কেউ বলেন প্রবাসী সরকার, কেউ বলেন মুজিব নগর সরকার, কেউ বলেন অস্থায়ী সরকার, কেউ বলেন বিপ্লবী সরকার; আসলে কোনওটাই সঠিক নয়। প্রকৃতার্থে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের প্রথম সরকার। ২০২১ সালের ১০ এপ্রিল স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ সরকারের সুবর্ণ জয়ন্তী।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাত ১২টা ২০ মিনিটে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। স্পষ্ট করে ঘোষণা করেছিলেন ‘আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন’। তার এক ঘণ্টা ১০ মিনিট পরে বঙ্গবন্ধুকে ৩২ নম্বর বাসা গ্রেপ্তার করে নিয়ে যাওয়া হয়।
সবচেয়ে দুভাগ্যের ব্যাপার বঙ্গবন্ধু কেন গ্রেপ্তার হয়েছিলেন, কেন নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যাননি- এটা নিয়ে বিগত ৪৫ বছর বছর যাবৎ কুতর্ক করার চেষ্টা করা হয়েছে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালের কোনও এক সময়ে ড. মাযহারুল ইসলাম , প্রয়াত কথাসাহিত্যিক রাহাত খান, বাংলা একাডেমির বর্তমান সভাপতি অধ্যাপক শামসুজ্জামান খান বঙ্গবন্ধুর সাথে দেখা করতে গিয়েছিলেন। অনেক বিষয় নিয়ে আলোচনার এক পর্যায়ে বঙ্গবন্ধুর কাছে সরাসরি প্রশ্ন করা হয়েছিল, আপনি তো গ্রেপ্তার এড়াতে পারতেন? প্রশ্নোত্তরে বঙ্গবন্ধুর উত্তর ছিল একেবারেই স্পষ্ট-
২৫শে মার্চ (১৯৭১) রাতে আমি গ্রেফতার হবার আগে স্বাধীনতার ঘোষণা দেই। পুলিশ হেডকোয়াটার্সের মাধ্যমে ওয়্যারলেসে সে ঘোষণা সব জেলা সদরে পাঠানো হয়। আমি বিভিন্ন চ্যানেলে ভারতের সঙ্গেও যোগাযোগ করে যাই। তা না হলে তোমরা অত সহজে অস্ত্র ও সাহায্য সহযোগিতা পেতে না।
আমরা প্রশ্ন করলাম কিন্তু আপনি কেন ওদের হাতে ধরা দিলেন। তিনি বললেন, ‘এ ব্যাপারে আমার বেশ ক’টি চিন্তা কাজ করেছে। এক. আমাকে ধরতে না পারলে ওরা আরও বেশি লোককে খুন করতো; দুই. আন্তর্জাতিকভাবে আমরা বিচ্ছিন্নতাবাদী ও ভারতের ক্রীড়নক বলে প্রমাণিত হতাম এবং এতে আন্তর্জাতিক সহমর্মিতা কমতো এবং আরও বেশি দেশ আমাদের আন্দোলন সম্পর্কে সন্দেহ পোষণ করতো। আর একটা কথা বলি, তোমরা কিভাবে নেবে জানি না, প্রফেসর সাহেব আমার সঙ্গে একমত হবেন কিনা তাও বলতে পারি না- তবে আমার সুদৃঢ় বিশ্বাস আমি পাকিস্তানিদের হাতে বন্দি থাকায় আমার দুঃখী বাঙালিদের মধ্যে দুশ্চিন্তা, উদ্বেগ যেমন বেড়েছে তেমনি মানুষ আমার অনুপস্থিতিতে আমার একটা বিশাল প্রতীক মনে মনে তৈরি করে নিয়েছে। এটা ছিল মুক্তিযুদ্ধের খুব বড়ো একটা শক্তি। আমি প্রবাসী সরকারে থাকলে শুধু প্রমাণ সাইজের মুজিবই থাকতাম। ওদের হাতে বন্দি থাকায় আমি এক মহাশক্তিধর ও বাংলাদেশের সকল মানুষের প্রাণপ্রিয় নেতার ভূমিকায় স্থান পাই। মানুষ আমার নাম দিয়ে হেলায় হেসে প্রাণ বিসর্জন দিয়েছে। কি অমোঘ অস্ত্র ছিলো, ‘জয় বাংলা’ স্লোগান। ওরা যদি আমাকে মেরে ফেলতো, তাহলে আমি আরো বড়ো প্রতীকে পরিণত হতাম। বাংলার মানুষ আরো লড়াকু হয়ে যুদ্ধ করতো। তাছাড়া, আমার জাতি আমাকে যে মর্যাদা দিয়েছে তার প্রতি সম্মান রেখেই আমি আমার বুঝ মতো ব্যবস্থা নিয়েছি, আর আমার দেশবাসী ও যোগ্য সহকর্মীরা মুক্তিযুদ্ধ চালিয়েছে।
