Category: ধর্ম

  • কোরআনের চোখে সফল যাঁরা

    কোরআনের চোখে সফল যাঁরা

    জীবনে সফলতা পেতে কে না চায়। সফলতার জন্য মানুষ কত কী-ই না করে, তার শেষ নেই। তবে প্রকৃত সফলতা কী, তা আমরা অনেকে জানি না। মহান আল্লাহ যাদের সফল হিসেবে ঘোষণা করেছেন, তারাই প্রকৃত সফলকাম। তিনি পবিত্র কোরআনের বিভিন্ন আয়াতে সফলকাম মানুষদের বর্ণনা দিয়েছেন। নির্দেশনা দিয়েছেন সেসব বিষয়ে, যেগুলো একজন মানুষকে প্রকৃতপক্ষে সফল করতে পারে।

    পবিত্র কোরআনে তাকওয়া, ঈমান বিল গায়েব, পবিত্র কোরআন ও আগের কিতাবের ওপর বিশ্বাস, কিয়ামত ও আখিরাতে বিশ্বাস, সৎকাজে আদেশ অসৎ কাজে নিষেধ, নামাজ কায়েম, জাকাত প্রদান, আল্লাহর রাস্তায় সম্পদ ব্যয়, রাসুল (সা.)-এর ওপর ঈমান আনা ও তাঁর সহযোগিতা করা, তাঁর সুন্নতের অনুসরণ করা, শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে নিজের জীবন-সম্পদ ব্যয় করে আল্লাহর রাস্তায় লড়াই করা, আল্লাহ ও তাঁর রাসুল (সা.)-এর জন্য কাউকে ভালোবাসা বা ঘৃণা করা, সংকীর্ণ মনোভাব ত্যাগ করাকে সফলতা অর্জনের মাধ্যম বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। নিম্নে সেসব আয়াত তুলে ধরা হলো, যেখানে মহান আল্লাহ এই গুণে গুণান্বিতদের সফলকাম বলে ঘোষণা দিয়েছেন।

    ঈমান আনা
    ‘যারা অদৃশ্যের প্রতি ঈমান আনে, নামাজ কায়েম করে এবং আমি তাদের যে রিজিক দিয়েছি তা থেকে ব্যয় করে। আর যারা ঈমান আনে তাতে, যা তোমার প্রতি নাজিল করা হয়েছে এবং যা তোমার আগে নাজিল করা হয়েছে। আর আখিরাতের প্রতি তারা পূর্ণ বিশ্বাস রাখে। তারা তাদের রবের পক্ষ থেকে হিদায়েতের ওপর রয়েছে এবং তারাই সফলকাম।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ৩-৫)

    রাসুল (সা.)-এর অনুসরণ
    ‘যারা অনুসরণ করে রাসুলের, যে উম্মি নবী; যার গুণাবলি তারা নিজদের কাছে তাওরাত ও ইঞ্জিলে লিখিত পায়, যে তাদের সৎকাজের আদেশ দেয় ও বারণ করে অসৎ কাজ থেকে এবং তাদের জন্য পবিত্র বস্তু হালাল করে, আর অপবিত্র বস্তু হারাম করে। আর তাদের থেকে তাদের ওপর থাকা বোঝা ও শৃঙ্খল অপসারণ করে। সুতরাং যারা তাঁর প্রতি ঈমান আনে, তাঁকে সম্মান করে, তাঁকে সাহায্য করে এবং তাঁর সঙ্গে যে নূর নাজিল করা হয়েছে তা অনুসরণ করে, তারাই সফলকাম।’ (সুরা : আরাফ, আয়াত : ১৫৭)

    নামাজ কায়েম ও আখিরাতে দৃঢ় বিশ্বাস
    ‘এগুলো প্রজ্ঞাপূর্ণ কিতাবের আয়াত, সৎকর্মশীলদের জন্য হিদায়েত ও রহমতস্বরূপ, যারা নামাজ কায়েম করে এবং জাকাত দেয়, আর তারাই আখিরাতে দৃঢ় বিশ্বাস পোষণ করে; তারাই তাদের রবের পক্ষ থেকে হিদায়েতের ওপর  এবং তারাই সফলকাম।’ (সুরা : লুকমান, আয়াত : ২-৫)

    আল্লাহর রাস্তায় আহ্বানকারী
    ‘আর যেন তোমাদের মধ্য থেকে এমন একটি দল হয়, যারা কল্যাণের প্রতি আহ্বান করবে, ভালো কাজের আদেশ দেবে এবং মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করবে। আর তারাই সফলকাম।’ (সুরা : আলে-ইমরান, আয়াত : ১০৪)

    যারা সেই আহ্বানে সাড়া দেয় তারাও সফলকাম। ইরশাদ হয়েছে, ‘মুমিনদের যখন আল্লাহ ও তাঁর রাসুল (সা.)-এর প্রতি এ মর্মে আহ্বান করা হয় যে তিনি তাদের মধ্যে বিচার মীমাংসা করবেন, তাদের কথা তো এই হয় যে তখন তারা বলে, ‘আমরা শুনলাম ও আনুগত্য করলাম।’ আর তারাই সফলকাম।’ (সুরা : নূর, আয়াত : ৫১)

    অধিক নেক আমলের অধিকারী
    কিয়ামতের দিন যাদের আমলের পাল্লা ভারী হবে, তারাও সফলকাম। ইরশাদ হয়েছে, ‘আর সেদিন পরিমাপ হবে যথাযথ। সুতরাং যাদের পাল্লা ভারী হবে, তারাই হবে সফলকাম।’ (সুরা : আরাফ, আয়াত : ৮)

    অন্য আয়াতে ইরশাদ হয়েছে, ‘অতঃপর যাদের পাল্লা ভারী হবে তারাই হবে সফলকাম।’ (সুরা : মুমিনুন, আয়াত : ১০২)

    শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াইকারী
    বিশ্বব্যাপী আল্লাহর দ্বিন ও শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য জাহিলিয়াতের ঘোর অন্ধকার থেকে উম্মাহকে মুক্ত করার জন্য জান-মাল দিয়ে লড়াই করেছেন সাহাবায়ে কেরাম। যারা তাদের মতো বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আল্লাহর রাস্তায় লড়াই করবে, আল্লাহ তাদের সফলকাম বলে ঘোষণা করেছেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘কিন্তু রাসুল ও তাঁর সঙ্গে মুমিনরা তাদের মাল ও জান দিয়ে লড়াই করে, আর সেসব লোকের জন্যই রয়েছে যাবতীয় কল্যাণ এবং তারাই সফলকাম।’ (সুরা : তাওবা, আয়াত : ৮৮)

    যারা মানুষের হক আদায় করে
    প্রত্যেক মানুষের ওপরই তার আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী ও মিসকিন-মুসাফিরদের হক রয়েছে। যারা তা যথাযথভাবে পালন করবে আল্লাহ তাদের সফল করবেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘অতএব আত্মীয়-স্বজনকে তাদের হক দিয়ে দাও এবং মিসকিন ও মুসাফিরকেও। এটি উত্তম তাদের জন্য, যারা আল্লাহর সন্তুষ্টি চায় এবং তারাই সফলকাম।’ (সুরা : রুম, আয়াত : ৩৮)

    যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের ভালোবাসা প্রাধান্য দেয়
    ‘তুমি পাবে না আল্লাহ ও আখিরাতে বিশ্বাসী এমন কোনো সম্প্রদায়, যারা ভালোবাসে আল্লাহ ও (পাশাপাশি) তাঁর রাসুলের বিরুদ্ধাচরণকে (ভালোবাসে)—হোক না এই বিরুদ্ধাচরণকারী তাদের পিতা, অথবা পুত্র, অথবা ভাই, অথবা জ্ঞাতি-গোষ্ঠী হয়। এদের অন্তরে আল্লাহ সুদৃঢ় করেছেন ঈমান এবং তাদের শক্তিশালী করেছেন তাঁর পক্ষ থেকে রুহ দ্বারা। তিনি তাদের জান্নাতে প্রবেশ করাবেন। যার পাদদেশে নদী প্রবাহিত; সেথায় তারা স্থায়ী হবে; আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং তারাও আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট। এরাই আল্লাহর দল। জেনে রেখো, আল্লাহর দলই সফলকাম।’ (সুরা : মুজাদালা, আয়াত : ২২)

