ধ্যায় কাফির হয়ে যাবে এবং যে ব্যক্তি সন্ধ্যায় মুমিন থাকবে সে সকালে কাফির হয়ে যাবে। মানুষ দুনিয়াবি স্বার্থের বিনিময়ে তার ধর্ম বিক্রয় করে দেবে।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস : ২১৯৫)

  • মসজিদের দ্বিতীয় জামাতের সময় কি ইকামত লাগে?

    মসজিদের দ্বিতীয় জামাতের সময় কি ইকামত লাগে?

    সমাধান দিয়েছে ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার বাংলাদেশ, বসুন্ধরা, ঢাকা

    প্রশ্ন : মসজিদের দ্বিতীয়বার জামাত করার সময়ও কি ইকামত দিতে হবে?

    —কামরুল হাসান, খলিফাপাড়া, উপশহর, রংপুর।

    উত্তর : যেসব মসজিদের ইমাম-মুয়াজ্জিন নির্ধারিত নেই সেখানে প্রত্যেক জামাতের মধ্যেই ইকামত দেবে। আর সেসব মসজিদের নির্ধারিত ইমাম-মুয়াজ্জিন আছে, সেখানে দ্বিতীয় জামাত করা মাকরূহ। তথাপি কেউ যদি দ্বিতীয় জামাত করে, তখন ইকামত দেবে না।

    সূত্র : রদ্দুল মুহতার : ১/৩৯৫, আফ কে মাসায়েল আউর উনকা হল : ৩/৩১৪, আহসানুল ফাতাওয়া : ১০/২৯৩

  • রাষ্ট্রীয় সম্পদ ব্যয়ে মহানবী (সা.)-এর নির্দেশনা

    রাষ্ট্রীয় সম্পদ ব্যয়ে মহানবী (সা.)-এর নির্দেশনা

    দেশ ও জাতির সামগ্রিক উন্নয়ন রাষ্ট্রীয় সম্পদের সুষ্ঠু বণ্টন ও যথাযথ ব্যবহারের ওপর নির্ভর করে। তাই ইসলাম রাষ্ট্রীয় সম্পদ যথার্থ ও ন্যায়সংগত ব্যবহার নিশ্চিত করার নির্দেশ দিয়েছে। মদিনায় ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর রাসুলুল্লাহ (সা.) রাষ্ট্রীয় সম্পদের সর্বোচ্চ কল্যাণ নিশ্চিত করার প্রয়াস পান। একই সঙ্গে তিনি রাষ্ট্রীয় সম্পদের সব ধরনের অপব্যয় ও অপরিণামদর্শী ব্যবহার বন্ধের উদ্যোগ নেন। রাষ্ট্রীয় সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করতে মহানবী (সা.) অর্থ প্রশাসন প্রতিষ্ঠা করেন এবং সম্পদের প্রবাহকে তিনি নিয়মাধীন করেন। যেন সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করা যায়। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘সম্পদ যেন তোমাদের ধনীদের হাতে কুক্ষিগত হয়ে না যায়।’ (সুরা : হাশর, আয়াত : ৭)

    রাষ্ট্রীয় সম্পদের কল্যাণ নিশ্চিত করতে মহানবী (সা.) ও পরবর্তী খলিফাদের কর্মপদ্ধতি থেকে যেসব নির্দেশনা পাওয়া যায় তার একটি সংক্ষিপ রূপরেখা তুলে ধরা হলো।

    কেন্দ্রীয় অর্থব্যবস্থা
    ইসলামী রাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় অর্থব্যবস্থার নাম বায়তুল মাল। মহানবী (সা.)-এর মাধ্যমেই ইসলামী রাষ্ট্রের প্রথম কেন্দ্রীয় অর্থব্যবস্থা গড়ে ওঠে। মহানবী (সা.) অর্থনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য কর্মী নিয়োগ দিতেন এবং তার কাছেই রাষ্ট্রের সমুদয় সম্পদ একত্র হতো। তবে সে সময় ইসলামী কেন্দ্রীয় অর্থব্যবস্থার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক নাম ছিল না। খলিফা ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর এই কেন্দ্রীয় ব্যবস্থার নামকরণ ‘বায়তুল মাল’ করা হয়। তিনি পূর্ণাঙ্গ প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেন। (ইমাম তাবারি, তারিখুল উমাম ওয়াল মুলুক : ২/৫১৯)

    ইসলামী অর্থনীতিতে রাষ্ট্রীয় সম্পদ ব্যয়ে সুসংহত কেন্দ্রীয় অর্থব্যবস্থা অপরিহার্য। শুধু সম্পদ পুঞ্জীভূত করা বা রক্ষণাবেক্ষণ করাই বায়তুল মালের একমাত্র কাজ নয়। বরং সম্পদের সর্বোচ্চ সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করাই হবে তার প্রধান লক্ষ্য। ইসলামী রাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় অর্থ প্রশাসক ভবিষ্যতের প্রয়োজনের তুলনায় জনগণের বর্তমান প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দেবে। ওমর (রা.) বায়তুল মালের সম্পদ ব্যয়ে এই নীতি অবলম্বন করতেন। ঐতিহাসিক ইবনুল জাওজি তাঁর সম্পর্কে বলেন, ‘ভবিষ্যতের জন্য সম্পদ জমা করে রাখা ওমর (রা.)-এর নীতি ছিল না। বরং তিনি সম্পদের অধিকারীদের হাতে তা দ্রুততম সময়ে পৌঁছে দিতেন। প্রতিবছর একবার তিনি রাষ্ট্রীয় কোষাগার শূন্য করার নির্দেশ দিতেন।’ (মানাকিবু আমিরিল মুমিনিনা ওমর ইবনুল খাত্তাব, পৃষ্ঠা. ৭৯)

    দক্ষ ও সৎ প্রশাসক নিয়োগ
    রাষ্ট্রীয় সম্পদ ব্যয়ে দক্ষ ও সৎ প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া ইসলামী রাষ্ট্রের দায়িত্ব। যাঁরা সততা ও দক্ষতার সঙ্গে রাষ্ট্রীয় সম্পদ ব্যয় করবেন। ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর বর্ণনা থেকে তার একটি ধারণা লাভ করা যেতে পারে। তিনি বলেন, ‘আমি কি তোমাকে আমার ও এদের দৃষ্টান্ত সম্পর্কে বলব? আমাদের দৃষ্টান্ত হলো এমন একটি যাত্রীদলের মতো যারা তাদের সম্পদ একত্র করে এবং তাদের একজনের হাতে অর্পণ করে—যে প্রয়োজন অনুযায়ী খরচ করবে। এখন সেই ব্যক্তির জন্য কি বৈধ হবে কাউকে অগ্রাধিকার প্রদান করা?’ (মানাকিবু আমিরিল মুমিনিনা ওমর ইবনুল খাত্তাব, পৃষ্ঠা. ১০২)

    ওমর ইবনুল আবদুল আজিজ (রহ.) রাষ্ট্রীয় কাজ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্রীয় অর্থে জ্বালানো প্রদীপ নিভিয়ে দিতেন। বলতেন, ‘আমি মুসলমানের সেবায় নিয়োজিত ছিলাম, তাই তাদের সম্পদ দিয়ে প্রদীপ জ্বালিয়েছিলাম। এখন তুমি আমার অবস্থা জানতে চেয়েছ, তাই আমি আমার ব্যক্তিগত অর্থে প্রদীপ জ্বালালাম।’ (আল ইকতিসাদুল ইসলামী, ২৫৬)

    দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা
    সম্পদ পুঞ্জীভূত করা ইসলামী অর্থনীতির মৌলিক দর্শনবিরোধী হলেও ইসলাম সম্পদের অপরিণামদর্শী ও অর্থহীন ব্যয় নিরুৎসাহ করে। বরং জনগণের প্রয়োজন পূরণ করার পর উদ্বৃত্ত অর্থ সংরক্ষণ করতে হবে এবং জনগণকে যেকোনো ধরনের দুর্যোগ ও সংকট থেকে রক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা থাকতে হবে। পবিত্র কোরআনে দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনার একটি রূপরেখা পাওয়া যায়। ইরশাদ হয়েছে, ‘ইউসুফ বলল, তোমরা সাত বছর একাদিক্রমে চাষ করবে, অতঃপর তোমরা যে শস্য কর্তন করবে তা থেকে সামান্য পরিমাণ আহার করবে, তা ছাড়া পুরো শিষসহ রেখে দেবে। এরপর আসবে সাতটি কঠিন বছর। এই সাত বছর আগে সঞ্চয় করে রাখা শস্য খাবে। কেবল সামান্য অংশ, যা তোমরা সংরক্ষণ করবে তা ছাড়া।’ (সুরা : ইউসুফ, আয়াত : ৪৭-৪৮)

    সুষম বণ্টন
    রাষ্ট্রীয় সম্পদ ব্যয়ে ইসলামী অর্থনীতির অন্যতম মূলনীতি সুষম বণ্টন নিশ্চিত করা। জাকাত, খিরাজ, ওশর, জিজিয়াসহ ইসলামের অর্থনৈতিক বিধানগুলোর প্রধান লক্ষ্যই সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করা। যেন রাষ্ট্রের কতিপয় মানুষের হাতে সম্পদ কুক্ষিগত হয়ে না থাকে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আল্লাহ জনপদবাসীর কাছ থেকে তাঁর রাসুলকে যা কিছু দিয়েছেন তা আল্লাহর, আল্লাহর রাসুলের, রাসুলের স্বজনদের, এতিমদের, অভাবগ্রস্ত ও পথচারীদের। যেন সম্পদ তোমাদের মধ্যে যারা বিত্তবান তাদের মধ্যে আবর্তন না করে।’ (সুরা : হাশর, আয়াত : ৭)

    সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার
    ইসলামী রাষ্ট্র সম্পদের সর্বোচ্চ সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করার চেষ্টা করবে। যেন রাষ্ট্রীয় সম্পদের পূর্ণ সুফল জনগণ লাভ করে। বেশি ঝুঁকিপূর্ণ কোনো খাতে—যেখানে সম্পদের যথাযথ ব্যবহার না-ও হতে পারে রাষ্ট্র তার সম্পদ ব্যয় করবে না। এ ব্যাপারে কোরআনের নির্দেশনা হলো, ‘তোমরা তোমাদের সম্পদ যা আল্লাহ তোমাদের জন্য উপজীবিকা করেছেন, তা নির্বোধদের হাতে অর্পণ কোরো না। …’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ৫)

    এই আয়াতের ব্যাখ্যায় আল্লামা ইবনে কাসির (রহ.) বলেন, ‘যে সম্পদের ওপর মানুষের জীবন-জীবিকা নির্ভরশীল তা কোনো নির্বোধের হাতে তুলে দিতে নিষেধ করেছেন। এই ধরনের মানুষ কয়েক শ্রেণির হতে পারে। যেমন—বয়স কম হওয়ার কারণে, মানসিক ভারসাম্যহীন হওয়ার কারণে, ধর্মীয় জ্ঞান ও জাগতিক অভিজ্ঞতার অভাব থাকার কারণে, এমন ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি—যে ঋণে নিমজ্জিত এবং তা পরিশোধের ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে।

    সম্পদের অপচয় রোধ
    শুধু রাষ্ট্রীয় সম্পদ নয়; বরং ব্যক্তিগত সম্পদ অপচয়ে ইসলামের কঠোর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ইসলামী শরিয়তের দৃষ্টিতে বৈধ কাজেও অপচয় ও অপব্যয় নিষিদ্ধ। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা খাও এবং পান করো, কিন্তু অপব্যয় করবে না। নিশ্চয়ই তিনি (আল্লাহ) অপব্যয়কারীকে পছন্দ করেন না।’ (সুরা : আরাফ, আয়াত : ৩১)

    রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘আল্লাহ তোমাদের জন্য তিনটি জিনিস অপছন্দ করেন। অনর্থক গালগল্প, সম্পদের অপচয় ও বেশি বেশি প্রশ্ন করা।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১৪৭৭)

    অসদ্ব্যবহার রোধ
    রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপব্যয়ের মতো অসদ্ব্যবহারও ইসলামে নিষিদ্ধ। কোনো ব্যক্তি রাষ্ট্রীয় সম্পদ ব্যক্তি বা গোষ্ঠীস্বার্থে ব্যবহার করতে পারবে না। মহানবী (সা.) বলেন, ‘কিছু লোক আল্লাহর দেওয়া সম্পদ অন্যায়ভাবে ব্যয় করে, কিয়ামতের দিন তাদের জন্য জাহান্নাম নির্ধারিত।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৩১১৮)

    ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) কসম করে বলেন, ‘নিশ্চয়ই এই সম্পদে কেউ কারো চেয়ে বেশি হকদার নয়। আমিও কারো চেয়ে বেশি হকদার নই। এই সম্পদে সব মুসলমানের অধিকার রয়েছে, তবে মালিকানাধীন দাস ছাড়া।’ (আল ফাতহুর রব্বানি, পৃষ্ঠা. ৮৭)

    দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোরতা
    রাষ্ট্রীয় সম্পদের সুফল লাভের পথে অন্যতম প্রধান অন্তরায় আর্থিক দুর্নীতি। ইসলাম দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর হওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। দুর্নীতির পথ খোলে এমন বৈধ বিষয়েও ইসলাম কঠোরতা আরো করেছে। মহানবী (সা.) এক ব্যক্তিকে জাকাত আদায়ের জন্য পাঠালে সে ব্যক্তিগত উপহার গ্রহণ করে। তখন তিনি তাকে বলেন, ‘তুমি কেন তোমার বাড়ি বসে থেকে অপেক্ষা করলে না যে তোমাকে উপহার দেয় কি না?’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ২৫৯৭)

    রাসুলুল্লাহ (সা.) আরো বলেন, ‘তোমাদের যাকে আমি কোনো কাজে নিয়োগ দিই এবং সে একটি সুই বা তার চেয়ে বেশি কিছু গোপন করল, সে কিয়ামতের দিন তা আত্মসাতের সম্পদ হিসেবে উপস্থিত করা হবে।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১৮৩৩)।