(তথ্য সূত্র : বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আলাপ ও অন্যান্য প্রসঙ্গ , লেখক অধ্যাপক শামসুজ্জামান খান। প্রকাশক- দ্য রয়েল পাবলিশার্স)
আমরা খেয়াল করলেই দেখতে পারবো, পশ্চিম পাকিস্তানের বর্বরোচিত আক্রমণ শুরুর ছয়দিন পর ৩১ মার্চ ১৯৭১ ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী সংসদে এক আবেগপূর্ণ প্রস্তাব নিয়ে উঠে দাঁড়িয়েছিলেন। গভীর প্রত্যয়ের সঙ্গে উচ্চারণ করেছিলেন যা, সেটি ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সূচনা। ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর বক্তব্যের কয়েকটা লাইন ছিল এরকম, “ভারতের সংসদ পূর্ব বাংলায় মানুষের গণতন্ত্রের সংগ্রামে গভীর সহানুভূতি ও সহমর্মিতা প্রকাশ করছে। ভারত শান্তি এবং মানবাধিকার রক্ষায় দায়বদ্ধ। সে কথা স্মরণে রেখে সভা অবিলম্বে অসহায় নিরস্ত্র মানুষের ওপর পাকিস্তান সরকারের বলপ্রয়োগ ও নির্মম হত্যাকাণ্ড বন্ধ করার দাবি জানাচ্ছে। ভারতের সংসদ পৃথিবীর সকল মানুষকে এবং তাদের সরকারকে আহ্বান জানাচ্ছে দ্রুত কোনও সদর্থক ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য যাতে পাকিস্তান এই গণহত্যা বন্ধ করতে বাধ্য হয়। এই সভার গভীর দৃঢ় বিশ্বাস পূর্ব বাংলার সাড়ে সাত কোটি মানুষের ঐতিহাসিক অভ্যুত্থানের জয় হবেই। ভারতের সংসদ পূর্ব বাংলার মানুষকে আশ্বস্ত করছে তাদের সংগ্রাম ও আত্মত্যাগে ভারতের জনগণের পূর্ণ সহানুভুতি এবং সমর্থন থাকবে।”
লক্ষ্য করার বিষয় শ্রীমতি ইন্দিরা লোকসভায় ভাষণের দিনই ৩১ মার্চ মেহেরপুর সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে পৌঁছেছিলেন বঙ্গবন্ধুর একান্ত বিশ্বস্ত আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দীন আহমদ ।
ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর ওই অঞ্চলের মহাপরিদর্শক গোলক মজুমদার তাদের নিরাপদ আশ্রয়ের বন্দোবস্তু করেছিলেন। খবর পেয়ে চলে এলেন ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মহাপরিচালক কে এফ রুস্তামজী। দিল্লির সঙ্গে যোগাযোগ করলে, সেখান থেকে রুস্তামজীকে বলা হল, তাজউদ্দীনসহ দিল্লিতে চলে আসতে। ভারতের সে সময়কার প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী তাজউদ্দীনের সঙ্গে বৈঠকে বসবেন। বাংলাদেশ সরকার গঠন করে, সেই সরকারের পক্ষ থেকে ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে কথা বলে, দাবি পেশ করলে তিনি সহায়তা করতে পারবেন। সব মিলিয়ে এটা তার কাছে পরিষ্কার হয় গেল- গুছিয়ে স্বাধীনতা সংগ্রাম করতে হলে, স্বাধীন সরকার গঠনের কোনও বিকল্প নেই। এ মন্ত্রিপরিষদ আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হল ১০ এপ্রিল। পাঠক নিশ্চয় মনে করতে পারবেন (লেখার শুরুতে আছে) বঙ্গবন্ধু অধ্যাপক শামসুজ্জামান খান ও অন্যান্যদের বলেছিলেন, “আমি বিভিন্ন চ্যানেলে ভারতের সঙ্গেও যোগাযোগ করে যাই। তা না হলে তোমরা অত সহজে অস্ত্র ও সাহায্য সহযোগিতা পেতে না।” সেটা আওয়ামী লীগের নেতারা ভারতে যাওয়ার সাথে সাথে তা স্পষ্ট করে বুঝতে পেরেছিলেন।