    যারা অন্য মুমিনকে নিজের ওপর প্রাধান্য দেয়
    ‘আর মুহাজিরদের আগমনের আগে যারা মদিনায় নিবাস হিসেবে গ্রহণ করেছিল এবং ঈমান এনেছিল (তাদের জন্যও এ সম্পদে অংশ রয়েছে), আর যারা তাদের কাছে হিজরত করে এসেছে তাদের ভালোবাসে। আর মুহাজিরদের যা প্রদান করা হয়েছে তার জন্য এরা তাদের অন্তরে কোনো ঈর্ষা অনুভব করে না। এবং নিজেদের অভাব থাকা সত্ত্বেও নিজেদের ওপর তাদের অগ্রাধিকার দেয়। যাদের মনের কার্পণ্য থেকে রক্ষা করা হয়েছে, তারাই সফলকাম।’ (সুরা : হাশর, আয়াত : ৯)

    মহান আল্লাহ আমাদের আমল করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

  • শত্রুর অনিষ্ট থেকে বাঁচার দোয়া

    শত্রুর অনিষ্ট থেকে বাঁচার দোয়া

    উচ্চারণ : ‘আল্লাহুম্মা ইন্না নাজআলুকা ফি নুহুরিহিম ওয়া নাউজুবিকা মিং শুরুরিহিম।’

    অর্থ : ‘হে আল্লাহ! আমরা তাদের মোকাবিলায় তোমাকে যথেষ্ট ভাবছি এবং তাদের অনিষ্ট থেকে তোমার কাছে আশ্রয় চাইছি।’

    উপকার : আবু বুরদা ইবনে আবদুল্লাহ (রহ.) থেকে বর্ণিত, তার পিতা তাকে বর্ণনা করেন যে, নবী (সা.) কোনো সম্প্রদায় দ্বারা ক্ষতির আশঙ্কা করলে এই দোয়া পড়তেন।

  • আমাদের প্রিয় নবী যেভাবে কাঁদতেন

    একজন মানুষ হিসেবে মহানবী (সা.)ও মানবীয় এসব বৈশিষ্ট্যের অধিকারী ছিলেন। তাঁর জীবনেও ছিল হাসি-কান্না, আনন্দ-বেদনার অনুভূতি।

    মহানবী (সা.) বিভিন্ন সময় কান্না করেছেন। তিনি অনুচ্চ আওয়াজে কান্না করতেন। কখনো বিলাপ করে কান্না করতেন না। বেশির ভাগ সময় তিনি আল্লাহর দরবারে প্রার্থনারত অবস্থায় কাঁদতেন।

    নামাজে কান্না : আবদুল্লাহ ইবন সিখখির (রা.) বলেন, ‘আমি মহানবী (সা.)-এর খেদমতে উপস্থিত হলাম। তখন তিনি নামাজরত ছিলেন। তাঁর বক্ষদেশ থেকে জ্বলন্ত চুলার পানি ভরা পাত্র থেকে যেরূপ আওয়াজ আসে সেরূপ আওয়াজ আসছিল।’ (শামায়েলে তিরমিজি : ৩০৭/১)

    আবদুল্লাহ ইবন আমর (রা.) বর্ণনা করেন, একবার মহানবী (সা.)-এর জীবদ্দশায় সূর্যগ্রহণ হয়। মহানবী (সা.) মসজিদে গিয়ে নামাজ পড়া শুরু করেন। এ নামাজে এত দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকেন মনে হয়েছে যেন আর রুকুতে যাবেন না। অতঃপর রুকুতে যান। এত দীর্ঘ সময় রুকু করেন মনে হয়েছে যেন রুকু থেকে আর দাঁড়াবেন না। এরপর রুকু থেকে উঠে কাওমায় (রুকু থেকে উঠে দাঁড়ানো) এত দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেন, মনে হলো যেন আর সিজদা করবেন না। সিজদা এত দীর্ঘ করলেন মনে হলো যেন সিজদা হতে মাথা উঠাবেন না। অনুরূপভাবে সিজদা থেকে উঠে দুই সিজদার মধ্যে এত দীর্ঘ সময় বসে থাকেন মনে হলো আর সিজদা করবেন না। এভাবে দ্বিতীয় রাকাতও দীর্ঘ সময় নিয়ে আদায় করেন এবং কাঁদতে থাকেন। (শামায়েলে তিরমিজি : ৩০৯/৩)

    আয়াত শুনে কান্না করা : মহানবী (সা.) একবার আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ (রা.)-কে বলেন, হে আবদুল্লাহ! তুমি আমাকে কোরআন তিলাওয়াত করে শোনাও। আবদুল্লাহ বলেন, হে আল্লাহর রাসুল! আপনার প্রতি কোরআন অবতীর্ণ হয়েছে, আর আমি আপনাকে কোরআন পড়ে শোনাব! মহানবী (সা.) বলেন, আমার মন চায় অন্যের মুখে কোরআন তিলাওয়াত শুনি। আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ (রা.) যখন তিলাওয়াত করতে করতে সুরা নিসার আয়াত ‘ফা কাইফা ইজা জি-না মিন কুল্লি উম্মাতিম বি শাহিদিন ওয়া জি-না বিকা আলা হাওলায়ে শাহিদা’ পর্যন্ত পৌঁঁছেন, তখন তিনি (রাসুল) কাঁদতে থাকেন। (শামায়েলে তিরমিজি : ৩০৮/২)

    প্রিয়জনের জন্য কান্না করা : উম্মুল মুমিনিন আয়েশা (রা.) বলেন, ‘উসমান ইবনে মাজউন (রা.)-এর মৃত্যুর পর মহানবী (সা.) তাঁর ললাটে চুম্বন করেন। তখন মহানবী (সা.)-এর চোখ থেকে অশ্রু ঝরছিল।’ (শামায়েলে তিরমিজি : ৩১১/৫)

    আনাস (রা.) বর্ণনা করেন, ‘মহানবী (সা.)-এর কন্যা উম্মে কুলসুম ইন্তেকাল করার পর, তার কবরের পাশে বসে ছিলেন, তখন তাঁর চোখ মোবারক থেকে অশ্রু ঝরছিল।’ (শামায়েলে তিরমিজি : ৩১২/৬)

    মহানবী (সা.)-এর কোন এক কন্যা মুমূর্ষু অবস্থায় উপনীত হলে তিনি তাকে স্বীয় কোলে উঠিয়ে নেন। তখন মহানবী (সা.)-এর সামনেই তার মৃত্যু হয়। মহানবী (সা.)-এর দাসী উম্মে আইমান, তখন উচ্চৈঃস্বরে কাঁদতে থাকেন। মহানবী (সা.) তাকে বললেন, তুমি আল্লাহর নবীর সামনে এভাবে উচ্চৈঃস্বরে কাঁদছ! উম্মে আইমান বললেন, হে আল্লাহর রাসুল! আপানাকেও তো কাঁদতে দেখছি। মহানবী (সা.) বললেন, এটা ওই নিষিদ্ধ কান্না নয়। এটা আল্লাহর রহমত। (শামায়েলে তিরমিজি : ৩১০/৫)

