Bangla Online News Banglarmukh24.com
জাতীয়

স্বাস্থ্যে শুদ্ধি অভিযান শুরু

করোনা মহামারীর মধ্যে দুর্নীতি, অনিয়ম, বিশৃঙ্খলা রোধে স্বাস্থ্য খাতে শুদ্ধি অভিযান শুরু হয়েছে। এর অংশ হিসেবে মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদফতর, কেন্দ্রীয় ঔষধাগারে নিয়োগ-বদলির মাধ্যমে রদবদল করা হচ্ছে।

ছোট-বড় ৪৩টি বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক, আরটিপিসিআর ল্যাব, ডায়াগনস্টিক সেন্টারে অভিযান চালানো হয়েছে। প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ না করায় প্রায় অর্ধশত প্রতিষ্ঠানকে দেয়া হয়েছে কারণ দর্শানোর নোটিশ।

বন্ধ করা হয়েছে একাধিক প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম। দুর্নীতির অভিযোগ ওঠায় করোনা হাসপাতালে নিয়োজিত চিকিৎসক, নার্সসহ স্বাস্থ্যকর্মীদের হোটেল বাস বন্ধ করা হয়েছে। একই ধারাবাহিকতায় দুর্নীতির অভিযোগে ১৪ ঠিকাদারকে কালোতালিকাভুক্ত করা হয়েছে।

এরা স্বাস্থ্য বিভাগের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের জন্য কেনাকাটার সঙ্গে জড়িত। স্বাস্থ্য অধিদফতর থেকে এ অভিযান চালানো হচ্ছে। আগামী শনিবার অভিযানের প্রাথমিক ধাপ সম্পন্ন হবে বলে জানা গেছে।

দেশের হাসপাতাল, ক্লিনিকসহ অন্যান্য চিকিৎসা সংক্রান্ত প্রতিষ্ঠানগুলো অনিয়ম খতিয়ে দেখতে সরকার নতুন করে একটি শক্তিশালী টাস্কফোর্স গঠন করবে। এর আগে বিভিন্ন ক্লাবে যেমন ক্যাসিনোবিরোধী অভিযান চালানো হয়েছে, তেমনি স্বাস্থ্য খাতেও কঠোর ব্যবস্থা হবে। এর আগে দুর্নীতি দূর করতে স্বাস্থ্য খাতের সব জায়গায় শুদ্ধি অভিযান চালানো হবে বলে জানিয়েছিলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক।

স্বাস্থ্য খাতের নানা অনিয়মের বিরুদ্ধে শুদ্ধি অভিযান শুরু হয়েছে বলে সম্প্রতি মন্তব্য করেছেন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের।
অনলাইন ব্রিফিংয়ে তিনি বলেন, চিকিৎসাব্যবস্থা বিশেষ করে হাসপাতাল, নমুনা পরীক্ষার ভুয়া সনদ, প্লাজমা ডোনেশন, সুরক্ষা সামগ্রী ক্রয়, হাসপাতালের যন্ত্রপাতি সংগ্রহসহ অন্যান্য খাতের নানা অনিয়মের বিরুদ্ধে শেখ হাসিনা সরকারের শুদ্ধি অভিযান শুরু হয়েছে। এটা অব্যাহত থাকবে। অপরাধীর কোনো দলীয় পরিচয় নেই। যত ক্ষমতাধর হোক, আইনের আওতায় আসতে হবে। যারা জনগণের অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে অবৈধ ব্যবসা করছে, প্রতারণা করছে, শেখ হাসিনা সরকার তাদের বিরুদ্ধে শূন্য সহিষ্ণুতার নীতিতে অটল।

অধিদফতরের হাসপাতাল শাখা সূত্রে জানা গেছে, জেকেজি ও রিজেন্টের পর কর্তৃপক্ষ কিছুটা নড়েচড়ে বসে। বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে শুরু করেছে অভিযান। ইতোমধ্যে ছোট-বড় মিলিয়ে ২৩ হাসপাতালে অভিযান পরিচালিত হয়েছে। এগুলো হল- আনোয়ার খান মডার্ন মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, বাংলাদেশ স্পেশালাইড হাসপাতাল, ইউনাইটেড হাসপাতাল, সাহাবুদ্দিন মেডিকেল কলেজ, সেন্ট্রাল হাসপাতাল, আসগর আলী হাসপাতাল, সুমনা ক্লিনিক, গ্রীন লাইফ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ইবনে সিনা, জাহান আরা ক্লিনিক, পপুলর ডায়াগনস্টিক, ল্যাবএইড হাসপাতাল, কমফোর্ট ডায়াগনস্টিক, জাপান বাংলাদেশ হাসপাতাল, ঢাকা ট্রমা সেন্টার। এছাড়া উত্তরার শিনশিন, লেকভিউ, আল আশরাফ এবং লুবানা ক্লিনিক। এদের মধ্যে ঢাকা ট্রাম সেন্টার ও আল আশরাফ হাসপাতালকে স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। ঢাকার বাইরেও একাধিক হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।