  • ফেরেশতাদের সঙ্গে মানুষের বিস্ময়কর সাক্ষাৎ

    ফেরেশতাদের সঙ্গে মানুষের বিস্ময়কর সাক্ষাৎ

    ফেরেশতা আল্লাহর বিস্ময়কর এক সৃষ্টি। আল্লাহ সৃষ্টিজগতে নানা কাজে ফেরেশতাদের নিয়োজিত করেছেন। পবিত্র কোরআনে তাঁদের আল্লাহর বিশেষ বাহিনী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহর বাণী ও নির্দেশনা তাঁর প্রেরিত পুরুষ নবী-রাসুলদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার গুরুদায়িত্ব পালন করেন ফেরেশতারা। সে হিসেবে নবী-রাসুলদের সঙ্গে ফেরেশতাদের সাক্ষাৎ খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু নবী না হয়েও অনেকেই ফেরেশতার সাক্ষাৎ পেয়েছেন। তাদের মধ্যে যেমন পুণ্যবান মানুষ রয়েছে, তেমনি রয়েছে পাপিষ্ঠরাও। যেমন—সারা, মারিয়াম, মুসা (আ.)-এর মা ও লুত (আ.)-এর সম্প্রদায়ের লোকেরা। এ ছাড়া মৃত্যুর সময় প্রত্যেক মানুষ মৃত্যুর ফেরেশতাকে দেখতে পায়। কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘যারা বলে আল্লাহ আমাদের প্রভু; অতঃপর তারা অটল থাকে। তাদের কাছে (মৃত্যুর সময়) ফেরেশতা এসে বলে, তোমরা ভয় পেয়ো না, চিন্তিত হয়ো না এবং জান্নাতের সুসংবাদ গ্রহণ করো—যার প্রতিশ্রুতি তোমাদের দেওয়া হয়েছিল।’ (সুরা : ফুসসিলাত, আয়াত : ৩০)

    পাপীদের ব্যাপারে বলা হয়েছে, ‘যেদিন (মৃত্যুর সময়) তারা ফেরেশতাদের দেখবে, (সেদিন বলা হবে) আজ অপরাধীদের জন্য কোনো সুসংবাদ নেই।’ (সুরা : ফোরকান, আয়াত : ২২)

    মানুষের চোখে ফেরেশতাদের দেখা সম্ভব?
    মানুষের পক্ষে ফেরেশতাদের দেখা সম্ভব। যা কোরআনের আয়াত ও হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। তবে ধর্মতাত্ত্বিক আলেমদের মতে, ফেরেশতাদের নিজস্ব আকৃতিতে দেখা সম্ভব নয়। কারণ হিসেবে তাঁরা বলেন, ফেরেশতারা আল্লাহর নূর বা জ্যোতি দ্বারা সৃষ্ট, যা মানুষের চোখ সহ্য করার ক্ষমতা রাখে না। মুসা (আ.) আল্লাহর নূর দেখে অচেতন হয়ে যান। ইরশাদ হয়েছে, ‘সে বলল, হে আমার প্রভু! আমাকে দর্শন দাও, আমি আপনাকে দেখব। তিনি বললেন, তুমি আমাকে কখনোই দেখতে পারবে না। বরং তুমি পাহাড়ের প্রতি লক্ষ করো, যদি তা নিজ স্থানে স্থির থাকে, তবে তুমি আমাকে দেখতে পারবে। যখন তার প্রতিপালক পাহাড়ে জ্যোতি প্রকাশ করলেন, তখন তা পাহাড়কে চূর্ণ-বিচূর্ণ করল এবং মুসা জ্ঞান হারিয়ে পড়ে গেল।…’ (সুরা : আরাফ, আয়াত : ১৪৩)

    এই আয়াত দ্বারা প্রমাণিত হয়, মানবচোখে ফেরেশতাদের দেখা সম্ভব নয়। তবে রাসুলুল্লাহ (সা.) জিবরাঈল (আ.)-কে একাধিকবার আপন আকৃতিতে দেখেন। প্রথমবার দেখার পর তিনিও ভয় পান। হাদিসের বর্ণনায়, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) তা নিয়ে এমন অবস্থায় ফিরে এলেন যে তাঁর হৃত্স্পন্দন বেড়ে গেল। তিনি খাদিজা বিনতে খুয়াইলিদ (রা.)-এর কাছে এসে বললেন, আমাকে চাদর আবৃত করো, আমাকে চাদর আবৃত করো। তিনি তাঁকে চাদর আবৃত করলেন। যাতে তাঁর ভয় দূর হয়।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৩)

    তবে আল্লাহ কখনো কখনো মানুষকে শেখানোর জন্য, তাদের পরীক্ষা করার জন্য মানুষরূপে ফেরেশতা পাঠিয়েছেন। পৃথিবীতে নবী (আ.) ছাড়া যারা ফেরেশতাদের সাক্ষাৎ পেয়েছে, মানুষরূপেই পেয়েছে। সহিহ বুখারি ও মুসলিমের হাদিসে সাহাবিদের উপস্থিতিতে রাসুল (সা.)-এর কাছে জিবরাঈল (আ.)-এর আগমনের ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। তিনি যাওয়ার পর তিনি বলেন, ‘ইনি জিবরাঈল। তিনি তোমাদের দ্বিন শেখাতে এসেছিলেন।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২)

    স্বপ্নে ফেরেশতার সাক্ষাৎ

    মানুষের আকৃতিতে মানুষের যেমন ফেরেশতার সাক্ষাৎ পাওয়া সম্ভব, তেমনি স্বপ্নেও ফেরেশতার সাক্ষাৎ পাওয়া সম্ভব। আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি স্বপ্নে দেখলাম দুজন ফেরেশতা আমাকে ধরে জাহান্নামের দিকে নিয়ে গেল। সেটি ছিল একটি কূপের মতো ভাঁজ করা (গর্ত) এবং কূপের মতো তাতে দুটি স্তম্ভ ছিল। তার ভেতর মানুষ ছিল। আমি তাদের চিনতে পারি। আমি বলতে শুরু করি—‘আমি আল্লাহর কাছে জাহান্নাম থেকে মুক্তি চাই’, ‘আমি আল্লাহর কাছে জাহান্নাম থেকে মুক্তি চাই’। ফেরেশতাদ্বয় অপর এক ফেরেশতার সঙ্গে দেখা করেন। তিনি আমাকে বলেন, ভয় পেয়ো না। আমি এই স্বপ্ন হাফসা (রা.)-কে বলি। তিনি রাসুল (সা.)-কে তা বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, আবদুল্লাহ কতই না ভালো মানুষ, যদি সে রাতে নামাজ (তাহাজ্জুদ) পড়ত!’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৪৭৯)

    এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, স্বপ্নে ফেরেশতাদের দেখা সম্ভব।

    বর্তমান যুগে ফেরেশতাদের সাক্ষাৎ সম্ভব?

    বর্তমান সময়েও ফেরেশতাদের সাক্ষাৎ লাভ সম্ভব। তবে ফকিহ আলেমরা একমত যে নবীদের পরে কোনো ব্যক্তি ফেরেশতা দেখার অকাট্য দাবি করতে পারবে না। কেননা তাঁরাই ছিলেন ফেরেশতাদের সত্যায়নকারী। যেহেতু মুহাম্মদ (সা.)-এর পর আর কোনো নবী আসবেন না, তাই এখন কেউ দাবি করতে পারবে না আমি ফেরেশতার দেখা পেয়েছি। করলে সে মিথ্যাবাদী প্রমাণিত হবে। (শায়খ আবদুল্লাহ ইবনে বাজ, ফাতাওয়া আল জামি আল কাবির, ফাতাওয়া : ৩৪৬৬)

    ফেরেশতার সাক্ষাতের জন্য মুমিন হওয়া শর্ত?

