Category: ইসলাম

  • রোজা অবস্থায় বমি করলে বা অজ্ঞান হলে কি রোজা ভেঙে যাবে?

    রোজা অবস্থায় বমি করলে বা অজ্ঞান হলে কি রোজা ভেঙে যাবে?

    প্রশ্ন : রোজা অবস্থায় বমি করলে বা অজ্ঞান ও বেহুশ হয়ে পড়লে কি রোজা ভেঙে যাবে?
    উত্তর : রোজা অবস্থায় বমি হলে রোজা ভাঙবে কি-না, এ নিয়ে অনেকেই আমরা উদ্বিগ্ন হয়ে থাকি। এ ব্যাপারে ইসলামের নির্দেশনা হচ্ছে, বমির পরিমাণ বেশি হোক বা কম, সেটা খাদ্য বমি হোক বা রক্ত বমি, মনে রাখতে হবে—রোজা হলো পানাহার না করার নাম। বমি হলে তো পানাহার করা হয় না; বরং তার বিপরীত হয়। তাই রোজা অবস্থায় বমি হলে রোজা ভাঙ্গবে না।

    তবে বমি হওয়ার পর রোজা পালনে সক্ষম হলে তা পূর্ণ করবে; অক্ষম হলে রোজা ছেড়েও দিতে পারবে। এ রোজা পরে কাজা আদায় করতে হবে; কাফফারা প্রয়োজন হবে না। বমি মুখে আসার পর তা গিলে ফেললে রোজা ভেঙে যাবে। ইচ্ছাকৃত বমি করলে রোজা ভঙ্গ হবে। এমতাস্থায় কাজা ও কাফফারা উভয়টাই আদায় করতে হবে।

    অনুরূপভাবে কোনো কারণে অজ্ঞান হলে (যাতে সাধারণত রোজার বিপরীত কিছু ঘটে না), রোজা ভঙ্গ হবে না। তবে দুর্বলতা বা অসুস্থতার কারণে প্রয়োজনে পানাহার বা ওষুধ সেবনে রোজা ভাঙ্গলে পরে কাজা আদায় করে নিতে হবে।

    উল্লেখ্য, অনিচ্ছাকৃত বমি হওয়া ও অজ্ঞান হওয়া অজু ভঙ্গের কারণ; রোজা ভঙ্গের কারণ নয়।

  • খতম তারাবির সুন্দর পদ্ধতি কোনটি?

    খতম তারাবির সুন্দর পদ্ধতি কোনটি?

    প্রতি বছরই আমাদের দেশের মসজিদগুলোতে একই পদ্ধতিতে খতম তারাবি পড়তে বিশেষ আহ্বান জানায় ইসলামিক ফাউন্ডেশন। এতে তারাবির নামাজে প্রথম ছয় দিনে দেড় পারা করে ৯ পারা এবং বাকি ২১ দিনে ১ পারা করে ২১ পারা তেলাওয়াত করার প্রতি অনুরোধ জানানো হয়। এ পদ্ধতি অনুসরণ করলে ২৭ রমজানে সব মসজিদে একযোগে পবিত্র কোরআন খতম হয়। এতে করে সবচেয়ে বড় সুবিধাটা হলো, একজন মুসল্লি দেশের যে কোনো মসজিদেই তারাবি পড়ুক না কেন, তাতে তারাবির নামাজে তার পুরো কোরআন শ্রবণে কোনো প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয় না।

    যেমন—যদি কোনো মুসল্লি ১৩ পারার দিন তথা দশম রমজানের তারাবি তার মহল্লার মসজিদে আদায় করে এবং পরের দিন অন্য কোনো মসজিদে তারাবি পড়ে, তাহলে নামাজে সম্পূর্ণ কোরআন তেলাওয়াত শোনার তার যে ইচ্ছে ছিল, তা অটুট থাকবে। কেননা, সব মসজিদে একই পদ্ধতিতে অনুশীলন হচ্ছে। পরের দিন তথা একাদশ রমজানে সে যেই মসজিদে নামাজ পড়বে, সেখানে নিয়মমতো ১৪ নম্বর পারা তেলাওয়াত করা হবে। রমজানে তারাবিতে পারা ভাগ করে কোরআন খতমের এই যে বাহ্যত সুন্দর পদ্ধতি, এটি কি বাস্তবেই সুন্দর নাকি এর চেয়ে আরও উত্তম কোনো পদ্ধতি আছে? কোরআনকে ত্রিশ পারায় ভাগ করার উদ্দেশ্যসহ আরও একটি বিষয় সম্পর্কে আলোচনা করলে ব্যাপারটি বুঝে আসবে।

    কোরআনকে ত্রিশ পারায় ভাগ করার উদ্দেশ্য
    পারা শব্দটি ফার্সি; যার অর্থ—টুকরো, অংশ। বর্তমানে আমাদের সামনে পবিত্র কোরআনুল কারিমের যে প্রতিলিপি রয়েছে, তা মোট ত্রিশটি অংশে বা পারায় বিন্যস্ত। পারার এ বিন্যাস অর্থ হিসেবে নয়; বরং হিফজের ছোট বাচ্চাদের পড়া এবং পড়ানোর সুবিধার্থে। হাফেজি কোরআনুল কারিমের প্রতিটি পারায় ২০টি পৃষ্ঠা থাকে। পৃষ্ঠার এ বিন্যাসও বাচ্চাদের দিকে খেয়াল করেই সাজানো।

    এক কথায়—পারা এবং পৃষ্ঠা অর্থ বা বিষয়ের প্রতি নজর রেখে বিন্যস্ত হয়নি। তাই অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, একটি পৃষ্ঠা বা পারা শেষ হয়েছে, কিন্তু বিষয়বস্তু অপূর্ণ রয়ে গেছে। পারা ও পৃষ্ঠার এ বিন্যাস কে করেছেন, এর নির্ভরযোগ্য কোনো সূত্র পাওয়া যায় না। তবে শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.) তার অমর গ্রন্থ মাজমাউল ফাতাওয়াল কোবরায় উল্লেখ করেছেন, হরকত তথা জবর-জের-পেশ এর মতো পবিত্র কোরআনে পারারও প্রবর্তন করেছেন হাজ্জাজ বিন ইউসুফ।

    কোরআনের ৫৪০ রুকু ও একটি বিশেষ রহস্য
    পারার মতো পবিত্র কোরআনের আরেকটি বিন্যাস আছে, যেটিকে রুকু বলা হয়। কোরআনের মুসহাফ বা প্রতিলিপিতে পাদটিকায় রুকুর চিহ্ন হিসেবে আরবি অক্ষর ‘আইন’ লেখা থাকে। মাশায়েখে বোখারা পুরো কোরআনকে সর্বমোট ৫৪০টি রুকুতে ভাগ করেছেন। কোরআনকে রুকুতে বিভাজন করা হয়েছে অর্থ ও মর্মের প্রতি লক্ষ্য রেখে। উদ্দেশ্য—যেন আরবি ভাষা সম্পর্কে অনবহিত পাঠক বুঝতে পারেন, কোথায় একটি বিষয়ের আলোচনা শেষ হয়েছে, আর কোথা থেকে নতুন বিষয়বস্তুর আলোচনার সূচনা হয়েছে।

    আর ৫৪০ সংখ্যায় রুকুর বিভাজনে রয়েছে দারুণ এক রহস্য। ফতোয়ায়ে তাতারখানিয়ার প্রথম খণ্ডের ৪৭৯ পৃষ্ঠায় এবং ফতোয়ায়ে আলমগিরির প্রথম খণ্ডের ৯৪ পৃষ্ঠায় তারাবি অনুচ্ছেদে কোরআনুল কারিমের ৫৪০ রুকুতে বিভাজনের রহস্য বর্ণনা করে বলা হয়েছে, মাশায়েখে কেরাম কোরআনকে ৫৪০ রুকুতে ভাগ করেছেন এ কারণে যে, যাতে পবিত্র রমজানে তারাবির নামাজে ২৭ দিনে কোরআন খতম করা যায়। অর্থাৎ প্রতিদিন ২০ রাকাত তারাবির নামাজে প্রত্যেক রাকাতে যদি এক রুকু পরিমাণ তেলাওয়াত করা হয়, তাহলে ২৭ রমজানে ৫৪০টি রুকু তথা সম্পূর্ণ কোরআন খতম হবে। কেননা, ৫৪০ সংখ্যাটিকে ২০ দিয়ে ভাগ দিলে ভাগফল হয় ২৭।

    তারাবির রাকাত রুকু হিসেবে পড়া যে কারণে উত্তম
    নামাজে কেরাত পাঠে বিশেষ দুটি মাসআলা আছে—এক. প্রথম রাকাতের কেরাত দ্বিতীয় রাকাতের কেরাতের চেয়ে বড় হওয়া মুস্তাহাব। দুই. বিষয়বস্তু ঠিক রেখে প্রতি রাকাতে তেলাওয়াত করা। অর্থাৎ প্রতিটি রাকাতে কোনো বিষয়ের আয়াতগুলো তেলাওয়াত শুরু করলে ওই বিষয়ের সবগুলো আয়াত পড়ে শেষ করা মুস্তাহাব। কিন্তু রুকু হিসেবে রাকাত আদায় করলে কিছু কিছু সময় উপরিউক্ত মাসআলাদুটির ওপর একত্রে আমল করা অসম্ভব হয়ে পড়ে।