  • মুক্তিযুদ্ধ ও ইসলাম

    মুক্তিযুদ্ধ ও ইসলাম

    বাঙালি জাতির হাজার বছরের ইতিহাসে একাত্তরের স্বাধীনতা একটি মহান অর্জন। স্বাধীনতার জন্য তারা কালে কালে যুদ্ধ ও সংগ্রাম করলেও ১৯৭১ সালের আগে স্বদেশ শাসনের উল্লেখযোগ্য কোনো সুযোগ বাঙালির হয়ে ওঠেনি। আর বাঙালি মুসলমানের জন্য একাত্তরের স্বাধীনতা ছিল আরো বেশি তাৎপর্যময়। কেননা ১৯৪৭ সালের আগে এক দল ‘তথাকথিত’ বাঙালি ‘ইসলাম ও বাঙালিত্ব’কে যেমন মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছিল, তেমনি পাকিস্তান আমলে শাসকগোষ্ঠী একই কাজ করেছিল। প্রথম শ্রেণি মুসলিম হওয়ার কারণে ‘বাঙালি মুসলমানে’র বাঙালিত্ব নিয়ে সংশয় প্রকাশ করত আর দ্বিতীয় শ্রেণি বাঙালি হওয়ার দরুন তাদের মুসলমানিত্ব নিয়ে সংশয় প্রকাশ করত। পাকিস্তানি বাহিনী বাংলাদেশে সংঘটিত নৃশংস গণহত্যাকে বৈধ করার জন্য ধর্মের নানা অপব্যবহার করে একাত্তরের আগে ও পরে। ‘এটি স্বাধিকার নয়, ইসলামের বিরুদ্ধে কাফিরের যুদ্ধ’ বলে তারা দেশ-বিদেশে ব্যাপক প্রপাগান্ডা চালায়। সাংবাদিক অ্যান্থনি মাসকারেনহাস লিখেছেন, ‘কুমিল্লার নবম ডিভিশন হেডকোয়ার্টারে আমার সফরকালে আমি দেখেছি, পাঞ্জাবি অফিসাররা বাঙালিদের ইসলামের আনুগত্যের প্রতি সব সময়ই সন্দেহ পোষণ করত। তারা বাঙালি মুসলমানদের কাফির ও হিন্দু বলত।’ (দ্য রেইপ অব বাংলাদেশ, পৃষ্ঠা ২৪)

    দুঃখজনক ব্যাপার হলো, স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে একশ্রেণির রাজনীতিক ও বুদ্ধিজীবী পাকিস্তানি শাসকদের সুরে বলতে থাকে ‘এটি ধর্মের বিরুদ্ধে ধর্মহীনতা’র লড়াই, যা দেশের সাধারণ মানুষকে বিস্মিত ও ক্ষুব্ধ করে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মানুষের ‘সংশয়’ দূর করে দেন। ১০ জানুয়ারি ১৯৭২ দেশে ফিরেই তিনি বলেন, ‘আমি মুসলমান; আমার বাংলাদেশ বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম রাষ্ট্র।’ (আবুল মনসুর আহমদ, আমার-দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর, খোশরোজ কিতাব মহল, ২০১০, পৃষ্ঠা ৬০৪)

    ইতিহাস বলে, বাঙালি জাতির দীর্ঘ স্বাধীনতা সংগ্রামে ইসলাম কখনো অন্তরায় ছিল না; বরং সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ধর্ম হিসেবে তা অনুপ্রেরণা হিসেবেই কাজ করেছে। ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচন, নির্বাচন-পরবর্তী আন্দোলন সংগ্রাম ও মহান মুক্তিযুদ্ধ; সর্বত্র বাঙালি মুসলিম তার ধর্ম থেকে অনুপ্রেরণা লাভের চেষ্টা করেছে। বিপরীতে পাকিস্তানি শাসকরা তাদের ধর্মপরায়ণতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে এবং ধর্মের মুখোমুখি দাঁড় করানোর চেষ্টা করেছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাদের প্রতিবাদে বলেন, ‘আমাদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার করা হচ্ছে, আমরা ইসলামে বিশ্বাসী নই। এ কথার জবাবে আমাদের সুস্পষ্ট বক্তব্য, লেবেলসর্বস্ব ইসলামে আমরা বিশ্বাসী নই। আমরা বিশ্বাসী ইনসাফের ইসলামে। আমাদের ইসলাম হজরত রসুলে করিম (সা.)-এর ইসলাম; যে ইসলাম জগদ্বাসীকে শিক্ষা দিয়েছে ন্যায় ও সুবিচারের অমোঘ মন্ত্র।’ (বঙ্গবন্ধুর ভাষণ, নভেল পাবলিকেশন্স, ঢাকা, ১৯৮৮, পৃষ্ঠা ২১)

    বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণকে বলা হয় স্বাধীনতার পরোক্ষ ঘোষণা। তেজোদীপ্ত সেই ভাষণে তিনি স্বাধীনতার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন ‘ইনশাআল্লাহ’ বলে। তিনি বলেন, ‘রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরো দেব; এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশাল্লাহ।’ এভাবেই যাত্রা শুরু হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধের। ২৬শে মার্চ ১৯৭১ চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে কবি আবদুস সালামের কণ্ঠে সন্ধ্যা ৭টা ৪০ মিনিটে প্রচারিত ঘোষণাটিও (মুক্তিযুদ্ধের প্রথম বেসামরিক ঘোষণা) শুরু হয়েছিল ইসলামী রীতিতে ‘নাহমাদুহু ওয়ানুসাল্লিয়ালা রাসুলিহীল কারিম’ দিয়ে এবং শেষ হয়েছিল কোরআনের আয়াত ‘নাছরুম মিনাল্লাহি ওয়া ফাতহুন কারিব’-এর মাধ্যমে। একই দিনে কলকাতা বেতার স্টেশন থেকে বঙ্গবন্ধুর একটি বক্তব্য প্রচারিত হয়। যার পরিসমাপ্তি হয় এভাবে,  ‘May Allah bless you and help in your straggle for freedom. JOY BANGLA.’ অর্থাৎ এই মুক্তিসংগ্রামে আল্লাহ তোমাদের ওপর দয়া করুন এবং সাহায্য করুন। জয় বাংলা। (বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের দলিলপত্র, খণ্ড-৩, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার, তথ্য মন্ত্রণালয়, হাক্কানী পাবলিশার্স, ২০১০, পৃষ্ঠা ১১ ও ২৩২)

    মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ১৪ এপ্রিল ১৯৭১ ‘স্বাধীন বাংলার সংগ্রামী জনগণের প্রতি বাংলাদেশ সরকারের নির্দেশনাবলি’ শিরোনামের একটি প্রচারণা ছিল এমন—“বাঙালির অপরাধ তারা তাদের মা-বাবা, ভাই-বোন, সন্তান-সন্ততিদের জন্য অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিৎসার দাবি জানিয়েছে। বাঙালির অপরাধ আল্লাহর সৃষ্ট পৃথিবীতে, আল্লাহর নির্দেশমতো সম্মানের সাথে শান্তিতে সুখে বাস করতে চেয়েছে। বাঙালির অপরাধ মহান স্রষ্টার নির্দেশমতো অন্যায়, অবিচার, শোষণ, নির্যাতনের অবসান ঘটিয়ে এক সুন্দর ও সুখী সমাজব্যবস্থা গড়ে তোলার সংকল্প ঘোষণা করেছে।… আমাদের সহায় পরম করুণাময় সর্বশক্তিমান আল্লাহর সাহায্য। মনে রাখবেন, আপনার এ সংগ্রাম ন্যায়ের সংগ্রাম, সত্যের সংগ্রাম। পশ্চিম পাকিস্তানি হানাদার দুশমন বাঙালি মুসলমান নারী-পুরুষ, বালক-বালিকা কাউকে হত্যা করতে, বাড়িঘর লুট করতে, জ্বালিয়ে দিতে এতটুকু দ্বিধা করেনি। মসজিদের মিনারে আজান প্রদানকারী মুয়াজ্জিন, মসজিদে-গৃহে নামাজরত মুসল্লি, দরগাহ-মাজারে আশ্রয়প্রার্থী হানাদারের গুলি থেকে বাঁচেনি। এ সংগ্রাম আমাদের বাঁচার সংগ্রাম। সর্বশক্তিমান আল্লাহ তাআলার ওপর বিশ্বাস রেখে ন্যায়ের সংগ্রামে অবিচল থাকুন। ‘অতীতের চাইতে ভবিষ্যৎ নিশ্চয়ই সুখকর’। বিশ্বাস রাখুন : ‘আল্লাহর সাহায্য ও বিজয় নিকটবর্তী।’” (প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ১৬-১৮)