অধিদফতরের হাসপাতাল শাখা সূত্রে জানা গেছে, উত্তরার আল আশরাফ নামের হাসপাতালটি কোনো ধরনের লাইসেন্স ছাড়াই তাদের কার্যক্রম চালিয়ে আসছিল। অন্যদিকে ঢাকা ট্রমা সেন্টারের লাইসেন্স থাকলে সেটি ছিল মেয়াদোত্তীর্ণ। এছাড়া তাদের বিরুদ্ধে নানা অনিয়মের অভিযোগ প্রমাণ পাওয়া গেছে।

এদের বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো হচ্ছে, এদের লাইসেন্স আপডেট করা নেই। চিকিৎসক, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মী অপ্রতুল। চিকিৎসক ও নার্সদের পিপিই ব্যবহারের জন্য নির্দিষ্ট স্থান নেই। কোনো নির্ধারিত ডিউটি রোস্টার মানা হয় না, হাসপাতালের প্রবেশমুখে কোনো স্ক্রিনিংয়ের ব্যবস্থা নেই।
কালার কোড অনুযায়ী বর্জ্য ব্যবস্থাপনা না হওয়াসহ আরও অনেক। এছাড়া আরটিপিসিআর ল্যাব অনুমোদন নিয়ে কাজ নমুনা পরীক্ষা না করা এবং ল্যাব প্রস্তুত না করার খবর পাওয়া গেছে। যার পরিপ্রেক্ষিতে ইতোমধ্যে ২০টা পিসিআর ল্যাব পরিদর্শন করেছে অধিদফতরের হাসপাতাল শাখা। এদের মধ্যে কয়েকটির সঙ্গে চুক্তি বাতিল এবং কয়েকটির অনুমোদন করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, জেকেজিসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ব্যাপক প্রতারণা ও জালিয়াতি প্রকাশ হলেও এর বাইরেও রয়েছে আরও নানা দুর্নীতি-অনিয়মের খবরাখবর।

যা নিয়ন্ত্রণের এখন সময়। এজন্য সরকারকে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। ইতোমধ্যে প্রতারণার অভিযোগে রিজেন্টের চেয়ারম্যান সাহেদ, এমডি পারভেজ, জেকেজির চেয়ারম্যান ডা. সাবরিনা, ম্যানেজিং ডিরেক্টর আরিফসহ বেশ কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এসব অনিয়মে সহযোগিতা করায় এবং যথোপযুক্ত যাচাই-বাছাই ছাড়াই এসব প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেয়ায় সচিব, মহাপরিচালক, পরিচালকসহ বিভিন্ন পদে পরিবর্তন আনা হয়েছে। যা চলমান রয়েছে বলেও মন্ত্রণালয় ও অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে।

এদিকে রিজেন্ট ও জেকেজি কাণ্ডের আগে করোনার মধ্যেই বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) ঋণে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে একটি প্রকল্প নেয়া হয়। যাতে বাজার মূল্যের চেয়ে তিন-চারগুণ পর্যন্ত বেশি দামে মাস্ক, পিপিই, গগলস, বুট কেনার চেষ্টা হয়েছে। এছাড়া অবিশ্বাস্য খরচ দেখানো হয়েছিল আরও কয়েকটা জায়গায়।

মাত্র ৩০টা অডিও-ভিডিও ফিল্ম তৈরির খরচ দেখানো হয়েছে ১১ কোটি ৫০ লাখ টাকা। মাত্র চারটি ওয়েবসাইট উন্নয়ন করতে স্বাস্থ্য অধিদফতরের খরচ ১০ কোটি ৫০ লাখ টাকা।

পাঁচটি ডাটাবেজ তৈরিতে খরচ দেখানো হয়েছে ১০ কোটি ৫০ লাখ টাকা। পাঁচটি কম্পিউটার সফটওয়্যার কেনায় খরচ ধরা হয়েছে ৫৫ কোটি টাকা। এসব ঘটনা জানাজানির পর প্রকল্প দুটির পরিচালক (পিডি) অধ্যাপক ডা. ইকবাল কবিরকে ওএসডি করা হয়। একইভাবে ওএসডি করা হয়েছে পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলো) ডা. আমিনুল হাসানকে।
এর আগে সিএমএসডি’র পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শহীদুল্লাহকে প্রতিরক্ষা বিভাগে ন্যস্ত করা হয়। নানা অভিযোগে ওই প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৮ জন কর্মীকে বদলি করা হয়। স্বাস্থ্যসেবা সচিব মো. আসাদুল ইসলামকে বদলি করা হয়েছে। এসব অভিযোগের দায় কাঁধে নিয়ে মঙ্গলবার অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ পদত্যাগ করেন। বৃহস্পতিবার সেটি গৃহীত হয়।

শুদ্ধি অভিযানে বাদ পড়েনি রাজনীতিবিদ। দেশে করোনাভাইরাস প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়ার পর ১৮ এপ্রিল ৫০ হাজার কেএন৯৫ মাস্ক সরবরাহের জন্য আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় উপপ্রচার সম্পাদক আমিনুল ইসলামের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানকে তড়িঘড়ি করে কার্যাদেশ দেয় কেন্দ্রীয় ঔষধাগার।