    যেমন—সুরা বাকারার প্রথম রুকু ছোট আর দ্বিতীয় রুকু বড়। এ ক্ষেত্রে তো দ্বিতীয় মাসআলা তথা বিষয়বস্তু ঠিক রেখে প্রতি রাকাতে তেলাওয়াত করার ওপর আমল হলো; পক্ষান্তরে প্রথম রাকাতে বড় আর দ্বিতীয় রাকাতে ছোট কেরাত পাঠের ওপর আমল করা সম্ভব হলো না। এ ক্ষেত্রে ফুকাহায়ে কেরাম ও ইসলামি স্কলারদের অভিমত হলো, বিষয়বস্তুর ওপর আমলের ব্যাপারটা প্রথম রাকাতের তুলনায় দ্বিতীয় রাকাতে ছোট কেরাত পড়ার আমলের ওপর প্রাধান্য পাবে। এ জন্য সর্বাবস্থায়ই পারার তুলনায় রুকু হিসেবে খতম তারাবি পড়া উত্তম এবং মুস্তাহাব।

    বর্তমানে রুকু হিসেবে খতম তারাবি
    সাহাবাদের যুগ থেকেই আরবরা তারাবিসহ অন্যান্য নামাজে রুকু হিসেবে পবিত্র কোরআনের তেলাওয়াত করতেন। মাশায়েখে বোখারা অনারবদের সুবিধার্থে রুকুর প্রবর্তন করলে আরবের বাইরেও এ পদ্ধতিতে তারাবির নামাজ আদায় শুরু হয়। এখনও আরব-অনারব অনেক জায়গায় রুকু হিসেবে খতম তারাবি ও কিয়ামুল লাইলের সালাত আদায় করা হচ্ছে। বাংলাদেশে রাজধানীর দারুল উলুম ঢাকা নামে মিরপুরের একটি মাদরাসায় কয়েক বছর যাবত এ পদ্ধতি অনুসরণ করে খতম তারাবি আদায় শুরু হয়েছে।

    মাদরাসাটির প্রিন্সিপাল মুফতি রেজাউল হক মুহাম্মদ আবদুল্লাহ সালাফদের অনুকরণে মুস্তাহাব এ পদ্ধতি চালু করেছেন। এ ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘যে কোনো নামাজে রুকু হিসেবে তেলাওয়াত করাটাই কোরআন ও নামাজের দাবি। এতে প্রতিটি রাকাত অর্থবহ হয় এবং প্রতিটি বিষয়ের শুরু-শেষ শ্রবণে আত্মিক প্রশান্তি অনুভূত হয়। ইনশাআল্লাহ, আগামীতে এ পদ্ধতির প্রসারে আমি যথাসাধ্য চেষ্টা করব।’

    আল্লাহতায়ালা আমাদের সবাইকে বুঝে কোরআন তেলাওয়াত করা ও নামাজ আদায়ের তৌফিক দান করুন। আমিন।

  • রমজান মাসে দান-সদকার ফজিলত

    রমজান মাসে দান-সদকার ফজিলত

    মাহে রমজান মানুষকে দানশীলতা, বদান্যতা, উদারতা ও মহত্বের শিক্ষা দেয়। কোনো প্রকার অপচয় না করে রোজার মাসে মানুষের সেবায় দান-সদকা করলে অভাবক্লিষ্ট মানুষের কল্যাণ হয় এবং মানবতা উপকৃত হয়। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘হে নবী! তাদের ধন-সম্পদ থেকে সদকা নিয়ে তাদেরকে পাক-পবিত্র করুন, (নেকির পথে) তাদের এগিয়ে দিন এবং তাদের জন্য রহমতের দোয়া করুন। (সুরা তওবা : ১০৩)।

    রমজানে দানের আধিক্য
    রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মানবকুলের মধ্যে সর্বাধিক উদার ও দানশীল ছিলেন। রমজান মাসে যখন জিবরাইল আলাইহিস সালাম নিয়মিত আসতে শুরু করতেন, তখন তার দানশীলতা বহুগুণ বেড়ে যেত। (বোখারি)। আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, ‘আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চেয়ে কাউকে অধিকতর দয়ালু দেখিনি।’ (মুসলিম)। অন্য বর্ণনায় আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দানের হাত এতটা প্রসারিত ছিল যে, সকালবেলা যদি ওহুদ পরিমাণ সম্পদও রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে রাখা হয়, আমার মনে হয়, মাগরিব আসার আগেই তিনি সব দান করে শেষ করে ফেলবেন। (বোখারি ও মুসলিম)।

    রমজান মাসে দানে ৭০ গুণ বেশি সওয়াব
    রমজানে প্রতিটি ভালো কাজের নেকি ৭০ গুণ বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে এ মাসে যত বেশি দান-সদকা করা যাবে, তা বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার প্রিয় উম্মতকে রমজান মাসে বেশি পরিমাণে দান করতে উৎসাহিত করতেন। রমজান মাসে একটি নফল আমল ফরজের মর্যাদায় সিক্ত। সে হিসেবে রমজান মাসে আমাদের প্রতিটি দান-সদকাই ফরজ হিসেবে আল্লাহতায়ালার কাছে গণ্য। দান-সদকার এমন ঈর্ষণীয় ফজিলত অন্যান্য মাসে কখনোই পাওয়া যাবে না। শুধু রমজানেই এই অফার সীমাবদ্ধ।

    দানকারীর তুলনা
    যারা আল্লাহর পথে স্বীয় ধন-সম্পদ ব্যয় করে, তাদের জন্য কোরআনে বলা হয়েছে, ‘যারা স্বীয় ধন-সম্পদ আল্লাহর পথে ব্যয় করে, তাদের উপমা হলো একটি শস্য বীজ; তা হতে উৎপন্ন হলো সাতটি শীষ। প্রত্যেক শীষে (উৎপন্ন হলো) শত শস্য এবং আল্লাহ যার জন্য ইচ্ছে করেন, বর্ধিত করে দেন। বস্তুত আল্লাহ হচ্ছেন বিপুল দাতা, মহাজ্ঞানী।’ (সুরা বাকারা : ২৬১)। তাই যারা গরিব, অসহায়-নিঃস্ব, তাদেরকে সাধ্যানুযায়ী দান করা চাই। সামর্থ্য থাকলে কোনো এক হতদরিদ্র পরিবারের এক মাসের সেহরি ও ইফতারের দায়িত্ব নিতে হবে। এতে অঢেল সওয়াব অর্জনের পাশাপাশি রমজান মাসের পবিত্র ভাব-গাম্ভীর্য চারদিকে ছড়িয়ে পড়বে। ঈদে প্রতিবেশী কিংবা চেনা-জানা কোনো গরিবকে একটি নতুন জামা উপহার দেওয়া চাই। ফুটপাতে বসবাসকারী কোনো শিশুর মুখে হাসি ফোটানো কর্তব্য।

    দান হবে গোপনে
    রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘যারা গোপনে দান করবেন, মহান আল্লাহ কঠিন কেয়ামতের দিন তাদের আরশের ছায়াতলে স্থান দেবেন।’ (বোখারি)। কাজেই দান-সদকা ও অসহায়কে সহযোগিতা করার বিষয়টি সামর্থবান ও বিত্তশীলদের এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। এতিম, মিসকিন, অভাবগ্রস্ত, ভিক্ষুক, মুসাফির ও অসহায়দের প্রতিও তাদের দায়িত্ব অপরিসীম। অন্তত পবিত্র মাস রমজানে তাদের খুঁজে খুঁজে বের করে তাদের বিভিন্ন ধরনের সহযোগিতা করা ও তাদের প্রাপ্য আদায় করা জরুরি।

    দানের পুরস্কার
    রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো বস্ত্রহীনকে কাপড় পরাবে, আল্লাহতায়ালা তাকে জান্নাতে সবুজ রেশমি কাপড় পরিধান করাবেন। যে ব্যক্তি কোনো ক্ষুধার্তকে আহার করাবে, আল্লাহতায়ালা তাকে জান্নাতের ফল খাওয়াবেন। যে ব্যক্তি কোনো তৃষ্ণার্তকে পানি পান করাবে, আল্লাহতায়ালা তাকে জান্নাতের পবিত্র শরাব পান করাবেন।’ (সুনানে আবি দাউদ)।

    দানে রিজিকে বরকত হয়
    দান-সদকা রিজিকে বরকত এনে দেয়। মহান আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই যারা আল্লাহর কিতাব অধ্যয়ন করে, সালাত কায়েম করে এবং আল্লাহ যে রিজিক দিয়েছেন, তা থেকে গোপনে ও প্রকাশ্যে ব্যয় করে, তারা এমন ব্যবসার আশা করতে পারে, যা কখনও ধ্বংস হবে না। যাতে আল্লাহ তাদের কাজের প্রতিফল পরিপূর্ণ দেন। তিনি নিজ অনুগ্রহে তাদের আরও বেশি দেন। নিশ্চয়ই তিনি পরম ক্ষমাশীল, অসীম গুণগ্রাহী।’ (সুরা ফাতির : ২৯-৩০)।