    এ ছাড়া রণাঙ্গনে মুক্তিযোদ্ধাদের উদ্দীপ্ত করতে গায়েবানা জানাজা, কোরআন তিলাওয়াত, শহীদদের জন্য প্রার্থনা, অস্থায়ী মসজিদ স্থাপন ও ইমাম নিয়োগের প্রশাসনিক নির্দেশের প্রমাণও মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক দলিলপত্রে পাওয়া যায়। যেখানে এটাও বলা আছে,  ‘This arrangement is required to boost up the moral of the service-man.’ অর্থাৎ যুদ্ধক্ষেত্রে এসব (ইসলাম ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের) আয়োজন যোদ্ধাদের মনোবল বাড়িয়েছিল। (প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ৬১৯)

    দীর্ঘ ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ শেষে বিজয়ের যে ঘোষণা দেওয়া হয়, তাতেও ছিল বিশ্বাসের দ্যুতি। ১৬ই ডিসেম্বর ১৯৭১ অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি তাঁর ঘোষণায় বলেন, ‘আমি মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানসহ দেশবাসীকে আল্লাহর প্রতি শোকরিয়া জ্ঞাপনের জন্য ও একটি সুখী, সমৃদ্ধিশালী সমাজ গঠনে আল্লাহর সাহায্য ও নির্দেশ কামনা করার উদাত্ত আহ্বান জানাচ্ছি।’ (বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের দলিলপত্র, খণ্ড-৩, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার, তথ্য মন্ত্রণালয়, হাক্কানী পাবলিশার্স, ২০১০, পৃষ্ঠা ৩১৪)

    মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী বাহাত্তরের সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতার সংযুক্তি এবং মুক্তিযুদ্ধে ইসলামের অনুপ্রেরণা বিষয়ে সৈয়দ আবুল মকসুদ লিখেছেন, ‘বাংলাদেশের যে ধর্মনিরপেক্ষ আদর্শ ঘোষিত হলো তা ইসলামহীন সেক্যুলারিজম নয়। কারণ মুক্তিযুদ্ধের মধ্যে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে ইসলামসংক্রান্ত অনুষ্ঠান একটু বেশিই যেন প্রচারিত হতো। হিন্দু-বৌদ্ধ ধর্ম নিয়ে বিশেষ কিছুই হতো না। কিন্তু কেন তা হতো? তা হতো এ জন্য যে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান শ্রোতার কাছে ইসলামী অনুষ্ঠানের বিশেষ আবেদন ছিল।’ (সলিমুল্লাহ খান সম্পাদিত বেহাত বিপ্লব ১৯৭১, আগামী প্রকাশনী, ডিসেম্বর ২০১৩, পৃষ্ঠা ২২৮)

  • শীতকালে আল্লাহর অশেষ নিয়ামত

    শীতকালে আল্লাহর অশেষ নিয়ামত

    প্রকৃতিতে শুরু হয়েছে শীতের আবহ। কুহেলিঘেরা সকাল মনে হয় শ্বেত হিমালয়। ধবধবে কুয়াশা শুভ্রতার চাদর বিছিয়ে দেয় চারদিকে। শীতের এই ঋতুতে মহান আল্লাহর অনন্য নিয়ামত নতুন শাকসবজি আর ফলমূলে ভরে যায় গ্রামের মাঠ। মেঠোপথ ধরে চলতে গিয়ে চোখ জুড়িয়ে যায় সবুজের সেই সমারোহ দেখে। বিস্তীর্ণ জমিতে ছড়িয়ে থাকে ফুলকপি, বাঁধাকপি, ওলকপি, ব্রকোলি, গাজর, শালগম, টমেটো, শিম, চীনা বাঁধাকপি, লাল বাঁধাকপি, ফ্রেঞ্চ বিনসহ নানা ধরনের সবজি। শাকের মধ্যে থাকে লালশাক, পালংশাক, ঢেঁকিশাক, মুলাশাক ইত্যাদি। আর এ সব কিছুই আল্লাহ তাআলার অশেষ দান। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন, ‘মানুষ তার খাদ্যের প্রতি লক্ষ করুক। আমি তো অঝোর ধারায় বৃষ্টি বর্ষণ করেছি। অতঃপর মাটিকে বিদীর্ণ করেছি। আর তাতে উৎপন্ন করেছি শস্যাদি, আঙুর, শাকসবজি, জলপাই, খেজুর, বহু বৃক্ষবিশিষ্ট বাগান, ফলফলাদি ও ঘাস। এসব তোমাদের ও তোমাদের পালিত পশুকুলের জীবনধারণের জন্য।’ (সুরা : আবাসা, আয়াত : ২৪-৩২)

    শীতের শিশিরে সবজি থাকে টাটকা। শাকসবজি যত টাটকা খাওয়া যায়, তার পুষ্টিগুণ তত বেশি পাওয়া যায়। ক্ষেত থেকে তোলার পরই সবজির অনেক পুষ্টিগুণ নষ্ট হতে থাকে। যেমন—টমেটো ক্ষেত থেকে তোলার তিন দিনের মধ্যে তার ভিটামিন ‘সি’ প্রায় অর্ধেক কমে যায়। তাই আমরা যে সবজিই খাই না কেন, তা যেন থাকে সতেজ ও টাটকা। শীতকালে শাকসবজিতে পোকামাকড়ের উপদ্রব কম থাকায় অন্যান্য সময়ের তুলনায় বিষাক্ত কীটনাশক ছিটানো হয় কম। তাই শীতকালের সবজিতে স্বাস্থ্যঝুঁকিও কম থাকে।

    শীতের আরেকটি অন্যতম নিয়ামত হলো খেজুর রস। শীতকালের সঙ্গে খেজুর রস ওতপ্রোতভাবে জড়িত। যেন একে অন্যের পরম বন্ধু। কনকনে শীতের সকালে এক গ্লাস ঠাণ্ডা রস শরীরে এনে দেয় সজীবতা। গ্রামে শীতকালের সকালটা খেজুর রস ছাড়া যেন জমেই না। স্বাদে আর গন্ধে এককথায় অমৃত। পাখিরাও সে স্বাদ উপভোগ করা থেকে বাদ যায় না। মাটির হাঁড়িতে সরু ঠোঁট লাগিয়ে চুকচুক করে পান করে সুমিষ্ট রস। পবিত্র কোরআনে ২৬ বার খেজুরের কথা বর্ণিত হয়েছে। আবার এই পবিত্র কোরআন প্রথম লেখা হয়েছিল খেজুরের পাতায়।

    গ্রামের পিচঢালা সরু রাস্তার দুই পাশে খেজুর বিথীকায় ঝোলে মাটির হাঁড়ি। সে এক অপূর্ব দৃশ্য। ফজর নামাজ শেষে কুয়াশাঘেরা এমন সুন্দর পরিবেশে হাঁটতে বড্ড ভালো লাগে। খেজুর রস আর গুড় দিয়ে গ্রামাঞ্চলের বাড়িতে বাড়িতে জমে ওঠে নানা পদের পিঠা বানানোর ধুম। ভাপা, পুলি, সিদ্ধপুলি, মালপোয়া, লালুয়া, রসের চিতইয়ের মতো বহু রকম পিঠা। পায়েসের ম ম ঘ্রাণে মোহিত হয় গ্রামের পরিবেশ। ঘরে ঘরে শুরু হয়ে যায় পৌষ পার্বণের এমন রকমারি আয়োজন। কেউ আবার জামার কোঁচড়ে মুড়ি আর খেজুর গুড় নিয়ে বসে কোমল রোদে। শীতের মজাদার এই পিঠার কথা উঠে এসেছে সুফিয়া কামালের কবিতা ‘পৌষ পার্বণে পিঠা খেতে বসে/খুশিতে বিষম খেয়ে।/বড় উল্লাস বাড়িয়াছে মনে/মায়ের বকুনি খেয়ে।’

    গ্রামের বউ-ঝিরা আতপ চাল গুঁড়া করে খেজুর রস দিয়ে তৈরি করেন নানা স্বাদের পিঠা। সে পিঠা খেয়ে মনটা তৃপ্ত হয়ে যায়। নিমিষেই মুখ থেকে বেরিয়ে আসে শুকরিয়া ধ্বনি ‘আলহামদুলিল্লাহ’।