    ফেরেশতার সাক্ষাৎ পাওয়ার জন্য মুমিন হওয়া শর্ত নয়। কোরআনে বর্ণিত লুত (আ.)-এর জাতির ঘটনা ও বদর যুদ্ধে ফেরেশতাদের সাহায্যের বিবরণ থেকে বোঝা যায় অবিশ্বাসীরাও ফেরেশতার দেখা পেতে পারে। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত এক দীর্ঘ হাদিস থেকে জানা যায়, বদর যুদ্ধের দিন মুশরিকরা ফেরেশতাদের সৈনিকরূপে দেখতে পায়। ফেরেশতাদের ঘোড়ার পায়ের শব্দ ও চাবুকের আওয়াজও যুদ্ধে অংশগ্রহণকারীরা শুনতে পেয়েছিল। (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১৭৬৩)

    মানুষ ও ফেরেশতার সাক্ষাতের কয়েকটি ঘটনা

    পবিত্র কোরআন ও হাদিসের বর্ণনায় নবী-রাসুল নন এমন মানুষ ও ফেরেশতার সাক্ষাতের যেসব ঘটনা পাওয়া যায় তার কয়েকটি হলো,

    এক. মারিয়াম (আ.) : ঈসা (আ.)-এর মা মারিয়াম (আ.) পুরুষরূপে একজন ফেরেশতার সাক্ষাৎ পান। যিনি তাঁকে সন্তান লাভের সুসংবাদ দেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘আমি তার কাছে আমার রুহকে (জিবরাঈল) প্রেরণ করলাম, সে তার কাছে পূর্ণ মানবাকৃতিতে আত্মপ্রকাশ করল। মারিয়াম বলল, যদি তুমি আল্লাহকে ভয় করো, তবে আমি তোমার কাছ থেকে দয়াময়ের কাছে আশ্রয় চাইছি।’ (সুরা : মারিয়াম, আয়াত : ১৭-১৮)

    দুই. সারা (আ.) : ইবরাহিম (আ.)-এর স্ত্রী সারা (আ.)ও ফেরেশতার সাক্ষাৎ পেয়েছিলেন। কোরআনে সেই ঘটনার দিকে ইঙ্গিত করে বলা হয়েছে, ‘তার স্ত্রী দাঁড়িয়ে ছিল। সে হেসে ফেলল। অতঃপর আমি তাকে ইসহাকের এবং ইসহাকের পরবর্তী ইয়াকুবের সুসংবাদ দিলাম। সে বলল, কী আশ্চর্য! আমি সন্তান জন্ম দেব, আমি বৃদ্ধা আর এই আমার স্বামী বৃদ্ধ! এটি অবশ্যই এক অদ্ভুত ব্যাপার। তারা (ফেরেশতারা) বলল, ‘আল্লাহর কাজে তুমি বিস্ময় বোধ করছ? হে পরিবারবর্গ! তোমাদের ওপর রয়েছে আল্লাহর অনুগ্রহ ও কল্যাণ। তিনি তো প্রশংসা ও সম্মানের অধিকারী।’ (সুরা : হুদ, আয়াত : ৭১-৭৩)

    তিন. লুত (আ.)-এর জাতি : লুত (আ.)-এর জাতি বিকৃত যৌনচর্চায় অভ্যস্ত ছিল। সমকামিতার মতো ব্যাধি সে সমাজে বিস্তার লাভ করে। লুত (আ.) তাদের এই বিকৃত মানসিকতা ও ভয়াবহ পাপ থেকে বেঁচে থাকার আহ্বান জানায়। কিন্তু ক্রমেই তাদের অবাধ্যতা বাড়তে থাকে। আল্লাহ তাদের ধ্বংস করার জন্য একদল ফেরেশতা প্রেরণ করেন। তারা সুদর্শন পুরুষের আকৃতিতে আসে। ফলে তারা আগত ফেরেশতাদের ওপর হামলে পড়ে। ইরশাদ হয়েছে, ‘যখন আমার প্রেরিত ফেরেশতারা লুতের কাছে এলো, তখন তাদের আগমনে সে বিষণ্ন হলো। নিজেকে তাদের রক্ষায় অসমর্থ মনে করল এবং বলল, এটি একটি নিদারুণ দিন। তার সম্প্রদায় তার কাছে উদভ্রান্তের মতো ছুটে এলো এবং তারা আগে থেকে কুকর্মে লিপ্ত ছিল। সে বলল, ‘হে আমার সম্প্রদায়! এরা আমার কন্যা, তোমাদের জন্য তারা পবিত্র। সুতরাং আল্লাহকে ভয় করো। আমার মেহমানের ব্যাপারে আমাকে হেয় কোরো না। তোমাদের মধ্যে কি কোনো ভালো মানুষ নেই?’ (সুরা : হুদ, আয়াত : ৭৭-৭৮)

    চার. মুসা (আ.)-এর মা : আল্লাহ তাআলা মুসা (আ.)-এর মায়ের প্রতি ওহি অবতীর্ণ করেন। কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আমি তোমার মায়ের প্রতি ওহি অবতীর্ণ করলাম, যা অবতীর্ণ করার।’ (সুরা : ত্বহা, আয়াত : ৩৮) আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) এই আয়াতের অর্থ এভাবে করেছেন, ‘আমি ওহি অবতীর্ণ করলাম, যেমন নবীদের প্রতি করেছিলাম।’ (আবদুল্লাহ জাবের, আহলুলহাদিদ ডটকম, প্রকাশ : ২৬ মে ২০১২)

    এই ব্যাখ্যা ও সুরা কাসাসের বর্ণনা থেকে অনুমান হয়, মুসা (আ.)-এর মায়ের সঙ্গে হয়তো ফেরেশতাদের সাক্ষাৎ হয়েছিল।

    পাঁচ. সুলাইমান (আ.)-এর রাজ্যের অধিবাসী : আল্লাহ সুলায়মান (আ.)-এর রাজ্যের অধিবাসীদের পরীক্ষার জন্য হারুত ও মারুত নামে দুজন ফেরেশতা পাঠান। মানুষের আকৃতিতে তারা সেখানে অবস্থান করে। কোরআনে সেই ঘটনা সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘সুলাইমানের রাজ্যে শয়তানরা যা পাঠ করত, তারা তার অনুসরণ করে। সুলাইমান কুফরি করেনি; বরং শয়তানরাই কুফরি করেছে। তারা মানুষকে জাদু শিক্ষা দিত এবং যা বাবেল শহরে হারুত-মারুত ফেরেশতাদ্বয়ের ওপর অবতীর্ণ হতো। তারা দুজন কাউকে এই কথা না বলে কিছু শেখাত না যে আমরা পরীক্ষাস্বরূপ। সুতরাং তুমি কুফরি কোরো না।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ১০২)

    ছয়. সাহাবিদের মজলিস : সাহাবিদের উপস্থিতিতে রাসুল (সা.)-এর কাছে মুসাফিরের বেশে জিবরাঈল (আ.) আসেন এবং তাঁকে কয়েকটি প্রশ্ন করেন। রাসুল (সা.) তার উত্তর দেন। তিনি বলে যাওয়ার পর রাসুল (সা.) বলেন, ‘ইনি জিবরাঈল। তিনি তোমাদের দ্বিন শেখাতে এসেছিলেন।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২)

