প্রতি বছর বাংলাদেশে প্রায় ১৯ হাজার মানুষ পানিতে ডুবে মারা যায়। এর মধ্যে ১০ হাজারই থাকে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু।
ডুবে শিশুদের এভাবে প্রাণহানি রোধে একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে সরকার। মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নেওয়া এই প্রকল্পের মাধ্যমে শিশুদের প্রারম্ভিক বিকাশের কার্যক্রমও পরিচালিত হবে।
গবেষণায় দেখা গেছে, গ্রামাঞ্চলে সকাল ৮টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত বাবা-মায়েরা যখন কাজে ব্যস্ত থাকেন তখন শিশুরা বেশি পানিতে ডুবে মারা যায়।
এজন্য ওই সময়টা শিশুদের নির্দিষ্ট স্থানে রাখতে পারলে এই মৃত্যুহার অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব গত ২২ ফেব্রুয়ারি একনেকে (জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি) ‘ইন্টিগ্রেটেড কমিউনিটি বেইজড সেন্টার ফর চাইল্ড কেয়ার, প্রটেকশন অ্যান্ড সুইম-সেইফ ফ্যাসিলিটিজ’ নামে প্রকল্পটি অনুমোদন পেয়েছে।
তিন বছর মেয়াদী এই প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ২৭১ কোটি ৮২ লাখ ৫৭ হাজার টাকা। বেসরকারি সংস্থা ও সরকারের অন্যান্য দপ্তরের সহায়তায় মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় শিশু একাডেমির মাধ্যমে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে।
এই প্রকল্পের আওতায় দেশের ১৬ জেলার ৪৫টি উপজেলায় আট হাজার শিশু যত্ন কেন্দ্র করা হবে। গবেষণায় মোতাবেক পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যুর ঝুঁকিপূর্ণ সময় অর্থাৎ সকাল ৯টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত শিশুরা এসব কেন্দ্রে থাকবে।
কেন্দ্রে পাঁচ ঘণ্টা থাকার সময় শিশুর প্রারম্ভিক বিকাশের সহায়ক নানা শিক্ষা ও বিনোদনমূলক কার্যক্রম পরিচালিত হবে। এই ৪৫ উপজেলায় এক থেকে পাঁচ বছর বয়সী দুই লাখ শিশু কার্যক্রমটির আওতায় আসবে।
একই সঙ্গে এই ৪৫ উপজেলায় ছয় থেকে ১০ বছর বয়সী তিন লাখ ৬০ হাজার শিশুকে সাঁতার শেখানো হবে। এছাড়া প্রকল্পের আওতাভুক্ত অঞ্চলের দুই লাখ মা-বাবাকে সচেতন করা হবে, যেন তারা শিশু যত্ন, সুরক্ষা এবং বিকাশে ভূমিকা রাখতে পারেন।
২০১৬ সালে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বাংলাদেশ হেলথ ও ইনজুরি সার্ভে রিপোর্ট অনুযায়ী, ইনজুরি বা আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে মৃত্যুর ক্ষেত্রে তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে পানিতে ডুবে মৃত্যু। ইনজুরি বা আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে মৃত্যুর মধ্যে ১১ দশমিক ৭ শতাংশ পানিতে ডুবে মারা যায়। জরিপ অনুযায়ী, প্রতিদিন ৪০টি শিশু পানিতে ডুবে মারা যায়।
এছাড়া প্রতি বছর বাংলাদেশে সব বয়সের প্রায় ১৯ হাজার মানুষ পানিতে ডুবে মারা যায়। এর মধ্যে ১০ হাজারই থাকে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু।
কেন্দ্রে শিশুরা সকাল ৯টা থেকে ২টা পর্যন্ত থাকবে। ছড়া, গানসহ নানা কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তাদের বিকাশের কাজগুলো করা হবে। দুপুরে যেন তাদের একটা খাবার দেওয়া যায়, যেটা তাদের পুষ্টির চাহিদা পূরণ করবে
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) গ্লোবাল রিপোর্ট অন ড্রাউনিংয়ে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে এক থেকে চার বছরের শিশু মৃত্যুর ক্ষেত্রে ৪৩ শতাংশই মারা যায় পানিতে ডুবে।
পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যু রোধে বেসরকারি সংস্থার কিছু উদ্যোগ থাকলেও এতদিন সরকারের দৃষ্টিগ্রাহ্য কোনো কার্যক্রম ছিল না। ডুবে শিশুমৃত্যু রোধ এবং শিশুর প্রারম্ভিক বিকাশ নিয়ে এই প্রথম বড় আকারে প্রকল্প নিলো সরকার।
পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যু রোধে কাজ করা বেসরকারি সংস্থা ও বিশেষজ্ঞরা সরকারের এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়েছেন। ডুবে শিশুমৃত্যু রোধে আশার আলো দেখছেন তারা।
মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (উন্নয়ন, পরিকল্পনা ও পরিসংখ্যান) অনুবিভাগ মহিউদ্দীন আহমেদ বলেন, ‘প্রকল্পটি একনেকে পাস হয়েছে।
রেজুলেশন অনুমোদনের পর আমরা যখন পাবো, এরপর কাজ শুরু হয়ে যাবে। প্রকল্প পরিচালক বা পিডি নিয়োগ দেওয়া হবে। আমাদের দিক থেকে অন্যান্য পদগুলো পূরণ করে দেবো।’
তিনি বলেন, ‘যে বিষয়টিতে আমাদের নজর ছিল না, সেই বিষয়ে আমরা কাজ শুরু করতে যাচ্ছি। এটা খুবই আনন্দের বিষয়।’ অতিরিক্ত সচিব বলেন, ‘আমাদের দেশে অনেক শিশু পানিতে ডুবে মারা যাচ্ছে। প্রকল্প নেওয়ার আগে গবেষণা হয়েছে। কোন শিশু ঝুঁকিপূর্ণ, তা সেখানে উঠে এসেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, গ্রামাঞ্চলে সকাল ৮টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত বাবা-মায়েরা যখন কাজে ব্যস্ত থাকেন তখন শিশুরা বেশি পানিতে ডুবে মারা যায়।
এজন্য ওই সময়টা শিশুদের নির্দিষ্ট স্থানে রাখতে পারলে এই মৃত্যুহার অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব। একই সঙ্গে ওই সময়টায় শিশুদের শিক্ষামূলক নানা কর্মকাণ্ডে রাখা যেতে পারে, যেন শিশুর প্রারম্ভিক বিকাশটা হয়। সেই অনুযায়ী নতুন প্রকল্পটি নেওয়া হয়েছে।’
‘এই প্রকল্পের আওতায় আমরা শিশু যত্ন কেন্দ্র করবো। সরকার ও এনজিওদের সহায়তায় ১৬ জেলায় আট হাজার কেন্দ্র করা হবে। সবার সহযোগিতায় শিশু একাডেমি মূলত এই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে।’
এই প্রকল্পের আওতায় ছয় থেকে ১০ বছরের শিশুদের সাঁতার শেখানো হবে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘প্রতি বছর এক লাখ ২০ করে তিন বছরে তিন লাখ ৬০ হাজার শিশুকে সাঁতার শেখানো হবে।’

