    গ্রামাঞ্চলে এ সময় সন্ধ্যা নামতেই চাল কোটার শব্দে মুখরিত হয় চারদিক। রাতভর চলে পিঠা তৈরির কাজ। অনেকে পিঠা তৈরির সময় গীত গেয়ে রাত পার করে। পিঠার অন্যতম উপাদান চালের গুঁড়া হলেও এর সঙ্গে লাগে গুড়, চিনি, নারকেল, ক্ষীরসহ নানা উপকরণ। সকালবেলা বাড়িতে বাড়িতে খেজুরের রসে ভেজানো পিঠা খাওয়ার ধুম পড়ে। এ সময় গ্রামে বেড়াতে আসেন শহুরে নাইয়র। জামাই-ঝি, আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশী সবাই মিলে পিঠা খাওয়ার আসরটা জমজমাট হয়ে ওঠে। হাসি-আনন্দে প্রাণবন্ত হয় চারপাশের পরিবেশ।

    শীতের সময়টা কিন্তু ইবাদতের জন্যও অনেক বড় নিয়ামতের। হাদিস শরিফে এসেছে, ‘শীতকাল মুমিনের জন্য ইবাদতের বসন্তকাল।’ আমের ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, ‘শীতল গনিমত হচ্ছে শীতকালে রোজা রাখা।’ (তিরমিজি, হাদিস : ৭৯৫)

    শীতকালে দিন অনেকটা ছোট থাকায় রোজা রাখতে খুব একটা কষ্ট হয় না। কারো যদি কাজা রোজা থাকে, তাহলে শীতকালে সেগুলো আদায় করে নেওয়া সহজ। তা ছাড়া বেশি বেশি নফল রোজা রাখারও এটি সুবর্ণ সময়। মহানবী (সা.) ইরশাদ করেন, ‘বিশুদ্ধ নিয়তে যে ব্যক্তি এক দিন রোজা রাখল, মহান আল্লাহ প্রতিদানস্বরূপ জাহান্নাম এবং ওই ব্যক্তির মাঝখানে ৭০ বছরের দূরত্ব তৈরি করে দেবেন।’ (বুখারি, হাদিস : ২৮৪০)

    শীতকালে রাত বেশ লম্বা হয়। কেউ চাইলে শরীরের চাহিদামতো ঘুমিয়ে শেষ রাতে তাহাজ্জুদ পড়তে পারেন। মহান আল্লাহ ঈমানদারদের গুণাবলি সম্পর্কে বলেন, ‘তাদের পার্শ্ব শয্যা থেকে আলাদা থাকে। তারা তাদের রবকে ডাকে ভয়ে ও আশায় এবং আমি তাদের যে রিজিক দিয়েছি, তা থেকে ব্যয় করে।’ (সুরা : সাজদাহ, আয়াত : ১৬) মহান আল্লাহ আমাদের আমল করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

  • রসিকতার সীমারেখা টেনে দিয়েছে ইসলাম

    প্রাচীন যুগ থেকে মানুষ আমোদপ্রিয়। তাই মানুষকে আকৃষ্ট করতে যুগ যুগ ধরে ব্যাবসায়িক পণ্য বিক্রি ও রাজনৈতিক প্রচারণায় কমেডির ব্যবহার হয়ে আসছে। বর্তমান যুগে এর জনপ্রিয়তা দিন দিন বাড়ছে। তাই ব্যক্তিগত পর্যায়েও অনেকে কমেডি ভিডিও তৈরি করে ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দিচ্ছে। কাজটিকে আরো আকর্ষণীয় করে তুলতে দিন দিন বাড়ছে নতুন নতুন অ্যাপ।

    এ ছাড়া বিভিন্ন দেশি-বিদেশি টিভি চ্যানেল চালু করেছে নতুন নতুন কমেডি শো, যেখানে মানুষকে হাসানোর জন্য মিথ্যা ও অশ্লীল কৌতুকগুলোই বেশি শোনানো হয়। এ কারণেই হয়তো বিশ্ববিখ্যাত গ্রিক দার্শনিক প্লেটো বলেছিলেন, কৌতুকাভিনয় হলো আত্ম-অবক্ষয়। তাঁর মতে, কৌতুকাভিনয় এমন অনুভূতির সঞ্চার করে, যা নৈতিক আত্মনিয়ন্ত্রণ ও শিক্ষাকে অগ্রাহ্য করে।

    কমেডিয়ান হওয়া
    কমেডিকে পেশা হিসেবে নেওয়া কোনো মুমিনের জন্য শোভা পায় না। কৌতুক মানুষকে আল্লাহর জিকির থেকে দূরে রাখে। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, আর মানুষের মধ্য থেকে কেউ কেউ না জেনে আল্লাহর পথ থেকে মানুষকে বিভ্রান্ত করার জন্য বেহুদা কথা খরিদ করে, আর তারা ওগুলোকে হাসিঠাট্টা হিসেবে গ্রহণ করে; তাদের জন্য রয়েছে লাঞ্ছনাকর শাস্তি। (সুরা : লুকমান, আয়াত : ৬)

    কমেডিয়ানরা সাধারণত মানুষকে হাসানোর জন্য বিভিন্ন গল্প বানিয়ে বলে। বাস্তবে যার কোনো ভিত্তি থাকে না। সম্পূর্ণ একটি মিথ্যা গল্প দিয়েই তারা মানুষের মনোরঞ্জন করে। হাদিসে এ ধরনের কাজকে নিষেধ করা হয়েছে। আবদুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, মিথ্যা বাস্তবিকপক্ষেও নয় এবং ঠাট্টাচ্ছলেও সংগত নয়। তোমাদের কেউ তার সন্তানকে কিছু দেওয়ার ওয়াদা করে তা তাকে না দেওয়ার বিষয়টিও সংগত নয়। (আদাবুল মুফরাদ, হাদিস : ৩৮৮)

    অন্য হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, মানুষকে হাসানোর জন্য যে ব্যক্তি মিথ্যা বলে তার জন্য ধ্বংস, তার জন্য ধ্বংস, তার জন্য ধ্বংস। (আবু দাউদ, হাদিস : ৪৯৯০)

    তা ছাড়া এই কমেডি শোগুলোর মাধ্যমে ছড়ানো হয় নানা অশ্লীল কথাবার্তা। যা পরবর্তী সময়ে মানুষ ঠাট্টাচ্ছলে নিজেদের পরিবারের মধ্যেও বলে ফেলে। অথচ এগুলো শয়তানের কাজ। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, শয়তান তোমাদেরকে অভাব-অনটনের ভয় দেখিয়ে থাকে এবং অশ্লীলতার আদেশ করে থাকে।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ২৬৮)

    ফান ভিডিও শেয়ার করা
    অনেকে কৌতুক করতে জানেন না। কিন্তু কৌতুক ভীষণ পছন্দ করেন। তাই কোনো কৌতুকের ভিডিও পেলেই তা ইন্টারনেটে শেয়ার করে দেন। কেউ কেউ আবার ভিডিও শেয়ারিংয়ের মাধ্যমে আয় করার জন্য কমেডি ভিডিওকেই বেছে নেন। ইসলামের দৃষ্টিতে এ ধরনের মিথ্যা, অশ্লীল ভিডিও প্রচার করাও জঘন্য অপরাধ।

    ইরশাদ হয়েছে, যারা পছন্দ করে যে মুমিনদের মধ্যে অশ্লীলতা প্রসার লাভ করুক, তাদের জন্য দুনিয়া ও পরকালে রয়েছ যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি; আর আল্লাহ জানেন, তোমরা জানো না। (সুরা : নূর, আয়াত : ১৯)

    রসিকতার সীমারেখা
    হ্যাঁ, এর মানে এই নয় যে ইসলাম আমাদের মুখের হাসি কেড়ে নিতে চাইছে। ইসলাম রসিকতা করতে নিষেধ করেনি। নিজের পরিবার-পরিজন ও বন্ধুবান্ধবের মাঝেমধ্যে রসিকতা করারও অনুমতি আছে। তবে সেখানে কোনো অশ্লীলতা ও মিথ্যার মিশ্রণ ঘটানো যাবে না।

    আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, তাঁরা (সাহাবায়ে কেরাম) বললেন, হে আল্লাহর রাসুল! আপনি আমাদের সঙ্গে কৌতুক করছেন? তিনি বললেন, আমি কৌতুকের ছলে কখনো সত্য ছাড়া কিছু বলি না। (শামায়েলে তিরমিজি, হাদিস : ১৭৬)

    অনেক ক্ষেত্রে মানুষ কমেডি করার জন্য কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি কিংবা জাতি-গোষ্ঠীকে ট্রল করে বসে। যা ইসলামে নিষিদ্ধ। একদিন আয়েশা (রা.) হাসির ছলে নবী (সা.)-কে জনৈক ব্যক্তির চালচলন নকল করে দেখালেন। রাসুল (সা.) তাতে বিরক্তি প্রকাশ করেন। (তিরমিজি, হাদিস : ২৫০২)

    মুমিন কোনো অনর্থক কাজে আত্মনিয়োগ করতে পারে না। পবিত্র কোরআনে যারা অনর্থক কাজ থেকে বিরত থাকে তাদের সফল বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। (মুমিনরা সফল) যারা অনর্থক কাজ থেকে বিরত থাকে। (সুরা : মুমিনুন, আয়াত : ৩)। তা ছাড়া আমাদের সবাইকে মহান আল্লাহর দেওয়া প্রতিটি মুহূর্তের হিসাব দিতে হবে। হিসাব দিতে হবে তাঁর দেওয়া অঙ্গ-প্রতঙ্গগুলো সঠিক জায়গায় ব্যবহৃত হয়েছে কি না সে বিষয়ে। মহান আল্লাহ বলেন, নিশ্চয়ই কান, চক্ষু ও অন্তঃকরণ এদের প্রত্যেকটি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে। (সুরা : আল-ইসরা, আয়াত : ৩৬)

    তাই আমাদের উচিত কমেডির অনর্থক কাজ বর্জন করে সোনালি পরকাল বিনির্মাণে আত্মনিয়োগ করা।

  • বন্ধ হলো মিজানুর রহমান আজহারীর মাহফিল

    বন্ধ হলো মিজানুর রহমান আজহারীর মাহফিল

    দেশের বিভিন্ন স্থানের মতো চাঁদপুরেও জনপ্রিয় ও আলোচিত ইসলামী বক্তা মিজানুর রহমান আজহারীর মাহফিল বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।

    শনিবার (১৪ ডিসেম্বর) মাহফিল কমিটিকে এ সংক্রান্ত একটি চিঠি দিয়ে মাহফিল বন্ধ রাখতে জেলা প্রশাসন কার্যালয় থেকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। রেলওয়ে দারুল উলুম ইসলামিয়া মাদরাসা ও মাহফিল এন্তেজামিয়া কমিটির সভাপতি মুহাম্মদ হোসেন গাজী এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

    মাহফিল ঘিলে নিরাপত্তার অভাব এবং সব ধরনের ‌আপত্তিকর ঘটনা এড়াতে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে বলে চাঁদপুর সদর মডেল থানা থেকে জানানো হয়েছে।

    এর আগে আগামীকাল রোববার চাঁদপুর রেলওয়ে দারুল উলুম ইসলামিয়া মাদরাসায় আয়োজিত মাহফিলে মিজানুর রহমান আজহারী অংশগ্রহণ করবেন বলে মাহফিল কমিটি এক প্রেস বিজ্ঞপ্তি দেয়। এটি স্থানীয় গণমাধ্যমে প্রকাশ হলে ডিসেম্বরের শুরু থেকেই বিষয়টি নিয়ে চাঁদপুর সরগরম হয়ে ওঠে। এ নিয়ে মিজানুর রহমান আজহারীর ভক্তদের মাঝে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখা দেয়। তবে চাঁদপুর রেলওয়ে দারুল উলুম ইসলামিয়া মাদরাসার বার্ষিক মাহফিলে প্রধান বক্তা হিসেবে আজহারীর আশাকে কেন্দ্র করে একটি পক্ষ লিখিত অভিযোগ দিয়ে প্রশাসনকে অবহিত করেন।

    সরকার বিরোধী কার্যক্রম ও বিভিন্ন বিষয়ে বয়ান দেয়ার আশঙ্কায় প্রতিপক্ষরা ওয়াজ বন্ধের জন্য লিখিত অভিযোগটি প্রদান করে বলে জানা গেছে। তাই নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে প্রশাসন ওয়াজ বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

    চাঁদপুর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নাছিম উদ্দিন বলেন, মিজানুর রহমান আজহারী চাঁদপুর রেলওয়ে মাদরাসায় ওয়াজ করার জন্য আসার খবর শুনে একটি পক্ষ অভিযোগ করেছেন। তাই নিরাপত্তার স্বার্থে পুলিশ সুপারের নির্দেশে ওয়াজ মাহফিল বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। মাহফিলে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে অনুমতি না থাকায় পুলিশ প্রশাসনও অনুমতি দেয়নি বলে জানান তিনি।

    মাহফিল পরিচালনা কমিটির সভাপতি সাবেক পৌর কমিশনার হোসেন গাজী স্থানীয় গণমাধ্যমকে জানান, ‘আমরা প্রথম দিকে প্রশাসনের অনুমতি নিয়ে মাহফিল প্রচারণা শুরু করেছি। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা অবনতির আশঙ্কার কথা জানিয়ে ১৩ ডিসেম্বর পুলিশের পক্ষ থেকে এবং ১৪ ডিসেম্বর জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে চিঠি দিয়ে আমাদেরকে মাহফিলের অনুমতি নেই বলে জানানো হয়েছে।’

    সম্প্রতি দেশের কয়েকজন ইসলামী বক্তার মধ্যে মিজানুর রহমান আজহারী বেশ জনপ্রিয় হয়েছেন। তবে তাকে নিয়ে নানা বিতর্কও চলছে।

    এর আগে বিশ্ব সুন্নী আন্দোলন নামে একটি সংগঠনের দাবিতে ডিসেম্বরের শুরুতে ফেনীতে মিজানুর রহমান আজহারীর মাহফিল বন্ধ করে দেয় জেলা প্রশাসন।

    বিভিন্ন মাহফিলে মিজানুর রহমান আজহারীকে যুদ্ধাপরাধে সাজাপ্রাপ্ত বাংলাদেশ জামায়াত ইসলামী দলের নেতা দেলোয়ার হোসেন সাঈদীর প্রশংসায় বক্তব্য দিতে দেখা গেছে। এছাড়া ওয়াজে বিভিন্ন শব্দ ও ভাষার ব্যবহার নিয়েও তার সমালোচনা করা হচ্ছে।

  • নতুন কাপড় পরার দোয়া

    নতুন কাপড় পরার দোয়া

    উচ্চারণ : আল্লাহুম্মা লাকাল হামদু কামা কাসাওতানিহি, আসআলুকা খইরাহু ওয়া খইরা মা সুনিআ লাহু, ওয়া আউজুবিকা মিন শাররিহি ওয়া শাররি মা সুনিআ লাহু।

    অর্থ : হে আল্লাহ! তোমারই জন্য যাবতীয় প্রশংসা। যেহেতু তুমিই আমাকে তা পরিধান করিয়েছ। আমি তোমার কাছে এর কল্যাণ প্রার্থনা করছি, আরো কল্যাণ চাচ্ছি যে উদ্দেশ্যে এটা তৈরি করা হয়েছে তার। আর আমি তোমার শরণাপন্ন হচ্ছি এর যাবতীয় অনিষ্ট থেকে এবং যে উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছে তার অনিষ্ট থেকে।’

    উপকার : আবু সাঈদ খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুল (সা.) যখন নতুন কাপড় পরিধান করতেন তখন কাপড়ের নাম যথা—পাগড়ি, জামা অথবা চাদর ইত্যাদি উচ্চারণ করতেন। তারপর তিনি এই দোয়া পড়তেন। (শামায়েলে তিরমিজি, হাদিস : ৪৭)