প্রথম দফায় ভুয়া মাস্ক সরবরাহের পর জাল-জালিয়াতির বিষয়টি ধরা পড়লেও শুরুতে ঔষধ প্রশাসন অধিদফতর নীরব ভূমিকা পালন করে। বিষয়টি ফাঁস হলে তার বিরুদ্ধে অনেকটা গোপনে মামলা করে নিজেদের দায় সারে ঔষধ প্রশাসন।

একই ধারাবাহিকতায় দুর্নীতির অভিযোগে সম্প্রতি ১৪ ঠিকাদারকে কালোতালিকাভুক্ত করে স্বাস্থ্য অধিদফতর। বিভিন্ন মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের যন্ত্রপাতি কেনাকাটায় দুদকের তদন্তে এসব ঠিকাদারের নাম উঠে আসে। এসব প্রতিষ্ঠান ও তাদের মালিকদের বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে দুদক মামলা করে সে তালিকা পাঠিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদফতরে। দুর্নীতি দমন কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে এসব ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানসহ প্রতিষ্ঠানের মালিকদের বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে ৯ জুন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় চিঠি দেয় অধিদফতরকে। এতে বলা হয়, উল্লিখিত কালোতালিকাভুক্ত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানসহ প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারীর সঙ্গে কোনো প্রকার দাফতরিক ক্রয় সংক্রান্ত কাজে সম্পৃক্ত না হওয়ার জন্য নির্দেশ দেয়া হল।

এদিকে কোভিড-১৯ চিকিৎসায় যুক্ত সেবাকর্মীদের হোটেলে থাকা নিয়ে নানা দুর্নীতির অভিযোগ উঠে আসে। যার পরিপ্রেক্ষিতে হোটেলের পরিবর্তে সরকারি প্রতিষ্ঠানে থাকার ব্যবস্থা করা হচ্ছে চিকিৎসকদের। জানা গেছে, কোভিড-১৯ রোগীদের চিকিৎসাসেবার সঙ্গে জড়িত চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের আবাসিক হোটেলে থাকতে হবে না। ঢাকা মহানগরে কর্মরত চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা নির্ধারিত ছয়টি সরকারি প্রতিষ্ঠানে থাকতে পারবেন। আর ঢাকা মহানগরের বাইরের জেলা-উপজেলার ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা করে সরকারি প্রতিষ্ঠান বা অন্য কোনো প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানে অবস্থান করবেন।

তবে কেউ সরকারি আবাসন সুবিধা গ্রহণ করতে না চাইলে ভাতা পাবেন। ঢাকা মহানগরের একজন চিকিৎসক দৈনিক ২ হাজার টাকা, নার্স ১ হাজার ২০০ টাকা এবং অন্যরা ৮০০ টাকা করে ভাতা পাবেন।

ঢাকার বাইরের চিকিৎসকরা দৈনিক পাবেন ১ হাজার ৮০০ টাকা, নার্স ১ হাজার টাকা এবং অন্যরা পাবেন ৬৫০ টাকা করে। কেউ এক মাসে ১৫ দিনের বেশি এ ভাতা পাবেন না। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য বিভাগ থেকে এ সংক্রান্ত আদেশ জারির জন্য প্রধানমন্ত্রীর অনুমতি চেয়ে একটি প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। অনুমতি পেলে প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে।

ঢাকা মহানগরে ছয়টি প্রতিষ্ঠানকে আবাসন সুবিধার জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এগুলো হচ্ছে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (প্রশাসন) একাডেমি, বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ ম্যানেজমেন্ট, জাতীয় পরিকল্পনা ও উন্নয়ন একাডেমি, ন্যাশনাল একাডেমি অব এডুকেশনাল ম্যানেজমেন্ট, টিচার্স ট্রেনিং কলেজ ও জাতীয় স্থানীয় সরকার ইন্সটিটিউট। ঢাকা মহানগরের বাইরে জেলা-উপজেলার ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা করে সেখানে অবস্থিত বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান বা প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানে এমন ব্যবস্থা করা হবে।

সম্পর্কিত পোস্ট

আইন-বিধি মেনে কাজের গতি বাড়ানোর তাগিদ

banglarmukh official

আছিয়া ধর্ষণ ও হত্যার বিচার ৭ দিনের মধ্যে শুরু হবে: আইন উপদেষ্টা

banglarmukh official

শুক্রবার কক্সবাজার যাচ্ছেন প্রধান উপদেষ্টা ও জাতিসংঘ মহাসচিব

banglarmukh official

শিশু আছিয়ার মৃত্যুতে প্রধান উপদেষ্টার শোক, দ্রুত বিচার নিশ্চিতের নির্দেশ

banglarmukh official

২০২৬ সালেই বাংলাদেশকে এলডিসি থেকে উত্তরণ করা হবে

banglarmukh official

জাতিসংঘ মহাসচিব ঢাকায়

banglarmukh official