    ইফতার ও সেহরি করানো
    একবার রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করা হলো, ‘ইসলামের মধ্যে উত্তম কাজ কোনটি?’ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘অপরকে খাওয়ানো।’ রমজানে আমরা প্রতিবেশীদের সঙ্গে সানন্দে সেহরি-ইফতার শেয়ার করতে পারি। এতে সওয়াব যেমন হবে, তেমনি সবার মাঝে সম্প্রীতি-সৌহার্দ্য বৃদ্ধি পাবে। আর অনেক গরিব-দুঃখী আছেন, যারা সেহরি ও ইফতারে সামান্য খাবারও জোগাড় করতে হিমশিম খান। বছরের অন্যান্য সময়ের তুলনায় রমজানে তাদের দুঃখটা খানিক বেড়ে যায়। এ ধরনের মানুষকে ইফতার ও সেহরি করানোর মাধ্যমে অজস্র সওয়াব লাভ করতে বলেছেন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। জায়েদ ইবনে খালেদ আল জুহানি (রা.) সূত্রে বর্ণিত হাদিসে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো রোজাদারকে ইফতার করাবে, সে তার (রোজাদারের) অনুরূপ প্রতিদান লাভ করবে; তবে রোজাদারের প্রতিদান থেকে বিন্দুমাত্রও হ্রাস করা হবে না।’ (তিরমিজি)।

  • রমজানই জাকাত দেওয়ার উত্তম সময়

    রমজানই জাকাত দেওয়ার উত্তম সময়

    জাকাত ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের অন্যতম একটি। জাকাত দেওয়া ইসলামের ফরজ বিধান। নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিকের জন্য জাকাত দেওয়া ফরজ। কারণ এটি ইসলামি অর্থ ব্যবস্থার প্রধান মাধ্যম। আর রমজানে জাকাত দেওয়ার সর্বোত্তম সময়।

    জাকাত দেওয়ার মাধ্যমেই সম্পদের পবিত্রতা পরিশুদ্ধতা সমৃদ্ধির ধারাকে বাড়িয়ে দেয়। মুসলমানদের মধ্যে কেউ সম্পদের মালিক মানেই তিনি জাকাত দেবেন। সম্পদের পবিত্রতা পরিশুদ্ধতা এবং বৃদ্ধির ধারাকে অব্যাহত রাখতে মুমিন মুসলমান জাকাত দেয়। রমজানে জাকাত দিলে আদায়কারী ও গ্রহীতারা উভয়ই বেশি ‍উপকৃত হয়।

    জাকাত দেওয়ার সেরা সময় রমজান

    গরিব-দুঃখীর মাঝে জাকাত দেওয়ার সময় সুনির্দিষ্ট না থাকলেও রমজানই জাকাত দেওয়ার সর্বোত্তম সময়। আর ফেতরা ঈদুল ফিতরের আগে দেওয়াই উত্তম। রমজানে যে কোনো দান-সাদকাই অন্য সময়ের তুলনা ৭০ গুণ বেশি সাওয়াব পাওয়ার মাধ্যম। এ জন্যই অধিকাংশ ধনী ও সম্পদশালীরা রমজানে দান-সাদকা, জাকাত-ফেতরা আদায়ে খুব বেশি উদ্যোগী হয়ে থাকেন।

    রমজানে মানুষের কাজের পরিধি কমে যায়। দুর্বলতা ও কষ্টের কারণে অভাবি, গরিব-দুঃখী মানুষ ঠিকভাবে আয়-রোজগার করতে পারে না। তাই রমজানে ধনীদের জাকাত-ফেতরা তথা আর্থিক দান-অনুদান গরিবদের জন্য অনেক বেশি উপকারি ও জীবন যাত্রার জন্য বেশ সহায়ক হয়।

    উপকারিতা

    জাকাত একদিকে ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। সহায়-সম্বলহীন মানুষকে সবল ও স্বচ্ছল করে তোলার মাধ্যমে ধনী-গরিবের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব ও মায়া-মমতার সুসম্পর্ক তৈরি করার অন্যতম সুযোগও এটি। রমজানে জাকাত-ফেতরা, দান-সাদকা করলে অভাবি মানুষগুলো একটু স্বস্থি পায়। রমজানের দিনগুলোতে উভয়ের মাঝে বিরাজ করে এক স্বর্গীয় পরিবেশ।

    অন্যদিকে সম্পদশালীরা ৭০ গুণ বেশি সাওয়াব পাওয়ার আশায় রমজানে দান-সদকা ও জাকাত- ফেতরা প্রদানে উৎসাহিত হয়। আল্লাহর বিধান পালনেও পায় পরিপূর্ণ তৃপ্তি। অন্য সময়ের তুলনায় অনেক বেশি নেকি পায়।

    রমজান মাসে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনে যে কোনো নফল ইবাদতের বিনিময় ফরজ ইবাদত আদায়ের মতো। আর তা জাকাত, ফেতরা ও দান-অনুদানের সওয়াবের বেলায়ও ঘটে।

    জাকাত দিতে যেসব বিষয় খেয়াল রাখা জরুরি

    ১. জাকাত ধনীর সম্পদকে পবিত্র, পরিশুদ্ধ ও বাড়িয়ে দেয়। ইসলামি শরিয়তে মানুষের প্রয়োজন পূরণের পর যদি নেসাব পরিমান সম্পদ পূর্ণ একবছর কারো কাছে গচ্ছিত থাকে তবে তাকে ওই গচ্ছিত সম্পদের জাকাত দিতে হয়।

    ২. কোরআনে ঘোষিত নির্ধারিত ৮ খাতেই জাকাতের অর্থ বণ্টন করতে হবে। আল্লাহ বলেন-

    اِنَّمَا الصَّدَقٰتُ لِلۡفُقَرَآءِ وَ الۡمَسٰکِیۡنِ وَ الۡعٰمِلِیۡنَ عَلَیۡهَا وَ الۡمُؤَلَّفَۃِ قُلُوۡبُهُمۡ وَ فِی الرِّقَابِ وَ الۡغٰرِمِیۡنَ وَ فِیۡ سَبِیۡلِ اللّٰهِ وَ ابۡنِ السَّبِیۡلِ ؕ فَرِیۡضَۃً مِّنَ اللّٰهِ ؕ وَ اللّٰهُ عَلِیۡمٌ حَکِیۡمٌ

    ‘সাদাকাহ (জাকাত) তো কেবল নিঃস্ব, অভাবগ্রস্ত ও তৎসংশ্লিষ্ট কর্মচারীদের জন্য, যাদের চিত্তআকর্ষণ করা হয় (নওমুসলিম) তাদের জন্য, দাস মুক্তির জন্য, ঋণ ভারাক্রান্তদের, আল্লাহর পথে ও মুসাফিরদের জন্য। এটা আল্লাহর বিধান।’ (সুরা তওবাহ : আয়াত ৬০)

    ৩. বিভিন্ন মহামারি, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও সমস্যায় জর্জরিতদের সহযোগিতা ও চিকিৎসাসহ অভাবগ্রস্ত মানুষের দুঃসময়ে সহায়তায় রাষ্ট্রীয় কোষাগারেও দেওয়া যেতে পারে জাকাতে অর্থ। কিংবা নিজ উদ্যোগে নিজেদের জাকাতের অর্থের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করে গরিবদের দেওয়া যেতে পারে। এ ব্যাপারেও মতামত দিয়েছেন বিশ্বের অনেক ইসলামি স্কলার।

    রমজানে জাকাত আদায়ই হোক ধনী-গরিব পরস্পরের মধ্যে ইসলামের সেতু বন্ধন। যে বন্ধনের কথা বলেছেন নবিজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। হাদিসে পাকে এসেছে-

    ‘জাকাত ইসলামের সেতুবন্ধন।’ (মুসলিম)

    আল্লাহ তাআলা রমজানের সব ইবাদতই দেখেন এবং এর নেয়ামতও দান করেন। সওয়াব দেন ৭০ গুনের বেশি। এ কারণেই মহান আল্লাহ তাআলা বান্দার জাকাত প্রদানে অনুগ্রহ দানের ঘোষণা দিয়েছেন একাধিক আয়াতে। আল্লাহ তাআলা বলেন-

    وَ اَقِیۡمُوا الصَّلٰوۃَ وَ اٰتُوا الزَّکٰوۃَ ؕ وَ مَا تُقَدِّمُوۡا لِاَنۡفُسِکُمۡ مِّنۡ خَیۡرٍ تَجِدُوۡهُ عِنۡدَ اللّٰهِ ؕ اِنَّ اللّٰهَ بِمَا تَعۡمَلُوۡنَ بَصِیۡرٌ

    ‘তোমরা নামাজ আদায় করো এবং জাকাত প্রদান করো। তোমরা যে উত্তম কাজ নিজেদের জন্য আগে পাঠবে তা আল্লাহর কাছে পাবে। নিশ্চয়ই তোমরা যা করো আল্লাহ তা দেখছেন।’ (সুরা বাকারা : আয়াত ১১০)

    وَ اَقِیۡمُوا الصَّلٰوۃَ وَ اٰتُوا الزَّکٰوۃَ وَ اَطِیۡعُوا الرَّسُوۡلَ لَعَلَّکُمۡ تُرۡحَمُوۡنَ

    ‘তোমরা নামাজ আদায় করো, জাকাত দাও এবং রাসূলের আনুগত্য করো যাতে তোমরা অনুগ্রহভাজন হতে পারো।’ (সুরা নুর : আয়াত ৫৬)

    لٰکِنِ الرّٰسِخُوۡنَ فِی الۡعِلۡمِ مِنۡهُمۡ وَ الۡمُؤۡمِنُوۡنَ یُؤۡمِنُوۡنَ بِمَاۤ اُنۡزِلَ اِلَیۡکَ وَ مَاۤ اُنۡزِلَ مِنۡ قَبۡلِکَ وَ الۡمُقِیۡمِیۡنَ الصَّلٰوۃَ وَ الۡمُؤۡتُوۡنَ الزَّکٰوۃَ وَ الۡمُؤۡمِنُوۡنَ بِاللّٰهِ وَ الۡیَوۡمِ الۡاٰخِرِ ؕ اُولٰٓئِکَ سَنُؤۡتِیۡهِمۡ اَجۡرًا عَظِیۡمًا