  • প্রযুক্তিগত পরকীয়া, ইসলাম যা বলে

    প্রযুক্তিগত পরকীয়া, ইসলাম যা বলে

    বর্তমান সমাজে পরকীয়া ক্যান্সারের আকার ধারণ করছে। যুবক থেকে বৃদ্ধ সব মহলেই এর আগ্রাসন দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে। বেলজিয়ামের মনস্তাত্ত্বিক এস্থার পেরেল তাঁর ‘দ্য স্টেট অব অ্যাফেয়ার’ বইয়ে পরকীয়াকে ক্যান্সারের সঙ্গে তুলনা করেছেন। তিনি বলেছেন, জীবনযন্ত্রণার অন্যতম কারণ দ্বিতীয় কোনো নারী বা পুরুষের সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্কে জড়িয়ে পড়া।

    পরকীয়া বিশ্বব্যাপী অশান্তি নামিয়ে আনছে। এর জেরে কখনো কখনো খুনখারাবির মতো জঘন্য ঘটনাও ঘটে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব নেভাদার অধ্যাপক ড্যানিয়েল উয়েগেল ও গবেষক রোজি শ্রাউটের মতে, পরকীয়া সম্পর্ক ভুক্তভোগীর মনে ক্রোধ, অশান্তি, দুঃখ, অবিশ্বাস ও অশেষ মনোযন্ত্রণার সৃষ্টি করে। এর প্রধান কারণ আল্লাহর আইনের অমান্য করা। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, যে ব্যক্তি আল্লাহর জিকির থেকে বিমুখ হয়, তার জীবনযাত্রা সংকীর্ণ ও দুঃখে ভরপুর হয়ে ওঠে।’ (সুরা : ত্বহা, আয়াত : ১২৪)

    বর্তমান প্রযুক্তির যুগে পরকীয়া অনেক সহজ। বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, ফ্রি কলিং অ্যাপ ও মোবাইল ফোন এই কাজটি ভীষণ সহজ করে দিয়েছে। এখন আর কারো সঙ্গে দেখা করার জন্য গোপনে তার ঘরের পেছনে গিয়ে মশার কামড় খেতে হয় না। মুঠোফোনে ভিডিও কলের মাধ্যমে এক মুহূর্তেই প্রেমিকার দেখা পাওয়া যায়।

    এতে কোনো সন্দেহ নেই যে মোবাইল ফোনের অনেক ইতিবাচক দিক আছে। মানুষের মধ্যে সহজ যোগাযোগ ও দূরত্ব ঘুচিয়ে আনতে মোবাইল ফোনের জুড়ি নেই। লেনদেন, ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে শুরু করে বিশ্বকে জানা ও বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার অন্যতম হাতিয়ার হিসেবে মোবাইলের জনপ্রিয়তা দিন দিন বাড়ছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও মানুষের জীবনে বহুমাত্রিক অকল্যাণ বয়ে আনছে এই যন্ত্রটি।

    কিন্তু ক্ষেত্রবিশেষে এর অপকারিতাও কম নয়। শুধু পরকীয়াই নয়, বরং শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায়ও ব্যাপক প্রভাব ফেলে এই প্রযুক্তি। সিএনএনের গবেষণা মতে, ৫০ শতাংশ কিশোর ও ২৭ শতাংশ মা-বাবা মনে করেন, তাদের মধ্যে মোবাইল ফোন আসক্তির রূপ নিয়েছে। প্রায় ৮০ শতাংশ ছাত্র-ছাত্রী প্রতি ঘণ্টায় তাদের মোবাইল চেক করে। ৭২ শতাংশ অনুভব করে যে অন্যের মেসেজের রিপ্লাই দেওয়া তাদের জন্য জরুরি।

    পরকীয়া মানুষকে ব্যভিচারের দিকে টেনে নেয়। অথচ এটি ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘তোমরা ব্যভিচারের কাছেও যেয়ো না। নিশ্চয় তা অশ্লীল কাজ ও মন্দ পথ।’ (সুরা : ইসরা, আয়াত : ৩২)

    অনেকের ধারণা হতে পারে, প্রযুক্তির ব্যবহার করে দূর থেকে কথোপকথন আর ব্যভিচার নয়। কথাটি ঠিক নয়। দূর থেকে যেমন ভার্চুয়াল প্রেম সম্ভব, তেমনি বর্তমান যুগে দূর থেকে ভার্চুয়াল সেক্সও সম্ভব। বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কিছু অসামাজিক মানুষকে এ রকম বিজ্ঞাপন দিতেও দেখা যায় যে ‘মোবাইল সেক্স প্রতি ঘণ্টা এত টাকা’। (নাউজুবিল্লাহ!)।

    রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, চোখের ব্যভিচার হলো (বেগানা নারীকে) দেখা, জিহ্বার ব্যভিচার হলো (তার সঙ্গে) কথা বলা (যৌন উদ্দীপ্ত কথা বলা)। (বুখারি, হাদিস : ৬২৪৩)

    অন্য হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, দুই চোখের জিনা (বেগানা নারীর দিকে) তাকানো, কানের জিনা যৌন উদ্দীপ্ত কথা শোনা, মুখের জিনা আবেগ উদ্দীপ্ত কথা বলা, হাতের জিনা (বেগানা নারীকে খারাপ উদ্দেশ্যে) স্পর্শ করা আর পায়ের জিনা ব্যভিচারের উদ্দেশ্যে অগ্রসর হওয়া এবং মনের জিনা হলো চাওয়া ও প্রত্যাশা করা।’ (মেশকাত, হাদিস : ৮৬)

    বোঝা গেল, যারা প্রযুক্তি ব্যবহার করে ভিডিও কল, অডিও কল কিংবা মেসেজিংয়ের মাধ্যমে পরকীয়ায় লিপ্ত রয়েছে, তারা ব্যভিচারেই লিপ্ত রয়েছে, যার শাস্তি ভয়াবহ।

  • অপরাধীদের প্রতি মহানবীর আচরণ যেমন ছিল

    অপরাধীদের প্রতি মহানবীর আচরণ যেমন ছিল

    রাসুলুল্লাহ (সা.) দয়া, অনুগ্রহ ও ভালোবাসার নবী। তিনি নিজের পরিচয় দিয়ে বলেছেন, ‘আমি ক্ষমা ও দয়ার নবী।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৩৫৫) আর কোরআনে মহানবী (সা.) সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘তোমাদের মধ্য থেকে তোমাদের জন্য নবী রাসুল এসেছেন। তোমাদের যা বিপন্ন করে তা তাকে কষ্ট দেয়, তিনি তোমাদের মঙ্গলকামী এবং মুমিনদের প্রতি দয়ার্দ্র ও পরম দয়ালু।’ (সুরা : তাওবা, আয়াত : ১২৮)

    রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর দয়া ও কল্যাণকামিতা ছিল সব মানুষের জন্য। তাঁর দয়া, অনুগ্রহ ও ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত হতো না সমাজের অপরাধীরাও; বরং তাদের প্রতি ছিল তাঁর বিশেষ মমত্ব ও কল্যাণকামিতা। কারো ভেতর কোনো অপরাধপ্রবণতা দেখা দিলে তিনি প্রথমেই তা সংশোধনের চেষ্টা করতেন। যুক্তি দিয়ে তাকে বোঝানোর চেষ্টা করতেন। বেশির ভাগ সময় কারণ ব্যাখ্যা করতেন। আবার অপরাধ প্রমাণিত হলে যথোপযুক্ত শাস্তি প্রয়োগ করতেন। যেন তা সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত না হয়।

    পাপ থেকে সতর্কীকরণ
    আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘নবী (সা.) আমার শরীরে দুটি জাফরান রঙের কাপড় দেখলেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, তোমার মা কি তোমাকে এই দুটি পরার নির্দেশ দিয়েছেন? আমি বললাম, আমি কি কাপড় দুটি ধুয়ে দেব? রাসুল (সা.) বললেন, বরং তুমি তা পুড়িয়ে ফেলো। কেননা এটি অবিশ্বাসীদের পোশাক। তুমি পরিধান কোরো না।’ (রিয়াদুস সালিহিন, হাদিস : ২৮৯)