    সাত. বনি ইসরাইলের তিন ব্যক্তি : বনি ইসরাইলের তিন ব্যক্তি, যারা অন্ধ, টাকবিশিষ্ট ও কুষ্ঠ রোগী ছিল। আল্লাহ তাদের পরীক্ষার জন্য ফেরেশতা পাঠান এবং তাদের মাধ্যমে তাদের রোগমুক্ত করেন। তবে পরবর্তী সময়ে তারা তা ভুলে যান। (বিস্তারিত দেখুন : সহিহ বুখারি, হাদিস : ৩২৭৭)

    আট. আল্লাহর জন্য সম্পর্ক রক্ষাকারী : আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী (সা.) বলেন, এক ব্যক্তি অন্য গ্রামে বসবাসকারী তার এক ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করতে বের হন। পথিমধ্যে একজন ফেরেশতা আসেন এবং বলেন, কোথায় যাচ্ছ? তিনি উত্তর দেন, এই গ্রামে বসবাসকারী ভাইয়ের কাছে। ফেরেশতা বললেন, তোমার প্রতি কি তার কোনো অনুগ্রহ আছে? তিনি বলেন, না, তবে আমি তাকে আল্লাহর জন্য ভালোবাসি। তখন ফেরেশতা বলেন, আল্লাহ আমাকে তোমার কাছে পাঠিয়েছেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাকে ভালোবাসেন, যেমন তুমি তাঁকে ভালোবাসো। (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৫৬৭)

    ফেরেশতারা কি শুধু মানুষের আকৃতিতে আসে?

    আল্লাহ তাআলা ফেরেশতাদের যেকোনো আকৃতি ধারণের শক্তি দিয়েছেন। তাই ফেরেশতারা শুধু মানবাকৃতিতেই দেখা দেয় না; বরং কখনো কখনো ভিন্ন আকৃতিতেও আসে। উসাইদ বিন হুদাইর (রা.) সুরা বাকারা বা সুরা কাহাফ তিলাওয়াত করছিলেন। এমন সময় তাঁর ঘোড়াটি কয়েকবার ডেকে ওঠে। তিনি বের হয়ে আকাশের দিকে তাকালে আলোর প্রদীপ বা মেঘমালার ভেতর প্রদীপ দেখতে পান। এই ঘটনা তিনি রাসুল (সা.)-কে বললে তিনি আবারও তাঁকে তিলাওয়াত করতে বলেন এবং আসমানের দিকে তাকালে তিনি মেঘমালার ভেতর প্রদীপ সদৃশ বস্তু দেখতে পান। এরপর তিনি বলেন, ‘তারা একদল ফেরেশতা। তোমার তিলাওয়াতের আওয়াজ শোনার জন্য (পৃথিবীর) নিকটবর্তী হয়েছে। যদি তুমি সকাল পর্যন্ত তিলাওয়াত করতে, তবে তারা সকাল পর্যন্ত অবস্থান করত এবং মানুষ তাদের দেখতে পেত।’ (আল ইসাবা : ৪/৪৮২)

    ফেরেশতারা কেন পুরুষরূপে হাজির হন

    ফেরেশতারা লিঙ্গ পরিচয়ের ঊর্ধ্বে। আল্লাহ তাদের নারী বা পুরুষ বানাননি। তবে কোরআন ও হাদিসের বর্ণনায় মানুষ ও ফেরেশতার সাক্ষাতের যে বিবরণ পাওয়া যায়, তাতে ফেরেশতাদের পুরুষের রূপ ধারণ করতে দেখা যায়। পবিত্র কোরআনেও তাদের ব্যাপারে পুরুষবাচক শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। এর কারণ কী? মুফাসসিররা এর উত্তরে বলেন, প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে বিভিন্ন কাফির ও মুশরিক সম্প্রদায় বিশ্বাস করে যে ফেরেশতারা আল্লাহর কন্যা। আল্লাহ তাদের বিশ্বাস ভুল প্রমাণিত করার জন্য পুরুষরূপে তাদের প্রেরণ করেন। পবিত্র কোরআনেও তাদের ভ্রান্ত বিশ্বাসের প্রতিবাদে বলা হয়েছে, ‘তারা ফেরেশতাদের আল্লাহর কন্যা প্রতিপন্ন করেছেন। প্রকৃতপক্ষে তারা আল্লাহর বান্দা। তারা কি তাদের সৃষ্টির সময় উপস্থিত ছিল? অতি শিগগিরই তাদের সাক্ষ্য লিখে রাখা হবে এবং তারা জিজ্ঞাসিত হবে।’ (সুরা : জুখরুফ, আয়াত : ১৯)

    এ ছাড়া সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি, মানুষের প্রকৃতি ইত্যাদি বিবেচনায় নারীর চেয়ে পুরুষরূপে আবির্ভূত হওয়াই ছিল বেশি কার্যকর। (তাফসির আল-বাহরুল মুহিত : ৪/৮৩)

  • ফজর নামাজ পড়তে না পারলে করণীয়

    ফজর নামাজ পড়তে না পারলে করণীয়

    পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের মধ্যে এশা ও ফজরের জামাতের গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি। এ দুই সময় মানুষ সাধারণত পরিবারের সঙ্গে সময় কাটায় ও বিশ্রাম করে। ফলে জামাত দুটিতে যথেষ্ট অবহেলা ও গাফিলতি হয়ে থাকে। এ জন্য হাদিসে এর প্রতি বিশেষভাবে উৎসাহিত করা হয়েছে।

    উবাই ইবনে কাব (রা.) থেকে বর্ণিত, ‘একবার মহানবী (সা.) আমাদের ফজরের নামাজ পড়িয়েছেন। সালাম ফিরিয়ে জিজ্ঞেস করেন, অমুক কি আছে? লোকেরা বলল, নেই। তারপর আরেকজনের নাম নিয়ে জিজ্ঞেস করেন, অমুক কি আছে? লোকেরা বলল, নেই। তিনি বলেন, এ দুই নামাজ (এশা ও ফজর) মুনাফিকদের জন্য সবচেয়ে কঠিন। তোমরা যদি জানতে যে এই দুই নামাজে কী পরিমাণ সওয়াব আছে, তাহলে হামাগুড়ি দিয়ে হলেও তাতে শরিক হতে।’ (আবু দাউদ, হাদিস: ৫৫৪)

    অন্য হাদিসে এসেছে, ‘যে ব্যক্তি এশা ও ফজর জামাতের সঙ্গে পড়ল, সে যেন সারা রাত দাঁড়িয়ে নামাজ পড়ল।’ (মুসলিম, হাদিস: ৬৫৬)

    ফজরের নামাজের জন্য নির্দিষ্ট সময় হলো সুবহে সাদিক থেকে সূর্য ওঠার আগ পর্যন্ত। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘ফজরের নামাজের সময় হলো, ঊষার উদয় থেকে সূর্যোদয় পর্যন্ত।’ (মুসলিম, হাদিস: ৬১২)

    সুতরাং ঘুম থেকে জাগ্রত হতে না পারলে বা ভুলে যাওয়ার কারণে ফজর নামাজ ছুটে গেলে তার ওপর কাজা করা ওয়াজিব। কেননা রাসুলুল্লাহ বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি নামাজ আদায় করতে ভুলে যায় বা সে সময় ঘুমিয়ে থাকায় তা ছুটে যায়, তার কাফফারা হলো যখনই তা মনে হবে, তখনই (সঙ্গে সঙ্গে) নামাজ আদায় করে নেবে।’ (মুসলিম, হাদিস: ৬৮৪)