    ‘আর যারা নামাজ আদায় করে, জাকাত দেয় এবং আল্লাহ ও পরকালে ঈমান রাখে আমি তাদের মহাপুরস্কার দেবো।’ (সুরা নিসা : আয়াত ১৬২)

    রমজানের এই পবিত্র সময়ে জাকাত দেওয়াই মুমিন মুসলমানের সম্পদশালীদের জন্য সর্বোত্তম সময়। তাই প্রত্যেক ধনী ও সম্পদশালীর উচিত, জাকাতের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইসলামের অন্যতম একটি ফরজ ইবাদত রমজানের বরকতময় সময়ে যথাযথভাবে আদায়ের মাধ্যমে কুরআনের ঘোষণায় নেয়ামত, বরকত, অনুগ্রহ ও মহাপুরস্কার পাওয়ার চেষ্টা করা।

    আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহর সম্পদশালী ও ধনীদের রমজানে জাকাত আদায় করে অফুরন্ত সওয়াব ও ফজিলত অর্জনের তাওফিক দান করুন। গরিব-অসহায়দের মুখে হাসি ফোটানোর তাওফিক দান করুন। আমিন।

  • রমজান হোক কোরআনময়

    রমজান হোক কোরআনময়

    মুনশি মুহাম্মদ উবাইদুল্লাহ

    কোরআন কী?
    কোরআন অর্থ পড়া, পাঠ করা, পাঠযোগ্য, যা বারবার পাঠ করা হয়। কোরআন শরিফ দুনিয়ার সবচেয়ে বেশি পঠিত গ্রন্থ। কোরআন অর্থ—কাছে যাওয়া, নিকটবর্তী হওয়া। কোরআন পঠন ও অনুশীলনের মাধ্যমে বান্দা আল্লাহর নৈকট্য ও সান্নিধ্য লাভ করে।

    কোরআনের নির্দেশনা
    পঠন-পাঠন ও বিদ্যার্জন এবং জ্ঞান-বিজ্ঞানচর্চার নির্দেশ দিয়েই কোরআনের প্রথম আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়—‘পড়ো তোমার রবের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন, সৃজন করেছেন জমাট রক্তপিণ্ড থেকে। পড়ো তোমার রব মহাসম্মানিত, যিনি লিপির মাধ্যমে শিক্ষাদান করেছেন; শিখিয়েছেন মানুষকে, যা তারা জানত না।’ (সুরা কলম : ১-৫)।

    কোরআন পাঠের ফরজ
    কোরআন শরিফ তেলাওয়াতে তিনটি ফরজ রয়েছে—
    এক. হরফ বা বর্ণসমূহ সঠিকভাবে উচ্চারণ করা।
    দুই. হরকত বা স্বরচিহ্ন তাড়াতাড়ি পড়া।
    তিন. মদ বা দীর্ঘস্বর হলে টেনে পড়া।

    কোরআন পাঠে যা করতে হয়
    কোরআন শরিফ পড়তে তিনটি কাজ করতে হয়—
    এক. পবিত্র হওয়া (ফরজ)।
    দুই. আউজুবিল্লাহ পড়া (ওয়াজিব)।
    তিন. বিসমিল্লাহ পড়া (সুন্নত)।

    কোরআন শেখা ফরজ
    কোরআন শিক্ষা করা ফরজ। শিখে ভুলে গেলে মারাত্মক গোনাহ। অশুদ্ধ বা ভুল পাঠ করলে কঠিন পাপের কারণ হতে পারে। তাই কোরআন বিশুদ্ধভাবে শেখা ও সুন্দরভাবে তেলাওয়াত করা জরুরি। যারা পড়তে জানেন না, তাদের শিখতে হবে। যারা শিখে ভুলে গেছেন, তাদের পুনরায় পড়তে হবে। যারা ভুল পড়েন, তাদের শুদ্ধ করতে হবে।

    যাদের পাঠে ভুল মাফ
    তিন ধরনের লোকের তেলাওয়াতের ভুল মাফ হবে—
    এক. যারা সহিহ করার আপ্রাণ চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছেন।
    দুই. যারা সহিহ করার চেষ্টায় রত আছেন।
    তিন. যাদের সহিহ শিক্ষার সুযোগ নেই বা সহিহ ও ভুলের জ্ঞান নেই।

    রাসুলকে প্রেরণের উদ্দেশ্য
    কোরআন অধ্যয়ন, অনুশীলন ও প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব দিয়েই পাঠানো হয়েছিল প্রিয় রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে। ইবরাহিম আলাইহিস সালাম দোয়া করেছিলেন, ‘হে আমাদের রব! আপনি তাদের মাঝে তাদের মধ্য থেকে এমন রাসুল পাঠান, যিনি আপনার আয়াত পাঠ করে শোনাবেন, কিতাব ও হিকমত শেখাবেন এবং তাদের পরিশুদ্ধ করবেন। নিশ্চয়ই আপনি স্নেহশীল ও মহাকৌশলী।’ (সুরা বাকারা : ১২৯)।

    কোরআন তেলাওয়াত শ্রেষ্ঠ ইবাদত
    কোরআন তেলাওয়াত করাও ইবাদত, তেলাওয়াত শোনা এবং শোনানোও ইবাদত। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে পাঠ করে সাহাবিদের শোনাতেন এবং সাহাবিদের তেলাওয়াতও শুনতেন। প্রতি রমজান মাসের আগে যতটুকু কোরআন নাজিল হয়েছে, তা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিবরাইল আলাইহিস সালামকে শোনাতেন। জিবরাইল আলাইহিস সালামও তা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শোনাতেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জীবনের শেষ রমজানে উভয়ে উভয়কে দু-দু’বার করে পূর্ণ কোরআন পাঠ করে শোনান। (তাফসিরে ইবনে কাসির)।

    কোরআনের কারণে রমজান অনন্য
    কোরআন নাজিলের কারণেই রমজান ও শবে কদরের ফজিলত। মক্কা-মদিনার ফজিলতও কোরআন নাজিলের কারণেই। কোরআনের পরশেই গিলাফ ও রেহালের সম্মান। যে মানুষ যত কোরআনের ধারক-বাহক হবে, তার সম্মানও তত বেশি হবে।

    কোরআন পাঠকারীদের জন্য সুসংবাদ
    রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘কোরআনওয়ালাই আল্লাহওয়ালা এবং আল্লাহর খাস পরিবারভুক্ত।’ রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেন, ‘যে অন্তরে কোরআন নেই, তা যেনো পরিত্যক্ত বিরান বাড়ি।’ রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেন, ‘হাশরে বিচারের দিনে কোরআন তোমার পক্ষে বা বিপক্ষে দলিল হবে।’ (মুসলিম)।

    কোরআন বর্জনে ধমকি
    যারা কোরআন তেলাওয়াত, চর্চা ও অনুশীলন করবে না, তাদের বিরুদ্ধে রোজ কেয়ামতে আল্লাহর আদালতে প্রিয় রাসুল রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অভিযোগ করবেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলবেন, ‘হে আমার রব! এই লোকেরা কোরআন পরিত্যাগ করেছিল।’ (সুরা ফোরকান : ৩০)।

    ইহ-পরকালীন শান্তি ও মুক্তির পথ
    কোরআন সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বশেষ আসমানি কিতাব। যা সর্বশ্রেষ্ঠ ফেরেশতা জিবরাইল আলাইহিস সালামের মাধ্যমে সর্বশেষ নবী ও রাসুল মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর নাজিল হয়েছে। এরপর কেয়ামত পর্যন্ত আর নতুন কোনো কিতাব ও নতুন কোনো নবী বা রাসুল আসবেন না। এটিই কেয়ামত পর্যন্ত সব মানুষের জন্য দুনিয়ার শান্তি ও পরকালীন মুক্তির একমাত্র পথ।

    প্রয়োজন পরিমাণ কোরআন শেখা
    কোরআনের অংশবিশেষ পাঠ ছাড়া প্রধান ইবাদত নামাজও আদায় হয় না। এ জন্যই সহিহভাবে কোরআন তেলাওয়াত শিখতে হবে। কমপক্ষে নামাজ পড়তে যতটুকু প্রয়োজন, ততটুকু শেখা ফরজে আইন।

    মাহে রমজান ও কোরআন
    কোরআন নাজিলের মাস রমজান। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘রমজান মাস, যে মাসে নাজিল করা হয়েছে আল কোরআন, মানুষের জন্য হেদায়াতরূপে এবং পথনির্দেশনার প্রমাণ ও সত্য-মিথ্যা পার্থক্য নির্ণয়কারী হিসেবে।’ (সুরা বাকারা : ২৮৫)।

    রমজানে কোরআন পাঠ
    আল্লাহতায়ালা রমজানের পরিচয় দিয়েছেন কোরআনের মাধ্যমে। তাই স্পষ্টত কোরআন শরিফ অবতীর্ণের মাধ্যমেই মাহে রমজানের ফজিলত বেড়েছে বহুগুণ। হাদিসে এসেছে, ‘অন্যান্য মাসসমূহে যে আয়াতসমূহ অবতীর্ণ হতো, রমজান মাসে সব একসঙ্গে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিবরাইল আলাইহিস সালামকে শোনাতেন। আবার জিবরাইল আলাইহিস সালাম রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে শোনাতেন। এভাবে পরস্পর কোরআন তেলাওয়াত করতেন।’ (বোখারি ও মুসলিম)।