    অপরাধপ্রবণতা দূর করতে মনস্তাত্ত্বিক চিকিৎসা
    অপরাধপ্রবণতা কমাতে মনস্তাত্ত্বিক চিকিত্সার কথা বলে আধুনিক অপরাধ বিজ্ঞান। রাসুলুল্লাহ (সা.) অপরাধপ্রবণতা দূর করতে এই পদ্ধতিকে গুরুত্ব দিতেন। তিনি এমনভাবে অপরাধের স্বরূপ উন্মোচন করতেন যে মানুষের অপরাধস্পৃহা দূর হয়ে যেত। যেমন—এক যুবক রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে ব্যভিচারের অনুমতি চাইলে তিনি বললেন, তোমার মা, মেয়ে, বোন, ফুফি ও খালার সঙ্গে কেউ এমন করুক এটা কি তুমি পছন্দ করবে? সে বলল, না, এটা কেউ পছন্দ করবে না। তখন রাসুল (সা.) তাকে বললেন, মানুষও তার আপনজনের সঙ্গে ব্যভিচার পছন্দ করে না। অতঃপর তিনি তার পাপমুক্তি ও আত্মার পরিশুদ্ধির জন্য দোয়া করলেন। (মুসনাদে আহমদ : ৫/২৫৬)

    অপরাধীর আত্মসম্মানে আঘাত নয়
    রাসুল (সা.)-এর সময়ে কেউ কোনো অপরাধ করলে তিনি তার নাম উল্লেখ না করেই মানুষকে সতর্ক করতেন, যেন অপরাধীর আত্মসম্মানে আঘাত না লাগে। আয়েশা (রা.) বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে যখন তাঁর কোনো সাহাবির ব্যাপারে কোনো অভিযোগ পৌঁছাত, তখন তিনি বলতেন না অমুকের কী হলো; বরং তিনি বলতেন, মানুষের কী হলো তারা এমন কাজ করে!’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ৪৭৮৮)

    অপরাধকর্মের প্রচারণা অনুচিত
    মহানবী (সা.) সামাজিকভাবে অপরাধীর দোষ-ত্রুটি ও অপরাধের প্রচার নিষিদ্ধ করেছেন। যেন ওই ব্যক্তি অনুতপ্ত হয়ে ফিরে আসার সুযোগ পায়। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি তার কোনো মুসলিম ভাইয়ের দোষ গোপন করল, আল্লাহ কিয়ামতের দিন তার দোষ গোপন করবেন। আর যে তার কোনো মুসলিম ভাইয়ের দোষ প্রকাশ করে দেবে, আল্লাহ তার দোষ প্রকাশ করে দেবেন; এমনকি তাকে নিজ ঘরে অপমানিত করবেন।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস : ২৫৪৬)

    ইসলামী আইনজ্ঞদের মতে, ব্যক্তির অপরাধের সঙ্গে যদি অন্য কারো অধিকার, সামাজিক শৃঙ্খলা ও অবক্ষয়, বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থ জড়িত না থাকে তখন তার অপরাধ গোপন করা যাবে। নতুবা তা প্রকাশ করে দিতে হবে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আল্লাহ মন্দ কথার প্রচারণা পছন্দ করেন না। কিন্তু যার ওপর জুলুম করা হয়েছে সে ছাড়া। আর আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ১৪৮)

    সংশোধনের সুযোগ দেওয়া
    কেউ অপরাধ করলে তার ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তাকে আত্মসংশোধনের সুযোগ দিতে বলেছেন। ইসলামী শরিয়তে শাস্তির যে বিধান রয়েছে তার মূল উদ্দেশ্যও ব্যক্তির আত্মসংশোধন। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যখন তোমাদের কারো দাসী (অবিবাহিত) ব্যভিচারে লিপ্ত হয় এবং তা প্রমাণিত হয়, তখন তাকে দোররা মেরে তাকে শাস্তি দাও। কিন্তু তাকে ভর্ত্সনা কোরো না। যদি সে আবারও ব্যভিচারে লিপ্ত হয় এবং তার ব্যভিচার প্রমাণিত হয়, তবে তাকে দোররা মেরে শাস্তি দাও। কিন্তু তাকে ভর্ত্সনা কোরো না। তার পরও যদি সে ব্যভিচার করে এবং তার ব্যভিচার প্রমাণিত হয়, তাহলে তাকে বিক্রি করে দাও একটি রশির বিনিময়ে হলেও।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ২২৩৪)

    অপরাধীরাও মৌলিক মানবাধিকার পাবে
    আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত উল্লিখিত হাদিস দ্বারা এটাও প্রমাণিত হয় যে কোনো ব্যক্তি অপরাধী প্রমাণিত হলেও সে মৌলিক মানবাধিকার থেকে বঞ্চিত হবে না। একটি অপরাধের দায়ে ব্যক্তিকে আজীবন ভর্ত্সনা ও অপমান করা যাবে না। নতুবা রাসুলুল্লাহ (সা.) দাসীকে ভর্ত্সনা করতে নিষেধ করতেন না।

    ক্ষমার ব্যাপারে আশান্বিত করা
    মনুষ্যত্বের কারণে মানুষ অপরাধ করার পর আত্মগ্লানিতে ভোগে। রাসুলুল্লাহ (সা.) অপরাধীকে আত্মগ্লানি থেকে মুক্তি দেওয়ার জন্য আল্লাহর ক্ষমা ও অনুগ্রহের প্রতি আশান্বিত করতেন। আবদুর রহমান ইবনে জোবায়ের (রা.) আবু তুয়াইল শাতাব আল মামদুদ (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে বললেন, ‘আপনি সেই ব্যক্তির ব্যাপারে কী বলেন, যে সব ধরনের পাপ করেছে। কোনো পাপই সে ছাড়েনি; ছোট-বড় সব পাপই সে করেছে। তার এত পাপের মার্জনা আছে? রাসুল (সা.) বললেন, তুমি কি ইসলাম গ্রহণ করেছ? তিনি বললেন, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি আল্লাহ ছাড়া আর কোনো উপাস্য নেই এবং আপনি আল্লাহর রাসুল। মহানবী (সা.) বললেন, ভালো কাজ করো, পাপ পরিহার করো, আল্লাহ তোমার পাপকে পুণ্যে পরিণত করবেন। আবু তুয়াইল (রা.) বললেন, আমরা বিশ্বাসঘাতকতা ও পাপাচারও? রাসুল (সা.) বললেন, হ্যাঁ! আল্লাহ মহান। কোনো কিছু তাঁর সীমার ঊর্ধ্বে নয়।’ (সুনানে তিবরানি, হাদিস : ৭২৩৫)

    কল্যাণের জন্য শাস্তি প্রদান
    মহানবী (সা.) অপরাধীদের মানবিক অধিকার ও উত্তম জীবন কামনা করলেও সার্বিক কল্যাণের জন্য ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় বদ্ধপরিকর ছিলেন। অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার পর তিনি কাউকে ছাড় দিতেন না। রাসুল (সা.) বলেন, ‘নিশ্চয়ই তোমাদের আগে যারা ধ্বংস হয়েছে, তাদের মধ্যে যখন কোনো অভিজাত ব্যক্তি চুরি করত, তারা তাদের ছেড়ে দিত। আর যখন তাদের মধ্যে দুর্বল কেউ চুরি করত, তার ওপর শাস্তি প্রয়োগ করত। আল্লাহর শপথ! যদি মুহাম্মদের কন্যা ফাতেমাও চুরি করে আমি তার হাত কেটে দেব।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ৩৪৭৫)

    অপরাধীদের সঙ্গে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আচরণ ছিল অত্যন্ত মানবিক, ন্যায়সংগত ও কল্যাণের ধারক-বাহক। ঠিক যেমন কোরআনে বলা হয়েছে, ‘আল্লাহর অনুগ্রহে আপনি তাদের প্রতি কোমল হৃদয় হয়েছেন। যদি আপনি কঠোর হৃদয় ও রূঢ় আচরণকারী হতেন, তবে তারা আপনার পাশ থেকে সরে যেত। আপনি তাদের ক্ষমা করুন। তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করুন এবং কাজে-কর্মে তাদের সঙ্গে পরামর্শ করুন।… ’ (সুরা: আলে ইমরান, আয়াত : ১৫৯)