    তবে ইচ্ছাকৃতভাবে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নামাজ আদায় না করা কবিরা গুনাহ। আর প্রতিদিন ভুল করা গ্রহণযোগ্য নয়। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘অতএব দুর্ভোগ সেসব নামাজির, যারা তাদের নামাজ সম্পর্কে উদাসীন।’ (সুরা মাউন, আয়াত: ৪-৫)

    তাফসিরবিদ আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন উল্লিখিত আয়াতে সেসব নামাজির কথা বলা হয়েছে, ‘যারা নামাজের নির্দিষ্ট সময় থেকে দেরিতে আদায় করে।’ (তাফসিরে কুরতুবি, খণ্ড : ২০, পৃষ্ঠা: ২১১)

  • বিশ্ব ইজতেমার দ্বিতীয় পর্বে লাখো মুসল্লির ঢল

    বিশ্ব ইজতেমার দ্বিতীয় পর্বে লাখো মুসল্লির ঢল

    গাজীপুরের টঙ্গীতে আম বয়ানের মধ্য দিয়ে শুরু হলো ৫৫তম বিশ্ব ইজতেমার দ্বিতীয়পর্ব। শুক্রবার ফজরের নামাজের পর ভারতের নিজামুদ্দিন মারকাজরে মওলানা চেরাগ উদ্দিনের বয়ানের মধ্য দিয়ে শুরু হয় ইজতেমার দ্বিতীয় পর্বের আনুষ্ঠানিকতা।

    এই পর্বে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ময়দানে জড়ো হয়েছেন দিল্লীর মাওলানা সা’দ কান্ধলভীর অনুসারীরা। ইজতেমার সার্বিক নিরাপত্তায় আইন শৃংঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা গড়ে তুলেছেন নিরাপত্তা বলয়।

    ইজতেমার দ্বিতীয় পর্ব উপলক্ষে বুধবার থেকেই টঙ্গীর তুরাগ তীরে জড়ো হতে থাকেন মুসল্লিরা। আনুষ্ঠানিকভাবে শুরুর আগেই বৃহস্পতিবার বাদ আছর আম বয়ান করেন বাংলাদেশের ফায়সাল সুরা ওয়াসিফুল ইসলাম। শুক্রবার ফজরের নামাজের পর ভারতের নিজামুদ্দিন মারকাজের মওলানা চেরাগ উদ্দিনের বয়ানের মধ্য দিয়ে শুরু হয় ইজতেমার দ্বিতীয় পর্বের আনুষ্ঠানিকতা।

    দ্বিতীয়পর্বেও দেশের ৬৪ জেলা ছাড়াও বিদেশি মুসল্লিরা ইজতেমায় অংশ নিয়েছেন। এরইমধ্যে মুসল্লিরা যার যার খিত্তায় অবস্থান নিয়েছেন।

    এদিকে ইজতেমাকে কেন্দ্র করে নিরাপত্তা ব্যবস্থাও জোরদার করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ৭ স্তরে কাজ করছে পুলিশের প্রায় ৮ হাজার সদস্য। পুরো ইজতেমার মাঠ ঘিরে থাকবেন র‌্যাব, বিজিবি ও আনসার সদস্যরা। পুলিশের নিজস্ব ১৬টি ওয়াচ টাওয়ারসহ র‌্যাবের নিজস্ব ওয়াচ টাওয়ার থেকে পর্যবেক্ষণ করা হবে পুরো ইজতেমা। মাঠের চারপাশে রয়েছে অসংখ্য সিসিটিভি ক্যামেরা। জেলা প্রশাসকের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। ইজতেমায় আসা মুসল্লিদের সুবিধা-অসুবিধাগুলো সার্বক্ষণিক তত্ত্বাবধান করা হচ্ছে।

    এর আগে ৯ জানুয়ারি বাদ মাগরিব ভারতের মওলানা ইব্রাহিম দেওলার আম বয়ানের মধ্য দিয়ে শুরু হয় বিশ্ব ইজতেমার প্রথম পর্ব। ১২ই জানুয়ারি আখেরি মোনাজাতে সম্পন্ন হয় বিশ্ব ইজতেমার প্রথম পর্ব।

  • নামাজ দীর্ঘায়িত করতে একাধিক সুরা পাঠ করা যাবে?

    নামাজ দীর্ঘায়িত করতে একাধিক সুরা পাঠ করা যাবে?

    সমাধান দিয়েছে ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার বাংলাদেশ, বসুন্ধরা, ঢাকা।

    প্রশ্ন : অনেকে শুক্রবারের নামাজে কিংবা ফজর নামাজে লম্বা সুরা পড়েন। আমাদের বড় সুরা মুখস্থ নেই। আমরা কি লম্বা সময় ধরে নামাজ পড়ার জন্য একত্রে একাধিক সুরা মিলিয়ে নামাজ আদায় করতে পারব?

    —রেহানা বারী, ঢাকা।

    উত্তর : ফরজ নামাজে সুরা ফাতেহার পর এক রাকাতে একাধিক সুরা মিলানো জায়েজ হলেও মিলানো অনুচিত। তবে নফল নামাজে একাধিক সুরা মিলানোতে কোনো অসুবিধা নেই।

    (সূত্র : হাশিয়াতুত তাহতাভি, পৃ. ৩৫২, ফাতাওয়ায়ে মাহমুদিয়া : ৭/৯০)

  • শীতকালে অজু ও গোসলের সতর্কতা

    শীতকালে অজু ও গোসলের সতর্কতা

    পবিত্রতা অর্জনের জন্য নারী-পুরুষ উভয়কেই অজু ও গোসল করতে হয়। কিন্তু আমরা অনেকেই জানি না যে কোন ভুলগুলো হলে অজু ও গোসল হবে না।

    অজুর ক্ষেত্রে অজুর অঙ্গগুলো এবং ফরজ গোসলের ক্ষেত্রে পুরো শরীর পরিপূর্ণভাবে পানি দ্বারা ভেজানো আবশ্যক। অন্যথায় পবিত্রতা অর্জিত হবে না।

    বিশেষ করে অজুর কোনো অঙ্গ সামান্যও শুকনা থেকে গেলে তার জন্য হাদিসে জাহান্নামের শাস্তির কথা বর্ণিত হয়েছে। আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, কোনো এক সফরে আল্লাহর রাসুল (সা.) আমাদের পেছনে পড়ে গেলেন। পরে তিনি আমাদের কাছে পৌঁছলেন। এদিকে আমরা (আসরের) নামাজ আদায় করতে বিলম্ব করে ফেলেছিলাম। তাই (তা আদায় করার জন্য) আমরা অজু করা শুরু করলাম। এ সময় আমরা আমাদের পা কোনোমতে পানি দ্বারা ভিজিয়ে নিচ্ছিলাম। তখন তিনি উচ্চৈঃস্বরে বলেন, ‘সর্বনাশ! গোড়ালির নিম্নাংশগুলোর জন্য জাহান্নামের আগুন রয়েছে।’ তিনি দুই বা তিনবার এ কথা বললেন। (বুখারি, হাদিস : ৯৬, মুসলিম, হাদিস : ২৪১)