    রমজানে কোরআন পাঠে সওয়াব বেশি
    কোরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে অত্যধিক সাওয়াব লাভ করার জন্য রমজানই মোক্ষম সময়। কোরআন শরিফের বিশেষত্ব হচ্ছে, একটি হরফ তেলাওয়াতে দশটি নেকি হাসিল হয়। রমজানের বিশেষত্ব হচ্ছে, একটি নেকি দশ থেকে সাতশত পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়। তাই মাহে রমজানে কোরআনের একটি হরফ তেলাওয়াত করলে দশ থেকে সাতশত পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়।

    রমজান ও কোরআন একই সুতোয় গাঁথা
    রমজানের কারণেই এই নফল ইবাদতটি আল্লাহর দরবারে ফরজের মর্যাদায় গণ্য হচ্ছে। সুতরাং যারা মাহে রমজানে কোরআন শরিফ তেলাওয়াত করেন, নিঃসন্দেহে তারা অফুরন্ত-অগণনীয় সওয়াবের অধিকারী হয়ে থাকেন। রমজান ও কোরআন দুইয়ের বিশেষত্বকে এক সুতোয় গাঁথা যায় একটি মাধ্যমে। তা হলো, রমজান মাসে কোরআন তেলাওয়াত করা।

    রমজানে পূর্বসূরিদের কোরআন পাঠ
    ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, পূর্বসূরি বুজুর্গানে দ্বীন রমজান মাসেই অধিক পরিমাণে কোরআন তেলাওয়াত করতেন। যেমন—
    ১. ইমাম আবু হানিফা রহমাতুল্লাহি আলাইহি রমজান মাসে কোরআন শরিফ মোট ৬১ (একষট্টি) বার খতম দিতেন। প্রতি রমজানের দিনে এক খতম করতেন। আবার রাতে এক খতম করতেন। বাকি এক খতম পুরো রমজানের তারাবির নামাজে আদায় করতেন। (তারিখে বাগদাদ)।

    ২. ইমাম বোখারি রহমাতুল্লাহি আলাইহি রমজান মাসের প্রতি রাতে ১ খতম কোরআন শরিফ তেলাওয়াত করতেন। (আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া)।

    ৩. আবু কাতাদা রহমাতুল্লাহি আলাইহি রমজান মাসে প্রতি ৩ দিনে এক খতম কোরআন তেলাওয়াত করতেন। শেষ দশকে প্রতি রাতে ১ খতম দিতেন। (সিয়ারু আলামিন নুবালা)।

    রমজানে তেলাওয়াতকারীর সোনায় সোহাগা
    কোরআন মানবজীবনের অকাট্য সংবিধান, বিশেষত মুসলমানদের জন্য। নাজিল হয়েছে পবিত্র রমজান মাসে। তাই আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রাপ্ত এ বিশেষ নেয়ামতের শুকরিয়া আদায়ের নিমিত্তে হলেও রমজান মাসে অধিক পরিমাণে কোরআন তেলাওয়াত করা উচিত। আর রমজানে কোরআন তেলাওয়াত করলে যে তেলাওয়াতকারীর জন্য সোনায় সোহাগা হবে, সেটাও সহজেই অনুমেয়। রমজানের বিশেষত্বই কোরআন। প্রতি রজনীতে কোরআন খতম দিয়ে যেনো আমাদেরকে এ মহান শিক্ষাই দিয়েছেন ইমাম আবু হানিফা ও ইমাম বোখারি রহমাতুল্লাহি আলাইহিমা। তাই কোরআন নাজিলের মাসে অধিক পরিমাণে কোরআন তেলাওয়াত করার চেষ্টা করি।

  • রমজানে রোজাদারের নিয়মিত ৬ কাজ

    রমজানে রোজাদারের নিয়মিত ৬ কাজ

    রমজান মাসজুড়ে রোজাদারের জন্য সব সময় ৬ কাজ করা জরুরি। কারণ এটি রহমত, বরকত, মাগফেরাত ও নাজাতের মাস। এ মাসটি রোজদারের জন্য নেয়ামতে ভরপুর। প্রতিটি কাজের ব্যাপারে নবিজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। যার বিনিময়ে রয়েছে গুনাহ মাফ ও সওয়াবের হাতছানি। কী সেই ৬ কাজ?

    নবিজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রমজান মাসজুড় রোজাদারের জন্য ৬টি কাজ করার বিশেষ তাগিদ দিয়েছেন। তাহলো-

    ১. তারাবি নামাজ পড়া

    রমজানে রাতের বেলা তারাবি নামাজ পড়া। চাই খতম তারাবি, সুরা তারাবি কিংবা ঘরে একা একা আদায় করা। হাদিসে পাকে এসেছে-

    হজরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেছেন, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে রমজান সম্পর্কে বলতে শুনেছি, ‘যে ব্যক্তি রমজানে ঈমানের সঙ্গে সওয়াব আশায় ‘কিয়ামে রমজান’ অর্থাৎ তারাবির নামাজ আদায় করবে, তার আগের সব গুনাহ ক্ষমা করে দেয়া হবে।’ (বুখারি)

    ২. শেষ রাতে সেহরি খাওয়া

    রমজানের রোজা পালনের জন্য শেষ রাতে সেহরি খাওয়া আবশ্যক। এটি নবিজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নির্দেশ। অনেকেই তারাবি পড়ে গভীর রাতে কিছু খেয়ে শুয়ে পড়ে। সকালে ওঠে ফজর নামাজ আদায় করে। এমনটি করলে সেহরির বরকত অর্জিত হবে না। সেহরির বরকত সম্পর্কে হাদিসে একাধিক বর্ণনা এসেছে-

    > হজরত আনাস বিন মালেক রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেছেন, নবিজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘তোমরা শেষ রাতে খাবার খাও। তাতে বরকত রয়েছে।’ (বুখারি ও মুসলিম)

    > হজরত ইবনে ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেছেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,নিশ্চয়ই আল্লাহ ও ফেরেশতারা সেহরি গ্রহণকারীর জন্য প্রার্থনা করেন।’ (তাবারানি ও ইবনে হিব্বান)

    > হজরত আবু সাঈদ খুদরি রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেছেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘সেহরি খাওয়ায় বরকত আসে। সুতরাং তোমরা তা (সেহরি) খেতে ছেড়ো না; যদিও তোমরা তাতে এক ঢোক পানিও খাও। কেননা যারা সেহরি খায়, তাদের জন্য আল্লাহ রহমত বর্ষণ করেন এবং ফেরেশতারা দোয়া করতে থাকেন।’ (মুসনাদে আহমাদ)

    > হজরত আমর বিন আস রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেছেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘আমাদের এবং আহলে কিতাবের (আমাদের আগে আসমানি কিতাব পাওয়া ইয়াহুদি-খ্রিষ্টান) মধ্যে পার্থক্য হলো- সেহরি খাওয়া। আর আমাদের তো ভোর (সোবহে সাদেক) হওয়ার আগ পর্যন্ত খাওয়া ও পান করার অনুমতি রয়েছে।’ (মুসলিম)

    ৩. খেজুর দিয়ে ইফতার শুরু করা

    ইফতারের সময় হলে খেজুর দিয়ে ইফতার শুরু করা। খেজুর না পেলে সাদা পানি পান করে ইফতার শুরু করা। হাদিসে এসেছে-

    > ‘রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম খেজুর খেয়ে (মাগরিবের) নামাজের আগে রোজা ভঙ্গ করতেন।’ (আবু দাউদ)

    > নবিজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘যখন তোমাদের কেউ ইফতার করে; সে যেন খেজুর দ্বারা ইফতার করে। কেননা তাতে বরকত (কল্যাণ) রয়েছে। আর যদি খেজুর না পাওয়া যায় তবে সে যেন পানি দ্বারা ইফতার করে। কেননা তা পবিত্রকারী। (তিরমিজি, আবু দাউদ, ইবনে মাজাহ, দারেমি, মিশকাত)

    ৪. ইফতারে দেরি না করা

    ইফতারের সময় হওয়ার পর ইফতার করতে দেরি না করা। অর্থাৎইফতারের সময় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ইফতার করা। হাদিসে পাকে এসেছে-

    নবিজী সাল্লাল্লাহু আলঅইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘মানুষ ততদিন কল্যাণের পথে থাকবে, যতদিন তারা (সময় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে) তাড়াতাড়ি ইফতার শুরু করবে।’ (মুসলিম)

    ৫. মিথ্যা ও মন্দ পরিহার করা

    রোজাদার ব্যক্তির জন্য মিথ্যা কথা বলা এবং মন্দ কাজ পরিহার করা জরুরি। রোজা রেখে মিথ্যা কথা পরিহার ও মন্দ কাজ থেকে বিরত থাকা ঈমানের অন্যতম দাবি। হাদিসে পাকে এসেছে-

    নবিজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি মিথ্যা কথা ও মন্দ কাজ থেকে বিরত থাকে না, তার পানাহার ত্যাগ করায় (রোজা রাখায় আল্লাহর) কোনো প্রয়োজন নেই।’ (বুখারি)

    ৬. মন্দ কথার উত্তম জবাব দেওয়া

    যে কোনো মন্দ কথায় উত্তম জবাব দেওয়া। আল্লাহ তাআলা নবিজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে এ আমলের নির্দেশ দিয়েছেন এভাবে-

    اِدۡفَعۡ بِالَّتِیۡ هِیَ اَحۡسَنُ السَّیِّئَۃَ

    ‘(হে রাসুল!) আপনি ভালো দ্বারা মন্দের মুকাবিলা করুন।’ (সুরা মুমিনুন : আয়াত ৯৬)