বাংলাদেশের প্রথম সরকারের রাষ্ট্রপতি হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নাম আর উপরাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম। বঙ্গবন্ধু যেহেতু তখন পাকিস্তানের কারাগারে, তাই বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পড়েছিল উপ-রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামের কাঁধে। প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন তাজউদ্দীন আহমদ। মন্ত্রিপরিষদের বাকি তিন সদস্য- ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী, খোন্দকার মোশতাক আহমদ এবং এ এইচ এম কামরুজ্জামান। পরের দিন, মানে ১১ এপ্রিল, প্রধান সেনাপতি হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল কর্নেল এম এ জি ওসমানীর নাম আর সেনাবাহিনীর চিফ অব স্টাফ হিসেবে ঘোষণা করা হয় কর্নেল আবদুর রবের নাম।
এ ঘোষণাপত্র অবশ্য ১০ এপ্রিলই প্রচার করা হয়েছিল। একজন সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ এ স্থানের নাম ‘মুজিবনগর’ নামকরণ করেন। ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর আত্মসমর্পণ পর্যন্ত মুজিবনগর ছিল বাংলাদেশের প্রথম সরকারের রাজধানী।
দুই
বাংলাদেশ (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) গণহত্যা শুরুর পরপরই ভারত প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে। প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী লোকসভা ও রাজ্যসভার যৌথ অধিবেশনে ২৭ মার্চ এক বক্তৃতায় বলেন, “আমাদের ভূখণ্ডের একেবারে সন্নিকটে নিরস্ত্র ও নিরপরাধ মানুষের ওপর যে নজিরবিহীন নির্যাতন চলছে, আমাদের জনগণ তার তীব্র নিন্দা না করে পারে না। পূর্ববঙ্গের জনগণের এই মহান সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের প্রতি সমর্থন ও সহৃদয় সহানুভূতি অব্যাহত থাকবে।”
৩১ মার্চ লোকসভা ও রাজ্যসভার যৌথ অধিবেশনে পাকিস্তান সরকারের প্রতি তীব্র নিন্দা ও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রতি সমর্থন ঘোষণা করা হয়। ১ এপ্রিল ১৯৭১- এর জাতিসংঘে নিযুক্ত ভারতের স্থায়ী প্রতিনিধি সমর সেন নির্লিপ্ত জাতিসংঘের সমালোচনা করে একটি বার্তা মহাসচিবের কাছে হস্তান্তর করেন। ওই বার্তায় বলা হয়, “বাংলাদেশে পশ্চিম পাকিস্তানি সৈন্যদের নির্যাতন এমন এক পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে যে তা পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার মনে করে চুপচাপ থাকার সময় আর নেই। মানব-দুর্গতির এ মুহূর্তে জাতিসংঘের নিস্ক্রিয়তা ও নীরবতাকে দুর্গত জনগণ উদাসীনতা মনে করবে।”
এখানে একটি বিশেষ তথ্য উপস্থাপন করা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছি। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন ভারতের লোকসভায় ৯২টা অধিবেশনের মধ্যে ২৯৬ বার বাংলাদেশ বিষয়ক নানা প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছিল ।