    অনেক সময় তাড়াহুড়া করে অজু করার কারণে মানুষের পায়ের গোড়ালি শুকনা থেকে যায়। বিশেষ করে শীতকালে এ ধরনের কাজ বেশি হয়ে যায়। তাই আমাদের উচিত অজু করার ক্ষেত্রে বিশেষভাবে লক্ষ রাখা, যাতে কোনো অঙ্গ শুকনা না থেকে যায়। পবিত্রতা অর্জনে এমন উদাসীনতা কোনোভাবেই কাম্য নয়। কারণ ফরজ গোসল ও অজুর সময় কোনো অঙ্গের সামান্য থেকে সামান্য পরিমাণ শুকনা থাকলে পবিত্রতা অর্জন হবে না।

    এ বিষয়ে আল্লামা মুহাম্মদ বিন সালেহ আল উসাইমিন (রহ.) বলেন, ‘মানুষ যদি পবিত্রতা অর্জনের অঙ্গে তৈলাক্ত বস্তু (তেল, ক্রিম) ব্যবহার করে, তাহলে দেখতে হবে যদি উক্ত তৈলাক্ত বস্তুটি জমাট বাঁধা ও আবরণবিশিষ্ট হয়, তাহলে পবিত্রতা অর্জনের পূর্বে অবশ্যই তা দূর করতে হবে। যদি তৈলাক্ত বস্তু সেভাবেই জমাট বাঁধা অবস্থায় থেকে যায়, তাহলে তা চামড়া পর্যন্ত পানি পৌঁছতে বাধা দেবে। এতে করে তখন পবিত্রতা শুদ্ধ হবে না।

    কিন্তু যদি তৈলাক্ত বস্তুটির কোনো আবরণ না থাকে কিন্তু পবিত্রতার অঙ্গগুলোর ওপর সেগুলোর চিহ্ন অবশিষ্ট থেকে যায়, তাহলে তাতে কোনো ক্ষতি নেই। কিন্তু এ অবস্থায় ওই অঙ্গের ওপর হাত ফিরিয়ে দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। কেননা সাধারণত তৈলাক্ত বস্তু থেকে পানি আলাদা থাকে। সুতরাং হতে পারে, পবিত্রতার ক্ষেত্রে পুরো অঙ্গে পানি পৌঁছবে না।’ (ফাতাওয়াত তাহারাহ, পৃষ্ঠা : ১৭৪)

    যেসব জিনিস অজু ও গোসলের সময় শরীরে পানি পৌঁছতে বাধা প্রদান করে না সেগুলো হলো—শরীরে সরিষা, তিল, কালোজিরা ইত্যাদির তেল, অলিভ ওয়েল, বডি লোশন, ক্রিম, লিকুইড ভ্যাসলিন, গ্লিসারিন ইত্যাদি। কারণ এগুলো দ্বারা চামড়ার ওপর প্রলেপ পড়ে না বা আবরণ তৈরি হয় না। তবে এ অবস্থায় অজু বা গোসলের সময় যথাসম্ভব হাত দিয়ে অজুর স্থানগুলো ও শরীরের বিভিন্ন স্থান ভালো করে ঘষে দেওয়া উচিত। যেন যথাস্থানে পানি পৌঁছতে সন্দেহ না থাকে। যেমন—ঠাণ্ডার সময় অজু বা গোসল করলে অজুর অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলো এবং শরীরের বিভিন্ন অংশ ভালোভাবে ঘষে নিতে হয়।

    অনুরূপ নারীদের মেহেদির রং, সাধারণ পাউডার, চোখের সুরমা, আতর, সেন্ট ইত্যাদি চামড়ায় পানি পৌঁছাতে কোনো বাধা প্রদান করে না। তবে বর্তমানে বাজারে কিছু কেমিক্যালযুক্ত কৃত্রিম টিউব মেহেদি পাওয়া যায়, যেগুলো চামড়ায় পাতলা আবরণ সৃষ্টি করে। তা ছাড়া নেইলপলিশ, কিছু লিপস্টিক ব্যবহার করলেও চামড়ার ওপর প্রলেপ পড়ে যায়। যার কারণে চামড়া পর্যন্ত পানি পৌঁছতে বাধাগ্রস্ত হয়। এ ধরনের ক্ষেত্রে অজু ও গোসলের পূর্বে এগুলোকে ভালোভাবে তুলে নিতে হবে।

    দেয়ালে লাগানোর রং, মবিল, আঠা জাতীয় বস্তু ইত্যাদি শরীরে লাগলে তা জমাটবদ্ধ হয়ে শরীরে আবরণ সৃষ্টি করে। সুতরাং অজু ও গোসলের আগে এগুলো তুলে ফেলতে হবে।

    যেসব—ক্রিম, চর্বিজাতীয় ও তৈলাক্ত বস্তু শরীরে লাগানোর ফলে চামড়ার ওপর প্রলেপ বা আবরণ পড়ে সেগুলো ব্যবহার করলে অবশ্যই অজু-গোসলের সময় সেই আবরণ ভালোভাবে ধুয়ে ফেলতে হবে। মোটকথা, অজু শুদ্ধ হওয়ার জন্য অজুর অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলো এবং গোসল শুদ্ধ হওয়ার জন্য শরীরের সর্বস্থানে পানি পৌঁছানো আবশ্যক। অন্যথায় পবিত্রতা অর্জিত হবে না। আর পবিত্রতা অর্জন ছাড়া নামাজ এবং যেসব ইবাদতের জন্য পবিত্রতা পূর্বশর্ত সেগুলো আল্লাহর কাছে গৃহীত হবে না।

    তাই আমাদের উচিত, সতর্কতার সঙ্গে অজু ও গোসল করা।

  • কেমন হবে মৃত্যু-পরবর্তী সময়কাল

    কেমন হবে মৃত্যু-পরবর্তী সময়কাল

    পরকাল বা মৃত্যু-পরবর্তী সময় ও জীবন নিয়ে মানুষের আগ্রহ ও কৌতূহলের শেষ নেই। মৃত্যু-পরবর্তী জীবন নিয়ে ইসলামসহ প্রায় সব ধর্মের বেশির ভাগ বক্তব্য রহস্যময় ও ব্যাখ্যাতীত। কোরআন ও হাদিসে পরকালীন জীবনের নানা দিক তুলে ধরা হলেও এই ব্যাপারে চূড়ান্ত বক্তব্য হলো ‘এর জ্ঞান শুধু আল্লাহরই আছে। তা আপনি কী করে জানবেন? সম্ভবত কিয়ামত খুব শিগগিরই হবে।’ (সুরা আহজাব, আয়াত : ৬৩)

    পরকালে কি সময় থাকবে?