    রোজাদারের সঙ্গে কোনো ব্যক্তি মন্দ কথার জবাবে ভালো কথায় উত্তর দেয়া। নবিজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-

    ‘কেউ যদি মন্দ কথা বলে, (কোনো রোজাদারকে) রাগানোর চেষ্টা করে, তখন তাকে এ কথা বলা যে, ‘আমি রোজাদার।’ (নাসাঈ)

    সুতরাং মুমিন মুসলমানের উচিত রমজানব্যাপী এ কাজগুলো যথাযথভাবে আদায় করে রমজানের অবিরত রহমত বরকত, মাগফেরাত ও নাজাত পাওয়ার চেষ্টা করা। কোরআন-সুন্নাহর উপর যথাযথ আমল করা।

    আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহকে উল্লেখিত আমলগুলো যথাযথভাবে পালন করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

  • শুরু হলো সিয়াম সাধনার মাস

    শুরু হলো সিয়াম সাধনার মাস

    এবার ২৯ দিনে শেষ হয়েছে হিজরি শাবান মাস। শনিবার (২৯ শাবান) সূর্যাস্তের পরই দেশের আকাশে পবিত্র রমজানের চাঁদ দেখা যায়, যার মধ্য দিয়ে শুরু হয় মুসলমানদের সিয়াম সাধনার মাস পবিত্র রমজান।

    দেশের ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা রমজানের চাঁদ দেখে তারাবির নামাজ আদায় ও প্রথম রোজার সেহরি করেছেন। রোববার (৩ এপ্রিল) প্রথম রোজা। ঢাকায় এদিন ইফতারের সময় ৬টা ১৯ মিনিটে।

    ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের কাছে রমজান সংযম, আত্মশুদ্ধি এবং ত্যাগের মাস। রমজান রহমত (আল্লাহর অনুগ্রহ), মাগফিরাত (ক্ষমা) ও নাজাত (দোজখের আগুন থেকে মুক্তি) এ তিন অংশে বিভক্ত। এ মাসে সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহার, স্বামী-স্ত্রীর সহবাস ও যে কোনো ধরনের পাপ কাজ থেকে বিরত থাকার মাধ্যমে রোজা পালন করেন মুসলমানরা।

    রমজানের শেষ অংশে রয়েছে হাজার মাসের এবাদতের চেয়েও উত্তম লাইলাতুল কদরের রাত। ইসলাম ধর্ম অনুযায়ী, রমজান মাসে প্রতিটি নেক আমলের সওয়াব আল্লাহ পাক ৭০ গুণ বাড়িয়ে দেন।

    এদিকে, রাজধানীর বায়তুল মোকাররমে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের সভাকক্ষে শনিবার সন্ধ্যায় জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটির সভায় ধর্ম প্রতিমন্ত্রী মো. ফরিদুল হক খান জানান, সব জেলা প্রশাসন, ইসলামিক ফাউন্ডেশনের প্রধান কার্যালয়, বিভাগীয় ও জেলা কার্যালয়, আবহাওয়া অধিদফতর, মহাকাশ গবেষণা ও দূর অনুধাবন কেন্দ্র থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী বাংলাদেশের আকাশে হিজরি ১৪৪৩ সনের রমজান মাসের চাঁদ দেখা গেছে। রোববার থেকে রমজান মাস শুরু। আগামী ২৮ এপ্রিল বৃহস্পতিবার দিনগত রাতে (রমজানের ২৭তম রাত) পবিত্র লাইলাতুল কদর পালিত হবে।

    করোনাভাইরাস মহামারির কারণে গত দুই বছর রমজানে বিধিনিষেধ ছিল। করোনার সংক্রমণ পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ায় গত ২২ ফেব্রুয়ারি থেকে উঠে যায় বিধিনিষেধ, স্বাভাবিক হয়ে যায় সবকিছু। দুই বছর পর এবারই স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে এলো সিয়াম সাধনার মাস।

  • আহলান সাহলান মাহে রমজান

    আহলান সাহলান মাহে রমজান

    বছর ঘুরে আবারও শুভ আগমন ঘটেছে পবিত্র রমজানুল মুবারাকের। অধীর আগ্রহে অপেক্ষামান প্রত্যেক মুসলিম নর-নারীকে এ মহান মাসের অফুরন্ত কল্যাণ হাসিলের জন্য সঠিকভাবে রমজানুল মুবারাকের যাবতীয় হক আদায় করতে হবে।

    আর এর জন্য প্রয়োজন একটি সুন্দর পূর্বপরিকল্পনা। পবিত্র কুরআন ও হাদিসের আলোকে আসুন আমরা সুপরিকল্পিতভাবে রমজানকে গ্রহণ করি।


    রমজান মাসকে অভিনন্দন জানাতে হবে
    একজন প্রকৃত মুসলমান রজব মাস থেকে পবিত্র রমজান মাস প্রাপ্তির জন্য মহান আল্লাহ তায়ালার নিকট দাবি পেশ করেছেন একথা বলে—
    হে আল্লাহ তুমি রজব ও শাবান মাসকে আমাদের জন্য বরকতময় করে দাও এবং রমজান মাস পর্যন্ত আমাদের পৌঁছে দাও।

    আর পশ্চিম দিগন্তে মাহে রমজান এর নতুন চাঁদ উদিত হওয়ার সাথে সাথে মুমিনদের কাজ হলো, এ মহান মাসকে যথাযথ নিয়মে অভিনন্দন জানানো। প্রিয় নবী মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ (সা.) এভাবে রমজান মাসকে স্বাগত জানাতেন—

    হে আল্লাহ তুমি আমাদের জন্য এ নতুন চাঁদকে নিরাপত্তা, বিশ্বাস, শান্তি ও আনুগত্যের প্রতীক হিসেবে কবুল কর। হে নতুন চাঁদ আমার ও তোমার রব হলেন আল্লাহ তায়ালা। তুমি হেদায়াত ও কল্যাণের চাঁদ। (তিরমিজি)


    সিয়াম সাধনা
    রমজানুল মুবারাকের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ও আবশ্যকীয় আমল হলো, মহান আল্লাহ তায়ালা কর্তৃক নির্ধারিত ফরজ সিয়াম পালন করা। প্রত্যেক প্রাপ্ত বয়স্ক মুসলিম নর-নারীর ওপর রমজান মাসের রোজা রাখা ফরজ। অসুস্থ এবং মুসাফির ব্যক্তির জন্য রোজা ছেড়ে দেওয়ার সুযোগ আছে, তবে পরে কাজা করা আবশ্যক। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তায়ালা বলেন—
    হে মুমিনগণ তোমাদের ওপর সিয়াম বা রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর, যাতে করে তোমরা তাক্বওয়া অবলম্বন করতে পার। নির্দিষ্ট দিনগুলোতে তথা রমজান মাসে। তবে কেউ যদি এই সময় অসুস্থ থাকে অথবা সফরে থাকে (তাহলে রোজা ছেড়ে দিতে পারবে) অতঃপর তাকে অন্য দিনগুলোতে তা কাজা করতে হবে। (সুরা বাক্বারাহ আয়াত ১৮৩)।

    এ সুরার ১৮৫ নং আয়াতে মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন—রমজান মাস যে মাসে নাযিল করা হয়েছে আল কুরআন, যা মানব জাতির জন্য পথপ্রদর্শক এবং সুস্পষ্ট বর্ননা সঠিক পথপ্রদর্শনকারী ও সত্য-মিথ্যার মধ্যে পার্থক্যকারী। অতএব তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি এ মাস পাবে সে যেন মাসব্যাপী রোজা পালন করে। তবে রোগী এবং মুসাফির পরবর্তীতে পালন করতে পারবে। মহান আল্লাহ তায়ালা দ্বীনকে তোমাদের জন্য সহজ করে দিয়েছেন তিনি তোমাদের ওপর কোনো কিছু কঠিন করেননি। সুতরাং তোমরা আল্লাহর বিধান অনুযায়ী নির্দিষ্ট দিনগুলোতে রোজা পালন কর। আসা করা যায়, তোমরা তার শুকর আদায় করতে পারবে।

    রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে আত্মশুদ্ধির নিয়তে সওয়াবের আসায় রমজান মাসের রোজা পালন করে তার পূর্ববর্তী গুনাহ সমূহ ক্ষমা করা হয়। (বুখারি ও মুসলিম)

    ক্বিয়াম তথা তারাবিহ আদায়
    মহানবী হজরত মুহাম্মদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন—যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে আত্মশুদ্ধির জন্য সওয়াবের আসায় রমজান মাসের রাতে ক্বিয়াম তথা তারাবিহ আদায় করে তার পূর্ববর্তী গুনাহসমূহ ক্ষমা করা হয়। (বুখারি ও মুসলিম)

    ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা আমিরুল মুমিনিন হযরত উমর ফারুক রা. এর খেলাফতকালে সকল সাহাবিদের ইজমার ভিত্তিতে মসজিদে নববিতে সর্বপ্রথম বিশিষ্ট সাহাবি হযরত উবাই বিন কা’ব রা. এর ইমামতিতে ২০ (বিশ) রাকাত তারাবিহর নামাজ প্রতিষ্ঠিত হয়। এরই ধারাবাহিকতায় আজও পবিত্র মসজিদে নববি ও পবিত্র মসজিদুল হারামে রমজানুল মুবারাকে ২০ রাকাত তারাবিহ জামাতের সাথে আদায় করা হয়।