    গবেষক আলেমরা বলেন, পরকালেও সময় থাকবে। সময়ের গণনাও থাকবে। তবে তা পৃথিবীর সময়ের মতো নয়। সেই সময় ও তার প্রকৃতি হবে সম্পূর্ণ ভিন্ন। মহান আল্লাহ যেমন পৃথিবীসহ প্রত্যেক গ্রহ-নক্ষত্রের জন্য সময়ের ভিন্ন ভিন্ন সীমা নির্ধারণ করেছেন, তেমনি পরকালের জন্য স্বতন্ত্র সময়কাল সৃষ্টি করেছেন। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘আল্লাহ বলেছেন, মানুষ সময়কে গালি দিয়ে আমাকে কষ্ট দেয়। অথচ আমিই সময় (সময়ের স্রষ্টা), সব কিছুর নিয়ন্ত্রণ আমার হাতে, আমি রাত-দিনের পরিবর্তন করি।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৭৪৯১)।

    আল্লামা ইবনে কাসির (রহ.) বলেন, ‘আল্লাহ দিন-রাতের একটির অংশ কেটে অন্যদিকে দীর্ঘ করেন, ফলে তাতে সমতা আসে। আবার দীর্ঘটা (দিন বা রাতের) ছোট করেন এবং ছোটটিকে বড় করেন। তিনি তাতে যথেচ্ছা পরিবর্তন করেন তাঁর নির্দেশ, ক্রোধ, ক্ষমতা ও জ্ঞানের মাধ্যমে।’ (দেখুন : সুরা নুরের ৪৪ নম্বর আয়াতের ব্যাখ্যা)

    পৃথিবীতে সময় পরিমাপের মূল ভিত্তি পৃথিবী ও অন্যান্য গ্রহ-নক্ষত্রের এই কাঠামোই আল্লাহ পরিবর্তন করে দেবেন। তাই পরকালে সময় ও তার গণনা ভিন্নভাবে করা হবে। আল্লাহ বলেন, ‘যেদিন এই পৃথিবী পরিবর্তন হয়ে অন্য পৃথিবীতে পরিণত হবে এবং আকাশমণ্ডলীও; মানুষ উপস্থিত হবে আল্লাহর সম্মুখে যিনি এক ও পরাক্রমশালী।’ (সুরা ইবরাহিম, আয়াত : ৪৮)

    পরকালে যেভাবে সময় গণনা করা হবে

    পরকালের সময় বোঝাতে কোরআন ও হাদিসে একাধিক শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। যা পৃথিবীর সময় ‘পরিমাপক শব্দে’র অনুরূপ। যেমন—

    ক. আস-সাআ : আরবি আস-সাআর শাব্দিক অর্থ কিছু সময়। আর ব্যাবহারিক অর্থ ‘ঘণ্টা’। কোরআনে শব্দটি কিয়ামত অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। আল্লাহ বলেন, ‘যেদিন কিয়ামত সংঘটিত হবে, সেদিন অপরাধীরা হতাশ হয়ে যাবে।’ (সুরা রোম, আয়াত : ১২)

    খ. সকাল ও সন্ধ্যা : জান্নাতবাসীর অবস্থা বর্ণনায় পবিত্র কোরআনে ‘সকাল ও সন্ধ্যা’ শব্দের ব্যবহার করা হয়েছে। আল্লাহ বলেন, “সেখানে তারা ‘শান্তি’ ছাড়া কোনো অসার কথা শুনবে এবং সকাল-সন্ধ্যা তাদের জন্য থাকবে জীবনোপকরণ।’ (সুরা মারিয়াম, আয়াত : ৬২)

    গ. ইয়াউম : ইয়াউম অর্থ দিন। কিয়ামত ও পরকালের অন্যান্য মুহূর্ত বোঝাতে কোরআন ও হাদিসে ইয়াউম বা দিন শব্দ ব্যবহূত হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে, ‘যেদিন মানুষ ভিন্ন ভিন্ন দলে বের হবে, যেন তাদের কৃতকর্ম দেখানো যায়।’ (সুরা জিলজাল, আয়াত : ৬)

    ঘ. সপ্তাহ : আনাস ইবনে মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিস থেকে বোঝা যায় পরকালে সময় গণনায় ‘সপ্তাহের’ হিসাব থাকবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘নিশ্চয়ই জান্নাতে একটি বাজার থাকবে। যাতে তারা প্রতি শুক্রবার একত্র হবে। তখন উত্তরের বাতাস প্রবাহিত হয়ে সেখানের ধুলাবালি তাদের মুখমণ্ডল ও কাপড়ে লাগবে। এতে তাদের রূপ ও সৌন্দর্য আরো বৃদ্ধি পাবে। …’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ৬৮৮৩)

    ঙ. বছর : বিভিন্ন আমলের পরকালীন শাস্তি ও পুরস্কারের বর্ণনায় একাধিক হাদিসে ‘সানাহ’ বা বছর শব্দের ব্যবহার হয়েছে। আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, হে আল্লাহ! তুমি আমাকে দরিদ্র অবস্থায় বাঁচিয়ে রাখো, দরিদ্র থাকা অবস্থায় মৃত্যু দিয়ো এবং কিয়ামত দিবসে দরিদ্রদের দলভুক্ত করে হাশর কোরো। (এ কথা শুনে) আয়েশা (রা.) বলেন, হে আল্লাহর রাসুল! আপনি কেন এরূপ বলছেন? তিনি বলেন, হে আয়েশা! তারা তো তাদের সম্পদশালীদের চেয়ে ৪০ বছর আগে জান্নাতে প্রবেশ করবে। …’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস : ২৩৫২)

    পরকালের সময়কাল ভিন্ন যেখানে

    পরকালের সময় ও তার সীমা বোঝাতে দিন, সপ্তাহ ও বছরের মতো শব্দগুলো ব্যবহৃত হলেও কোরআন ও হাদিসের ভাষ্য থেকে বোঝা যায়, পার্থিব জীবনের সময়ের সঙ্গে পরকালীন সময়ের মৌলিক কিছু পার্থক্য রয়েছে। মৃত্যু-পরবর্তী সময়ের প্রথম ও প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো অন্তহীন। পৃথিবী সৃষ্টির পর থেকে পার্থিব সময়ের যাত্রা শুরু হয়েছে। আর কিয়ামতের মাধ্যমে তার সমাপ্তি হবে। কিন্তু পরকালের সময় অনন্ত, কখনো শেষ হওয়ার নয়। অন্তহীন এই সময় বোঝাতে কোরআন ও হাদিসে ‘আবাদুন’ ও ‘খালিদুন’ শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। আল্লাহ বলেন, ‘যারা ঈমান এনেছে এবং ভালো কাজ করেছে অতিসত্বর আমি তাদের জান্নাতে প্রবেশ করাব; যার নিচ দিয়ে ঝরনা প্রবাহিত, তারা সেখানে চিরদিন বাস করবে।’ (সুরা নিসা, আয়াত : ৫৭)

    অন্যদিকে পরকালের সকাল-সন্ধ্যা, দিন ও বছরের ব্যাপ্তি, প্রকৃতি ও ধরন পৃথিবীর সময় থেকে ভিন্ন হবে। যেমন আল্লামা ইবনে কাসির (রহ.) কোরআনের আয়াত ‘সকাল-সন্ধ্যা তাদের জন্য থাকবে জীবনোপকরণ’-এর ব্যাখ্যায় বলেন, ‘সকাল ও সন্ধ্যার সাদৃশ্য সময়ে। প্রকৃতপক্ষে সেখানে রাত ও দিন থাকবে না। তবে সময়ের পরিবর্তন থাকবে। যা ‘দ্যুতি’ (তেজস্কর) ও ‘জ্যোতি’ (কোমল)-এর মাধ্যমে বোঝা যাবে। (দেখুন : সুরা মারিয়ামের ৬২ নম্বর আয়াতের ব্যাখ্যা)

    পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘যেদিনের পরিমাপ হবে তোমাদের হিসাবে সহস্র বছর।’ (সুরা সিজদা, আয়াত : ৫)