    কুরআনুল কারিম তেলাওয়াতের প্রতি যত্নবান হওয়া
    কুরআন নাজিলের মাস পবিত্র রমজান মাসে একজন কুরআন বিশ্বাসী মানুষের জন্য কুরআনের সাথে সম্পর্ক মজবুত করার উপযুক্ত সময়। এ কারণে এ মাসে অধিক পরিমাণে কুরআন তেলাওয়াত, সাধ্যানুযায়ী কুরআন হিফয, কুরআনের মর্ম উপলব্ধির চেষ্টা করা, কুরআনের আলোকে পরিবার, সমাজ গঠন ও কুরআনের আলোকে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার চেষ্টাসহ রমজান মাসে অধিক পরিমাণে কুরআন চর্চায় রত থাকা মুমিনদের জন্য একান্ত অপরিহার্য। আল্লাহর রাসুল (সা.) নিজেই এ মাসে পবিত্র কুরআন চর্চায় অধিক মনোযোগী হতেন।

    হাদিসে এসেছে
    হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বলেন, রসুলল্লাহ সা. ছিলেন সবচেয়ে বড় দানশীল। রমজান মাসে যখন হযরত জিবরাইল আ. তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতেন, তখন তিনি বেশি দান করতেন। আর রমজানের প্রতি রাতে জিবরাইল আ. তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতেন। এ সময় তারা দুজন একত্রে পবিত্র কুরআন অধ্যয়ন করতেন। তখন প্রবাহিত বাতাসের গতির চেয়ে নবীজির দানের গতি বেশি হতো। (বুখারি)

    দান সাদাক্বাহসহ ভালো কাজ করার সর্বোত্তম সময় রমজান মাস
    রমজান মাস হলো দান সাদাক্বাসহ সব ধরনের ভালো কাজের মাধ্যমে নিজের আমলনামা ভারী করার উপযুক্ত সময়। মহানবী (সা.) বলেছেন রমজান মাসের একটি নফল কাজ অন্য মাসের ফরজ কাজের সমান আর এ মাসের একটি ফরজ কাজ অন্য মাসের সত্তরটি ফরজ কাজের সমান।

    মহানবী স. আরও বলেছেন—রমজান মাসের আগমনের সঙ্গে সঙ্গে বেহেশতের সব দরজা খুলে দেওয়া হয় এবং এ মাসে আর বন্ধ করা হবে না। আর জাহান্নামের সব দরজা বন্ধ করে দেওয়া হয়। এ মাসে আর খোলা হবে না। এবং শয়তানকে কারাবন্দি করা হয়। রমজানের আগমনের সঙ্গে সঙ্গে আল্লাহর পক্ষ থেকে একজন ঘোষক বলতে থাকেন—হে! ভালো মানুষেরা তোমরা এগিয়ে যাও। আর দুষ্ট লোকেরা তোমরা থেমে যাও। মহানবী বলেছেন—রমজান হলো সবার সহনশীলতা ও সহমর্মিতার মাস।

    পানাহার ও জৈবিক চাহিদা থেকে বিরত থেকে সিয়াম সাধনা করতে হয়। আর এ চর্চার মধ্য দিয়ে রোজাদারদের অন্তর থেকে লোভ লালসা, হিংসা বিদ্বেষ, ক্রোধ দূর হবে এটাই রোজার উদ্দেশ্য। কাজেই সিয়াম সাধনার মধ্য দিয়ে ধৈর্য ও সহনশীলতার প্রশিক্ষণ নেওয়ার উপযুক্ত সময় হলো মাহে রমজান।

  • চাঁদ দেখা গেছে, রোজা শুরু রোববার

    চাঁদ দেখা গেছে, রোজা শুরু রোববার

    দেশের আকাশে শনিবার (২ এপ্রিল) সন্ধ্যায় পবিত্র রমজান মাসের চাঁদ দেখা গেছে। তাই মুসলমানদের সিয়াম সাধনার (রোজা) মাস পবিত্র রমজান শুরু হচ্ছে রোববার (৩ এপ্রিল)। আগামী ২৮ এপ্রিল বৃহস্পতিবার দিনগত রাতে পবিত্র লাইলাতুল কদর পালিত হবে।

    রাজধানীর বায়তুল মোকাররমে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের সভাকক্ষে শনিবার সন্ধ্যায় জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটির সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটির সভাপতি ও ধর্ম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মো. ফরিদুল হক খান।

    এবার ২৯ দিনেই শেষ হলো শাবান মাস। রমজান মাস শেষেই আসবে মুসলমানদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব ঈদুল ফিতর।

    সভায় ধর্ম প্রতিমন্ত্রী জানান, সব জেলা প্রশাসন, ইসলামিক ফাউন্ডেশনের প্রধান কার্যালয়, বিভাগীয় ও জেলা কার্যালয়, আবহাওয়া অধিদফতর, মহাকাশ গবেষণা ও দূর অনুধাবন কেন্দ্র থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী বাংলাদেশের আকাশে হিজরি ১৪৪৩ সনের রমজান মাসের চাঁদ দেখা গেছে। রোববার থেকে শুরু হচ্ছে রমজান মাস। আগামী ২৮ এপ্রিল বৃহস্পতিবার দিনগত রাতে (রমজানের ২৭তম রাত) পবিত্র লাইলাতুল কদর পালিত হবে বলেও জানান তিনি।

    শনিবার রাতেই এশার নামাজের পর ২০ রাকাত বিশিষ্ট তারাবি নামাজ শুরু হবে। রোজা রাখতে শেষরাতে সেহরি খাবেন মুসলমানরা। ঢাকায় প্রথম দিন সেহরির শেষ সময় রাত ৪টা ২৭ মিনিট। রোববার প্রথম রোজার ইফতারের সময় ৬টা ১৯মিনিট।

    ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের কাছে রমজান সংযম, আত্মশুদ্ধি এবং ত্যাগের মাস। রমজান রহমত (আল্লাহর অনুগ্রহ), মাগফিরাত (ক্ষমা) ও নাজাত (দোজখের আগুন থেকে মুক্তি)- এ তিন অংশে বিভক্ত। এ মাসে সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহার, স্বামী-স্ত্রীর সহবাস ও যে কোনো ধরনের পাপ কাজ থেকে বিরত থাকার মাধ্যমে রোজা পালন করেন মুসলমানরা।

    এ মাসের শেষ অংশে রয়েছে হাজার মাসের এবাদতের চেয়েও উত্তম লাইলাতুল কদরের রাত। ইসলাম ধর্ম অনুযায়ী, রমজান মাসে প্রতিটি নেক আমলের সওয়াব আল্লাহ পাক ৭০ গুণ বাড়িয়ে দেন।

    অপরদিকে, সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যে শনিবার থেকে রমজান শুরু হয়েছে।

    করোনাভাইরাস (কোভিড-১৯) মহামারির কারণে গত দু’বছর রমজানে বিধিনিষেধ ছিল। করোনাভাইরাস সংক্রমণ পরিস্থিতি উন্নীত হওয়ায় গত ২২ ফেব্রুয়ারি থেকে উঠে যায় বিধিনিষেধ, স্বাভাবিক হয়ে যায় সবকিছু। দু’বছর পর এবারই স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে এলো রমজান মাস।

  • রোজার আগেই যেসব প্রস্তুতি নেওয়া জরুরি

    রোজার আগেই যেসব প্রস্তুতি নেওয়া জরুরি

    বরকত ও কল্যাণের গুরুত্বপূর্ণ মাস রমজানের বেশকিছু আগাম প্রস্তুতি রয়েছে। মুসলমানের জন্য যে প্রস্তুতি রমজানজুড়ে রহমত, বরকত, মাগফেরাত, নাজাত ও যাবতীয় কল্যাণের দরজা খুলে রাখবে। তবে রমজানের প্রস্তুতি মানেই খাবারের সমাহার সংগ্রহের প্রস্তুতি নয়; বরং আত্মিকভাবে নিজেকে প্রস্তুত করা। যদিও মানুষ আত্মিক প্রস্তুতি বাদ দিয়ে খাবারের আয়োজনেই বেশি ঝুঁকে পড়ে।

    রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, নিশ্চয়ই আল্লাহর কোনো বান্দা যে কোনো ভালো কাজ বা আমল যদি যথাযথভাবে উত্তম উপায়ে করে; তবে সে আমল বা কাজ আল্লাহ তাআলা পছন্দনীয় হিসেবে গ্রহণ করেন।’ (তাবারানি)

    সুতরাং রমজানের আমল বা কাজ যেনতেনভাবে নয়; বরং পরিপূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে আদায় করতে হবে। তাতে আল্লাহর সন্তুষ্টি পাওয়া যাবে। আর এতে রমজানের আগাম ১১টি প্রস্তুতিমূলক বিষয় রয়েছে। তা হলো-

    তাওবাহ-ইসতেগফার করা
    রমজানের আগের সব গোনাহ থেকে তাওবাহ ইসতেগফার করতে হবে। কোনো অন্যায়কারী যদি ভাবেন, রমজান চলে এসেছে, আর আমার সব গোনাহ এমনিতেই ক্ষমা হয়ে যাবে। বাস্তবে বিষয়টি এমন নয়। বরং আগে থেকে তাওবাহ-ইসতেগফার করে রমজানের যাবতীয় কল্যাণ লাভে নিজেকে প্রস্তুত করা খুবই জরুরি। আর তাতে আল্লাহ তাআলা ওই বান্দার আগের সব গোনাহ মাফ করে দিয়ে রমজানের যাবতীয় কল্যাণ দিয়ে জীবন সুন্দর করে দেবেন। এ জন্য বান্দা বেশি বেশি পড়বে- اَللَّهُمَّ اغْفِرْلِىْ : আল্লাহুম্মাগফিরলি, হে আল্লাহ! আমাকে ক্ষমা করে দিন।

    বিজ্ঞাপন

    রমজানের উপকারিতা স্মরণ করা
    বরকতময় মাস রমজান সম্পর্কে কুরআন-সুন্নায় যেসব ফজিলত, মর্যাদা ও উপকারিতার বর্ণনা রয়েছে, রমজান শুরু হওয়ার আগেই সেসব সম্পর্কে জেনে নেওয়া। সেসব উপকার পেতে কুরআন-সুন্নাহর দিকনির্দেশনাগুলো মেনে চলার প্রস্তুতি নেওয়া। রমজান আসছে, মানসিকভাবে বারবার এ কথা স্মরণ ও নেক আমলের প্রস্তুতি নিতে দোয়াটি বেশি বেশি করা- اَللَّهُمَّ بَلِّغْنَا رَمَضَانَ : আল্লাহুম্মা বাল্লিগনা রামাদান। হে আল্লাহ! আপনি আমাদের রমজান পর্যন্ত পৌঁছে দিন। অর্থাৎ রমজান পর্যন্ত হায়াত দান করুন।’

    মানসিক প্রতিজ্ঞা নেওয়া
    রমজান মাসে পরিপূর্ণ সাওয়াব ও ক্ষমা পেতে মানসিকভাবে প্রস্তুতি নেওয়া। জীবনভর যত গোনাহ করেছি এ রমজানে সেসব গোনাহ বা অন্যায় থেকে পরিপূর্ণ ক্ষমা পেতে হবে। সবচেয়ে বেশি সাওয়াব পেতে হবে। রমজান শুরু হওয়ার আগে এ প্রতিজ্ঞা গ্রহণ করা জরুরি। অনেক সময় পূর্বপ্রস্তুতি না থাকায় রমজান পেয়েও মুসলমান পরিপূর্ণ সাওয়াব ও ক্ষমা পাওয়া থেকে বঞ্চিত হয়। তাই প্রতিজ্ঞা এমনভাবে করা, চাকরি-বাকরি, ব্যবসা-বাণিজ্য বা নিজের কাজ যেমনই হোক, আমি আমার বিগত জীবনের সব গোনাহ থেকে নিজেকে মাফ করিয়ে নেব। আমার প্রতি আল্লাহকে রাজি-খুশি করিয়েই ছাড়বো, ইনশাআল্লাহ।

    কাজা রোজা আদায় করা
    রমজান শুরু হওয়ার আগে বিগত জীবনে অসুস্থ হওয়ার কারণে বা সফরের কারণে রমজানের ফরজ রোজা কাজা হয়ে থাকলে তা যথাযথভাবে আদায় করে নেওয়া। বিশেষ করে মা-বোনদের ভাঙতি রোজা থাকতে পারে। তাই রমজানের আগে শাবান মাসের এ সময়ে কাজা রোজা আদায় করে নেওয়া। এতে দুটি ভালো আমল বাস্তবায়িত হবে। প্রথমত, বিগত জীবনের কাজা রোজা আদায় হবে। রমজানের রোজা পালনের প্রতি আগ্রহ বাড়বে। দ্বিতীয়ত, সুন্নাতের অনুসরণ হবে। রমজানের আগের মাস শাবানে প্রিয় নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বেশি বেশি নফল রোজা রাখতেন। রমজানের প্রস্তুতি নিতে। কাজা রোজা আদায় করার মাধ্যমে সুন্নাতের অনুসরণও হয়ে যাবে।

    সাধারণ ক্ষমা পাওয়ার চেষ্টা করা
    আল্লাহ তাআলা রমজান মাসে অনেক মানুষকে জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তি দিয়ে থাকেন। তবে এ সাধারণ ক্ষমা সবার ভাগ্যে জোটে না। এ ক্ষমা পেতে হলে দুটি কাজ থেকে বিরত থাকতে হবে। ক্ষমা প্রার্থনা করে তা থেকে ফিরে আসতে হবে। তা হলো- শিরক থেকে মুক্ত থাকা। আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শিরক না করা। কেউ ইচ্ছা কিংবা অনিচ্ছায়, ছোট বা বড় শিরক করে থাকলে রমজান আসার আগেই তা থেকে তাওবাহ-ইসতেগফারের মাধ্যমে ফিরে আসা। আর হিংসা থেকে মুক্ত থাকা। কারো প্রতি কোনো বিষয়ে হিংসা না করা। কারণ হিংসা মানুষের সব নেক আমলকে সেভাবে জ্বালিয়ে দেয়; যেভাবে আগুন কাঠকে জ্বালিয়ে দেয়। তাই হিংসা পরিহার করে মনকে ক্ষমা লাভে স্বচ্ছ রাখা।

    ফরজ রোজার নিয়ম-কানুন জানা
    রমজান আসার আগে রোজা পালনের মাসআলা-মাসায়েল তথা নিয়ম-কানুনগুলো ভালোভাবে জেনে নেওয়া জরুরি। তাতে রমজানের রোজা নষ্ট হওয়া বা মাকরূহ হওয়া বা অন্য বিষয়গুলো জেনে নেওয়ার সর্বাত্মক চেষ্টা করা।

    বিগত রমজানের অসমাপ্ত কাজ
    রমজান মাস আসার আগে বিগত রমজানের নেক আমলগুলো করতে না পারার কারণগুলো খুঁজে বের করার চেষ্টা করা। যেমন-
    ১. কেন নিয়মিত কুরআন অধ্যয়ন করা হয়নি?
    ২. কেন তারাবিহ পড়া হয়নি?
    ৩. কেন দান-সহযোগিতা করা হয়নি?
    ৪. কেন ইতেকাফ করা হয়নি?
    ৫. কেন রোজাদারকে ইফতার করানো হয়নি?
    ৬. কেন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ জামাআতের সাথে আদায় করা সম্ভব হয়নি?
    ৭. কেন কুরআন-সুন্নার আলোচনায় বসা হয়নি?
    ৮. কেন রমজানে পরিবারের হক আদায় করা হয়নি?
    ৯. কেন পাড়া-প্রতিবেশি বা আত্মীয়দের হক আদায় করা হয়নি?
    বিষয়গুলো চিহ্নিত করে নেওয়া। এ বছর রমজান আসার আগে আগে চিহ্নিত কারণগুলো থেকে নিজেকে বিরত রেখে কিংবা প্রস্তুতি নিয়ে কল্যাণকর সব নেক আমলগুলো করার প্রস্তুতি নেওয়া।

    শাবান মাসে রমজানের মহড়া চালু রাখা
    রমজান মাসে বেশি বেশি ইবাদত করতে এবং রোজা রাখার জন্য শাবান মাসে বেশি বেশি নফল রোজা রাখা। বেশি বেশি কুরআন অধ্যয়ন করা। নফল নামাজ পড়া। তাওবাহ-ইসতেগফার করা। ত্যাগের মানসিকতা তৈরি করা। দান-সাদকাহ শুরু করা। যাতে এ মহড়ার বাস্তবায়ন রমজানজুড়ে সুন্দরভাবে চালানো যায়।

    রোজায় ২৪ ঘণ্টার রুটিন করা
    রমজান মাসজুড়ে যে কাজেই থাকুন না কেন, পুরো সময়টি কোন কোন কাজে কীভাবে ব্যয় হবে; তার একটি সম্ভাব্য রুটিন তৈরি করে নেওয়া। আগাম রুটিন থাকলে রমজানে চরম ব্যস্ততার মাঝেও নেক আমলসহ অন্যান্য কাজও ইবাদতের মধ্যেই কেটে যাবে। এক কথায় সব কাজের তালিকা করে নেওয়া।

    রমজানের চাঁদের অনুসন্ধান
    শাবান মাসের ২৯ তারিখ সন্ধ্যায় চাঁদের অনুসন্ধান করা সুন্নাত। মুছে যাওয়ার পথে থাকা সুন্নাতটিকে আবারও জীবিত করার পূর্ব পরিকল্পনা গ্রহণ

    করা। বর্তমানে চাঁদ দেখা কমিটির দিকে তাকিয়ে থাকার রীতি চলছে। মোবাইল, রেডিও ও টিভির সংবাদের অপেক্ষা করেন। এতে চাঁদ দেখা এবং দোয়া পড়ার সুন্নাতটি থেকে বঞ্চিত হয় মুসলমান। এ থেকে বেরিয়ে এসে চাঁদ অনুসন্ধান করার সুন্নাতটি জীবিত করার সর্বাত্মক পূর্বপ্রস্তুতি রাখা।

    বেশি বেশি দোয়া
    রমজানের আগে আল্লাহর কাছে এ প্রার্থনা করা। হে আল্লাহ! আমি যতই চেষ্টা করি, তোমার তাওফিক বা ইচ্ছা না থাকলে আমি যেমন রমজান পাবো না। আবার রমজান পেলেও বরকত লাভে সক্ষম হবো না। সুতরাং রমজান ও রমজানের নেক আমল করার ক্ষমতা তোমার কাছে চাই। হে আল্লাহ! রমজানে যত মানুষ সৌভাগ্যবানদের কাতারে নাম লেখাবে, তাদের কাতারে আমাকেও শামিল করো; হে রাব্বুল আলামিন।

    আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহকে রমজানের আগের প্রস্তুতিসমূহ যথাযথভাবে বেশি বেশি বাস্তবায়ন করার তাওফিক দান করুন। আমিন।